ঝিমধরা নির্জন বিরাট শ্যামলাতালে একা বোটিং করার অভিজ্ঞতা যার নেই তিনি বুঝতে পারবেন না, ঠিক কিরকম অনুভূতি হয়। এক ঘন্টা সময় যেন এক অপার্থিব মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থেকে যায়। কোথাও জনমানব নেই। শুধু নৌকোর ছপছপ আওয়াজ। আর ধারের জঙ্গলে পাখি ঝিঁঝির ডাক। দূউউউরে ওই উঁচু পাহাড়ে একজন ছাগলের পাল চড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শ্যামলাতালের ছোট্ট ইস্কুলে দু-তিনজন মহিলা বসে আছেন, তালের কিনারা থেকে দেখা যাচ্ছে। পাড়ে দুটি সাদা দোতলা বাড়ি ভেঙে চুড়ে জরাজীর্ন। রোহিত বলল, “হোটেল ছিল, চলেনি,” তাই এই অবস্থা। ভাগ্যিস! চলেনি। নাহলে তো শ্যামলাতাল আর নৈনীতালে কোন ফারাক থাকত না। এই স্বর্গীয় অনুভূতি অধরা থেকে যেত।
এখানে একটু বলে দিই, শ্যামলাতাল একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। মায়াবতীর কাজের চাপে যখন স্বামী বিরজানন্দজী একটু আলাদা ভাবে সাধন করতে মনস্থ করলেন, তখন এই স্থানটি কিনে সাধনকুঠি বানিয়ে তপস্যায় ডুব দিয়েছিলেন। আর তার সাথে সাথে প্রবুদ্ধ ভারতের কাজও চালিয়ে গিয়েছেন। এখানে কোন দোকানপাঠ নেই। আলাদা করে ঘোরার জায়গা ও নেই। এখানে এলে মঠের সমস্ত নিয়ম মেনে চলতে হবে। চিৎকার করে কথা, হাসি কোনোটাই এখানে কাম্য নয়। শুধু প্রগাঢ় প্রশান্তি ছাড়া আর কিছু এখানে পাওয়া যায় না। এর আসল পাহাড়ি নাম শ্যাঁলা। স্বামী বিরজানন্দজী নাম রাখেন শ্যামলাতাল।

চাইলে এখানকার গ্রামে ঘুরে তাদের সঙ্গে আলাপ করা যায়। মানুষগুলো অত্যন্ত সহজসরল। এছাড়া অন্য বিনোদন কিছু নেই। আর একটি জিনিস ভীষণ ভাবে চোখে পড়ল, রাস্তার পাশে কোন প্লাস্টিকের বোতল বা ব্যাগ বা কোন আবর্জনা পড়ে নেই। এটা যে কি পরিমাণ শান্তি দিয়েছে মনকে বোঝাতে পারব না। নিত্যদিনের গাড়ির আওয়াজ, মানুষের কলরব, নোংরা রাস্তা দেখা আমাদের সঙ্গী এখন। শব্দদূষণ, দৃশ্যদূষণ ইত্যাদি নানা নামে আমরা বলে থাকি। কিন্তু সেগুলি যেখানে থাকার সেখানেই থাকে। এক বিন্দু ও কম হয়না। ভদ্র, শিক্ষিত মানুষজন শোনেন, বোঝেন, কিন্তু রাস্তায় নোংরা ফেলতে একটুও দ্বিধা বোধ করেন না। পাহাড়ি এই ছোট্ট গ্রামের মানুষগুলো কিন্তু এগুলো বোঝেন।
শ্যামলাতাল আশ্রম থেকে পনের জন চললেন মায়াবতী। কাল আমরা গেলে আবার দেখা হবে। এইটুকু সময়ে কেমন একটা টান তৈরী হয়েছে যেন। রাতে মহারাজ বলে দিলেন একসঙ্গে দল বেঁধে খেতে আসতে, কারণ আর কিছুই নয়, তেন্ডুয়া। পাহাড়ি চিতাবাঘ। আকারে খুব বড় নয়। তবে একা পেলে ঘাড়টি ধরে যে খুব আপ্যায়ন করবে এটা জানিয়ে রাখলেন। শুনেও খুব ভয় যে হলো তা নয়, বরং বেশ একটা মজাই হলো আমাদের। রাতে আমরা যেকজন ছিলাম, সকলেই একসঙ্গে লাঠি ঠকঠক করতে করতে খেতে গেলাম। আবার খেয়ে গল্প করতে করতে ফিরেও গেলাম। আকাশ ভর্তি তারারা আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ছিল। এই আকাশ তো সমতলে নামে না।
শ্রীহট্টের এক ভক্ত পুলিশ অফিসার স্বামী বিরজানন্দজীর সঙ্গে করিমগঞ্জ থেকে আখাউড়া জংশনের ট্রেনে উঠেছেন। ঢাকার গাড়ি ধরতে হবে। তিনি মহারাজকে এগিয়ে দিতে এসেছেন। মহারাজজী জানতে পেরেছেন যে ভদ্রলোক ধূমপান করেন। একটি সিগারেট তাঁর দিকে এগিয়ে মহারাজ বললেন, “নাও, ধর, খাও।” ভদ্রলোক লজ্জায় মুখ ঢেকেছেন। মহারাজ বললেন, “তাতে কি হয়েছে? নাও, নাও। খাবার জিনিস খাবে, এতে লজ্জা কি? আচ্ছা ওদিকে মুখ ফিরিয়ে খেয়ে নাও।” ভক্ত তখন চোখের জলে ভাসছেন।
অর্থাৎ যার যেটুকু দরকার তাকে দিচ্ছেন। সে নেশার জিনিস হলেও। আবার এক ভক্ত সাধু হবার গোপন ইচ্ছা নিয়ে, ওনার হাতে না জানিয়ে গেরুয়া বস্ত্র ধরিয়ে নিজের হাতে নিলে, তিনি তাকে তীব্রভাবে গেরুয়া ধারণ করতে অসম্মতি জানান।

নিজের আশ্রমের ফল মঠের জন্য যখন পাঠাতেন, তখন প্যাকিংবাক্স নেড়ে নেড়ে জায়গা করে আরও ফল গুঁজে দিতেন যাতে বেশি জিনিস মঠের সাধুরা পেতে পারেন। আর যে আম একটু গলে গেছে সেটি নিজের জন্য রাখতেন।বাকি ভাল ফল আশ্রমের অতিথিদের দিতেন। দৃষ্টি থাকত সকলের দিকে। সেবা করতে পারতেন মায়ের মতো করে, তাই তো স্বামীজী নিজের অন্তিম সময়ে তাঁকে সেবক রূপে পেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মায়াবতীর কাজে প্রবল ভাবে ব্যস্ত থাকায় তাঁর আর স্বামীজীর সেবা করা সম্ভব হয়নি।
শ্যামলাতাল সাধনকুঠিতে স্বামী বিরজানন্দজীর যে বৃহৎ ছবিটি আছে, সেটি দেখলে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। শুধু তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেই সাধারণ মানুষের সেদিনের জপধ্যান সম্পূর্ণ হয়। সাধনকুঠির চারপাশে পাখিদের কাকলি শুনতে শুনতে শ্যামলাতাল ছেড়ে মায়াবতীর দিকে অগ্রসর হতে হবে। যদিও আশ্রমের এক ছোট্ট নামানুষ জুতো মুখে নিয়ে এ পাহাড় ও পাহাড় ছুটোছুটি করুক না কেন, অনন্তকাল তো এখানে থাকা যাবেনা সংসারী মানুষদের। অবলা নামানুষটির কেন আমাকে পছন্দ হয়েছে তা বলতে পারি না। তবে সকালের জলখাবার, চা খেয়ে এবারের সারথি অশোকজীর সঙ্গে গাড়িতে উঠে শ্যামলাতালকে বিদায় জানিয়ে এগিয়ে যেতে হয়।
এবারের রাস্তা চম্পাবৎ হয়ে। চম্পাবৎ একটি ছোট শহর। সুন্দর, ছিমছাম। তবে আমাদের গাড়ির সামনের কাচটি ভাঙা দেখে জিজ্ঞেস করে জানলাম পাত্থর গিরনেসে কাচ টুটা। শুনে মনে খুব একটা সুখবোধ হলনা বলাই বাহুল্য। যাইহোক, একটি সোয়েটারে কেমন শীত ভাঙে শ্যামলাতাল বুঝিয়ে দিয়েছে, তাই মায়াবতীর চার পাঁচ ডিগ্রী সামলাতে চম্পাবৎ থেকে একটি সোয়েটার, টুপি আর একজোড়া মোজা নিয়ে নেওয়া হল। ব্যাগের ভার বাড়ল। এখন নাহয় গাড়িতে গাড়িতে যাওয়া, কিন্তু ট্রেনে ওঠার নামার সময় যে কি অশান্তি ভারি বোঝা টানা। তবু শীতের ভয়ে কিনতে হল।

শ্যামলাতাল থেকে মায়াবতী পুরো রাস্তাই পাহাড়ি। মায়াবতী ঢোকার মুখে রাস্তার দৃশ্য অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্ত চোখ ফেরানো দায়। প্রতিটি বাঁকে যেন সবুজের পান্না রাশি রাশি কেউ ছড়িয়ে রেখে গেছে। তার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো হিরের ঝলকানি দিয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। রাস্তা প্রায় পুরোটাই মসৃণ। সামান্য কোন কোন জায়গায় অল্প ধস নেমে ভাঙাচোরা। অশোকজী ও খুব অল্প কথা বলেন। তবে বললেন যে এই রাস্তায় মাঝে মাঝেই তেন্ডুয়া বের হয়। তবে রাস্তার অপরূপ সৌন্দর্য দেখলে তেন্ডুয়ার ভয় একেবারেই আসেনা।

এগারোটা নাগাদ পৌঁছে গেলাম স্বপ্নভূমি মায়াবতীতে। মায়াবতী থেকে শ্যামলাতাল ঘুরতে যাওয়া একটি গ্রুপের একজন বলেছিলেন মায়াবতী ভীষণ strict। শ্যামলাতালে ঘরোয়াভাব বা আপনভাব অনেক বেশি। মায়াবতী তা নয়। তবে সবকিছু আরও ঝকঝকে তকতকে। মায়াবতীতে পা রেখেই তাঁর কথার প্রমাণ পেলাম। সবকিছু ভীষণ নিয়ম মেনে ঘটে চলেছে। এখানেও মহারাজ এসে সমস্ত formalities পূরণ হবার পর ঘরের চাবি দিয়েই বললেন, “একেবারে খেয়ে তবে ঘরে যাবেন, নাহলে খাবার ঘর বন্ধ হয়ে যাবে।” আমরা নিজেদের লাগেজ রেখেই আবার চলে এলাম মূল আশ্রমে।

শ্যামলাতালের বন্ধুরা যারা আগের দিন এখানে এসেছেন তারা একে একে দর্শন দিতে শুরু করলেন। তারপর এমন সুন্দর হাসি সকলের মুখে ফুটে উঠল যেন কতোদিন পর আবার প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে সবটাই হচ্ছে খুব নতুন নীরবে নিঃশব্দে। শ্যামলাতালে কিন্তু আমরা এতটা নীরব ছিলাম না। বারান্দার সেই বিখ্যাত বেঞ্চে বসে অপেক্ষা করতে করতে খাবার ঘরের ঘন্টা বাজল। ঢুকে হাত ধুয়ে নীরবে টেবিলে বসে পড়া। ভাত, ডাল, তিনটি তরকারি আর পায়েস দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারা। রান্না অতীব সুস্বাদু। পরিবেশনও অত্যন্ত organised. কিন্তু শ্যামলাতালের শ্যামলস্পর্শ বোধহয় খানিক কম। (চলবে)