পুজো এলেই নানারকম লেখার ধুম পড়ে যায়। বড় বড় লেখকরা লেখেন আরও বড় বড় পুজোসংখ্যায়। কমনামীরা লেখেন ছোটখাটো কাগজে বা পত্রপত্রিকায়। যাদের এদুটোর কোনটাই জোটেনা তারা নিজেরাই বার করেন কাগজ। সেখানে গল্প, উপন্যাস, রম্যরচনা, কবিতা এমনকি আত্মজীবনীও লেখা যায়। সেই পত্রিকায় বউ, ছেলেমেয়ের লেখা প্রকাশ করারও সুযোগ থাকে। যোগাযোগ থাকলে তৎপর এবং উদ্যোগীরা এই ধরণের ম্যাগাজিনের সামনে-পিছনে বিজ্ঞাপনও যোগাড় করে ফেলেন। ব্যাপারটা জমে যায়। ভেবে দেখলাম, পুজোর লেখকরা তিনপ্রকার — নামী, কমনামী এবং গুমনামী, মানে যাদের কোন নামই নেই।
নাম না থাকলেও এই গুমনামীদের শক্তি প্রবল। এদের গল্প, কবিতা, উপন্যাস, ভ্রমণ কাহিনী এবং ব্যাক্তিগত উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার বিবরণ যেকোন সময় ও পরিস্থিতিতে ধরাশায়ী করে ফেলতে পারে আপনাকে! এদের এড়ানোর কোন উপায় নেই। যদি একবার আপনাকে পাকড়াও করতে পারেন, ভালোবাসার অত্যাচারে লেখা পড়িয়েই ছাড়বেন। তারপরেও নিষ্কৃতি নেই — ‘লেখাটা কেমন লাগলো’, ‘ঠিকঠাক হয়েছে কিনা’, ‘তা কি করে আরও ভালো করা যেতে পারে’ জানতে চেয়ে সকাল-বিকেল ফোন আসতে থাকবে। সেই অভিজ্ঞতার বিবরণ দিতে পারেন সাহিত্যসেবী ভুক্তভোগীরাই। সংস্কৃতি সচেতন বাংলায় কবি ও লেখকের সংখ্যা বরাবর বেশি। পুজোর সময় তাদের সংখ্যা বাড়ে।

এতদূর অবধি যদি কোনমতে পড়তে পেরে থাকেন, তাহলে অনেকেই ধরে নেবেন অখ্যাত, অনামী লেখকদের ওপর আমার ব্যাপক অশ্রদ্ধা। ব্যাপারটা ঠিক তার উল্টো। এটা ঠিক এদের উৎসাহ ও আতিশয্য অনেককে বিব্রত করে, তবে তা নিতান্তই নির্দোষ। এদের আন্তরিকতা আছে কিন্তু কোন ভান নেই। এই মানুষগুলি আমাদের লেখালেখিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। এদের সবচেয়ে বড় পরিচয় এরা বাংলা ভাষাটিকে ভালোবাসেন। এদের জন্য বই, পত্রপত্রিকা বিক্রি হয়। কাটতি বাড়ে পুজোসংখ্যার। সন্মান ও সংবর্ধনার ডাক পান কবি-সাহিত্যিকরা।
বইমেলায় এরাই তো প্রিয় লেখক-লেখিকার চারপাশে মেঘের মত ভিড় করে আসেন। মেলা থেকে কেনা বইয়ের ওপর সই নেন। নিজের বউ ছাড়া কখনও কেউ যার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেননি, তার পাশে দাঁড়িয়েও ছবি তোলেন এমন ভক্তরা। এদের উৎসাহে অনেক উঠতি কবি ও নবীন লেখকরা নিজেদের মনে করতে থাকেন ‘ক্লাস অ্যাপার্ট’। রাজরোষে পরিত্যক্ত লেখক-লেখিকাদের পাশে নির্ভয়ে দাঁড়ান এই গুণগ্রাহীরাই। সারাজীবন ‘কাঠি’ করে আসা যে মানুষগুলি রাতারাতি অবস্থান বদল করে কোন লেখক, কবি, শিল্পীর মরদেহে মালা দিতে আসেন প্রতিষ্ঠান তাদের জায়গা ছেড়ে দেয়। সেই ভিড়ে ঢুকতে পারেননা তাদের ভালোবাসা মানুষ। এরা তাদের মধ্যেই পড়েন।
সেই অবহেলা অগ্রাহ্য করে শালপাতা মোড়া শীর্ণকায় মালা নিয়ে নীরবে অপেক্ষা করেন এরা। মালাটি প্রয়াতের গলায় পরিয়ে দেওয়ার কোন সুযোগ থাকেনা। দূর থেকে নীরবে দেখেন প্রিয় লেখক, কবিদের চলে যাওয়া। ম্লানমুখে শোকমিছিলের একেবারে শেষদিকে অবসন্নভাবে হেঁটে চলেন এরা। কাঁচের শবাধারে থাকা মানুষটি যেন তাদের বেঁচে থাকার সব শক্তিটুকু কেড়ে নিয়ে চলে যাচ্ছেন। এরা যেন ব্যস্ত ব্রিজের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা মলিন ও বিষণ্ণ পিলার। ওপরের চলমান জীবন যাকে না দেখেই চলে যায়। অথচ বঙ্গ ভাষা ও সাহিত্যকে ধরে রেখেছে এদের মনোযোগ ও ভালোবাসা। আমাদের দুখিনী বর্ণমালা এদের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার দিকে তাকিয়েই বেঁচে থাকে।