“দিল্লির রাস্তায় ধেয়ে আসা উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের কর্পোরেট কৃষকদের সমস্যা অতি বিচিত্র – সে সাত দশক ধরে পুঁজিতান্ত্রিক কর্পোরেটের হয়ে যতরকম কুকম্ম গ্রামে সমাধা করার, করেছে – কর্পোরেটের অঙ্গুলিহেলনে বিষাক্ত চাষবাস ঢুকিয়েছে, চাষীর বীজ ধ্বংস করেছে, জমি দখলদারি করেছে, কারিগর উচ্ছেদ করেছে, যন্ত্রনির্ভর একফসলি চাষ নিয়ে এসেছে, চাষীর স্বনির্ভরতা লোপ ইত্যাদি গ্রামে চাপিয়ে দিয়ে হঠাত করোনার আবহাওয়ায় দেখতে পাচ্ছে, তারা যাদের লাভের জন্যে নিজেদের মাথা এমনকী বকল্মাটাও বিকিয়ে দিল, সেই কর্পোরেটরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নতুন বিলে নিজেদের এককণা অধিকার আর লাভ ছাড়তে রাজি নয় বরং কর্পোরেট চাষীদের কাছে বেণীর সঙ্গে মাথাও চাইছে। কর্পোরেট কৃষকেরা দেখল এটাই তার সাত দশকের কর্পোরেটিয় সবুজ বিপ্লব রূপায়ন করে কর্পোরেট পায়ে নিজেদের সঁপে দেওয়ার প্রাপ্তি”
তিন কৃষি বিল নিয়ে উত্তর পশ্চিম ভারতের কৃষকেরা বিশেষ করে পাঞ্জাবের শিখ আর জাঠ কৃষকেরা কেন্দ্রিয় সরকারের ওপর খড়গহস্ত, অন্যান্য কর্পোরেটকেও ছেড়ে কথা বলছে না। এক বছর আগের শাহিনবাগের আন্দোলনের মত উত্তর পশ্চিম ভারতের কৃষকদের আন্দোলন দেশজ ভৌগোলিক ব্যপ্তি না পেলেও রাজনৈতিক আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে বিদেশেও। আন্দোলন সম্বন্ধে নতুন কিছু বলার নেই, বাংলার অধিকাংশ প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদমাধ্যম দিল্লি আন্দোলনের সংবাদ প্রচারে খুব একটা মুক্তহস্ত না হলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ মাধ্যম সেই ঘাটতি পূরণ করে দিচ্ছে, প্রতিমুহূর্তের সংবাদ পাওয়া এখন খুব একটা সমস্যার নয়। বহু যোগ্য মানুষ এই কাজ করছেন তাই আন্দোলনের নানান প্রকরণ নিয়ে এই প্রবন্ধে টিপ্পনি না করাই ভাল।
এই আন্দোলনকে তীব্রভাবে সমর্থন করে ছোট্ট প্রবন্ধটিতে দুটি বিষয় আলোচনা করব। প্রথমটি কেন্দ্রিয় সরকারের নানান দমনমূলক পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার জোরটা এই আন্দোলনের কৃষকেরা কীভাবে অর্জন করল সেটা বুঝব পাঞ্জাব আর শিখেদের ইতিহাস থেকে। দ্বিতীয়ত লেখক যেহেতু কারিগর সঙ্গঠনের সঙ্গে যুক্ত, সেই দৃষ্টিতে দেখতে গেলে পশ্চিমি পুঁজিনির্ভর জাতিরাষ্ট্রীয় কেন্দ্রিভূত রাষ্ট্র ব্যবস্থা উপনিবেশের সময় থেকেই সাধারণ বহুফসলি অকেন্দ্রিভূত কৃষি ব্যবস্থার বিরোধী এবং কর্পোরেটিয় এক ফসলি পুঁজি নির্ভর কৃষিব্যবস্থার মদতদার— যে ব্যবস্থা পুঁজিনির্ভর, বিদ্যুৎ নির্ভর, শ্রম প্রতিস্থাপনকারী শিল্পবিপ্লবীয় কারখানা পদ্ধতির বিস্তৃতিমাত্র। বর্তমান কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে যে সব কথা উঠে আসছে, সে সব আলোচনায় অকর্পোরেটিয় কৃষি, কৃষকের স্বাধীনতা, গ্রামের স্বনির্ভরতা, খাদ্য সুরক্ষা ইত্যাদির মত অস্বস্তিকর প্রশ্নের ঠাঁই কোথায় সেই প্রশ্নে এই প্রবন্ধটি শেষ করব।
উত্তর পশ্চিমের বিশেষ করে পাঞ্জাবের শিখ সমাজের এই কৃষকেরা রাষ্ট্রকে হাড়ে হাড়ে চেনে সেই উপনিবেশের আগে থেকে। কেন বললাম এই কথা? পাঞ্জাবের শিখ সমাজ উপনিবেশ পূর্ব সময়ে রাষ্ট্র ব্যবস্থা চালিয়েছিলেন এবং পরের দিকে তারা উপনিবেশিক ক্ষমতার অংশিদার হন। সেই বিষয়গুলি চুম্বকে আলোচনা করি। ১৬৯৯-এ গুরু গোবিন্দ সিংহ নববর্ষে বৈশাখীর দিন বিপুল শিষ্য সমাবেশ ঘটিয়ে পাঁচজন শিষয়কে নির্বাচি। করলেন খালসার মূল ধারণার ধারক বাহক হিসেবে। প্রত্যেককে নির্দিষ্ট আচারের মধ্যে দিয়ে যেতে হল— প্রত্যেকে একটি পাত্রে একসঙ্গে পান করলেন। নিয়মও তৈরি হল – শিখেরা মাথা চুল আর দাড়ি কাটবে না, মদ, তামাক পরিহার করবে, হালাল মাংস খাবে না, মুসলমান মহিলাদের সঙ্গে সঙ্গম করবে না। প্রত্যেকের উপাধি হবে সিংহ। আকাটা চুল (কেশ) রাখবে, চুলে চিরুনি ডুবিয়ে রাখবে (কাঙ্গা), হাঁটু পর্যন্ত জামা পরবে (কাচ্ছা), ডান হাতে ইস্পাতের বালা পরবে (কাড়া) এবং তরোয়াল (কৃপাণ) বহন করবে (সূত্র বারনারড কোহন, কলোনিয়ালিজম এন্ড ইটস ফর্মস অব নলেজ, অনুবাদে সাম্রাজ্যের মন ও মান, প্রকাশক ডাকঘর)। একবদ্ধতার মন্ত্রে তৈরি হল শিখ সমাজ। ১৭০৭এ আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে মুঘলদের কেন্দ্রিয় কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে থাকে এবং ভারতজুড়ে নানান আঞ্চলিক রাষ্ট্রের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর পশ্চিমে শিখ রাষ্ট্র গড়ে ওঠে। শিখ রাষ্ট্র টিকে থাকে প্রায় দেড়শ বছর ১৮৪০এর দশকের মাঝামাঝি ব্রিটিশদের হাতে পর্যুদস্ত না হওয়া অবদি।
এখানেই শিখেদের ক্ষমতার সঙ্গে বোঝাপড়া শেষ হল না। শিখেদের যুদ্ধে হারিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তাত্ত্বিকদের মনে হল শিখেদের উপনিবেশিক ক্ষমতায় অঙ্গীভূত করে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। শিখ সেনাদের জন্যে লেখা তথ্যগ্রন্থে ক্যাপটেন আর ডব্লিউ ফ্যালকন শিখেদের যুদ্ধ জাতি অভিধা দিয়ে লিখলেন ‘এই ধর্মে মূর্তিপুজা, ভণ্ডামি, জাতিবাদিতা, মহিলাদের পুড়িয়ে মারা বা শিশুহত্যার মত জঘন্য কাজ হয় না… শিখেরা যুদ্ধ জাতি, তারা খেলোয়াড়, বুদ্ধিতে একটু খাটো কিন্তু সাহসী, ঋজু এবং সত্যবাদী’। এই সূত্রধরে ব্রিটিশ বাহিনীতে শিখেদের চাকরি দেওয়ার কাজ শুরু হল। তাদের বাহিনীর অন্যান্য জাতি থেকে আলাদা করতে বিশেষ ধরণের পাগড়ি পরিয়ে দিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। যে সব জ্ঞানী, বিদ্বান শিখ সম্প্রদায়ের উদ্ভব এবং বিকাশ নিয়ে লিখেছেন, তাঁরা কিন্তু পন্থে কিভাবে পাগড়িই শিখ চরিত্রের অন্যতম চিহ্ন হয়ে উঠল, সে বিষয়ে আশ্চর্যজনকভাবে চুপ থেকেছেন। শেষ অবদি শিখ এবং গোর্খা বাহিনীর বলে ১৮৫৭-র সিপাহিদের যুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রাম হারতে হারতে জেতে ব্রিটিশ উপনিবেশ। এক দশকেই ব্রিটিশ বাহিনীর বিপুল অংশ হয়ে উঠেছে শিখেরা। বারনারড কোহন বলছেন ১৯১২-র হিসেবে ব্রিটিশ ভারতের মোট সেনার মধ্যে ২০% শিখ, ১৬% পাঞ্জাবি মুসলমান, ১২% গুর্খা, রাজস্থানের রাজপুত ৮%, ডোগরা আর গাড়োয়ালিরা ৭.৫%, পাঠান ৮%, জাট ৬%। বাকি সেনা মারাঠা, ব্রাহ্মণ, হিন্দুস্থানী মুসলমান এবং অন্যান্য হিন্দু সমাজের থেকে যাদের মধ্যে তামিল আর তেলুগুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বেঙ্গল রেজিমেন্ট উঠিয়ে দিল সাম্রাজ্য।

সেনাবাহিনীতে বিপুল চাকরির পাশাপাশি ইন্ডিয়ান সিভিল সারভিসেও প্রবেশ করতে থাকে শিখেরা। সিপাহী লড়াইএর এক দশকের মধ্যে ২০ শতাংশ পদ ভারতীয়দের জন্যে সংরক্ষিত হলে প্রাথমিকভাবে বাঙ্গালিরা সফল হয় কিন্তু পরের দিকে শিখেরাও প্রশাসনিক সেবায় বড় ভূমিকা নিতে থাকে। বঙ্গভাগের পরে রাজনীতিতেও বড় ভূমিকা ছিল শিখেদের। খালিস্তান আন্দোলন সফল না হলেও রাষ্ট্রপতি এবং মাত্র ২৫ বছর আগেই প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শিখ সমাজ থেকে। শিখ সমাজের সঙ্ঘবদ্ধতা স্বর্ণ মন্দিরে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে জুতোও পরিষ্কার করিয়েছে।
শিখেদের ক্ষমতার সঙ্গে বোঝাপড়ার দীর্ঘ ইতিহাস। বহুকাল উপনিবেশপূর্ব, ঔপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র দুই ব্যবস্থার অংশিদার হওয়ার ফলে জানে ক্ষমতা কোন ভাষা বোঝে। এরা জানে রাষ্ট্রকে কীভাবে হাঁটু ভাঙ্গানো না গেলেও বাঁকানো যায়। দিল্লি সীমান্তে সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্যে হয়ত তারা তৈরিও। চাষীরা আন্দোলনের যে রণনীতি নিয়েছে সেটা যে কোনও পোড় খাওয়া কিন্তু রাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষি করতে দক্ষ আন্দোলনের নেতাকে ঘোল খাইয়ে দিতে পারে। মন্ত্রীর চেম্বারের গ্ল্যামার, মিটিঙে পাঁচ তারকার ১০০০ টাকার লাঞ্চের থালি দেখিয়ে কাজ হয় নি, সব খাবার ফেলে সঙ্গে আনা রুটি খেয়েছে। এই জোরের জায়গা থেকে উপনিবেশ উত্তর সময়ে বঙ্গ-পাঞ্জাব ভাগের দেড় দশকের মধ্যেই সবুজ বিপ্লবের অংশিদার হতে চেয়ে কর্পোরেটদের সঙ্গে রাষ্ট্রকে পাশে রেখেই কর্পোরেট ডিলটা করেতে পেরেছিল শিখ সমাজের একটা বড় অংশ।
এবারে দ্বিতীয় প্রশ্ন। এই আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্পোরেট কৃষক— এরাই সবুজ বিপ্লবের ধারক বাহক। কর্পোরেটদের সঙ্গে ফসলের চুক্তি চাষের ডিলটা সফলভাবে করে এসেছে গত দু’দশক – তাই সে জানে ক্ষমতার সঙ্গে কীভাবে লড়তে হয়। আমরা যারা কারিগর-হকার উৎপাদন ব্যবস্থার কথা বলি তাদের ভাবনা অন্য এক বিন্দুতে। পাঁচের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই বড় পুঁজি, বিশেষ করে ফোর্ড ফাউন্ডেশন এবং রকফেলার ফাউন্ডেশন ভারতে কর্পোরেট কৃষি চালুকরার পরিকিল্পনা নেয়। কর্পোরেট লবি আজকের জৈব কৃষির মসিহা এম এস স্বামীনাথনকে ভারত সরকারের কৃষি ব্যবস্থায় বসানোর পরিকল্পনায় রিচারিয়াকে অসম্মান করে তাড়িয়ে দেয়। রিচারিয়া নিয়ে বিশদে ক্লদ আলভারেজ আটের দশকে ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে একটি সাক্ষাতকার প্রকাশ করেন(http://satavic.org/dr-richharias-story-crushed-but-not-defeated/) এবং দ্য গ্রেট জিন রবারি নামক প্রবন্ধও লেখেন। রিচারিয়া ছিলেন দেশের অন্যতম প্রধান কৃষি, ধান বিশেষজ্ঞ। আজকের দিনের দেবল দেব অথবা অনুপম পাল হাতেকলমে যে দেশিয় কৃষকর্মে বৈপ্লবিক কর্মগুলি সাধিত করছেন, সেই কাজটি তিনি শুরু করেছিলেন পাঁচের দশক থেকে সরকারিস্তরে। তত দিনে পাঞ্জাব, বাংলা ভাগকরে ঔপনিবেশিক পুঁজির হাতে ভারত আত্মসমর্পণ করে বসে আছে। উত্তর ভারতীয় কৃষিতে ফোর্ড, রকফেলার ফাউন্ডেশন সহ বিভিন্ন আন্তির্জাতিক দাতা এবং বহুপাক্ষিক সংগঠনের সহায়তায় ভারত সরকার দেশজ কৃষির বৈচিত্রময় বনিয়াদ ধ্বংস করে নিয়ে আসছে বহুজাতিকদের উৎপাদন তত্ত্ব অনুসারী বৈচিত্রহীন লাভজনক অর্থকরী বড় পুঁজির অসামাজিক কৃষিকর্ম। পাঞ্জাবে শুরু হল নতুন কৃষি বিপ্লব – আদতে ঔপনিবেশিক লুঠ। অনুপম পাল দেখিয়েছেন প্রথম পঞ্চবার্ষিকী ছাড়া ভারতে দানা শস্যের ঘাটতির সমস্যা ছিল না। কর্পোরেট কৃষিতে শস্য ঘাটতি স্রেফ বাহানা।
রিচারিয়াজী ভারত সরকারের বড় পুঁজির হাতে কৃষিকে তুলে দেওয়ার বিরোধী ছিলেন— ফলে যখন জৈব কৃষির অন্যতম প্রবক্তা স্বামীনাথন দেশজ কৃষি ধ্বংস করতে উঠে পড়ে লেগেছেন বহুজাতিকদের সরাসরি সমর্থনে, রিচারিয়াজীকে ছুঁড়ে ফেলা হল বিস্মৃতির অন্ধকারে। তিনি নিজস্ব উদ্যোগে ১৯,০০০ ধান নথিভূক্ত করেন এবং বহু সংখ্যক ধান সংগ্রহ করেন। তিনি সরাসরি আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা সংস্থার রচিত ভারতীয় কৃষির যন্ত্রীকরণের এবং গবেষণাগারে জিন ইঞ্জিনিয়ারিং এবং রাসায়নিক দিয়ে বীজগুলির সংকর করার এবং মাঠে নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগের সরাসরি বিরোধিতা করায়, সরকারি এবং রাজনৈতিক দলগুলির বিরাগভাজন হন। তার সংগ্রহ করা ১৯,০০০ দেশীয় বীজ ছত্তিশগড়ের ইন্দিরা গান্ধী এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির হাতে ছিল। সঙ্গে জুড়েছিল আরও ৫,০০০টি প্রজাতি। ২০০২-এ বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ ২৪,০০০টি বহুজাতিক কৃষি সংস্থা সিনজেন্টাকে ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণার’ জন্য তুলে দেওয়ার চুক্তি করে। কোম্পানিটি সেই বীজগুলিকে জিন পরিবর্তন করে বাজারে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই খবর স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় চুক্তিটি আটকে যায়।
উপনিবেশের উত্তর সময়ের উত্তর পশ্চিম ভারতের কৃষি অর্থনীতির একটা অংশের রাশ চলে যায় কর্পোরেট কৃষকদের হাতে সেই ষাটের দশক থেকে। ফল হিসেবে ছোট জমির নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে থাকে বড় কৃষকদের কবলে। পুঁজি নির্ভর কর্পোরেট কৃষি যাকে ভারতীয় অর্থনীতি সবুজ বিপ্লব নাম দিয়েছে, তার ফলে ছোট কৃষকেরা ক্রমশঃ কোণ ঠাসা হয়ে পড়তে থাকে দ্রুত। কর্পোরেট কৃষির প্রথম দশকেই এই প্রবণতা দিনের আলোর মত পরিষ্কার হয়ে যায় ইউনিভার্সিটি অব দিল্লির এগ্রো ইকনমি রিসার্চ সেন্টারের করা পাঞ্জাবের নতুন পুঁজি, তেলে চলা যন্ত্রনির্ভর কৃষি সমীক্ষায়। পরের দশকগুলিতে আটের নয়ের এবং শুন্য দশকে এটি চরম রূপ ধারণ করবে। ইকনমিক এন্ড পলিটিক্যাল উইকলির ১৯৬৯এর সেপ্টেম্বরের রিভিউ অব এগ্রিকালচার সংখ্যায় এই সমীক্ষাটি প্রকাশ করেন অশোক রুদ্র, এ মজিদ এবং বি ডি তালিব। শীর্ষক ‘বিগ ফার্মার্স অব পাঞ্জাব— সাম প্রিলিমিনারি ফাইন্ডিংস অব আ স্যাম্পল সার্ভে’। সমীক্ষাকারেরা মুখবন্ধের সারাংশতে লিখছেন— ‘দিস পেপার প্রেজেন্টস সাম পারসিয়াল এন্ড প্রিলিমিনারি রেজাল্টস অব আ স্যাম্পল সারভে অব লার্জ ফারমস পাঞ্জাব ক্যারেড আউট ইন দ্য সামার অব ১৯৬৮-৬৯।

‘এন আইডিয়া অব দ্য এক্সপান্সান অব লার্জ স্কেল ফারমিং ইন পাঞ্জাব মে হ্যাড ফ্রম দ্য ফ্যাক্ট দ্যাট ল্যান্ড ওন্ড বাই ফারমার্স উইথ মোর দ্যান ২০ একরস ইনক্রিজড বাই এবাউট ৯.৫ পারসেন্ট বিটুইন ১৯৫৫-৫৬ এন্ড ১৯৬৭-৬৮। দিস এভারেজ, এগেইন হাইডস আ সিগনিফিক্যান্ট রেঞ্জ অব ভ্যারিয়েশন ইন দ্য রেটস অভ এক্সপান্সান। ফারমার্স অব দ্য সাইজ গ্রুপ ২০-২৫ একর্স এক্সপান্ডেড বাই অনলি ৪ পারসেন্ট হয়ারএজ দোজ ইন দ্য সাইজ গ্রুপ ১০০-১৫০ একর্স এক্সপান্ডেড বাই ৪০ পারসেন্ট।
‘দ্য এক্সপান্সান অব লার্জস্কেল ফারমিং হ্যাজ বিন একম্পানিড বাই র্যাপিড গ্রোথ অব মেকানাইজেশন এন্ড আ হাই রেট অব ক্যাপিট্যাল ফরমেশন। আ সিগনিফিক্যান্ট পোরশান অব ক্যাপিট্যাল ফরমেশন বাই ক্যাপিট্যালিস্ট ফারমারস ওয়াজ মেড পসিবল বাই স্টেট এসিস্ট্যান্স।
‘অলসো প্রেজেন্টেড হিয়ার আর সাম ইন্টারেস্টিং ফাইন্ডিংস এবাউট দ্য পারফরমেন্স অব দ্য বিগ ফারমারস ইন রেস্পেক্ট অব হাইইল্ডিং ভ্যারাইটিজ। বিটুইন ১৯৬৬-৬৭ অ্যান্ড ১৯৬৮-৬৯ দেয়ার ওয়াজ আ বিজ শিফট অব ল্যান্ড ফ্রম অর্ডিনারি ভ্যারাইটিজ অব হুইট, রাইস, মেইজ, বাজরা এন্ড সুগারকেন টু দ্য করসপন্ডিং ইমপ্রুভড ভ্যারাইটিজ। দিজ শিফটস অয়ার হাউএভার একম্প্যানিড বাই শার্দ ড্রপস ইন ইল্ড পার একর’।
বড় কর্পোরেট কৃষকদের আরও বড় কর্পোরেট যোগ্য হয়ে এই প্রবণতা আরও জোরদার হয় ১৯৯১-এর পরের সময় ওয়ালমার্ট, ভারতি, বিড়লা, টাটা ইত্যাদি দেশি বিদেশি কর্পোরেটরা খুচরো কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে থাকায়। শুধু জমির হাত বদল নয় আরও নানান আনুষঙ্গিক অভিচার চলতে থাকে পাঞ্জাব এবং উত্তর পশ্চিম ভারতের পুঁজি নির্ভর কৃষিক্ষেত্রগুলিতে
এই প্রসঙ্গে আরও একটা কথা বলা দরকার— আমরা কারিগর ব্যবস্থার মানুষেরা বড় কৃষক বা কুলাক আর কর্পোরেট কৃষকের মধ্যে মৌলিক ভেদ করি। কুলাকেরা গ্রামের মাটিতে থাকে। সে বৃহত্তর গ্রাম সমাজের অংশ, গ্রামের ওঠাপড়া, অন্যান্য সমাজের ভাল থাকা মন্দ থাকায় তার যায় আসে, গ্রামের কারিগরদের তার কৃষির কাজের অঙ্গাঙ্গী হাতিয়ার। সে সাধারণত একফসলি চাষ করে না— তাই সামগ্রিকভাবে যান্ত্রিক পুঁজি নির্ভর কৃষি তার পথ নয়। তার উতপন্ন ফসলের বাজার গ্রামে বা তার আশে পাশে। তার মূল লক্ষ্য বিদেশের বাজার নয় স্থানীয় বাজার, উদ্বৃত্ত হলে বিদেশে পাঠায়। কিন্তু কর্পোরেট কৃষকেরা দেশিয় চাষের জোর, তার মৌলিকতা, ফসল বৈচিত্র বিষয়ে চরম উদাসীন। তাদের এজেন্ডা কর্পোরেটের উদরভরণ। সে কর্পোরেটের মত গ্রামকে পশ্চাদপট এলাকা হিসেবেই ভাবে। গ্রাম সমাজের, গ্রাম কাঠামোর ওঠাপড়ায় তার কিছুই যায় আসে না। সে ১০ লেনের রাস্তা চায়, যেখানে কম্বাইনার, হারভেস্টার, ঠান্ডাগরম নিয়ন্ত্রণ করা ফসল তোলার ৩০ চাকার গাড়ি বাঁধ ছাড়া মাঠে ঢুকে আসতে পারে নির্বিবাদে। কর্পোরেট কৃষকদের এই পরিকল্পনায় গ্রাম সমষ্টির খুব বেশি ভূমিকা থাকে না। এটাই কর্পোরেটিয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল কৃষি। কর্পোরেটদের চাষে গ্রামের বড় অংশেরই কিছুই করার নেই।
কুলাকদের জমি ভাগে নিয়ে ছোট চাষী চাষ করে, গ্রামের কারিগর সেই বৈচিত্রওয়ালা জমিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি জোগাড় দেয়, গ্রামের অকৃষি শ্রমিক সেখানে নানান কাজ করে। গ্রামের পুকুর, চাষের সঙ্গে জুড়ে থাকা কৃষ্টি – গান, নাচ, যৌথ খাওয়া, জমিতে যে ফসল চলকে পড়ল ফসল হাতে তোলার সময় সেটাকে খেয়ে ইঁদুর সাপের বেঁচে থাকা, কোনওটাই কর্পোরেট কৃষিতে ঘটে না, ফলে এই কর্পোরেট কৃষি দিনের শেষে সাধারণ মানুষের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির বিনাশক। আজ বন্দনা শিব, অনুপম পাল, দেবল দেবেরা সামাজিক কৃষি ফেরত আনার যে লড়াই চালাচ্ছেন, সেটা কিছুটা হলেও পথ খুঁজে পাচ্ছে নানান স্তরে। শহুরে ইওরোপমন্য ভদ্রবিত্ত হয়ত বুঝতে পারছে রাসায়নিক, একমাত্রিক পুঁজি নির্ভর কৃষি তার সমাজ, পরিবারের স্বাস্থ্য রক্ষা করে না।

মাথায় রাখতে হবে কর্পোরেটদের চরমতম বিরোধিতা করে রাস্তায় নেমে আসা উত্তর পশ্চিম অঞ্চলের কর্পোরেট কৃষকদের সমস্যা অতি বিচিত্র— সে সাত দশক ধরে পুঁজিতান্ত্রিক কর্পোরেটের হয়ে যতরকম কুকম্ম গ্রামে করার, করেছে – কর্পোরেটের অঙ্গুলিহেলনে বিষাক্ত চাষবাস ঢুকিয়েছে, বীজ ধ্বংস করেছে, জমি দখলদারি করেছে, কারিগর উচ্ছেদ করেছে, যন্ত্রনির্ভর একফসলি চাষ নিয়ে এসেছে, চাষীর স্বনির্ভরতা লোপ ইত্যাদি গ্রামে চাপিয়ে দিয়ে হঠাত করোনার আবহাওয়ায় দেখতে পাচ্ছে, তারা যাদের লাভের জন্যে নিজেদের মাথা এমনকী বকল্মাটাও বিকিয়ে দিল, সেই কর্পোরেটরা রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নতুন বিলে নিজেদের এককণা অধিকার আর লাভ ছাড়তে রাজি নয় বরং কর্পোরেট চাষীদের কাছে বেণীর সঙ্গে মাথাও চাইছে। কর্পোরেট কৃষকেরা দেখল এটাই তার সাত দশকের সবুজ বিপ্লব রূপায়ন করে কর্পোরেট পায়ে নিজেদের সঁপে দেওয়ার প্রাপ্তি।
বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবারের সার্বিক ফ্যাসিবাদী পরিকল্পনার বিরুদ্ধে কর্পোরেট কৃষক, ছোট জোতের কৃষক, প্রান্তিক কৃষক, কৃষি শ্রমিক, কৃষির সঙ্গে জুড়ে থাকা নানান পেশার মানুষ আজ একজোট। কৃষকদের আন্দোলনটি জেতার কামনা করছেন সর্বস্তরের মানুষ। তবুও গত ৭০ দশক ধরে দেশিয় চাষে যে মৌলিক সমস্যা পীড়ন করছে, তার কী হাল হবে এই প্রশ্নটা তুলতেই হবে – কেন পাঞ্জাবে এত বেশি ক্যান্সার রোগী, কেন জমির পর জমিতে নোনা ধরছে, কেন জলস্তর নেমে যাচ্ছে এই প্রশ্নের সমাধান এই আন্দোলন জিতলেও নেই হারলেও নেই কারন কর্পোরেট কৃষি, কৃষি নয়, কারখানার এক্সটেনসন – এই উত্তর দেওয়ার দায় এই আন্দোলনের মূল আয়োজকদের কারোর নেই।
মাথায় রাখতে হবে এই লড়াইটা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ক্ষেত্রের দুই ইনসাইডারের লড়াই— একদল কৃষি কর্পোরেট যাদের ৭০ বছরের কর্পোরেট কৃষির ইতিহাস বর্তমান। যাদের প্রতিনিধি ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি যেমন আমলাতন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা, সেনাবাহিনীতে বিপুল সংখ্যায় রয়েছে, আর রয়েছে ক্ষমতা পরিচালনা দীর্ঘ ইতিহাস যার বলে আজ তারা কেন্দ্রিয় সরকারের চোখে চোখ রেখে লড়াই দিয়ে চলেছে। তাদের বিপক্ষে ইওরোপমন্য জাতিরাষ্ট্রব্যবস্থা নির্ভর অতীব ক্ষমতাধর কর্পোরেট যাদের ৪০০ বছরের বিশ্বদখলদারির ইতিহাস, যাদের উতপাদনের পদ্ধতি নকল করছে কৃষি কর্পোরেটরা।
তবুও কৃষি কর্পোরেটদের সঙ্গে মিলে অন্যান্য চাষী আর পেশাদারেরা লড়াইটা খোলা রাস্তায় পৌঁছে দিয়ে রাষ্ট্রকে প্রাথমিকভাবে হাঁটু বাঁকাতে বাধ্য করেছেন।
জয় চাষীর জয়। দেশিয় চাষীর জয়।
দারুণ l তাদের জয়ে আমরা আশাবাদী l আমাদের ও পথ খোঁজার নতুন উপায় বের করার ইচ্ছা হবে l