বেশ লম্বা আর চওড়া উচ্ছ্বাসের স্বপ্নগুলো। অদ্ভূত অদ্ভূত স্বপ্নরা ওর চোখে আহ্লাদী মেয়ের মত খেলা করে৷ ওর স্বপ্নীল ভাবনাগুলো কখনো কখনো ডানা মেলে উড়ে যায়, আবার সেই ডানায় ভর করে ফিরে আসতে ভুল করে না। স্বপ্ন রাগিনীর অপূর্ব সব সুর মূর্ছনায় মিশে থাকে ও।
শোক, তাপ, ক্ষুধা, ব্যর্থতা ভুলে নতুন করে স্বপ্নের নকশিকাঁথায় বুনন তোলে গ্রাম্য বৌয়ের মত ও। আলো থেকে আলো নিয়ে আলোকিত করেছে জীবন। ঝড়ের শক্তির মত বিশ্বাসের জোর ওর। কল্পনার আজগুবি ডানায় উড়ে বেড়ালেও কেউ বলতে পারবে না কিভাবে এত অল্প সময়ে সে আজ এই পর্যায়ে উপনীত হলো। সুখ শান্তির চাদরে মোড়া আজ তার গৃহ।
মনের আবহাওয়ায় দিন বদলের চিঠি। বাতাস যেন উন্মাতাল। কেন? ঘরে পটে আঁকা ছবির মত লাল সিঁদুরে রঙিন বধূ এসেছে। শব্দহীন আনন্দ মনের অলিন্দে পোনা মাছের মত কিলবিল করছে উচ্ছ্বাসের। মনে মনে কিছুটা ক্ষণ ভেবে কাটালো। ভাবায় ওর কাজ। আগামি দিনের পথ চলার মানচিত্রটা ধীরে ধীরে মনের কোঠরে আঁকলো। আকাশের দিকে তাকালো, জোনাকিরা যেন হাসছে।
বধূর দিকে তাকাতে কিসের বাধা? অদ্যবধি কোন নারীর দিকে এক পলকে যতটুকু দেখা যায় তার বেশি তো দেখা হয়ে উঠেনি। অদ্ভূত সুন্দর মেয়ে। মারাত্মক সুন্দরী মেয়ে। এত সুন্দর হওয়া ভারী অন্যায়। দেখে মনে হলো শঙ্খের মত দুই হাতে গলা ধরে ঠোঁটের কাজটা শুরু করে দিলে ভালো হত। সংযত হলো। মনের কুটিল রিপুকে যে যত সংযত করতে পেরেছে ভবিষ্যতের বন্ধুর পথ হাটা তার অনেক সহজ হয়েছে।
দূর থেকেই দেখছে। তাতেই অদ্ভূত অনুভূতি মনে জাগছে। রূপ থেকে খসে পড়ছে মায়াবী আলো। ঝলমলে হীরের আংটির ঝিলিক এসে চোখকে ধাঁধিঁয়ে দিচ্ছে। মনে মনে একরাশ ভাবনা ছেকে ধরলো মৌমাছির মত, মন বললো, লোভাতুর সুখ কোন দূরের বিষয় নয়, যদি তোমার সাথে পথ চলতে পারি। জীবন চলার পথে তুমি যোগ হলে, তোমায় নিয়ে চলবো পথ অনন্তকাল।
অদৃশ্য সুখের এক কাব্য উচ্ছ্বাসের বুকে হলি খেলছে। নির্বোধ বালকের মত হয়ে গেছে ও। হঠাৎ কেমন একটা সংকোচবোধ হলো নিজের মাঝে। যেন ঘোর কেটেছে। ওর রূপ যদি এমনি করে ঘোরের মধ্যে রেখে দেয় সেটি অস্বাভাবিক এবং অবশ্যই ব্যাধি হয়ে পড়বে। আবার তাকালো। যেন চোখের বিরতি শেষে পুনরায় দর্শন ক্রিয়ায় মনোনিবেশ। ভাবলো, দেখছি তো আমার প্রিয়জনকে, দোষ কেনো তবে? প্রিয়জনকে দেখার জন্যও অনেক সাহস প্রয়োজন, নতুবা বুকে ধুকধুক করবে কেন?
ও সুগোল চাঁদের মত যৌবনবতী, নতুবা ওর থেকে এত আলো বিচ্ছুরিত হবে কেন? অপূর্ব রূপের মোহময়ী ঝর্ণাধারায় সুস্নাত উচ্ছ্বাস। হঠাৎ নেতিবাচক চিন্তা মস্তিষ্কে কুণ্ডলী পাকালো, ভাবলো, তোমায় ঘিরে আমার যে স্বপ্ন তা ঝলসে যাবে না তো? ভাবনা-চিন্তার বহর কুঁচকে যাবে না তো?
মেয়েটি এতক্ষণ অনড় ছিলো পাথরের মত। কাজল কালো চোখের দুই কোণে হাসির ভাজ পড়লো। মায়াবী মুখে অনাবিল আনন্দ। উচ্ছ্বাস বাস্তবে, না স্বপ্নের জগতে বুঝতে গিয়ে থতমত খেয়ে গেলো। ও জেগে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পটু, ঘুমের স্বপ্নে বিশ্বাসী নয়। ঘুমের স্বপ্নে আছে হৃদয়কে ক্ষত করার অতর্কিত হানা।
কারো সাহসে কুলাচ্ছে না, কেউ কথাও বলছে না। উচ্ছ্বাস তো সাহস আর মনোবলের কারণে উঠে আসতে পেরেছে, সেতো জানতো সাহসের সীমাবদ্ধতা বলে কিছু নেই। তবে নিজের স্ত্রীর সাথে প্রথম কথা বলতে এত বুক কাঁপছে কেনো? ভাষা হারিয়ে ফেলছে কেনো? কোন একটার নিশ্চয় অভাব। আর অভাবটা বোধ হয় তেমন কিছুই নয়, প্রথমে কি বলবে এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্যেই আটকা পড়ে গেছে।
উচ্ছ্বাসের মনে অদ্ভূত এক পুলক। এটা যেন জীবনের শ্রেষ্ঠ পাওয়া। আসলে মনের মত হয়েছে বলেই মনে এত আকুলি-বিকুলি কিলবিল করছে। দুটি চোখ তুলে তাকালো অর্নিমা। দোলনচাঁপার পাপড়ির মত কোমল দুটি গাল। অদ্ভুত এক মোহ তাতে আঠার মত জেগে আছে। দেখে বিহ্বল হয়ে গেলো উচ্ছ্বাস। ভাবলো, রংধনুর কোন রংই রং নয় তোমার পানে যদি চাই। তোমার জন্য আকাশ থেকে চাঁদ না এনে দিতে পারলেও পদ্মা-মেঘনা সেচন করে মুক্তো এনে দিতে পারবো।
রাত বাড়ছে। চাঁদ দ্রুততর ছড়িয়ে দিচ্ছে তার জ্যোৎস্নার চাদর। সময়ের অগ্রগতির সংকেত পাচ্ছে অথচ তাদের মধ্যের সংকোচ থাকলো সেভাবেই। উভয়ই মুখ তুলছে, কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারছে না। উচ্ছ্বাস অর্নিমার দিকে নড়েচড়ে তাকালো, এবার একটা কিছু বলবেই। দেখলো, বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিকন নদীটার মত ওর কপালে সিঁথি। রক্ত রাঙা সিঁদুরে চিকমিক করছে সিঁথিটি। আয়নায় দীর্ঘ সময় অপব্যয় করে ও ওর সুন্দর মুখটাকে আরো সুন্দর করে সাজিয়েছে উচ্ছ্বাসের জন্য, আজকের এই রাত্রির জন্য।
মাথার উপর থেকে ঘোমটাটা খসে গেলো চৈত্রের ঝরা পাতার মত। নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়ে পুনরায় সেটি তুললো না আর অর্নিমা, ঢাকলো না লক্ষ্মীর ন্যায় কেশপুঞ্জ, ঢাকলো না কপাল কিংবা কপোল। দেখে সর্ব শরীরে শিহরণ জাগলো উচ্ছ্বাসের, মনে মনে জন্ম নিলো তীব্র অভিপ্সার, ভাবলো, তুমি মানবী, না সৌদামিনী? একটু যদি তোমায় স্পর্শ করতে পারতাম! দাও নাগো ধরা ধরার আগে! তোমার রূপের কবলে পড়েছি আমি চরম ধরা, নও তো তুমি অধরা মাধুরী কিংবা প্রহেলিকা?
জীবন যুদ্ধের দীক্ষা প্রকৃতি থেকেই পাই। প্রলয় ঝড়ে সকল জীর্ণ দূর হয়। আষাঢ়ের বারিধারায় ঊষর ভূমি প্রাণ পায়। নতুন ছন্দে জীবন সজীব হয়। বৈশাখী ঝড়ের শক্তি নিয়ে পার হয়েছে উচ্ছ্বাস দুঃখ-দারিদ্র্যের সাগর। প্রকৃতি এখন হাসছে, মৃদু বাতাস এসে এগালে ওগালে চুমু দিয়ে চোরের মত পালাচ্ছে। নেই আকাশে মেঘের চিহ্ন। এত সত্ত্বেও মন কেনো বল পাচ্ছে না? মনে অনেক কথা জমা, বলবে বলে সাজিয়েছে স্তরে স্তরে। অব্যক্তই কি থেকে যাবে সব? অনুভব বাড়ছে অথচ সাহস কমছে। স্বপ্নকে স্বাধ করে নাম দিয়েছে স্বপন, স্বপন আজীবন মনকে উস্কানি দিয়েছে, স্বপ্ন না দেখলে মনের বয়স বেড়ে যায়, তাই স্বপ্ন দেখেছে উচ্ছ্বাস, স্বপ্নপুঞ্জ তার বুকে জমা। অদ্যবধি মনের কোণে এমনি তো একটি নারীকে জীবনের দেবী রূপে কল্পনা করেছে, তাকেই যদি বলতে এত দ্বিধা, তবে কি স্বপ্নসৌধ ধূলিসাৎ হবে?
অর্নিমা ঠোঁট দুটো একদিকে বাঁকিয়ে বললো, শৌর্য-বীর্য পুরুষের বোঝা শেষ, বৌয়ের সাথে কথা বলার শক্তিটুকুও নেই।
জীবন দেবীর কাছ থেকে এমন কটাক্ষ আচরণ শুনেই যে তার জীবন তরণীর চলা শুরু হবে ও ভাবতেও পারেনি। মাথাটা নিচু হয়ে গেলো। স্বপ্নের রেণুগুলো যেন আছাড় খেলো এবং রক্তাক্ত হলো। স্বপ্নের পাখি স্বপ্নের চারণভূমিতে উড়ে বেড়াবে ডানা মেলে অষ্টপ্রহর, সে বলে কি এ! পুরুষত্ব নিয়ে কটাক্ষ করা তো দৃঢ় নারীরও দুঃসাহসিকতা। স্বামীকে নিয়ে স্ত্রীর এহেন উচ্চারণ তো কখনো ঘটে না। উচ্ছ্বাসের উচ্ছ্বাস মাখা মুখে নেমে এলো চিন্তা ও লজ্জার রক্তিম আভা। স্বপ্ন যদি স্বপ্নই রয়ে যাবে তবে স্বপ্নের মালা কাকে পরাবে আর কবে?
অর্নিমা কিঞ্চিৎ নাকে হেসে বললো, সব অর্জন করতে পেরেছেন, স্ত্রীকে স্পর্শ করার যোগ্যতা আজো হয়নি। আমি নলক আর চুড়ি খুলে দিচ্ছি আপনি পরেন, নারী বৈ কী আপনি?
উচ্ছ্বাস কপাল কুঁচকালো। মনে মনে বললো, ও আপনি করে বলছে কেনো? আজো যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি? জীবনের অর্ধেক বয়সই তো পড়াশোনার পিছনে গেছে। ভালো চাকরি না পাওয়া অবধি বিবাহের কথা মুখেই আনিনি। চাকরি পাওয়ার পর জাঁকজমক একটি বাড়ি করেছি। তারপর বিবাহ করলাম। যাতে যে বৌ হয়ে আসবে সে কোন ঘাটতিতে না পড়ে। আর তার মুখ থেকেই তীব্র কটাক্ষাঘাত শুনতে হলো? সব যে ধূলো ঝড়ে ধূলিসাৎ হলো! এলোমেলো হয়ে গেলো চিন্তা-চেতনা।
নিজের কাছে নিজের এত সব প্রশ্ন। অর্নিমা ওকে নিয়ে বিদ্রূপ করছে আর ও মনে মনে বিলাপ করছে। উচ্ছ্বাস ভাবলো, ওর চোখেতো বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া নেই। তবে ও এভাবে বলছে কেন বারবার? ওর অমল হাসিতে কেনো নির্জীব হয়ে যাচ্ছি? কেনো ওর দুই ঠোঁটের আলোকরশ্মি সূচের মত বুকে বিঁধছে?
অর্নিমা আবারও বললো, ওহ কী ভীরু পুরুষ! নির্লজ্জের মত দেখছেন আর দেখেই মুখ নামিয়ে নিচ্ছেন। এত কুণ্ঠাহীন, বেহায়া লোক জন্মে দেখিনি।
এমন কথার প্রতিউত্তরে উচ্ছ্বাস কিছু বলতে পারলো না। ভাবলো, এ মেয়ে বেশ দুষ্ট। গলায় আঙুল দিয়ে, পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করার অভ্যাস আছে। কথা তো না তোমার, ছারপোকার কুটকুটানি। পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। সামনে তুমি অথচ তোমাকে চিনতে পারছি না। যেন স্বচ্ছ কাচের দেয়ালের ঐ পাশে তুমি। একটু দেখতেও কেন মানা? খোলা চোখ দুটোকে তো আর অন্ধকারে ঢেকে রাখতে পারি না। তোমার দিকে তাকালে কি তোমার গায়ে ঘা হবে? খবরদার এমন মেয়ের হাতে হাত রাখবো না, আঙুলগুলো তো আঙুল না, ঈগলের নখের মত, হৃদয়টা উপড়িয়ে নিয়ে নিতে উদ্যত যেন!
উচ্ছ্বাস কুঁকড়ে গেলো। নিমীলিত হলো দৃষ্টি। কি চেয়েছিলো জীবনে ও, আর কি হলো, সুখ বড়ই চঞ্চল পাখি। ধরাই দেয় না, ধরা দিলেও সোনার খাঁচায় বন্দী হয় না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো উচ্ছ্বাস। স্বপ্নের কোলাহল নিঃশব্দ হয়ে গেলো।
অর্নিমা হেসে উঠলো, হাসি না বর্শার ফলা, হৃদয়টা উপড়িয়ে নিয়ে আসছে। বললো, এত বলার পরও একটি কথারও উত্তর করলেন না। যতদূর জেনেছি আপনি বোবা নন, তবে কথা বলছেন না কেন? আচ্ছা, প্রশ্ন করছি উত্তর দেন, নয়নে নয়ন ফেলতে ইতস্তত নন, তবে বদনে কেনো ইতস্তততা? নয়ন চলে বদন চলে না কেন? নয়ন তো নির্লজ্জ, বদন আড়ষ্ট কেন?
বিস্ফোরিত চোখ। দেখে উচ্ছ্বাস যেন তলিয়ে যাচ্ছে, তল পাচ্ছে না, বল পাচ্ছে না, ভাষা গেছে উড়ে বলাকার ডানায় ভর করে দূর তেপান্তরে। সংসার করার স্বপ্নটা যদি বীজ হয় তবে তা আর অঙ্কুরিত হবে না, মেলবে না ডানা, পাবে না যৌবন। এক লহমায় সব যেন কিভাবে বিনাশের দ্বারপ্রান্তে চলে গেলো। জীবনে জীবন যোগের অভীপ্সা করা বাতুলতা বৈ আর কিছুই নয়, ভাবলো, এলে আমার ঘরে আমার বধূ হয়ে, নিজেকে বিলিয়ে দিয়েও থেকে গেলে বেদখলে।
অর্নিমা মাথা তুলে দেখলো উচ্ছ্বাসের কপালে, দুই গালে ঘামবিন্দু হীরের কুচির মত চিকমিক করছে। তবুও বললো, আমার কোন কথায় তো আপনার গায়ে মাখে না, অদ্ভূত লোক বটে। বলি কানে কি কম শোনেন?
পবিত্র জ্যোৎস্নায় ভাসছে দিক দিগন্ত। অপ্সরী অশরীরীরা হয়ত নৃত্য করছে। অনির্বচনীয় সৌন্দর্য। অথচ উচ্ছ্বাসের মুখটায় বিষণ্নতা। চড়াই-উৎরাই মাড়িয়ে কোথায় উপনীত হলো ও! অর্নিমার কথায় বিদগ্ধ হয়ে গেছে ও, কথাগুলো মনে বড় বড় রেখাপাত করেছে। দেখে প্রথমে যে মুগ্ধতা পেয়েছিলো কথাগুলো শুনে বুঝলো মনে কুটিলতা, পঙ্কিলতা ঘর করছে। উচ্ছ্বাসের মনে একটি বাক্য নড়ে চড়ে বাজছে, সুন্দর অনেক সময় ভয়ংকর হয়। প্রথম মুগ্ধ হয়েও বুঝতে পারেনি মুগ্ধ হওয়ার আরো কিছু বাকি। প্রত্যাশাগুলো প্রতারিত হয়ে পথ হারালো।
অনেক সময় দিলো অর্নিমা। মুচড়ে যাওয়া শিমপাতার সোজা হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তীক্ষ্ণ স্বরে বললো, আমার দিকে তাকান।
উচ্ছ্বাস তাকালো। মুগ্ধ নয়নে, সতৃষ্ণ নয়নে প্রিয়তনুটির দিকে তাকালো। রক্তরঙা শাড়ি পরে আছে একটি পাতাবাহার গাছ। সুদৃশ্য পাতাবাহার গাছ। পাতাবাহার গাছে অত্যপূর্ব সৌন্দর্য পাতাবাহার গাছের অগোচরে উচ্ছ্বাসের গোচরে এলো। প্রাপ্তির এক বন্যায় মন, প্রাণ ভরে গেলো।
অর্নিমা সব বিবেচনা সাপেক্ষে বললো, আপনার নজর কামুকতাপ্রবল। আপনি সৌন্দর্যের আড়ালে বিবেক বিসর্জন দিয়ে কামনা রস খোঁজেন। আপনি পুরুষ, তবে কাপুরুষ।
কথাগুলো খুব লাগলো উচ্ছ্বাসের। ও আর ঘরে থাকবে না। দপ করে উঠেই বাইরে চলে যাবে। অর্নিমা বললো, এত রাতে বাঘ পর্যন্ত তার গুহা ছাড়ে না। খবরদার বাইরে যাবেন না।
এ কথা শুনে উচ্ছ্বাসের জেদ আরো বেড়ে গেলো। সে বাইরে যেতে গিয়েই দরজার চৌকাঠে প্রচণ্ড জোরে আঘাত খেলো। কপালটা যেন ফেঁটে গেলো। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে গিয়ে স্বামীকে ধরলো অর্নিমা । রক্ত পড়া দেখে কান্না করতে শুরু করলো সে। আর খুব বিচলিত হলো।
উচ্ছ্বাস অর্নিমার কান্না দেখে বললো, আমাকে জীবনে কখনো দেখোনি, একটা অচেনা অজানা মানুষের জন্য কান্না করছো কেনো? ব্যথা তো লেগেছে আমার, আমার জন্য তোমার চোখে জল কেনো? এত উদ্বিগ্ন কেনো? এত উৎকণ্ঠিত কেনো? একটা চেনা জানা মানুষের জন্য বুকে ভালোবাসা জন্মে, দরদ জন্মে, তার কিছু হলে না হয় এত উৎবেলিত হওয়া মানায়। সম্পূর্ণ একটা অপরিচিত মানুষের জন্য এত বেশি আর্তনাদটাই বা কেনো?
অর্নিমা স্বামীর কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত কথা শুনবে কল্পনাও করিনি। আসলেই তো সম্পর্ক যেমনই হোক না কেনো আত্মার সাথে আত্মার তো সম্পর্ক হয়নি যে চোখে এভাবে জল আসবে।
অর্নিমা উচ্ছ্বাসকে ছেড়ে দিলো। কপালটা ফেঁটে ওর রক্ত বের হতে লাগলো। একবার তাকিয়ে সেদিক অর্নিমা আর তাকাতে পারলো না। চোখ বুঝে বললো, যেভাবে রক্ত ঝরছে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে, আমি সহ্য করতে পারছি না।
আপনি থেকে তুমিতে নেমেছে, উচ্ছ্বাস হতবাক হলো। সে স্থির দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, বিবাহ কি এক বন্ধন! দুটো মানুষকে কত কাছের করে দেয়, একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের জন্য মনে কত মায়া-মমতার উদ্রেক করে। আমার ব্যথায় কত বেশি ব্যথিত ও।
দুই জন ঠাঁই দাড়িয়ে থাকলো। ততক্ষণে কপালের রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। অর্নিমার সামনে এলো। অর্নিমা চোখ তুলে চেয়ে আদরকণ্ঠে বললো, খুব যন্ত্রণা করছে বুঝি!
উচ্ছ্বাস বললো, আমি বুঝেছি, কপালের যন্ত্রণার চেয়ে তোমার মনে যন্ত্রণা বেশি। একরাতে একটা মানুষকে তুমি আরো কত আপন করে নেবে বলো? বিভেদের প্রাচীর ভেঙে সুসম্পর্কের কত মজবুত সেতু গড়ে তুলবে তুমি?
অর্নিমা বললো, যেদিন থেকে তোমার আমার বিয়ের কথা চলছে সেদিন থেকে তোমাকে আমি মনে-প্রাণে ভালোবাসতে শুরু করেছি, তোমার মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেছি। আর আজ রাতেই তোমার কপাল থেকে রক্ত ঝরলো, দেখে সহ্য করতে পারছি না। মন ছটফট করছে, সুযোগ থাকলে হাউমাউ করে কান্নাও করতাম।
বলে সে স্বামীর খুব সন্নিকটে গেলো, ইতস্তত করে উচ্ছ্বাস বললো, দেখো, শরীর উষ্ণ হচ্ছে, কাছে এসো না।
অর্নিমা স্বামীর কথায় আর পিছালো না, দেখলো এ খুব লাজুক, একে শিখিয়ে নিতে হবে। একেবারে বুকে গিয়ে মাথা রাখলো। উচ্ছ্বাস বললো, একেবারে বুকে?
অর্নিমা মৃদু হেসে বললো, স্বামীর ছোঁয়া ছাড়া স্ত্রী বাঁচে?
এমন কথা। কথা আর কথা। কথা আর থামে না। গুটি গুটি পায়ে রাত গেছে চলে কেউ টের পায়নি।
অচেনা পাকপাখালিরা ঘুম থেকে জেগে কূজনের জন্য প্রস্তুতি নেচ্ছে।
ঝিকরগাছা, যশোর, বাংলাদেশ।