‘জেলখাটাদের পুজো’ নামটা প্রথমেই শুনলে ভ্রু-কোঁচকাবে। মনে হবে খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ ও প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত কয়েদিদের পুজো। এক্ষেত্রে চিত্রটা একটু উল্টো। কারণ আজও আরামবাগের বুকে ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে’ অটুট। দেশমাতৃকার মহান বিপ্লবীদের কথা স্মরণে-মননে আরামবাগের বুকে আজও গাঁথা হয়ে আছে। বাঙালির বড়ো উৎসবের পিছনে বিপ্লবীদেরও কিছু স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। উৎসব এলেই সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করতে হয় সেই মহান বিপ্লবীদের। এঁদের হাত ধরেই জাতপাত ভুলে, ধর্ম ভুলে আরামবাগের বুকে বারোয়ারি বা ক্লাবে দুর্গা পুজোর শুভ সূচনা হয়। এই সূচনার প্রদীপ জ্বেলেছেন আরামবাগের বিপ্লবী জেলখাটারা। তবে ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় বারোয়ারি বা ক্লাব দুর্গা পুজোর সূচনা হয়েছিল ১৭৯০ সালের কাছাকাছি সময়ে। এই জেলারই গুপ্তিপাড়ায় বারোয়ারি বা বারো ইয়ার (১২জন বন্ধু) মিলে দুর্গা পুজোর আয়োজন করেন। যা সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়। এভাবেই একের পর এক পারিবারিক পুজোর বাইরে এসে কিংবা কয়েক জন বন্ধু মিলে ক্লাব বা বারোয়ারি পুজোর সৃষ্টি।
এর উদ্দেশ্য অবশ্যই সাধারণ মানুষ ও প্রতিবেশীরা মিলে একটি সম্মিলিত পুজো করার মধ্য দিয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। আরামবাগের জেলখাটাদের পুজো আলাদা মাত্রা এনে দেয়। মনে রাখতে হবে নবজাগরণের সামিল উচ্চশিক্ষিত, বিজ্ঞানমনস্ক, মধ্যবিত্ত যুব-সমাজ কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল প্রতিমা পুজো থেকে। কিন্তু স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সেই যুবসমাজই আবার নতুন করে অন্যরকম এক পুজোয় মেতে উঠেছিল। কার্যত, আবারও সমাজ সংস্কারেরই হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল সেই সব দুর্গাপুজোগুলি। আরামবাগ মহকুমার বিভিন্ন প্রান্তে নতুন নতুন শারদোৎসবের সূচনা হয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হাত ধরে। ভাবনার অভিনবত্বে, সামাজিক অবদানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বের দাবি রাখে সেই সব উদ্যোগ। তেমনই এক দুর্গাপুজোর আশ্চর্য গল্প শোনাব আপনাদের, যা গুরুত্বের দিক থেকে আরামবাগের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলা যায়।জেলখাটাদের পুজো।
১৯৩০ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরামবাগের ডোঙ্গলে কংগ্রেসের জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। সেখান থেকে প্রফুল্লচন্দ্র সেন ঘোষণা করলেন, আরামবাগ থেকেই হুগলি জেলার স্বদেশী আন্দোলন পরিচালিত হবে। প্রফুল্লচন্দ্র সেন, অতুল্য ঘোষ এবং বিজয় মোদক নেতৃত্ব দিলেন সেই আন্দোলনে। আইন অমান্য আন্দোলন হিসাবে জমির জরিপ বর্জন, ট্যাক্স বর্জন ইত্যাদি চলতে লাগল পুরোদমে। মহাত্মা গান্ধিজির আদর্শে অহিংস পন্থায় এই আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করল। জেলে গেলেন আরামবাগের অনেক বিপ্লবী। তারপর জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন। মাদক বর্জন, মদের দোকানের সামনে পিকেটিং, অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে আন্দোলন ইত্যাদি কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ভারত ছাড়ো আন্দোলনের রেশ কিছুটা কমলে ১৯৪৫ সালে গান্ধিজির নির্দেশে বেশ কিছু গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করল স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। তার মধ্যে ‘হরিজন আন্দোলন’ ছিল অন্যতম। তখন সমাজে খুব ছুঁৎ মার্গ ছিল। মুচি, মেথর বর্গক্ষত্রিয় ইত্যাদি জাতির লোকেদের ছায়া মারাত না ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, সদগোপ ইত্যাদিরা।
প্রতিটি জাতি, ধর্মের লোকের মাঝখানে দুর্গম প্রাচীর ছিল। জাতিপ্রথার এই প্রাচীর ভেঙে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে এক সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়াই ছিল হরিজন আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্যে হরাদিত্য পল্লি সংস্কার সমিতির উদ্যোগে দুর্গাপুজো শুরু হল। এই হরাদিত্য এলাকায় তখন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের একটা বড়ো ঘাঁটি তৈরি হয়েছিল। অহল্যাবাই রোড অর্থাৎ আজকের চাঁপাডাঙ্গা — আরামবাগ রাজ্য সড়কের পাশে হরাদিত্য এলাকা তখন ঘন জঙ্গলে ঢাকা। এই পথে যাতায়াতের সময় প্রায়ই প্রফুল্লচন্দ্র সেন, অতুল্য ঘোষ ও বিজয় মোদকরা এখানকার যুবকদের নিয়ে গোপন মিটিং করতেন। তাঁদের উৎসাহেই পুজোর আয়োজন করা হল। মুল উদ্যোক্তা হলেন মহাদেব মুখার্জি, তাঁর সঙ্গে রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়, সতীশ মল্লিক, দুলাল কুণ্ডু, মেথরচন্দ্র পান, বিভূতিভূষণ রায়, সুকুমার সাঁতরা, কালীপুরের গোবিন্দ কুণ্ডু প্রমুখ বহু যুবক যোগ দিলেন। এঁরা প্রত্যেকেই সরাসরি স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। এই পুজো তো আর নিছকই প্রতিমা পুজো নয়, বরং দেশমাতৃকার পুজো। এর আসল উদ্দেশ্য হল সমাজ সংস্কার।
বিতর্ক শুরু হল একেবারে প্রথম থেকেই। তখনকার প্রচলিত নিয়ম ছিল, ব্রাহ্মণদের বাড়ির ছেলে-মেয়েরাই পুজোর ফুল তোলা থেকে শুরু করে সমস্তরকম যোগাড় করবে, এখানে অব্রাহ্মণরা হাত দিত না। আর তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষ যেমন বর্গক্ষত্রিয়, চর্মকার এরা তো মন্দিরে উঠতেই পারত না। তারা দূর থেকে পুজো দেখত। এই নিয়মের বিরুদ্ধেই সোচ্চার হল তরুণ দল। তারা ঠিক করল জাতি-বর্ণ — নির্বিশেষে সকলেই পুজোর যোগাড়ে অংশগ্রহণ করবেন বিনা বাধায়। খবর শুনেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ব্রাহ্মণ সমাজ, ‘এ কি অনাচার! অ-জাত কু-জাতে পুজোর নৈবেদ্য সাজালে তা দেবতাকে উৎসর্গ করা তো পাপ হবে। পাড়ার ব্রাহ্মণরা বেঁকে বসলেন, তারা পুজো করবেন না। আশপাশের দু-চারটে গ্রাম খোঁজ করে কোথাও এই পুজোর জন্য পুজারি ব্রাহ্মণ পাওয়া গেল না। উদ্যোক্তাদের মাথায় হাত, তবে কি শুরুতেই ধাক্কা খাবে তাদের এই উদ্যোগ? খবর পেয়ে তাদের ডেকে পাঠালেন মাণিকপাট গ্রামের অনুকূল চক্রবর্তী। তিনি একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, বহুবার কারাবরণ করেছেন।
হুগলি বিদ্যামন্দির থেকে প্রফুল্লচন্দ্র সেন আরামবাগে আসার একেবারে প্রথম দিন থেকেই তিনি তাঁর সহায় হয়ে উঠেছিলেন। অনুকূল চক্রবর্তীকে তিনি ‘দাদা’ বলে ডাকতেন এবং সম্মান করতেন। মুশকিল আসান হয়ে দাঁড়ালেন এই অনুকূল চক্রবর্তী। তাঁর পাশের গ্রাম শালেপুর থেকে পূজারি ব্রাহ্মণ হিসাবে ঠিক করে দিলেন দিবাকর চক্রবর্তীকে। খবর শুনে রাজী হয়ে গেলেন তাঁর বাবাও। তাঁরা দুজনেই স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে একাধিকবার জেল খেটেছেন। অনুকূলবাবুর অনুরোধে শালেপুর থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে তাঁরা পুজো করতে যাবেন হরাদিত্যে, সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। জেলখাটা স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দলে দলে যোগ দিতে লাগলেন এই পুজোয়। গ্রামের পূজারি ব্রাহ্মণদের আপত্তি যেন জেদ বাড়িয়ে দিল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। খুব জাঁকজমক করে পুজো শুরু হল। কলকাতা থেকে মাইক এলো মার্টিন কোম্পানির রেলগাড়ি চড়ে। তারপর সেই মাইক জেলখাটারা চাঁপাডাঙ্গা থেকে মাথায় করে মেঠোপথে গ্রামের পথ ধরে হরাদিত্য গ্ৰামে পৌঁছাল। সেদিন সমস্ত শ্রেণির মানুষ মহা উৎসাহে, অবাধে যোগ দিল সেই পুজোয়। নৈবেদ্য সাজিয়ে দিল বর্গক্ষত্রিয় বাড়ির বৌয়েরাও। এ যেন সত্যি সত্যি এক ঈশ্বরের বাগান! নিজেদের বাড়ির ছেলেদেরও আটকে রাখতে না পেরে বাধা দিতে এসে, নিজেরাই এক ঘরে হয়ে গেলেন গ্রামের পুরোহিতরা। আর এরাই রটিয়ে দিলেন ‘জেলখাটাদের পুজো’।
অপমানের দেওয়া এই নামটাই যেন রাজটীকা হয়ে উঠল আন্দোলনকারীদের কপালে। আজও আরামবাগ মহকুমার মানুষ সম্ভ্রমের সঙ্গে বলেন ‘জেলখাটাদের পুজো’। এখনও সেই পুজো চলে আসছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। যে মহাদেব মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল এই পুজো, তিনি স্বাধীনতা — পরবর্তীকালে এই এলাকায় দুই বারের বিধায়ক হয়েছিলেন। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অবশ্য পুজো কমিটির নাম পরিবর্তন করে বর্তমানে হয়েছে ‘হরিণখোলা অঞ্চল সার্বজনীন দুর্গোৎসব’ কমিটি। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পুজো হিসাবে এখনও এলাকার মানুষ এই পুজোকে সম্ভ্রমের চোখে দেখে। ঐতিহ্যের কথা মনে রেখে বর্তমান পুজো কমিটিও নিষ্ঠার সঙ্গে আয়োজন করে এই পুজোর। নবজাগরণের যুক্তিবাদ এবং মানববাদকে সামনে রেখে এরকম বহু পুজোর আয়োজন করা হয়েছিল স্বদেশী যুগে। বহু বর্ণময় সেই সব পুজোর গল্প। সেখানে পুজো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে চিরাচরিত ধর্মাচরণের পাশাপশি অন্ন দান, বস্ত্র দান ইত্যাদি সমাজ সেবামূলক কর্মসূচি প্রাধান্য পেল। পুরাণের দুর্গা ক্রমশ হয়ে উঠলেন বাস্তবের দেশমাতৃকা। মন্দিরের দেবতার চেয়ে ‘জীবে প্রেম’ এর প্রতি আকৃষ্ট হল যুব সমাজ। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অনেকখানি শক্তি যুগিয়েছিল বাংলার স্বদেশী আন্দোলনকে।