দেশজুড়ে যখন সাম্প্রদায়িক শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। জাতি, ধর্মের নামে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল। তখন বাংলার বুকে সম্প্রীতির বার্তা দিতে চেষ্টা করছেন একদল গ্রামের মানুষ। হতে পারে সেটা কালীপুজো-কে কেন্দ্র করে কিন্তু দেশ জোড়া এই গোলমেলে সময়েও ওঁরা জাতি-ধর্মের তরজা সরিয়ে মিলনের ভাবনায় এককাট্টা হচ্ছেন। হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন কালী পুজোয়।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন ব্লকের মনোহলি গ্রামে প্রতিবছর দীপাবলির দিন হয়ে আসছে শ্যামা কালী এবং নিদয়া কালীর পুজো। প্রায় শতাধিক বছর ধরে এমনটাই হয়ে আসছে। পাশাপাশি গ্রামের দুই কালী যথাক্রমে শ্যামা এবং নিদয়া পূজোর চক্ষুদানের পাঠাবলি চলাকালীন স্থানীয় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষরা পীর বাবার মাজারে সিন্নি চড়ান। মনোহলি গ্রামের কালী পুজো উপলক্ষ্যে গ্রামে মেলাও বসে। সেই মেলাতে এলাকার মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরাও শরিক হন। মনোহলি গ্রামের কালীপুজো এবং তাকে ঘিরে মেলা উৎসব যেন স্মরণ করিয়ে দেয় যে ধর্ম যাই হোক না কেন তাতে অংশ নেওয়া বা উৎসবে সামিল হতে কোনও বাঁধা নেই।

অন্যদিকে উত্তর দিনাজপুর জেলার রায়গঞ্জ শহরের রাসবিহারী মার্কেট এলাকার বাসিন্দা অজয় সাহার জমিতে রয়েছে একটি পুরোনো বটগাছ। সেই গাছের নীচে রয়েছে সিমেন্ট বাঁধানো বেদী, কালীপুজোর দিন সেখানে পুজো করেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। কালী পুজোর দিন প্রতিমা পুজো নয়, গাছের পুজোয় মাতেন স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। তবে গত ১৬ বছর ধরে স্থানীয় বাসিন্দারা চাঁদা তুলে এখানে বড় করে পুজো করে আসছেন। বিভেদের আগুন তাঁদের পুজোকে স্পর্শ করতে পারেনি। প্রতি অমাবস্যাতেও এখানে নিয়ম করে পুজো হয়। তাতেও অংশ নেয় দুই সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই সঙ্গে হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের কোনও শুভকাজে এখানে মানত করে পুজো দেওয়া হয়।
দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার একটি গ্রামের নাম হাঁড়িপুকুর। গ্রামটির অবস্থান হিলি থানার অন্তর্ভুক্ত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে। গ্রামটি প্রায় পুরোটাই মুসলিম অধ্যুষিত। অথচ সেই গ্রামেই রয়েছে সীমান্ত কালীর থান। কোনও দেবী মূর্তি নেই, ঘট পুজ হয়। যদিও সারাবছর হিন্দু মতে পুজো হয় এবং দায়িত্বে থাকেন হিন্দু এক পুরোহিত। কিন্তু সেই পুজোর যাবতীয় দায় দায়িত্ব এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর। এমনকি যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণও করেন তাঁরা। দেশভাগের পর হাঁড়িপুকুর গ্রামে মুসলিমদের হাত ধরে কালী পুজো শুরু হয়েছিল তা আজও সমান উৎসাহে চলছে। এই পুজোরও যাবতীয় ভার এলাকারই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর। হিন্দু মতে হিন্দু পুরোহিত পুজো করলেও আদতে তা নিজেদেরই পুজো বলে মনে করেন এলাকার মুসলিম গ্রামবাসীরা। কেবল গ্রামবাসীরাই নয়, পুজোর আনন্দে গা ভাসাতে হাজির হন সীমান্তে প্রহরারত বিএসএফ জওয়ানরাও। এমনকি বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বিজিবিও সামিল হয় সেখানে। কালীপুজোর দিন খিচুড়ি ভোগেরও আয়োজন করা হয়। ভেদাভেদ ভুলে তাই ভাগ করে খান সবাই। উৎসবের রেশ চলে হাঁড়িপুকুর সংলগ্ন আশেপাশের গ্রামগুলিতেও।

কালিপুজো মুর্শিদাবাদ
হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে মেতে ওঠেন দুবরাজপুরে কালী পুজোয়। এখানেও কালী পুজোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। দুবরাজপুরের লোবা গ্রামে হয় তিনটি কালীর পুজো- বড়, মেজো ও ছোট বোনের উপাসনায় মাতেন কয়েক হাজার হিন্দু ও মুসলমানের সম্প্রদায়ের মানুষ। লোবার পুজোয় বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে বিশেষ রীতি। প্রতিমা গড়তে ব্যবহার করা হয় ভেষজ রং। তিন জায়গায় হয় কালীর উপাসনা। পুজো শেষে মেজো মা এবং ছোটমা আসেন বড়দির বাড়িতে। সেখান থেকে বেরোয় বিসর্জনের শোভাযাত্রা। বিসর্জনের মেলায় যেন মহামিলন। লোবা গ্রামে প্রায় সপ্তাহব্যাপী চলে সম্প্রীতির উৎসব।
একইসঙ্গে ভদ্রকালী ও পীর বাবার আরাধনা হয় পুরুলিয়া জেলার হিড়বহাল গ্রামে। পুরুলিয়া শহর থেকে মাত্র ২০ কিমি দূরে হিড়বহাল গ্রাম। সেই গ্রামের একই মন্দিরে ভদ্রকালী ও পীর বাবার পুজো হয়ে আসছে প্রায় ৫০০ বছর ধরে। ৩৬৫ দিনই নিয়ম মেনে আরাধনা করা হয় মা কালী ও পীর বাবার। এখানে পীর বাবা সত্যনারায়ণ হিসেবে পুজো নেন হিন্দু পুরোহিতের কাছে। পৌরহিত্যের ক্ষেত্রেও আর পাঁচটা মন্দিরের থেকে এখানকার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে কোনও ব্রাহ্মণ পরিবারের পুরোহিত নন, বংশ পরম্পরায় বাউরি সমাজের মানুষ পুজো করেন। কালী পুজোর সময় এই মন্দিরে ধর্মীয় ভেদাভেদ ভুলে হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। এখানের পুজোর অন্যতম আকর্ষণ বলি প্রথা। একপাশে পাঁঠা বলি ও অন্য পাশে মুরগি বলি চলে। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত তো বটেই ভিন রাজ্য থেকেও হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন।

লোবাগ্রাম দিনাজপুর
মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা থানাপাড়া এলাকার গোবরা মোড়ের কালীপুজোতেও নেই ধর্মের নিগড়। এখানেও কালী পুজোটা করেন হিন্দু মুসলমান মিলেমিশে। চাঁদা তোলা থেকে প্রসাদ বিতরণ পুজোর প্রতিটি কাজই দুই সম্প্রদায়ের মানুষকে মিলেমিশে করতয়ে হয়। পুজোর পর যে নরনারায়ণ সেবা, তাতে কয়েক হাজার মানুষ পাত পেড়ে খান। সে দিনও হিন্দু-মুসলমানে কোনও ভেদাভেদ থাকে না। বামুনের ছেলে হয়েও মুসলমানের এঁটো পাতা তুলতয়ে হয়, হিন্দুর প্রসাদ খাওয়ার পাতা ফেলতয়ে হয় মুসলমানকে।