কলকাতার বুকে উঠে এসেছে একটা আস্ত গ্রাম! হ্যাঁ ঠিক-ই পড়ছেন। শীতের ওম গায়ে মেখে গ্রাম্য পরিবেশের ঘ্রাণ পেতে কলকাতা থেকে ৩০-৪০ কিমি দূরত্বে যেতে হবে না। কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার প্রেস ক্লাবে উঠে এসেছে এক টুকরো আস্ত গ্রাম। তবে আক্ষরিক অর্থে। কলকাতা প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে ২৩ থেকে ২৯ ডিসেম্বর ব্যাপী আয়েজিত হচ্ছে গ্রাম কৃষ্টি উৎসব। সহজে বলা যায়, বর্ষশেষের আনন্দকে আরো পুরু করতে কলকাতা প্রেস ক্লাব, তার নিজস্ব প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে একটি গ্রামীণ হাট। দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশ এখানে। কী পাবেন এই হাটে? গ্রামের তাজা সব্জি, গ্রাম্য সংস্কৃতির নানা নিদর্শন যেমন, পুরুলিয়ার মুখোশ, হাওড়ার পোড়া মাটির খেলনা বাশি, কচুরি পানার তৈরি জিনিস, গ্রাম বাংলার জনপ্রিয় আচার থেকে শুরু করে ডোকবার গয়না, বা তাঁতের কাপড় সব-ই মিলছে এখানে সঙ্গে বাড়তি পাওনা টুসু, ভাদু, ইত্যাদি নাচ-গান। বিগত সাত বছর ধরে প্রেস ক্লাব রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীদের এক ছাদের তলায় নিয়ে এসে এই মেলার আয়োজন করে চলেছে। করোনা মহামারির জন্য ১ বছর এটি বন্ধ ছিল। ২০২২ সালে করোনাকে পিছনে ফেলে আবার নিজস্ব গরিমায় শহর কলকাতায় উঠে এসেছে গ্রামের পরশ — গ্রাম কৃষ্টি উৎসব।

কলকাতা প্রেস ক্লাবের সামাজিক কাজের মধ্যে এটি অন্যতম। এর মাধ্যমে গ্রামের সঙ্গে শহরের মেলবন্ধন ঘটে তো বটেই, একই সঙ্গে গ্রাম-শহরের অর্থনীতি অনেকটা ঘুরপাক খায় সপ্তাহ ব্যাপী এই মেলা বা হাট-কে কেন্দ্র করে। কী ভাবে? কলকাতা প্রেস ক্লাব এর মাধ্যমে মূলত একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করে। এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিল্পীরা তাঁদের শিল্পকে ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরেন। কোনো দালাল ছাড়াই শিল্পীরা সহজে ক্রেতাদের কাছে উপস্থিত হন। এর মাধ্যমে সারা বছরের অর্ডার তাঁরা সংগ্রহ করেন, একাধিক যোগাযোগের মাধ্যম সূচিত হয়। একদিক থেকে শিল্পীরা ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে তাঁদের চাহিদা যেমন বুঝতে পারেন, ঠিক একই ভাবে কোনো মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতে শিল্পীরাও সঠিক জিনিসের সঠিক মূল্য পান। এবং এর মাধ্যমে গ্রাম-শহরে টাকা আদান প্রদান হয় — যা রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থাকে পোক্ত করতে সাহায্য করে।

শুধু পেশার তাগিদে নয়, নেশাতেও অনেক শিল্পী বহু দূরের পথ পারি দিয়ে, অনেক কষ্ট সহ্য করে এই মেলায় উপস্থিত হন। অর্থনৈতিকভাবে সমাজে সাফল্যের প্রদীপের নীচে জমে থাকা কালো অন্ধকারে বাস যাঁদের, নিজ নিজ ক্ষেত্রে সেই সব নাম-না জানা আশা-লতা-সচিন-দের সঙ্গে পরিচিত হবার একটা বড়ো সুযোগ করে দেয় গ্রাম কৃষ্টি উৎসব। কলকাতার বইমেলার মতো এই উৎসবও কয়েক বছরে নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তুলতে পেরেছে। সারা বছর প্রেস ক্লাব শুধুমাত্র সদস্যদের প্রবেশাধিকার দিলেও মেলের এই কটি-দিন কোনা বিধি-নিষেধের বেড়ে জাল রচনা করে না। “এসো আমার ঘরে এসো … আমার ঘরে” — অনুভূতি ছড়িয়ে দিয়ে কলকাতা প্রেস ক্লাব আহ্বান করে গ্রাম কে। সাক্ষী থাকে আপামোর কলকাতা তথা রাজ্যবাসী। প্রেস ক্লাবের সদস্যরা কোনো রকম তথাকথিক বিজ্ঞাপণ ছাড়াই মুখে মুখে বা ফোনের মাধ্যমে এই মেলার গন্ডিকে অনেকটা বিস্তারিত করেন।

বহু আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্বপূর্ণ মানুষের দেখা মেলে এখানে। এই বছর মেলায় ঘুরতে ঘুরতে পরিচয় হলো নারায়ণ মাহাত-র সঙ্গে। ঝাড়গ্রামের দর্পশীলা গ্রামে বসবাস করা ষাটোর্ত্তীন্ন অদ্ভুত মানুষ তিনি। গর্ব করে বলেন, ‘আমার কিন্তু কোনো বাড়ি নেই’। এই কঠিন কথাটা বলতে বলতেও তাঁর মুখ থেকে এক উজ্জ্বল আলো, হাসির মাধ্যমে চারপাশ বিবৃত করে। তাঁর নেশা — গ্রামের মানুষদের পারিপাশ্বিক গাছ-গাছালির গুরুত্ব বোঝানো। এ যেন এক ‘গাছ পাগল মানুষ’। তথাকথিত পড়াশোনার ডিগ্রি না থাকলেও তাঁকে গ্রামের মানুষরা কবিরাজ বলে মান্য করেন। তাঁর কাজ কী? গাছের মাধ্যমে পরিষেবা দেওয়া সাধারণ মানুষকে! কোনো অবাস্তব কাহিনি বলছি না। এই কাজের জন্য চলতি মেলায় প্রেস ক্লাব তাঁকে সম্বর্ধনা দিয়েছে। তিনি জানালেন, “গাছ গাছালি থেকে পাওয়া অসুধের মাধ্যমে মানুষকে আরোগ্য লাভে সাহায্য করা আমাদের বংশ পরম্পরার পেশা। জন্মের পর থেকে আমি এটি দেখতে দেখতে বড়ো হয়েছি। পরিনত বয়সে একটু অন্য রকম আধুনিকতা এনে এই কাজটি স্বাধীন ভাবে আমি করছি। কালের নিরিখে পরম্পরার কিছু অংশ বর্জণ-গ্রহণের মাধ্যমে কাজটি আমি এগিয়ে নিয়ে চলেছি। এই বিষয়ে বেশ কিছু জায়গায় লেখা-লেখিও করি। আমার কাজের পদ্ধতি বা পন্থা অনেকে বিশ্বাস না-ও করতে পারেন। তবে বেশিরভাগ মানুষ-ই এর মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। গুরুর আখরায় থেকে আমি নিজেকে আরো সমৃদ্ধ করেছি।’

তাঁর উপলব্ধি, ‘স্থান ভেদে গাছের চরিত্র বদল হয়।’ ঝুমুর নিয়েও তিনি বহু কাজ করেছেন। সম্বর্ধনা পেয়ে কতটা আনন্দিত হলেন জানতে চাওয়ায় গালে থাপ্পর খাওয়ার মতো উত্তর পেলাম তাঁর থেকে — “সম্বর্ধনায় কিছু হয় না! শুধু দায়িত্বটা একটু বেড়ে যায়। সম্মান জিনিসটা ভালো, কিন্তু এর দ্বারা পেট ভরে না।” মানুষটা বলে কী! কলকাতা প্রেস ক্লাবের মতো আভিজাত্য পূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে এ যেন আরন্যক উপন্যাসের আদিবাসী রাজা দবরু পান্না! সত্য অনুসারী হয়ে কর্ম যোগে বিশ্বাসী এক ব্যক্তিত্ব। বিশ্বাস করেন, “ভেসজ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন, মিথ্যার সঙ্গে তাঁরা বসবাস করতে পারেন না।”

শুধু এক জন নারায়ণ মাহাত নয়, এই মেলায় এলে দেখা পাবেন এমন অনেক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। তাই আর দেরী না করে একবার ঘুরে যান কলকাতা প্রেস ক্লাবে। আর হ্যাঁ চেষ্টা করবেন অন্তত একটি শিল্প সামগ্রী সংগ্রহ করতে। আসল সত্য-নারায়ণ পূজার দক্ষিণা এর মাধ্যেই নিহিত আছে।