গত শুক্রবার জাতির উদ্দেশে ১৫ মিনিটের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার কৃষকদের বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটি আজ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রথমত; কৃষি আইন প্রণয়ন হওয়ার পর থেকেই কৃষকেরা আন্দোলনে নামেন। উত্তাল হয় দেশের রাজধানী। টানা দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষকরা তাদের দাবিতে অনড় থেকে যে আন্দোলন চালান তার সামনের সারিতে ছিলেন পাঞ্জাব, হরিয়ানা, পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কৃষকরা। কিন্তু কেন্দ্র কৃষকদের দাবি মানেনি, বরং কৃষি আইনকে ‘যুগান্তকারী’ সিদ্ধান্ত বলে বর্ণনা করেছে। একাধিকবার দু’পক্ষের বৈঠক হয়েছে কিন্তু প্রতিবারই তা নিস্ফলা থেকে গিয়েছে। কিন্তু আচমকাই সেদিন সকালে মোদী ভোল বদল করে কৃষকদের জেদের কাছে নতি স্বীকার করলেন। কারণ ২০২২ সালে যে পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচন তার মধ্যে একমাত্র গোয়া বাদ দিলে বাকি চার রাজ্যেই কৃষক আন্দোলনের যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে।
কৃষি আইন প্রত্যাহারের পিছনে যেমন মোদীর ৪ রাজ্যের ভোট সমীকরণ রয়েছে উলটো দিকে কৃষকদের রয়েছে এই সরকারের প্রতি তীব্র অনীহা ও অনমনীয় ভাব। গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে পার্লামেন্টের অধিবেশনে বিনা আলোচনায় তিনটি কৃষি বিল আইনে পরিণত হয়। আইনগুলি পাস হয় বিরোধী ও কৃষকদের দাবি উপেক্ষা করেই। সেদিন মোদী সরকার তাদের অবস্থান নিয়ে ছিলেন অনড়। যে কারণে একাধিকবার কৃষক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে বসলেও তা নিস্ফলা হয়। তাই মোদীর সিদ্ধান্ত বদলের কারণে তিনি যে কৃষকদের আস্থা বা বিশ্বাস ফিরে পেলেন তা কিন্তু একেবারেই নয়। বরং কৃষি বিল প্রত্যাহারের দিন থেকেই সংযুক্ত কিষাণ মোর্চার তরফে প্রধানমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে যে বিগত বছর ধরে তাদের লাগাতার আন্দোলন কেবলমাত্র তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার নয়। তাদের দাবি, সমস্ত কৃষি পণ্য এবং সব কৃষকদের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি। অতএব সরকারকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের গ্যারান্টি দিতে আইন প্রণয়ন করতে হবে। আর কেবল মুখে কৃষি আইনগুলি প্রত্যাহার করলেই হবে না, আইনমাফিক পদক্ষেপ করতে হবে সরকারকে।
প্রসঙ্গত রবিবার কৃষকদের যৌথ মঞ্চ সংযুক্ত কিসান মোর্চা বৈঠকের পর জানিয়েছে, নির্ধারিত কোনও আন্দোলন কর্মসূচির পরিবর্তন এই মুহুর্তে হচ্ছে না। অর্থাৎ, এই মাসে লখনৌতে কিসান মহাপঞ্চায়েত, দিল্লিতে জমায়েত ও সংসদ অভিযানের বিষয়ে তারা যে কর্মসুচি ঘোষণা করেছিলেন, তা বহাল থাকছে। এমনকি দিল্লি সীমান্তের বিক্ষোভ আন্দোলনের জায়গা থেকেও তাঁরা সরছেন না। ২৬ নভেম্বর দিল্লি সীমান্তে বড়সড় জমায়েত এবং ট্র্যাক্টর ও গরুর গাড়ির মিছিল। ২৯ নভেম্বর সংসদের অধিবেশন শুরুর দিন আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের দিকে পাঁচশো জন করে শান্তিপূর্ণ ট্র্যাক্টর মিছিল মিছিল করবেন। অর্থাৎ মোদী যে উদ্দেশ্যে কৃষকদের প্রতি দরদী হলেন কৃষকেরা মোদী সরকারের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ানো শুরু করলেন। উত্তর পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে কৃষি আইন প্রত্যাহারের ফলে বিজেপির নিয়ন্ত্রণে আসতে চলেছে, এমনটা ভাবা ভুল।
অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোদীর এই সিদ্ধান্তকে ভোটকেন্দ্রিক বলছেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০২২ সালে যে রাজ্যগুলিতে বিধানসভা নির্বাচন, তার মধ্যে অন্যতম পাঞ্জাব। শিখপ্রধান এই রাজ্য থেকেই সব থেকে বেশি সংখ্যক কৃষক আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কৃষকদের আন্দোলনে শিখদের আধিক্য মাথায় রেখেই মোদী শিখদের প্রথম গুরু নানক দেবের জন্মবার্ষিকী পবিত্র ‘গুরু পরব’ বেছে নেন। তিনি শিখদের গুরুর নামও উল্লেখ করেন। কিন্তু মোদীর সিদ্ধান্তে পাঞ্জাবের মানুষ কি আদৌ খুশি হতে পেরেছে?
আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা কৃষকেরা পাঞ্জাব-হরিয়ানা-সহ অন্যান্য রাজ্য থেকে নিজেদের ঘর-সংসার ছেড়ে প্রায় এক বছর ধরে দিল্লির সীমান্তে এসে অবস্থান করছেন। অনেকের পরিবারও সেখানে রয়েছে। তাঁরা শিশুদের পড়াশোনা করাতে স্কুল গড়ে তুলেছেন। কমিউনিটি কিচেন গড়ে দিনের পর দিন কৃষকদের খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। এই আন্দোলনে ৭০০–এর বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু সরকার কর্ণপাত করেনি। উলটে কৃষকদের গায়ে দেশদ্রোহীর তকমা লাগিয়ে দিয়েছে সরকার। বর্বরোচিত হামলা চালিয়ে, মামলা করে, কৃষকদের আন্দোলন ভেঙে ফেলতে চেষ্টা করেছে। ভোটের আগে মোদীর কাছে আজ কৃষকরা মহান। তিনি বলেছেন, সরকার কৃষককে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন। সেই ব্যার্থতা মনে হয় ভোটের বাক্সেও থেকে যাবে কারণ, মোদীর কৃষকদের প্রতি দরদের পর মোদির প্রতি কৃষকদের অবিশ্বাসের অবস্থান কৃষকদের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কৃষকেরা বলছেন, আইন প্রত্যাহার হয়েছে মুখে। কিন্তু তা কার্যক্র না হওয়া পর্যন্ত মাঠে থাকবেন তাঁরা। প্রশ্ন হল, মোদী যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই আইন তিনটি বাতিল করলেন, সেই উদ্দেশ্য অর্থাৎ ভোটে কি তিনি সেই ফল পাবেন? কৃষকেরা কী এত তাড়াতাড়ি কঠিন শীতের রাতে জল-কামান, সতীর্থের মৃত্যুর ঘটনা ভুলে ভোটে বিজেপিকেই জয়যুক্ত করবেন?
এমনিতেই যোগীর রাজ্যের অব্যবস্থা করোনাকালের আগে থেকেই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল, তার ওপর সে রাজ্যের ধর্মীয় বিভাজনের যে ফায়দা বিজেপি এর আগে ঘরে তুলেছিল, তা এবার তোলা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা। তাদের ব্যাখ্যা কৃষক আন্দোলনের সময় থেকে জাঠ ও মুসলিমরা কাছাকাছি এসেছে। অন্যদিকে জাটরাও বিজেপির ওপর খেপেছিল। বেশ কিছু গ্রামে বিজেপির স্থানীয় নেতাদের ঢোকা নিষিদ্ধ। জনহিতকারী একাধিক পরিকল্পনা সত্ত্বেও বিজেপির প্রতি এ রাজ্যের মানুষের প্রবল ক্ষোভ রয়েছে। ৪০৩ আসনের উত্তরপ্রদেশে বিজেপি এবার ১৭৫ আসন পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় জানিয়েছে সমীক্ষা। যোগী রাজ্যে পরিস্থিতি উত্তরোত্তর খারাপ হওয়া ঠেকাতে মোদী শেষ পর্যন্ত কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হলেও তার ফল পাওয়া মুশকিল।