বর্ষার ঘনঘটা সরিয়ে রোদ্দুর উঁকি দেয় যখন শিমুল তুলোর মতো ভেসে থাকা নীলাভ আকাশে, যখন ‘শরত রানী যেন কাশের বোরখা খানি খুলে, কাশ বনের ওই আড়াল থেকে নাচছে দুলে দুলে।’ তখন প্রকৃতি জানান দেয় মায়ের আগমনী বার্তা। বাঙালীর উল্লাস, অধীর অপেক্ষার আরমাত্র কটা দিন।
বয়সের কাঁটা যত ডানদিকে এগোয়, ফেলে আসা পুজোর স্মৃতিগুলো মোচড় দেয় মনের মণিকোঠায়। চিত্ত হয়ে ওঠে নস্ট্যালজিক। সারাবছরের একটু একটু করে জমানো পুঁজি দিয়ে চলে জল্পনার চরকা কাটা। স্মৃতিচারণ শুরু হয় কেনাকাটা বা শপিং দিয়ে। সাধ্যের সাধনের মধ্যে প্রিয়জনের পছন্দসই জিনিস কেনার আনন্দটুকুই আলাদা।
ছোটবেলায় কেনাকাটা শুরু হতো পুজোর কয়েক মাস আগে থেকে। লিস্ট বানানো হতো দেওয়ায়-দামের। লিস্টের ওপরে থাকতো অষ্টমীর দিন ঠাকুরের জন্য কাপড় দিয়ে। তারপর একে একে ‘দিতেই হবে’ আত্মীয়দের, আমাদের ভাই-বোনের, শেষে মা আর বাবার। শুধু জামা কাপড় নয় কেনা হতো নতুন জুতো, মোজা, পাউডার, সেন্ট, লিপস্টিক, বিছানার চাদর, গামছা থেকে আন্ডারওয়ার। নতুন জিনিস শুধু নয়, উপরি পাওনা হিসেবে থাকতো শালপাতার বাটিতে গরম কচুড়ির উপর ঢেলে দেওয়া ছোলার ডাল আর রসগোল্লা।
কেনাকাটা করা মানেই দরকষাকষির লড়াই। সেই লড়াইয়ে যেতেন কখনো ক্রেতা, কখনো বিক্রেতা।

এক ঝটকায় দাম নামিয়ে আনার জন্য দক্ষতা লাগে। বার্গেনিং একটা আর্ট। সেখানে সবাই শিল্পী হয়না। মার্কেটে দাম কমানোর ঘ্যানর ঘ্যানর করা ক্রেতাশিল্পী যেমন থাকে, তেমনি মজলিসি ওস্তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। কেউ ইমশানের সুড়সুড়ি, কেউ বা তুলনামূলক সস্তার দোহাইয়ে, কেউ বা ঝানু কূটনীতিকের থেকেও কৌশলী দক্ষতায় আলোচনার মাধ্যমে দাম কমিয়ে ফেলে। ‘বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে এই দোকানেই জিনিস কিনছি’ এই কমন ডায়ালগ শোনেনি এমন পুরোন দোকান কমই আছে। বোধহয় কমদামে বাছাইকরা জিনিসটা কিনতে পারার গর্বটাই আলাদা।
শুধু ক্রেতারা নন, বিক্রেতারাও এই শিল্পের গুরুদেব। খদ্দের লক্ষীকে এমন মাথার উপর চড়ান যে কমিয়ে কমিয়ে ক্রেতা হদ্দ হলেও, তারা অনেক ওপরেই থেকে যান বিক্রেতা। বিক্রেতা ক্রেতার পছন্দ, রুচিবোধের ভাষাটা ভালোই বোঝেন।
তবে অস্বীকার করা যায় না যে, বিক্রি করার বিভিন্ন লোভনীয় অফারের ফাঁদ এড়ানো কঠিন। যে ক্রেতার একটা শার্ট কিনলেই হয়ে যেত, ‘বাই ওয়ান গেট ওয়ান’ এর চক্করে তার ঝুলিতে জমতে থাকে অতিরিক্ত শার্ট, প্যান্ট থেকে শুরু করে বিছানায় চাদর, প্রেসার কুকার অবধি। অতিরিক্ত জিনিসগুলোর উপযোগীতা আদৌ কতখানি, সে প্রশ্ন অবান্তর। সস্তায় বাজিমাত হলো তার আনন্দই আলাদা।
শহর কলকাতায় পুজোর বাজার করতে আসে বহুলোক বহুদূর থেকে। নিউমার্কেট, হাতিবাগান, শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়, গড়িয়া হাট, বড়বাজার, বউবাজার ইত্যাদির অলি-গলির দোকানে পুজোর গন্ধ লাগা জিনিসগুলোর সুরভি ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত অর্থসংকটের কথা মাথায় রেখে টার্গেট করে ফুটপাতের দিকেই। লোভনীয় জিনিষের পসরা সাজিয়ে নতুন নতুন টিপস নিয়ে এখানের বিক্রেতাও রেডি।

করোনা আবহেও কেনাকাটার ভিড় উপচে নামছে রাস্তায়। হিমশিম খাচ্ছে ট্রাফিক পুলিশ। শপিং করতে গেলে চাই এনার্জি, চাই পেটপুজো। পরিশ্রান্ত বাঙালি সর্বভূক। চা থেকে চাউমিন, এগরোল, ফুচকা, মোমো সবই চলে রাস্তার ধারে বেঞ্চে বসে। এখানে ‘শারীরিক দূরত্ব’ কথাটা বেমানান। প্রশাসনও দেখে না দেখার ভান করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেটামরফসিস ঘটেছে কেনাকাটার বাজারে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম নিয়ে এসেছে ভিড়ে ঠাসাঠাসি দোকানগুলোকে আপনার ড্রয়িং রুমের সোফাতে। ব্র্যান্ডেড দোকানের ঠান্ডা হওয়ায় যেখানে দরকষাকষি স্বপ্ন, সেখানেই ৫০ থেকে ৭০% ছাড় পাচ্ছেন অনায়াসে ই-শপিং এর দৌলতে। আপনার একটা ক্লিকে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে পেয়ে যাচ্ছেন যে কোন জিনিসের প্রচুর অপশন। অপেক্ষা শুধু বেছে নেওয়ার।
চিরপরিচিত ‘পুজোয় চাই নতুন জামা’ না বলে তার সঙ্গে বলুন মাস্কের কথাও। গতবছর থেকে ডিজাইনারদের হাত ধরে শাড়ি বা জামার সঙ্গে এসেছে ম্যাচিং মাস্ক। ব্যবহার করুন নিরাপদ মাস্ক।
ভাইরাসের দাপটে অফলাইনের তুলনায় অনলাইনে ভিড় জমিয়েছেন বহুমানুষ। কেনাকাটা অনলাইনে হোক বা অফলাইনে, আনন্দটুকু বয়ে নিয়ে আসুক বেঁচে থাকার অমৃতের সন্ধান। গদগদ কণ্ঠে বাঙালি বলুক, ‘বেঁচে থাকুক পুজো, বেঁচে থাকুক পুজোর বাজার’।