দেশে বিদেশে নানান ভাষায় প্রবাদ প্রবচন মানব সমাজ ও মানব জীবনের ধর্ম, সংস্কৃতি, আচার, বিশ্বাস ও রসবোধের পরিচয় বহন করে। প্রবাদ যতই ক্ষুদ্র হোক না কেন, তার পূর্ণাঙ্গ ভাব কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ নয় বরং এর সবই বিজ্ঞান সম্মত এবং যৌক্তিক স্বাস্থ্যবিধান নির্দেশিত। স্বাস্থ্য রক্ষার নিরিখে প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন ও তার অন্তর্নিহিত অর্থ উল্লেখ করে আজকের প্রতিবেদন।
‘জর ভিটায় তুলে ঘর, সে আসে তারই জর’— অপরিচ্ছন্ন স্যাঁতস্যাঁতে জায়গায় ঘর করলে সে ঘরে অসুখ বিসুখ লেগেই থাকে।
‘খাওয়ার আগে শুক্তো খেলে/খাওয়ার সুফল তবেই মেলে’ অথবা ‘আহারের আগে তিতা শেষে মিঠা’ অর্থাৎ খাবারের শুরুতে তেতো খেলে কৃমিনাশ হয়ে পেট ঠান্ডা হয় হজম শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পাতে মিষ্টি খেলে শরীরে ক্যালোরি বৃদ্ধি এবং তৃপ্তি আসে।
বারো মাস ফল খাওয়া নিয়ে একটি বিশেষ প্রবাদের উল্লেখ আছে। ‘চৈতে গিমা তিতা/ বৈশাখে নালিতা মিঠা/ জ্যৈষ্ঠ অমৃত ফল /আষাঢ়ে খৈ, শায়নে দৈ/ ভাদরে তালের পিঠা/আশ্বিনে শশা মিঠা,/কর্তিকে খৈলসার ঝোল, /অগ্রাণে ওল/পৌষে কাঞ্ছি,/ মাঘে তেল,/ফাল্গুনে পাকা বেল।’ আমে ভিটামিন-এ প্রচুর পাওয়া যায় তালেও পাওয়া যায়। বেলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন-বি থাকে। শসা তে প্রচুর পরিমাণে খনিজ লবণ থাকে। বাঙালি সেই কবে থেকেই সব ঋতুতে নানাবিধ ফলের উপকারিতার মধ্যে বসবাস করছে।
লোভের বশবর্তী হয়ে অতিভোজন স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। খাদ্য গ্রহণ করতে হবে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণে — চাহিদার চার ভাগের তিনভাগ খাদ্য এবং একভাগ জলে পরিপূর্ণ করলে হজমের গোলমাল হবে না এবং রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকবে। প্রবাদ তাই সতর্কবাণী দিয়েছে, ‘অধিক খেতে করে আশ/ তার নাম বুদ্ধিনাশ।’
‘তিল তিসি তাল মাখনা/ খায় নির্মেদে হয় জোয়ানা। ‘ অর্থাৎ তৈলবীজ তেল কৃষি ছাড়া তাল এবং মাখনা (পদ্মের মতো একটি জলজ উদ্ভিদের ফলের বীজ) নিয়মিত আহরের তালিকায় রাখলে বাড়ন্ত কিশোর কিশোরী কিম্বা দূর্বল বাচ্ছা বা তরুণ তরুণী সবল ও স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে।
“জ্বরুয়া দেখে, জামিরের ভারা” বা “জ্বরো রোগী স্বপ্ন দেখে/ চিঁড়ে আর তেঁতুল মাখে।” জামির বা জাম্ভির হল এক বিশেষ প্রজাতির লেবু (Citrus medica) যাতে প্রচুর মাথায় ভিটামিন-সি খাদ্যতালিকাগত ফাইবার (পেকটিন, Pectin) এবং নানাবিধ খনিজ লবণ থাকে। জ্বরে ভুগলে রোগীদের মুখের রুচি থাকে না তখন তারা টক জাতীয় খাবার সামান্য পছন্দ করে। বাংলায় প্রবাদ আছে ‘জ্বরো রোগী স্বপ্ন দেখে/ চিঁড়ে আর তেঁতুল মাখে।’ জামির লেবু এতটাই টক যে এইসময় কেউ খেতে চায় না কিন্তু গ্রামে এই লেবুর রসে জারিত করে আমলকি, জোয়ান ইত্যাদি মুখসুদ্ধি রোদে শুকানো হয়। এই লেবুর রসের মুখে রুচি আসে অসুস্থ মানুষ খাবার গ্রহণ করতে আগ্রহ দেখায়। জ্বর, সর্দি, কাশি জ্বর যেহেতু ঘটে ভিটামিন-সি এর অভাবে, তাই জামিরের রস নিয়ম করে ভাতের পাতে দেওয়া হয়।
গ্রামে অনেকেই লেবুর রস চিপে বোতলে ভরে রাখেন। জ্বরে মাথাব্যথা শুরু হলে এইরস সামান্য কাপড়ে ভিজিয়ে কপালে একটুখানি দিলে মাথাযন্ত্রণা কমে যায়। নিয়মিত এই লেবুর রস সামান্য গ্রহণ করে নানান ধরনের রোগের হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
“মাছ ধুইলে মিঠে/মাংস ধুইলে শিঠে” অর্থাৎ মাছ বার বার পরিষ্কার জলে বা উষ্ণ জলে ধুয়ে নিলে ময়লা ও রোগ জীবাণু মুক্ত হয় কিন্তু মাংস কাটার পর জলে ধুলে ভিটামিন ও নানান পুষ্টিগুণ নষ্ট হতে পারে এই সত্যতা বোঝাবার জন্য এই প্রবাদ।
“ফল খেয়ে খায় পানি/পেট বলে আমি না জানি” — প্রবাদের অর্থ বলে, ফলে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল থাকে। এরপরও বাড়তি জল খাওয়ার ফলে এনজাইম সংযুক্তিতে বিঘ্ন ঘটায়। পরিনামস্বরূপ হজমে সমস্যা দেখা যায়। একাধিক ফল খাওয়ার ব্যাপারে বলতে হয়, হজম করতে পারলে কোন অসুবিধা নেই। কারণ উপযুক্ত ফলের সমাহারে ব্যালেন্স ডায়েট হয়।
অনেক কৃপণ ব্যক্তি আছে যারা কেবল অর্থই ভালোবাসেন। অর্থ সঞ্চয় করার নেশায় স্বাস্থ্যরক্ষা শরীর সুস্থ রাখা এবং পুষ্টিকর খাবারের প্রতি উদাসীন থাকে। এক কথায়, নিজেকে বঞ্চনা করে শুধু অর্থের পেছনে ছুটে। ফলে ব্যাধি ও দুঃখ যন্ত্রণার শিকার হতে হয়। তাই প্রবাদ বলে, “খায়না পুঁজিপাটা,/ তার কপালে মারি ঝাঁটা”।
তবে অনেক প্রবাদের অর্থ অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক নয় বা এগুলির অর্থ চিরসত্য বা সুনির্দিষ্ট হবে তা বলা যায় না।
যেমন — “ঘোল, কুল, কলা/তিন নাশে গলা।” সর্দি কাশি হলে কুল আর কলা খেতে বারণ করা হয় যদিও চিকিৎসকেরা বলেন কলা খাওয়ার সঙ্গে সর্দি কাশির কোন সম্পর্ক নেই।
অথবা “খালি পেটে জল /ভরা পেটে ফল” — ভরা পেটে ফল খাওয়ার সঙ্গে কোন সম্পর্ক সেভাবে প্রমাণিত নেই তবে যে সব ফলে বেশি পরিমাণে সাইট্রিক এসিড, টারটারিক অ্যাসিড, অক্সালিক এসিড (যেমন কিছু লেবু জাতীয় ফল, তেঁতুল, টককুল, কামরাঙ্গা, আমড়া ইত্যাদি) থাকে সেগুলি খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে।
নিয়মিত ভরা পেটে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত ফল বা ফলের রস খাওয়া উচিত নয় বরং খালি পেটে এর প্রভাব সামান্য কম।
এইধরনের অসংখ্য ছন্দবদ্ধ ও কাব্য সুষমামন্ডিত প্রবাদ প্রবচন প্রচলিত আছে সমাজে। মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রসূত এবং মূলত বুদ্ধিপ্রধান রচনা। বহুকাল ধরে প্রচলিত প্রবাদ প্রবচন প্রচলিত থাকুক সমাজে জ্ঞানপ্রসূত কালের আবর্তে গ্রহণযোগ্য হয়ে।।
বেশ হয়েছে লেখাটা।
থ্যাংক ইউ মামা।
খুব ভালো হয়েছে।
ধন্যবাদ ????
অতীব সুন্দর বিষয় এবং বিশ্লেষণ, খুবই উপকারি তথ্য, খুব ভালো লাগলো।
খুব খুশি হলাম ????❤️