আগে পুজোর সংখ্যা কম ছিল, বেশি ছিল পুজোসংখ্যা। সেসব পুজোবার্ষিকী বা বিশেষ প্রকাশনা শুধু সংখ্যাতেই বাড়তো না, গুণমানেও নজর কাড়তো মানুষদের। মনে মনে এগুলির জন্য অপেক্ষা করতেন মানুষজন, কবে সেই পুজো বা বিশেষ সংখ্যাটি হাতে পাবেন তারা। হাতে পাওয়ার পর সেই উৎসাহ বদলে যেত পাঠ প্রতিক্রিয়ার উত্তেজনায়। কে এবার সবচেয়ে ভালো লিখেছেন, কে দিয়েছেন ফাঁকি কেউবা শুরুটা ভালো করলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি তা নিয়ে নিজেদের মত করে মতামত দিতেন পাঠককুল। সেসব মোটেই বিশেষ অজ্ঞদের মতামত নয়, মানুষের ভালো বা মন্দ লাগার অনাবিল ঘোষণা। এই প্রতিক্রিয়ার জন্যই সারা বিশ্বে সংস্কৃতির ব্যাপারীরা একপায়ে খাড়া হয়ে অপেক্ষা করেন। নির্ধারিত হয় শিল্প-সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ। বাঙালি শিল্পসাহিত্য ভালো বোঝে এই ধারণাটির ভিত গড়েছে এই প্রতিক্রিয়া।

বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা, নতুন জামাকাপড়ের যেমন একটা মন ভালো করা গন্ধ থাকে পুজোবার্ষিকীগুলিতেও ঠিক তেমন একটা মন ভালো করা গন্ধ থাকতো। মলাট ওলটালেই সেই গন্ধটা এসে লাগতো নাকে। পুজোর ছুটি মানে মন ভালো হয়ে যাওয়া শুরু, এই বইগুলি যেন তার ঘন্টা বাজিয়ে দিত। ‘দেবদেউল’, ‘শারদীয়া’, ‘অলকানন্দা’র মত দেব সাহিত্য কুটিরের পুজোবার্ষিকীগুলি খোলা মানেই এক আনন্দভ্রমণের সূচনা। এখন অবশ্য ‘ভালো-মন্দ’ বলা উঠে গেছে। সিরিয়াস বা সবজান্তা লোকেদের উৎপাতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জীবন। তারা বলেন ‘পজিটিভ’ আর ‘নেগেটিভ’। যাকগে যা বলছিলাম, শৈশব পেরিয়ে বহুদিন পর যেখান থেকে এই বইগুলি বেরোতো সেই দেব সাহিত্য কুটির এর বাড়িটি দেখে অবাক হতাম! ভাবতাম, ঝামাপুকুর লেনের এই মলিন গলিতে এমন আনন্দের পাঠশালা তৈরি হল কীভাবে!

শুধু মন ভালো করে দেওয়াই নয়, বহু পত্রিকার পুজো বা বিশেষ সংখ্যাগুলি যোগাতো ভাবনার খোরাক। সাধারণ পাঠক তো বটেই এমনকি যারা কোনভাবে সেই লেখাগুলি পড়ে ফেলতেন তাদের মধ্যেও বিষয়টি সম্পর্কে একটা আগ্রহ তৈরি হত। উৎসাহীরা আরও জানতেন, পড়ে নিতেন বিষয়টি সংক্রান্ত আরও কয়েকটি বই। এভাবেই তো নিঃশব্দে তৈরি হয় পাঠক, বইকে ভালবাসতে শেখেন মানুষ। এরা হয়তো ‘শিল্পের সঙ্গে সহবাস’ জাতীয় কোন স্মার্ট বাক্যবন্ধ বানাতে পারবেন না কিন্তু এমন নিবিষ্ট সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষদের জন্যই তো বই-ছবি-গান চুপচাপ অপেক্ষা করে থাকে।

সঠিক বলছি কিনা জানিনা আমার যেন কেমন মনে হয় – ভালো বই, ছবি, চলচ্চিত্র ইত্যাদির ওপর নতুনদের আকর্ষণ বাড়ছে। বাংলা বইয়ের চমৎকার সব প্রোডাকশন, বিষয় বৈচিত্রের পাশাপাশি ছবি ও সিনেমা নিয়ে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষার সাহস সংস্কৃতির মরা গাঙে আবার ঢেউ তুলছে। পুজোসংখ্যাগুলিও তাদের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করে সেই যাত্রার সঙ্গী হোক।