আমরা চলেছি টনকপুর হয়ে। পুরো রাস্তা গাছ দিয়ে ছাওয়া হলেও পাহাড় শেষ চল্লিশ মিনিট। পাহাড় শুরু হলেই মন ভীষণ রকম ভাল হয়ে যায়। স্বামী বিরজানন্দজী মায়াবতীর কাজ করতে করতে নির্জনে একা সাধনের জন্য এই শ্যাঁলা নামক গ্রাম বেছে নিয়েছিলেন। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। চারপাশে কোন কোলাহল নেই। একটি টলটলে তাল। তালের উপরে সাধনকুঠি। চারদিকে পাখির কূজন আর বন্য জন্তুর উঁকিঝুকি ছাড়া আর কিছুর শব্দ নেই। স্বামী বিরজানন্দজী এই শ্যামলিমা দেখেই বোধহয় এখানকার নামকরণ করেন “শ্যামলাতাল”।
ঘুরে ঘুরে শ্যামলাতাল দেখেই মন নামতে আদেশ দিল। যেই গাড়ি থেকে নামা, অমনি কোত্থেকে চুকচুকে কালো একটি সারমেয় লেজ নাড়িয়ে আমার সামনে এমন ভাবে এসে দাঁড়াল, যেন মনে হল সে আমার প্রতীক্ষায় ছিল এতদিন। সঙ্গে বিস্কুট আর কেক থাকেই। দশ বারোটি বিস্কিট তিনি খেলেন, শেষেরটি আর খেলেন না, মানে পেট ভরে গেছে। তারপর আমাদের সঙ্গে ছুটে ছুটে তার খেলা শুরু, যেন বলতে চাইছে… এই দ্যাখো আমার জায়গা… এই দ্যাখো পাহাড়, তাল, গাছ…। ওকে রেখে আবার গাড়িতে উঠে একটা বাঁক ঘুরেই আশ্রমে পা রাখলাম ঠিক বারোটা বাজার আগেই।

কিছু formalities মিটতেই আমরা ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হতে চাইলাম। কিন্তু চাইলেই কি সব হয়? বারোটা মানে খাবার ঘরে যেতে হবে, হবেই। আর এখানে পা রেখেই দেখলাম একটা মিনি পশ্চিমবঙ্গ। সব বাঙালি দু-হাত বাড়িয়ে “আরে, আসুন, আসুন, কোত্থেকে আসছেন? আগে খেয়ে নিন, তারপর গিয়ে গরম জলে চান করবেন। কোন অসুবিধা নেই। সবসময় গরম জল থাকে। সোলার ওয়াটার হিটার বসানো আছে। ভীষণ সুন্দর ব্যবস্থা। তবে সব টাইম মেনে করতে হবে।” অগত্যা ওদের কথা মেনে নিয়ে খাবার ঘরে ঢুকলাম। মাথার উপরে মায়ের পা ছড়িয়ে বসা ছবি। যেন বলছেন, “আয়, খেতে বোস। পরে চান করবি এখন।”
মা তো আর জানেন না এই প্রথম দাঁতে ব্রাশ না করে আর সব হয়ে চলেছে।

আসলে ট্রেনটা এতটাই ঘিনঘিনে ছিল ব্রাশ করতে ইচ্ছে করেনি। ভেবেছিলাম স্টেশনে নেমে করব। কিন্তু নামতেই সামনে টিস্টল দেখে আগে চা চা মন। চা খেয়ে তাড়াহুড়ো করে স্টেশনের বাইরে এসেই ড্রাইভারদের খপ্পরে পড়ে সব কেমন ঘুলিয়ে গেল। তখন কে আমি, কিজন্য আমি, দাঁত একদিন না মাজলেই বা কি হয় এরকম একটা উচ্চ অনুভব হল। তাবলে কুলকুচি ও করিনি তা কিন্তু ভাবা উচিত নয়। এসি টু টায়ারও যে কি পরিমাণ নোংরা হয়ে উঠছে সত্যি ভাবা যায় না।
সে যাই হোক। খাবার টেবিলে অল্পস্বল্প আলাপ হল। কথা বলা মানা এখানে। ব্রহ্মকে নিবেদন করে খাওয়া শুরু। “ব্রহ্মার্পণম্
ব্রহ্ম হবি ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম।
সর্বৈব তেন গন্তব্যং সর্ব কর্ম সমাধিনা।
হরি ওঁ তৎসৎ”

ভাত, ঘন ডাল, দু-রকম নিরামিষ তরকারি, টম্যাটোর চাটনি আর শেষপাতে পায়েস। আমাদের যিনি সারথি ছিলেন, ওমপাল, তিনিও প্রসাদ পেলেন। তাঁর পাশে হাস্যমুখে আরও একজন বসেছিলেন, ভাস্কর যোশীজী, তিনি পায়েস দেবার আগে বলেছিলেন, “অর কুছ মিঠা নেহি হ্যায়? মিঠা তো রহেগাই…” বুঝলাম, উনি এখানের খাবার সম্বন্ধে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। পরে বিশদে আলাপ হল। হলদোয়ানির বাসিন্দা। রামকৃষ্ণ মিশনের দীক্ষিত। ওনার হাতেই থাকে আগত সব যাত্রীর ঘোরাফেরা অর্থাৎ উনি সারথি হয়ে সকলকে নিয়ে যান। শ্যামলাতাল থেকে মায়াবতী, আলমোড়া, আবার কাঠগোদামে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসাও ওঁর কাজ।
খাওয়ার পর কিছুক্ষণ নতুন বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে ঢাল বেয়ে নীচে নামতে শুরু করলাম। নীচের ঢালে আমাদের গেস্ট হাউস। গেস্ট হাউসে ঢোকার আগে একটা সাঁকো যোগ করেছে অন্যমাত্রা। ঢুকতে হবে তিনতলা দিয়ে, তারপর সিঁড়ি বেয়ে নীচে আরও দুটি তলা। ওপরে ছাদ। ছাদে সোলার ওয়াটার হিটার। আমাদের ঘর দোতলায়। সুতরাং ঢুকে আবার নীচে নেমে আমাদের ঘর। ঝকঝকে, সাজানো, সুন্দর। সঙ্গে একটি বারান্দা, যেখানে দাঁড়ালে প্রকৃতির সঙ্গে আপনার মধ্যে আর কেউ নেই। শুধু আপনি আর পাহাড়, আপনি আর আকাশ। মন ভরিয়ে আগে চান, ট্রেনের সব কেচে মেলে দেওয়া ইত্যাদি করতে করতে ভাবলাম বুঝি খুব ক্লান্তিতে ঘুম আসবে। ওমা! কোথায় কি? শুলে তো কিছুটা সময় নষ্ট হয়ে যাবে। তাই ছাদ, একতলার নির্জন খাদের পাশে জঙ্গলের কাছে চুপটি করে বসে থাকা।

সময় তরতর করে চারটের দিকে এগোতে লাগল। আবার চড়াই ভেঙে ওপরে মঠের খাবার ঘরে যেতে হবে, কারণ tea time. আর আমি নেশাগ্রস্থ মানুষ। গিয়ে দেখি আমার মিনি পশ্চিমবঙ্গের সবাই হাজির। ঘন্টা বাজিয়ে দরজা খুললে পাশে রাখা কাগজের কাপ নিয়ে নিজের নিজের চা, বিস্কুট, মুড়ি… যে যা খাবেন, অল্প কিছু নিয়ে নেওয়া। সঙ্গে ফিসফিস করে গল্প, হাসি, মজা।
এমনি আর কিছু দেখার জিনিস নেই। শুধু মঠে থাকলেই মনে হয় স্বর্গে আছি। সূর্যাস্তের দৃশ্য তো পাগল করে দেওয়া। সন্ধেয় জগদীশজী বলছিলেন বটে ছোট্ট ট্রেক করে টনকপুর পয়েন্ট ঘুরে আসতে। কিন্তু অন্য সকলেই বারণ করলেন। রাস্তা ভীষণ নির্জন, খাড়া এবং কোন আলো থাকেনা। এছাড়া বন্য প্রাণী তো আছেই। বারাশৃঙ্গা হরিণ আর তেন্ডুয়া নাকি মাঝে মধ্যেই দেখা যায়। সুতরাং থাক, দরকার নেই। কাল যাওয়া যাবে। কথা গল্পে ছটা বাজতেই ঠাকুরের ঘরে গিয়ে বসা হল। “খন্ডন ভব” দিয়ে শুরু করে অনেক ভক্তিগীতি, পাঠ শুনে মন ভরে গেল।
বেরেলী থেকে যখন এসেছিলাম তখন গায়ে একটি সোয়েটার দিইনি। যখন শ্যামলাতাল পৌঁছলাম তখন রোদ্দুর গায়ে লেগে শীত টের পাই নি। শুধু খাবার ঘরে খালি পা ঠান্ডায় একটু কষ্ট পাচ্ছিল। কিন্তু যেই সূর্য ডুবে গেল ঝপ করে ঠান্ডা ও বেড়ে গেল। আর এদিকে আমি বইতে হবে বলে একটি করে সোয়েটার এনেছি, উনি বারবার বলা সত্ত্বেও। এমনিতে ঘরে থাকলে কষ্ট নেই, কিন্তু রাতে ওই নির্জন রাস্তা দিয়ে ঢাল বেয়ে ওপরে এসে খেয়ে যাওয়া…. বেশ জমে যাওয়া ব্যাপার আর কি! তবে মোট চল্লিশজনের মত বাঙালি রয়েছেন এখানে, সুতরাং কথায়, গল্পের একটা ওম তো থাকবেই। তাতেই বুঝি ঠাণ্ডাটা আর অত ঠান্ডা বলে মনে হয়নি। রাতেও সুন্দর গরম গরম ভাত তরকারি, শেষে একটু মিষ্টিমুখ করে সকলে একসঙ্গে ঢাল বেয়ে নেমে যে যার ঘরে ঢুকে পড়ে কম্বলের তলায়। সুন্দর ঘুমে ভোর।

পরেরদিন সকাল সকাল স্নান সেরে ওপরে উঠে ব্রেকফাস্ট আর চা খাওয়া। মঠে সকালে শুধু চা খাওয়ার নিয়ম নেই। সুতরাং সকালেই পেট ভরা থাকলে বারোটা পর্যন্ত বাইরে বেরিয়ে আসা যেতে পারে। তাই দুজন মিলে চললাম টনকপুর পয়েন্ট আর শ্যামলাতাল। অন্যরা আগের দিন এগুলো সেরে রেখেছেন। বললে হয়তো বা কেউ যেতেন, কিন্তু আমরা আর বলিনি। পাহাড়ে চড়াই ভেঙে উঠতে বেশ হাঁপ ধরে। আর যেহেতু সর্দি জ্বর নিয়ে গেছি, আরও একটু হাঁপ বেশি ধরছে। টনকপুর পয়েন্ট থেকে নেপাল বর্ডার আর ক্ষীণতোয়া সারদা নদী দেখা যায়। আর দেখা যায় ঘন অরণ্য। এত শান্তির জায়গা না আগে পেয়েছি, না পরে পাবো। স্থানীয় একজন মানুষ কতো কিছু বললেন ওখানের সম্বন্ধে। কত সরল এঁরা।
টনকপুর পয়েন্ট দেখে এসে আশ্রমে আর একদফা চা খেয়ে এবার শ্যামলাতাল। সেটিও কম খাড়া নয়। আর কি অপূর্ব নির্জন রাস্তার শোভা। আমরা দুজন দুটি লাঠি জোগাড় করে চড়াই ভাঙছি। আমার কত্তা প্রথমে লাঠি নিতে অস্বীকার করেছিলেন। আমি জোর করে দিলাম। পরে স্বীকার করেছেন, কতো সুবিধা হাঁটতে। শ্যামলাতালের একপাশে একটি ছোট ছেলে কয়েকটি রঙিন বোট নিয়ে বসে আছে। ‘রোহিত’ নাম। ফর্সা টুকটুকে। বারো ক্লাস পাশ করে এবার মিলিটারিতে ঢোকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। হয় মিলিটারি নয় ড্রাইভারি। এটাই নাকি ছকে বাঁধা নিয়ম। মিলিটারিতে ভয় করে না? ওই টুকু ছেলে জীবনের সার বুঝে নিয়েছে, বলে, “মরতে তো হবেই, আজ আউর কাল।” বাহ্ রে ছেলে। (চলবে)
চমৎকার লাগছে ছোট ছোট মোচড়ে নানা রংবাহারি আলপনা আঁকা।
ভালবাসা
Baah. Khoob bhalo laglo. First part ta koi?
দিদি, ফেসবুকে সব share করেছি