| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পূজায় যাত্রা, পার্বনে যাত্রা, যাত্রা নিয়েই জীবনযাত্রা

Reporter Default
রিপোর্টার / ১১৫১ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২০

সুনীল চৌধুরী

“ষষ্ঠি টু জষ্টি—এটাই কোম্পানীর সঙ্গে সব আর্টিস্টের চুক্তি”। কথাটা যার মুখ থেকে আমি প্রথম শুনেছিলাম, তিনি যাত্রাজগতের মাস্টারমশাই পূর্নেন্দু শেখর ব্যানার্জী—কথা হচ্ছিল অধুনালুপ্ত সত্যম্বর অপেরার গদীঘরে—বছর ৪৫ আগে।

আমি তো তাজ্জব! ষষ্ঠীর সকালে পুজোর ঢাকে যখন কাঠি পড়বে, তখন ঘর-সংসার পাড়ার পুজো ছেড়ে কেন ধ্যাদ্দাড়ে গোবিন্দপুরে যাত্রা করতে যাবেন?

মাস্টারমশাইয়ের মুখে অমায়িক হাসি। বলেছিলেন, আমাদের ঘর-সংসার তো যাত্রাকে নিয়েই। আর পালা গাইতে যেখানে যাবো, সেখানেই আমার আপনজন, সেটাই আমার পাড়া।

আজ চল্লিশ বছরের বেশী যাত্রা জগতে কাটিয়ে মাস্টারমশাইয়ের কথার সত্যতা মর্মে মর্মে বুঝি। ষষ্ঠীর সকালে কলকাতার পুজো প্যান্ডেলে যখন বোধনের অনুষ্ঠান শুরু হয়, তার ঠিক আগের সন্ধ্যা—কিংবা আরও দু-একদিন আগের সন্ধ্যায় যাত্রাপাড়ার বাসগুলি পাড়ি দেয় দূর-দূরান্তরে। অবশ্য তাদের অধিকাংশেরই গন্তব্য থাকে দুর্গাপুর, আসানসোল কিংবা রানীগঞ্জের কোলিয়ারি অঞ্চল। কারণ, পুজোর মরশুমে ওখানকার প্রায় কোলিয়ারিতেই বসে যাত্রার আসর। ইদানীং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুরেও পুজোর সময় যাত্রা আসর বাড়ছে।

একবার…. সেও প্রায় বছর চল্লিশ আগের কথা—কোলিয়ারি অঞ্চলের কোনও এক গাহনাস্থল থেকে আমার একটি পালা দেখে ফিরছিলাম। পথে দেখি পান্নাদার (যাত্রা জগতের প্রখ্যাত নট পান্না চক্রবর্তী) গাড়ী। পান্নাদার মুখে বিচিত্র মেকাপ-বিভূষিত। কারণ জানতে চাইলেই পান্নাদা বললেন, আরে ভাই! কি করবো? মালিকের গাঁজাখুরি কারবার। এই ষষ্ঠীর রাতেই তিন-তিনটে শো ধরে ফেলেছেন। ভাগ্যি ভালো প্যান্ডেলগুলো কাছাকাছি। কিন্তু তিনবার মেকআপ করতে হলে শো করব কখন? তাই রং মেখে সং সেজে ঘুরে বেডাচ্ছি। শুনে তো আমি থ। এক রাতে তিন তিনটে শো!

অথচ পুজোর মরশুমে যাত্রাজগতে এটা তখন হামেশাই হতো।

কিন্তু কেন জানি না, এ ছবি বদলে গেলো! মাত্র বছর দশেকের ব্যবধানে পান্নাদা আমার পালা ‘পাগলাঘন্টা’য় অভিনয় করছেন। পালার প্রশংসায় যাত্রামোদীরা পঞ্চমুখ। কালীপূজা তখন সবেমাত্র শেষ হয়েছে। পান্নাদার সঙ্গে আবার দেখা ঐ একই জায়গায়। উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘পান্নাদা! আজ ক’টা শো হলো?’

‘নারে ভাই। সবে মাত্র একটা।’ পান্নাদার উত্তর।

বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো! ‘কেন লোকে কি পালা নিচ্ছে না?’

‘খুব নিচ্ছে। হৈ হৈ যশ…তাই তো, এই কোলিয়ারী থেকে দু-পাঁচ পালা বায়না পাচ্ছি। বেশির ভাগ দলের তাও জুটছে না।

হঠাৎ এ অবস্থা হলো কেন পান্নাদা?

আমার পাশের সিটে বসে যিনি প্রশ্ন করলেন, তিনি সেই মুহূর্তে যাত্রাজগতের সব থেকে জনপ্রিয় স্টার, যাত্রালক্ষী বীনা দাশগুপ্ত। তখন বছরের পর বছর বীনা শুধুমাত্র আমার লেখা পালাতেই অভিনয় করছেন। তাঁর নামেই তখন শয়ে শয়ে টিকিট বিক্রি হয়। তাঁর কণ্ঠেও শেষপর্যন্ত উৎকণ্ঠা, ‘কেন এমন হচ্ছে?’

কি জানি! তবে শুনেছি, পারমিশন নিতে গিয়ে নায়কদের (পালাগানের উদ্যোক্তা) যে টাকা দিতে হচ্ছে, তার অঙ্ক নাকি বেশি। কোথা থেকে দেবে ওরা?

গ্রাম এবং মফঃস্বল শহরের যাত্রা উদ্যোক্তাদের এইভাবে প্রতি পদে পদে বাধার সম্মুখীন। একটি মাত্র শো করার জন্য থানা থেকে ফায়ার ব্রিগেড পঞ্চায়েত, বি.ডি.ও, এসডিও থেকে ডিএম অফিস পর্যন্ত ছোটাছুটি করতে হচ্ছিল। অথচ এইসব যাত্রা শো করে উদ্যোক্তারা স্কুল বিল্ডিং তৈরি থেকে খেলার মাঠ, দাতব্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেন। বিনোদন এবং সমাজসেবার এক চমৎকার সহাবস্থান ছিল। পুজো থেকে মাঘমাস পর্যন্ত হতো চ্যারিটি শো (প্রবেশপত্র বিক্রি করে) আর ফাল্গুন মাস থেকে দোল, মেলা গাজন চড়কের ফ্রি যাত্রা। কিন্তু তৎকালীন সরকারের ভ্রান্ত পারমিশন নীতির দাপটে একটির পর একটি আসর বন্ধ হয়ে যেতে লাগলো। আগে মরশুমের প্রথম চারমাসে যেখানে একেকটি দলের কমবেশি একশোটি শো হতো—কয়েক বছরের মধ্যেই তা নেমে এলো চল্লিশ-পঞ্চাশটিতে। আগে যেমন দল মালিকেরা বুক ঠুকে বলতেন, চ্যারিটি শো ছাড়া ফ্রি যাত্রা করবো না—তারাও ফ্রি শো নিয়ে বায়নার খাতা ভর্তি করতে শুরু করলেন। অথচ ফ্রি শোয়ের নায়কেরা চান কম টাকার দল। মালিকরা বাধ্য হলেন প্রযোজনার খরচ কমাতে। পালার দরকারি অনুষঙ্গ ছাঁটা হল—প্রযোজনার মান পড়ল—বছরের পর বছর এইসব যাত্রাপালা দেখে দর্শকরা হতাশ হয়ে পড়লেন। অথচ সরকার তখনও উদাসীন।

আজকের যাত্রার কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ যখন বঙ্কিমচন্দ্রের কথা এসেই গেল, তখন বঙ্কিমচন্দ্রকে দিয়েই শুরু করি অতীতের যাত্রার কথা। মুচিরাম গুড়ের মুখে সাহিত্য সম্রাটের সেই অবিস্মরণীয় সংলাপ “সখী! বদন তুলে গুড়ুক খাও—”। বাংলা সাহিত্যের এক জনপ্রিয় রসিকতা। মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিতে বঙ্কিমচন্দ্রের সেই যাত্রা আসরের বর্ণনা বুঝিয়ে দেয়, নিয়মিত যাত্রা দেখার অভ্যাস তাঁর ছিল। তিনি যখন বঙ্গদর্শন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন সেখানেও নিয়মিত যাত্রাভিনয় সম্পর্কে সংবাদ পরিবেশিত হতো। এমনটি বঙ্কিম-অগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র বিদ্যাসুন্দর যাত্রাভিনয়ের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। বঙ্কিমের পূর্বসূরী খ্যাতনামা কবি-সম্পাদক ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় পালাকার মতিলাল রায়ের একাধিক রচনা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এখন সেসব কথা নয়—এখন পূজায় পার্বনে যাত্রার কথা—

উৎসবপ্রিয় বাঙালীর সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। সেই দুর্গাপূজায় সবচেয়ে বড় আসর বসতো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে। রবীন্দ্র-অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘আত্মস্মৃতি’তে লিখেছেন, “আমাদের বাড়ী দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী এই দুই পূজা হতো। কতরকম যাত্রাদল এসে মহল্লা দিতো। তাদের মধ্যে যা সেরা তাই বেছে নেওয়া হতো। যাত্রায় বহু লোক সমাগম হতো। উঠোনটা লোকে লোকারন্য।” আর কবিগুরু ‘জীবনস্মৃতি’তে লিখেছেন, ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যাত্রা শুনিবার জন্য চোখে ঘুম আসিত না। এগারোটা রাত্রে সেই ঢোলে চাটি পড়িল অমনি বিছানা হইতে লাফাইয়া একছুটে তিনি বাহিরের মজলিশে গিয়া হাজির হইতেন।…এই তিনদিন সকলের জন্যই নির্বিচারে অবারিত দ্বার।…তখনকার শ্রেষ্ঠ যাত্রাওয়ালা নিমাই ও নিতাই দাসের যাত্রাই এ বাড়ীতে হইতো।’

শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবার শুধুমাত্র জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীর যাত্রা দেখেই মন ভরতো না। তিনি কয়লাহাটায় চলে যেতেন যাত্রা দেখতে। সেখানে দূর্গাচরণ ঘড়িয়ালের যাত্রা শুনেছিলেন নবমীর রাতে। পালা বাঁধেন অবনঠাকুর। কবি-অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ তার বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

শুধুমাত্র সাহিত্য সম্রাট বা কবিগুরুই নন, অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রেরও যাত্রা শোনার বাতিক ছিল খুব। ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শরৎচন্দ্র লিখেছেন, “বৈচিত্রের লোভে মাঝে মাঝে যাত্রাদলে সাগরেদি করি।” এরপর যৌবনকালে ভাগলপুরের খঞ্জরপল্লীতে যখন ছিলেন তখন পাড়ার কয়েকজনকে নিয়ে তিনি সখের যাত্রাদল গড়ে তুলেছিলেন। পালাকার নির্দেশক ছিলেন তিনিই।

সেই শরৎচন্দ্রই এহেন এক পূজোর মরশুমে গ্রামে যাত্রা দেখেছিলেন। পালা, সাবিত্রী সত্যবান। পরিণত বয়সে হাওড়ার বাজে শিবপুরে থাকার সময় বন্ধু অমরেন্দ্র মজুমদারের বাড়ীতে তিনি সেই যাত্রার বর্ণনা দিয়েছিলেন এইভাবে—

“রাত দশটার পর যাত্রা আরম্ভ হলো লোকে লোকারণ্য। যাত্রাওয়ালারা ভালই অভিনয় করছিল।…যখন সত্যবান মারা গেল, সাবিত্রী তার মৃত স্বামীকে ঘিরে যমের উদ্দেশ্যে খুবই কান্নাকাটি করতে লাগল। যম মৃত সত্যবানকে নিয়ে যেতে চায়, সাবিত্রী ছাড়তে চায় না। মেয়েটির সে কি কান্না। এত জীবন্ত অভিনয়। ঠিক ঐ সময়েই (তৎকালীন অভিনয় রীতি) অঙ্কশেষের জুড়িদের ঐক্যতান। দর্শকেরা অধৈর্য। একদিকে যমরাজ তখন দর্শকদের মধ্যে দিয়ে যাতায়াতের জন্য যে পথ ছিল সেই পথ দিয়ে সত্যবানকে নিয়ে চলেছে, আর সাবিত্রী আকুলি-বিকুলি করে কাঁদতে কাঁদতে তার পিছন পিছন যাচ্ছে।…ঐ সময়ে দর্শকদের ভিতর থেকে প্রৌঢ় গোছের একটি লোক দাঁড়িয়ে চিৎকার করে যমরাজকে ডেকে বললে—ওহে যমরাজ! শোন-শোন যেও না। ওর স্বামীটাকে ছেড়ে দাও, বরং ওই বাজনদারদের লোককে ধরে নিয়ে যাও। ওরা অনেকগুলো আছে। ব্যাটারা যাত্রাটাকে একেবারে মাটি দিলে গা।”

শরৎসাহিত্য পড়লেই বোঝা যায়, যাত্রা দেখার কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা ছিল তার।

আর ‘পথের পাঁচালী’র স্রষ্টা বিভূতিভূষণ—আজীবন যাত্রাপালার মুগ্ধ দর্শক ছিলেন তিনি। দুর্গাপূজো নয়, তিনি কিন্তু ফি মরশুম কালীপূজায় যাত্রা দেখতেন ঘাটশীলায়। প্রখ্যাত কথা-সাহিত্যিক শচীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন—“বিভূতিভূষণের সঙ্গে আমার যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা ঘটে ঘাটশিলাতে। কালীপূজোর পরের দিন। রাতে খাওয়া-দাওয়া করে উঠে সবে নিজের ঘরে বসেছি, হঠাৎ ভেসে এলো বিভূতিভূষণের কণ্ঠস্বর, শচীন, যাত্রা শুনতে যাচ্ছি স্টেশনে। খুব ভালো যাত্রা, জয়দেব। আমরা যখন আসরে বসলাম তখনো কনসার্ট বাজেনি। এর পরের বছরও ওঁর যাত্রা সঙ্গী হয়েছিল। পালার নাম ছিল কেদার রায়। এদের নাটকে কোনও নাচটাচ নেই। প্রত্যেকেই ভালো অভিনয় করছে, কার্ভালো তো বটেই, কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে স্বকীয়তায় যিনি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলেন, তিনি কেদার রায়।” যাত্রার শেষ বিভূতিভূষণ বললেন, তুমি একটু যাও তো। জিজ্ঞেস করে এসো ভদ্রলোকের নাম কি? আমি উঠে সাজঘরের দরজার কাছে যাত্রাদলের যে এক কর্তাব্যক্তি দাঁড়িয়েছিলেন, তাকে গিয়ে কেদার রায়ের নাম জিজ্ঞাসা করলাম। ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে গেলেন, আর কেদার রায়কে নিয়ে ফিরে এলেন। লেখক বিভূতিভূষণ তার সাবলীল এবং সংযত অভিনয়ের প্রশংসা করে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার নামটা জানতে পারি কি?

‘কেদার রায়’ বললেন, আমার নাম পঞ্চু সেন।

যাত্রার প্রতি বিভূতিভূষণের এই ভালবাসা এবং সমীহই প্রতিফলিত হয়েছে ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে।

যাত্রা আরম্ভ হয়। জগৎ নাই কেহ নাই—শুধু অপু আছে। আর নীলমনি হাজরার যাত্রা দল আছে সামনে। আসলে, ঐ অপুই তো স্বয়ং বিভূতিভূষণ—যাত্রার এক তন্ময় দর্শক।

কালীপূজায় বিভূতিভূষণের যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতার পর, এবার আর এক কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্করের কলমে জগদ্ধাত্রী পূজোয় যাত্রার বর্ণনা। জীবনস্মৃতিতে ‘আমার কালের কথা’য় তারাশঙ্কর লিখছেন—

“জমিদারবাড়ীতে জগদ্ধাত্রী পূজার সমারোহ—

জগদ্ধাত্রী পূজায় জমিদারবাড়ীতে দুদিন যাত্র হলো। আসত বড় বড় যাত্রা দল। সে কালের নীলকণ্ঠ, শ্রীকণ্ঠ, সিতিকণ্ঠ তিন ভাই আসতেন। মতি রায়ও আসতেন। অধিকাংশ সময় আসতেন আমাদের জেলার খ্যাতনামা কৃষ্ণযাত্রার অধিকারী যোগীন্দ্র মুখোপাধ্যায় তার দল নিয়ে।

একবার একটি ঘটনা ঘটেছিল। শ্রীকণ্ঠ ও সিতিকণ্ঠ এসেছেন রাসের বাড়ীতে গাওনা করতে। লোকে লোকারণ্য, গান চলছে। কিন্তু গ্রামের কয়েকজন যুবকের গান মনঃপূত হয় নি। তাঁরা বল-হরি-হরিবল অর্থাৎ যাত্রাকে গঙ্গাযাত্রা বলে ব্যঙ্গ করে আসর ছেড়ে বেরিয়ে এসেই অকস্মাৎ চিৎকার করে উঠলেন আগুন! আগুন! আগুন! মাটির ঘরের দেশ, ঘনসন্নিবদ্ধ খড়ের চাল। চীৎকার শুনে মুহূর্তের মধ্যে আসর গেলো ভেঙে। আতঙ্কিত গ্রাম্য শ্রোতার দল। ছুটল আপন আপন বাড়ীর দিকে।”

বর্ণালী বন্দ্যোপাধ্যায় ও সমীর লাহিড়ী ‘দেবী মালিনী’ ১৩৮৮

পুজো ছেড়ে এবার পার্বনের কথা বলি। জন্মাষ্টমী, দোল কিংবা রাসযাত্রায় কিন্তু কৃষ্ণবিষয়ক যাত্রা হয়—আজকের বাহালী যাকে উপহাস করে কেষ্টলীলা বলে। অথচ কৃষ্ণকমল গোস্বামী রচিত ‘স্বপ্নবিলাস’, ‘দিব্যোন্মাদ’, ‘রাইউন্মাদিনী’ ইত্যাদি পালা তৎৎকালীন (ইং-১৮৩৫ সন) সারস্বত সমাজে উচ্চপ্রশংসিত হয়েছিল। শুধুমাত্র তাই নয়। এই পালাগুলির উপর গবেষণা করে নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় জার্মানীর জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি উপাধি লাভ করেন। সম্ভবতঃ কোনও বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এটাই প্রথম বাংলা সাহিত্যের গবেষণা পত্রের প্রথম স্বীকৃতি। গবেষণাপত্রের শিরোনাম ছিল : The Jatras : or The Popular Dramas of Bengal. গবেষণাপত্রটি ১৮৮২ সালে বই আকারে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। বিদেশে সমাদৃত কৃষ্ণকমলের এই গানগুলি কিন্তু পূজায় পার্বনে বহুল অভিনীত এবং দর্শক সমাদৃত হয়েছে। গবেষণাপত্রে নিশিকান্ত তারই উল্লেখ করেছেন—

Swapna-Vilas was first Performed in Ekrampore, Dacca. Very soon it became immensely Popular in Eastern Bengal. Divyonmada/Rai Unmadini was first staged in the Abdullapur Village of Vikrampur Pargana.

শিবরাত্রি বাঙালীর এক প্রিয় উৎসব। আর এই শিবরাত্রিতেই যাত্রা শুনতে গিয়ে যাত্রা গেয়ে ফেলেছিলেন বালক গদাধর—আপামর বাঙালীর কাছে যিনি পরিচিত ঠাকুর রামকৃষ্ণ নামে। ঘটনাটি মজার—একটু সংক্ষেপে বলি—

রামকৃষ্ণদেবের জন্মস্থান কামারপুকুরে প্রতি বৎসর শিবরাত্রি উপলক্ষ্যে সীতারাম পাইনের বাডীর সামনে শিবযাত্রা হতো। সে বারও প্রতিবারের মতো যাত্রা গাহনা করতে যাত্রা দল এসেছে। গ্রামের আর সবার মতো বালক গদাধরও যাত্রা দেখার জন্য ছটফট করছেন। কিন্তু হঠাৎ দুঃসংবাদ। অধিকারীমশাই জানিয়ে দিয়েছেন, যাত্রা হবে না। যে ছেলেটি শিব সাজে, সে নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পাইন মশাইয়ের মাথায় হাত। শেষমেশ অধিকারীমশাই একটা দাওয়াই বাৎলালেন—কোন বালক যদি শিবের ভূমিকাটি আজ রাতের মতো চালিয়ে দিতে পারে, তাহলে পালা হবে। শুনেই গদাধর তো আনন্দে আত্মহারা, তিনিই শিব সাজবেন। হলোও তাই। বালক গদাধরের অভিনয়ে সকলেই মুগ্ধ—উৎসবের আঙিনায় আবার ফিরে এল উৎসবের মেজাজ।

রামকৃষ্ণদেবের মতো বিবেকানন্দও কিন্তু যাত্রার প্রেমে মাতোয়ারা হয়েছিলেন। আর তার কারন ছিল এইরকম এক বারোয়ারি পূজায় অনুষ্ঠিত গোবিন্দ অধিকারীর দলের যাত্রা। বিবেকানন্দ অনুজ মহেন্দ্রনাথ দত্ত স্মৃতিচারণা করে লিখেছেন—

“মহেন্দ্র গোস্বামীর গলিতে বা ডোমপাড়ায় আগে একটা বড় পুকুর ছিল। এখন পুকুর বুজাইয়া মাঠ হইয়াছে। ইংরাজী ১৮৭১ বা ৭২ সালে গয়লাদের মাঠে বারোয়ারী পূজা হইল। আমরা দুইভাই তখন খুব ছোট। শেষ রাতে কাপড় পড়িয়া যাত্রা শুনিতে গেলাম।

বীরেশ্বর বাড়িতে আসিয়া সেই যাত্রা শুরু করিয়া দিল। কাপড়খানি যাত্রাওয়ালাদের মত পরিয়া যাত্রায় যাহা যাহা শুনিয়াছিল, তাহারই আবৃত্তি চলিল। সেই লইয়া বেশ দিন কতক চলিল।”

বারোয়ারী পূজায় যাত্রা দেখার অভ্যাস প্রমথনাথ বিশীরও ছিল। এ লেখায় ষষ্ঠী থেকে জষ্ঠীর কথা বলেছিলাম। ষষ্ঠীতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ীতে যাত্রার কথা বলেছি। এবার জষ্ঠিতে প্রমথনাথ বিশীর যাত্রা দেখার অভিজ্ঞতা দিয়ে এ পরিক্রমা শেষ করি। ‘রবীন্দ্রনাথ ও শান্তিনিকেতন’এ প্রমথনাথ বিশী লিখছেন—

যাত্রাগান শুনিতে চিরকাল আমার ভালো লাগে। বোলপুর শহরে গ্রীষ্মকালে নানা উপলক্ষে যাত্রা-অভিনয় হইয়া থাকে। খবর পাইলেই আমি যাইতাম। হঠাৎ একদিন বিভূতি গুপ্ত বলিল, যাত্রাপালা লিখিলে হয়। দু-চারজন বন্ধুকে আইডিয়াটা বলিলাম, তাহারাও উৎসাহ অনুভব করিল। শচীন করের উপর গানের দলটি পরিচালনার ভার ছিল। অভিনেতার দল জুটিয়া গেল। এমন কি, জগদানন্দবাবুর মত প্রবীণ লোক ও তেজেশবাবুর মত গম্ভীর লোকও অভিনয়ের দিন আলখাল্লা পরিয়া বেহালা হাতে আসরে নামিলেন। তারপর একদিন রাত্রে আশ্রমের প্রাঙ্গনে আসর বাঁধিয়া, সামিয়ানা টাঙাইয়া, আলো জ্বালিয়া অভিনয়ের উদ্যোগ হইল। দর্শকদের মধ্যে সকল শ্রেণীর লোক ছিল। চাকর-বাকর হইতে আরম্ভ করিয়া স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত। তিনি আসরে বসিয়া ধৈর্যের সঙ্গে আগাগোড়া শুনিয়াছিলেন।—পালার নাম বীরভূমেশ্বর পরাজয়।

আমাদের যাত্রাপালার সাফল্য দেখিয়া রবীন্দ্রনাথের ঝোঁক হইল যাত্রা লিখবেন। একদিন আমাকে বলিলেন, “দেখ্, এবার যাত্রাপালা লিখব ভাবছি! আমি বলিলাম, সাহিত্যের সব পথই তো আপনার পদচিহ্নিত; এক-আধটা গলিপথও কি আমাদের মত আনাড়িদের জন্য রাখবেন না? আমার কথা শুনিয়া তিনি কি ভাবিলেন জানি না। কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন, আচ্ছা যা। ভাবটা এই, ও পথটা তোদেরই ছাড়িয়া দিলাম।”

রবীন্দ্রনাথ এই সার সত্য বুঝেছিলেন বলেই লিখেছিলেন, “যাত্রাগান ছিল শুকনো গাঙে কোশ-দু’কোশ অন্তর বালি খুঁড়ে জল তোলা। ঘন্টা কয়েক তার মেয়াদ। পথের লোক হঠাৎ এসে পড়ে, আজলা করে তেষ্টা নেয় মিটিয়ে—”। আসলে যাত্রার উৎস কিন্তু এইসব উৎসবই। তাই উৎসব যতদিন থাকবে, ততদিন যাত্রাও থাকবে।

দীর্ঘ তিন দশকের অধিককাল সরকারী উপেক্ষা এবং অবিচারের শিকার হয়ে যাত্রা হয়তো সাময়িকভাবে গতি হারিয়ে শ্লথ হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে মা মাটি মানুষ সরকারের সহায়তা এবং মুখ্যমন্ত্রীর উৎসাহে যাত্রার মরাগাঙে আবার জোয়ার এসেছে। যাত্রাদলগুলির শো বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে যাত্রাদলের সংখ্যাও। এই তো সবে শুরু। কিন্তু শেষ? না, হবে না—কারন, যাত্রা মানেই এগিয়ে যাওয়া থেমে যাওয়া নয়। শেষ হয়ে যাবার প্রশ্নই নেই এ যাত্রা অনন্ত, বাংলার, বাঙালীর অন্তরের চিরন্তন সম্পদ।

ছবি : দেবশ্রী মুখোপাধ্যায় ‘জ্যোৎস্না দত্ত’ ‘মুচি মায়ের মুচি ছেলে’

সংগ্রামী মা মাটি মানুষ পত্রিকা ২০১৬ পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev