| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

যীশুখ্রিস্ট ও শ্রীরামকৃষ্ণ : লিখছেন প্রণবেশ চক্রবর্তী

Reporter
প্রণবেশ চক্রবর্তী / ২৪৬১ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০

শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দ তখন পুরীতে অবস্থান করছেন। একদিন জগন্নাথ মন্দিরের সামনে তিনি দেখলেন কয়েকজন খ্রিস্টান পাদ্রি যীশুর মহিমা কীর্তন ও খ্রিস্টধর্ম প্রচার করছেন এবং চারদিকে বহুলোক ভিড় করে তাদের কথা শুনছে। সেই ভিড় দেখে স্বামী প্রেমানন্দও দাঁড়িয়ে পড়লেন। পাদ্রিদের কাণ্ডকারখানা দেখে তাঁর মনে স্ব-ধর্মচেতনা হঠাৎ জাগ্রত হয়ে উঠল। তিনি শ্রোতাদের মধ্যে মিশে গিয়ে গলা উচ্চগ্রামে তুলে ‘হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষও তাঁর সঙ্গে গলা মিলিয়ে ‘হরিবোল’ দিতে লাগল। পরিনামে পাদ্রিদের প্রচারসভা ভেঙে গেল, প্রেমানন্দজি সেদিন এই সাহস ও স্ব-ধর্মপ্রীতি দেখিয়েছিলেন তার জন্য সকলেই তাঁর প্রশংসা করলেন ও তাঁকে অভিনন্দন জানালেন।

এই ঘনার কথা উল্লেখ করে স্বামী গম্ভীরানন্দ তাঁর ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা’ গ্রন্থে লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত ‘প্রেমানন্দের ভাগ্যে কিন্তু আসিল বিজয় উল্লাসের পরিবর্তে গভীর বিষাদ।’ রাত্রে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন, ঠাকুর দর্শন দিযা বলিতেছেন ‘হ্যাঁরে ওদের সভা ভেঙে দিলি কেন? ওরা তো আমার নাম, আমার কথাই প্রচার করছিল। কাল ভোরে উঠে গিয়েই ক্ষমা চাইবি ওদের কাছে।’ বাবুরাম (স্বামী প্রেমানন্দ) প্রত্যুষে উঠিয়াই শশব্যাস্ত অন্বেষণে নির্গত হইলেন এবং বহু কষ্টে খ্রিস্টান প্রচারকদের বাড়ীর সন্ধান পাইয়া ক্ষমা চাইয়া আসিলেন।

বেথেলহেম থেকে কামারপুকুর যদিও বহুদূরের পথ। এবং সময়ের বিচারে দূরত্ব যদিও প্রায় আঠারশ বছর, কিন্তু জীবনধারা ও ঘনাধারায় যীশু অবতার ও শ্রীরামকৃষ্ণ-অবতারের মধ্যে একা প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ও অভেদত্ব লক্ষ্যণীয়ভাবে সুস্পষ্ট। শ্রীরামকৃষ্ণের আরেকজন সন্ন্যাসী-শিষ্য স্বামী শিবানন্দজি ‘শিবানন্দ-বাণী’ (স্বামী অপূর্বানন্দ) গ্রন্থে বলেছেন, ‘যীশু ছিলেন সন্ন্যাসীর রাজা, ত্যাগের জ্বলন্ত মূর্তি। আদর্শ সন্ন্যাসী না হলে তাঁর অতি আশ্চর্য লোকাতীত জীবন ও অপরূপ উপদেশ বোঝা বড় কঠিন। আমরা ঠাকুরকে দেখেছি, তাঁর সঙ্গ লাভ করেছি, তাই তাঁকে কিছু কিছু বুঝতে পারি। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁকে কি করে বুঝবে? এমনকি যীশুখ্রিস্টের দলের লোকেরাও তাঁকে যথার্থরূপে বুঝতে পারেনি।’

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত এক বিশেষ অধ্যায় আছে, যার শিরোনাম ‘ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও যীশুখ্রিস্ট।’ এখানে খ্রিস্টধর্ম, খ্রিস্টত্ব ও রামকৃষ্ণ-ধর্ম, রামকৃষ্ণ-বেদান্তের তুলনামূলক আলোচনা স্থান পেয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, কথামৃতকার শ্রীম (মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত) স্বয়ং তাঁর পাঁচখণ্ড কথামৃতের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণের অপূর্ব জীবন ও অতুলনীয় বাণীর ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে ঘুরে ফিরে যীশুর প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন ও যীশুর সঙ্গে তুলনা করেছেন। কখনও কখনও তিনি এই দুই অবতার পুরুষের মধ্যে অভেদত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন।

এখানে এক ঘটনা অবশ্যই স্মরণীয়। শ্রীরামকৃষ্ণ মা ভবতারিণীর পূজারী এবং তিনি হিন্দুধর্মের প্রতিনিধি। অথচ দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে তিনি যে-ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দেওয়ালেই যীশুখ্রিস্টের একটি ছবি ছিল এবং আছে। আমরা কথামৃতকারকে অনুসরণ করে সেই ঘরের বর্ণনাটি একবার স্মরণ করতে পারি। শ্রীম লিখছেন, ‘ঘরের দেওয়ালে ঠাকুরদের ছবি, তার মধ্যে পিটার জলমধ্যে ডুবিতেছেন ও যীশু তাঁর হাত ধরিয়া তুলিতেছেন সেই ছবি খানিও আছে।’

কথামৃতের পঞ্চম ভাগে দেখি, ‘ভক্তেরা কেহ কেহ ভাবিতেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ কি অবতার পুরুষ? যেমন শ্রীকৃষ্ণ, চৈতন্যদেব, Christ?’ শুধুমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত বা অনুরাগীদের কাছেই যে শ্রীরামকৃষ্ণ ও যীশুর জীবন ও আদর্শের মিল ধরা পড়েছিল তাই নয়, ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষও এই দুই অবতারের মধ্যে সেকালে সাদৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। এখানে আমরা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ডা. কৌসে-এর কথা উল্লেখ করতে পারি। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের গলরোগের চিকিৎসক হিসেবে এসেছিলেন এবং বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই রোগীর রোগ নিরাময় করা অসাধ্য। তারপরই তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘এমন অদ্ভুত রোগীও জীবনে দেখি নাই! আমাদের ধর্মশাস্ত্র বাইবেলে পড়িয়াছি মাত্র, প্রভু ইশামশীর ভগবৎ-কথা প্রসঙ্গে এইরূপ ‘ট্রান্স’—ভাবসমাধি হইত। আজ কিন্তু প্রত্যক্ষ করিলাম, এই মহাভাগ স্বেচ্ছায় এমন সমাধিস্থ হইলেন যে, দেহবুদ্ধি আদৌই রহিল না। ইহার পুণ্য-দর্শনে আমি এতই মুগ্ধ যে, পারিশ্রমিক লইয়া হস্ত ও মনকে কলুষিত করিতে পারি না। বরং আমার প্রাপ্য অর্থ ইহারই সেবায় উৎসর্গ করিলাম।’ এই বর্ণনা আমরা পেয়েছি বৈকুণ্ঠনাথ সান্যল রচিত ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ-লীলামৃত’ গ্রন্থে।

একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, এই দুই অবতার পুরুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত উভয়ের জীবনের ঘটনাবলীর মধ্যে এক অদ্ভুত সাদৃশ্য। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, আজ পর্যন্ত এই বিশ্বে যীশুখ্রিস্ট হলেন সব থেকে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। গত দু-হাজার বছর ধরে সেই একই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নরনারী যে কোন ভাবেই হোক খ্রিস্টান। রোমান সম্রাট থেকে শুরু করে বহু রাজা, মহারাজা এই ধর্মের প্রচারে ও প্রসারে রাজশক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছেন।

অথচ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মের পর (১৮৩৬-৮৬) মাত্র দেড়শ বছর ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। তিনি কোনো নতুন ধর্মমত প্রচার করেননি, তৈরি করেননি কোনো সম্প্রদায়ও, পরাধীন ভারতবর্ষে তাঁর আবির্ভাব—কোনও রাজা মহারাজার পৃষ্ঠপোষকতা তিনি কোনোদিনই পাননি। তবুও এই অল্প সময়ের মধ্যে সাত মহাদেশের অসংখ্য মানুষ তাঁর আশ্রয়ে এসে সমবেত হয়েছে। বহু বিখ্যাত শিল্পী, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও ঐতিহাসিক তাঁকে নিয়ে গবেষণা করছেন এবং বই লিখেছেন।

যীশুখ্রীষ্টের সমগ্র জীবন যেমন মানবকল্যাণে নিয়োজিত, তেমনি শ্রীরামকৃষ্ণের মহাজীবনও মানুষের জন্য নিয়োজিত। বিখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক রোঁমা রোঁলা তাঁর সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থ ‘রামকৃষ্ণ জীবন’-এর ভূমিকায় লিখেছেন, রামকৃষ্ণকে আমি আমার অন্তরঙ্গ বলে অনুভব করি। এর কারণ এই নয় যে, তাঁর শিষ্যদের মতো আমি তাঁকে ভগবানের অবতার বলে ভাবি। তার কারণ, তাঁর মধ্যে আমি মানুষকে প্রত্যক্ষ করেছি। যীশু যেমন সমাজের ব্রাত্যজনকে কৃপা করেছেন, সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণও একইভাবে রসিক মেথর থেকে শুরু করে চিনু শাঁখারি পর্যন্ত অসংখ্য অন্ত্যজ মানুষকে নিজের বুকে টেনে নিয়েছেন। পণ্ডিত ব্যক্তিরা শ্রীরামকৃষ্ণকে যতখানি পেয়েছেন, সমাজের নিচুতলার মানুষ পেয়েছে তার থেকে অনেক বেশী।

রোঁমা রোঁলা শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্ত-শিষ্যদের কথা বলতে গিয়ে যীশুর জীবনের অনেক ঘটনা তুলে ধরেছেন এবং এই দুই মহাপুরুষের জীবন ও চরিত্রের অপরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘খ্রিস্টের কনিষ্ঠ ভ্রাতা’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘তিনি ছিলেন এই বঙ্গীয় যীশুর প্রচার-দূত সেন্ট-পল।’

একজন খ্রিস্টান ভক্ত উইলিয়ামস দক্ষিণেশ্বরে এসেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে। প্রথম দর্শনেই তিনি অবাক বিস্ময়ে শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে থাকেন। শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে তিনিও ঈশ্বরপুত্র যীশুখ্রিস্টকে প্রত্যক্ষ করেন এবং ঈশ্বর সান্নিধ্যের দিব্য উপলব্ধিতে তাঁর মন প্রাণ ভরে যায়, পরিপূর্ণ হয় তাঁর সমগ্র সত্বা। শ্রীরামকৃষ্ণ যখন উত্তর কলকাতার শ্যমপুকুর স্ট্রিটের ‘শ্যমপুকুরবাটিতে’ চিকিৎসার প্রয়োজনে অবস্থান করছিলেন সেই সময় একজন নিষ্ঠাবান খ্রিস্টান ধর্মযাজক শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শন করতে ওখানে আসেন, তিনি পরে বলেছিলেন, ইনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) এখন এই আছেন—আবার একসময় সাক্ষাৎ ঈশ্বর। আপনারা এনাকে চিনতে পাচ্ছেন না। প্রকৃতপক্ষে শ্রীরামকৃষ্ণকে সেই পাদ্রি প্রভুদয়াল তাঁর ইষ্ট দেবতা সাক্ষাৎ ঈশা বলে নিজ মত ব্যক্ত করেছিলেন এবং তাঁর চরণপ্রান্তে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, যীশুখ্রিস্ট স্বয়ং ঈশ্বর এবং শ্রীরামকৃষ্ণ সাক্ষাৎ ঈশ্বর।

যীশুর মতোই শ্রীরামকৃষ্ণও ছিলেন প্রেমের অবতার। তাই রোঁমা রোঁলা শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে দেখেছেন, ‘সেই একই মানবপুত্র যেন নতুন করে জন্মগ্রহণ করেছেন—চেতনায়, চরিত্রে, অভিজ্ঞতায় আরো সমৃদ্ধ ও ঐশ্বর্যবান হয়ে এসেছেন এবারে। কারণ খ্রিস্টের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত প্রসারিত সময়ের মধ্যে যে কঠিন মানবিক সমস্যাবলী জমে উঠেছে—সে সবের সহজ সমাধান আমরা খুঁজে পাই যীশুর কনিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বাণীর মধ্যে।’ তিনিও শ্রীরামকৃষ্ণকে ‘প্রেমের অবতার’ বলে উল্লেখ করেছেন। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন ‘মূর্তিমান প্রেম।’

অন্যান্য অবতার বা সাধকদের মতো যীশুখ্রিস্ট ও শ্রীরামকৃষ্ণ এই দুঃখময় জগৎ সংসারকে ত্যাগ করে নির্জনে চলে যাননি। বরং তাঁরা আর্ত-পীড়িত-যন্ত্রণাকাতর মানুষের জীবনে দিব্য আশীর্বাদরূপে বারবার দেখা দিয়েছেন। তাঁরা দুজনেই গল্পের মাধ্যমে মানুষকে ধর্ম ও নীতিশিক্ষা দিয়েছেন। স্বামী সারদানন্দজি ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ লীলা প্রসঙ্গ’-এ লিখেছেন, ‘সকল মহাপুরুষদিগের জীবনে দেখা যায়, তাঁহারা সাদা কথায় মর্মস্পর্শী ছোট ছোট গল্প, উপমা বা রূপকের সহায্যে যাহা বলিবার বলিয়া ও বুঝাইয়া গিয়াছেন। লম্বা-চওড়া কথা, দীর্ঘ-দীর্ঘ সমাস প্রভৃতির ধার দিয়াও যাননি। কিন্তু সেই সাদা কথার, সেই ছোট উপমার ভিতর এতো ভাব ও মানব সাধারণকে উচ্চ আদর্শে পৌঁছাইয়া দিবার এত শক্তি রহিযাছে যে, আমরা হাজার হাজার বৎসর ধরিয়া চেষ্টা করিয়াও তাহাদের ভাবের অন্ত ও শক্তির সীমা এখনো করিতে পারিলাম না।’

সেকালের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত এবং ধর্ম জগতের নক্ষত্র কেশবচন্দ্র সেনের মতো মানুষেরাও শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখে এবং তাঁর কথা শুনে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গিয়েছেন। তাঁরা ভেবেছেন, ‘কি আশ্চর্য, নিরক্ষর ব্যক্তি এতসব কথা কিরূপে বলছেন? এ যে ঠিক যীশুখ্রিস্টের মতো কথা! গ্রাম্যভাষা! সেই গল্প করে করে বুঝানো—যাতে পুরুষ-স্ত্রী-ছেলে সকলে অনায়াসে বুঝতে পারে। যীশু ‘পিতা পিতা’ বলে পাগল হয়েছিলেন, আর ইনি ‘মা মা’ করে পাগল। ….ইনিও যীশুর মতো ত্যাগী। তাঁহারই মতো ইঁহারও জ্বলন্ত বিশ্বাস, তাই কথাগুলির এত জোর!’

এই দুই অবতার পুরুষই আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ত্যাগ, সেবা ও সমদর্শনের এক অভ্রান্ত পথ। আর দুজনেই দেখিয়েছেন সত্য লাভের পথ। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন, ‘সত্যই কলির তপস্যা।’ যীশুখ্রিস্ট প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘এই ঈশ্বরের দূত বার্তাবহ যীশু সত্যলাভের পথ দেখাইতে আসিযাছিলেন।’ যীশুখ্রিস্টের জীবন ও বাণী যেমন বাইবেলের মাধ্যমে ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, তেমনি শ্রীরামকৃষ্ণ-মহাজীবনের কথাও মনে মনে প্রাণে প্রাণে প্রচারিত হয়েছে ‘পঞ্চম বেদ’ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের মাধ্যমে। আজকের পৃথিবী এবং এই পৃথিবীর যন্ত্রণাবিদ্ধ মানুষ কথামৃতের অমৃত পাণ করে নবজীবনে সঞ্জীবিত হচ্ছে দেশ ও দেশান্তরে।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev