আধুনিক কবি, প্রাবন্ধিক তথা শিক্ষক দেবজ্যোতি কর্মকারের ‘অলৌকিক জন্ম’ কাব্যগ্রন্থটি পড়লাম। কাব্যটি প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে সাড়ে তিন বছরেরও আগে। এতদিন পরে তাহলে কেন এই গ্রন্থ নিয়ে আলোচনায় আসলাম এ নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কাব্য যদি মধুর হয় তার তো আর সময়ের বাধাধরা গণ্ডি থাকে না, তা যে কোনো সময়, যে কোন কালে সমসাময়িক হয়ে ওঠে। আমার কাছে এই কাব্যগ্রন্থটি পড়েও মনে হল এখনো এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে প্রত্যেকটি কবিতায় অনেকটা প্রাসঙ্গিক। রবি ঠাকুর আবেগ আপ্লুত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন—
“আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছো বসে আমার কবিতাখানি/ কৌতুহল ভরে।”
রবীন্দ্রনাথও জানতেন আজ থেকে ১০০ বছর পরেও তাঁর কবিতা রয়ে যাবে আধুনিক হয়ে,হয়ে উঠবে চিরন্তন, শ্বাশ্বত, ও সমসাময়িক বা প্রাসঙ্গিক।
২৭ টি কবিতায় ঋদ্ধ ‘অলৌকিক জন্ম’ কাব্যগ্রন্থের প্রত্যেকটি কবিতাই এক এক রকম অনুভূতি নিয়ে হাজির হয়েছে পাঠকের দরবারে। কতটা নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর মননের সূক্ষ্ম অনুভূতি থাকলে এ ধরনের একটি কাব্যগ্রন্থের পরিকল্পনা করা যায় তা ভাবতে অবাক লাগে।এই কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয় প্রেম, যন্ত্রণা, বিরহ যাপন, দহন, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস, হতাশা, বিপন্নতা, অভিমান, নিঃসঙ্গতা। মানসিক ভাবাবেগ নয়, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে অসম্ভব এক অলৌকিকতার জাল বুনেছেন কবি। হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক উপলব্ধি কবিকে জীবন রসে জারিত হতে সাহায্য করেছে। তার ফলস্বরূপ এরকম একটা কাব্যগ্রন্থ আমরা উপহার পেয়েছি।
প্রেম মানব জীবনের এক শ্বাশ্বত সত্য। আর প্রেম,অতৃপ্তি এ থেকেই আসে বিরহ,অভিমান,যন্ত্রণা আর আত্মদহন। সেই আত্মদহনে ক্রমে পরিণত হয় ‘নিকষিত হেম’-এ। কেননা বিরহ না আসলে প্রেমে মিলন আসে না। তাই ‘প্রেম’ কবিতায় কবি বলেছেন—
“এবার দীর্ঘতর অন্ধকার খুঁজে নেব আলোর বুক থেকে
খুলে দেব সব অন্তর্বাস
আমাকে ঘিরে যেসব নিয়ত নিয়ন
শুকোতে দেওয়া ঘাম
কিছু স্তন্যপায়ী অসুখ
সব রেখে যাব—
তারপর
পৃথিবীর প্রাচীন প্রেম শিখে নেব অন্ধকারের উত্তাপ বুকে দাঁড়িয়ে থাকা বোকা মেয়েটির থেকে।”
আলোর দিক থেকে অন্ধকারের দিকে যাত্রা,সমস্ত অসুখকে দূরে সরিয়ে আদিম প্রেম, প্রবৃত্তিকে শিখে নিতে চেয়েছেন কবি। কিন্তু প্রেম,নারী,নগ্নতা, যৌনতা, নশ্বর জীবনের মধ্যেই মানুষ বিচরণ করা সত্ত্বেও কবি এক অনাসক্ত জীবনকে বরণ করে নিতে চেয়েছেন—
“তুমি ইচ্ছে হলেই উপড়ে নিতে পার শিকড় বাকড় দেহ
অথচ রাত্রি হলেই নগ্ন হও
মুঠো ভর্তি আগুন
কেমন করে ফাঁস পরিয়ে পুরুষ চোখে আত্মহত্যা ঝরাও!
আমাদের কলঙ্কেরা দ্যাখো
আঁশটে খুলে রাখছে ময়ূর পাখায়
এই হৃদযমুনায় ধরে আছি বিরহমাথুর আর
কলস থেকে ছিটকে পড়া প্রেম।”
যে প্রেম কলস থেকে ছিটকে বেরিয়ে যেতে চায়, তাকে আর ধরে রাখা যায় না। এই শিথিলতা ক্রমে ক্রমে কবিকে অনাসক্ত করে তোলে। কিন্তু অনাসক্ত হতে চাইলেই কি আর সহজে হওয়া যায়! তাইতো আক্ষেপ ঝরে পড়েছে কবিকণ্ঠে—
“এখনো পথের ধারে বসে বাউল হতে পারিনি
কতদিন চাঁদ দেখবো বলে
উঠোনময় ব্যস্ততা! রাত্রি যাপন—”
আবার বলেছেন—
“চলে গেছি
যেমনটা চেয়েছিলে।
আঁকড়ে আছি কত কিছু।
বারবার তবু ফাঁক গলে
সরে যাচ্ছ কোথায়!”
দয়িতার সঙ্গে কাটানো মধুর স্মৃতিগুলো, ‘সে সব অবাধ্য ছোঁয়া’ আঁকড়ে ধরা সত্ত্বেও সময়ের ফাঁক গলে সরে যায় একসময়। আর তখনই কবি অনাসক্ত হয়ে পড়েন আর প্রিয় বাঁশিটি হয়ে পড়ে বিকলাঙ্গ—
“তারপর থেকে
এই বিকলাঙ্গ বাঁশি
ভাসিয়ে দিলাম জলে।”
অথবা
“সেই যে নূপুর খুলে দিলে
আর লিপস্টিক ঘ্রাণ ভাসিয়ে দিলাম জলে…”
কবির চারিদিকে অথৈ জল। এ জল আসলে সাংসারিক বন্ধন, বাধা-বিপত্তি, অন্তরায় বা প্রতিবন্ধকতার প্রতীক। সেই জল পেরিয়ে দূরে একসময় কোথায় হারিয়ে যায় প্রিয়তমার উত্তাপ আর নূপুরের নিক্বণ। মনে হয় এ যেন শরতের মেঘের মতো অল্প সময় স্থায়ী স্বপ্নের এক বুঁদবুঁদ। তাই—
“এক একটা জীবন তবু নির্বাসিত হয় হাঁটতে থাকি ছায়াপথ ধরে
প্রিয়তম নদী সরে সরে যায় দূরে
যন্ত্রণা অভ্যেস হয়ে যায়।”
যন্ত্রণার সেই ক্ষত এখন কবির বুকে দগদগে ঘা এর মত থেকে গেছে, যাকে তিনি কখনো সারাতে পারেননি—
“একটি কথা আজও বিঁধে আছে বুকে তোমাকেই দেখাব তার দহন
কতবার চেষ্টা করেছি উপড়ে দেবার!
এই শরীরে তবু থেকে গেল বিষ
সেই মাতৃগর্ভ থেকে আমার চিৎকার আজকেও নিঃসঙ্গ ঝড়
একটি দহন এঁকে চলেছি বারবার
ঈশ্বর-তুমি না হয় এসো এবার
ঝরিয়ে দাও আমার সব অস্থিরতা।”
তাইতো সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের কাছেই কবি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছেন। কোন এক অলৌকিক জন্মকে বরণ করে নিতে চেয়েছেন—
“আর কোনও কথা নেই আমার/
যা কিছু ছিল সবটুকু নিজস্ব ছায়ারেখায়/ মিশিয়ে দিয়েছি সমুদ্র ফেনায়।”
আবার কখনো বলেছেন—
“চলেই এসেছি কতকিছু উপেক্ষা করে
আর ফেরা হবে না জানি
শুধু তাকিয়ে থাকা —
অলৌকিক জন্মের দিকে চেয়ে।”
জীবনের পথে চলতে চলতে আামাদের একটু একটু করে যাবতীয় ঋণের বোঝা বেড়েই চলে। পাশাপাশি এসে পড়ে অনেক দায়বদ্ধতা, দায়িত্বশীলতা। কবি সুকান্ত যেমন উচ্চারণ করেছিলেন—
“চলে যাব তবু আজ
যতক্ষণ দেহ আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃহ অঙ্গীকার।”
কবি রবীন্দ্রনাথও যেমন মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জীবনের ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন তেমনি কবির অঙ্গীকার একটা একটা করে জীবনের ঋণ শোধ করা।
“আমি হাঁটছি
আমার সন্তানকে ঋণ বইতে হবে না বলে
এখনও ব্যস্ত রৌদ্রে আমি ঋণ শোধ করছি
ডুবে যাচ্ছি অসীম হাওয়ায়।”
কিন্তু —
“সমস্ত গাছেরা আজও
আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে।”
তাই কবি আবারও এক অলৌকিক জন্মের ছবি এঁকেছেন—
“সবকিছু থেকে একটু ফাঁক গলিয়ে নতুন কোনও জন্ম আঁকি।”
কিন্তু কিছুই গুছিয়ে নিতে পারেননি কবি।গুছিয়ে নিতে চাইলেও পুনরায় সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়—
“এক একটা বিকেল মায়াবী হয়ে যায় উপোসী শরীর সহবাস খোঁজে
তোমার খেয়ালি প্রেমে
সবকিছু পরাজয়।”
তাই-
“আমাদের যাবতীয় মেঘ
জানালায় আটকে গ্যাছে কবে।”
কার্নিশে বৃষ্টির দাগ লেগে থাকা, বৈশাখ ডাকা, নিজস্ব মেঘ বৈঠক, আত্মস্বর নিয়ে কবি সেই ছায়া চিহ্নের স্পর্শে দাঁড়িয়ে থাকেন কোনো এক অলৌকিক জন্মের খোঁজে —
” একটা করে কথা খুঁজছি
আর গেঁথে রাখছি সুতোয়—”
কবি একটা একটা করে কথা খুঁজে কথার মালা তৈরি করেছেন আর আমাদের ভাবিয়েছেন কখনো প্রেমে, কখনো বিরহ-বেদনায়, কখনো অভিমানে। আশ্চর্য এক উপলব্ধির শক্তিতে জারিত হয়েই কবি বরণ করে নিতে চেয়েছেন এক ‘অলৌকিক জন্ম’।
সবশেষে আসি কবিতার নির্মাণ শৈলীতে। আত্মদীপ্ত প্রকাশভঙ্গী, শব্দচয়ন কৌশল, খুব সহজে অনেক কঠিন কথা বলা অর্থাৎ ওই একটুখানির মধ্যে অনেকখানি ভাবের প্রকাশ, কবি হৃদয়ের আশা-আকাঙ্ক্ষা, চাওয়া-পাওয়া, ব্যক্তিগত আবেগ যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে কবিতা গুলির মধ্যে। যাতে কিছুটা গীতি কবিতার বৈশিষ্ট্যও ফুটে উঠেছে কবিতাগুলিতে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কাব্য কবিতা তখনই বিশ্বজনীন হয়ে ওঠে যখন তা ‘আমি’-র গণ্ডি থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর স্তরে উত্তীর্ণ হয়। সেই অর্থে দেবজ্যোতি কর্মকারের কবিতার এই বইটিও সর্বস্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে, আবারও নতুন করে একান্ত অনুগত কবিতা পাঠককে বিমোহিত করবে সন্দেহ নেই।
কাব্যগ্রন্থঃ ‘অলৌকিক জন্ম’। কবিঃ দেবজ্যোতি কর্মকার।, প্রথম প্রকাশঃ ২০২০,৯ জানুয়ারি। প্রকাশকঃ ‘আকাশ’ ৫২/জি/১ ডলি আবাসন, বাবুপাড়া,গোরাবাজার, বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ-৭৪২১০১। প্রচ্ছদ শিল্পীঃ অভিজিৎ রায়। উৎসর্গঃ মন। মূল্যঃ ৬০ টাকা।