মূল আশ্রম থেকে বরফে ঢাকা শৃঙ্গ ত্রিশূল, নন্দাদেবী, নন্দাঘুন্টি, নন্দাকোট আর পঞ্চচুল্লি পরিষ্কার দৃশ্যমান। যদিও ছবি তোলার পর সেটি খুব ভালো বোঝা যাচ্ছে না। তাও স্মৃতি হিসেবে তো থাকুক। খেয়েই নেমে যাওয়া হল অনেকটা নীচের বিবেকানন্দ ভবন আর ঋষি কুটিরে। তার আগেই রয়েছে মাদার্স বাংলো। মিষ্টার এন্ড মিসেস সেভিয়ারের বাংলো। আর মাদারের বাংলো আর অতিথিদের নিবাসের ঠিক মাঝখানে রয়েছে বিস্তৃত খানিক স্থান, আর সেখানে সোনালি রোদ্দুরে লাল রঙের সিমেন্টের বসার জায়গা। শ্যামলাতালের সকলে মায়াবতী দখল করে এখানে হাহাহিহি করে পাহাড় কাঁপিয়ে তুলেছে। এখানে আশ্রমের নিয়মের বাঁধন নেই। রোদ পোয়ানো এবং গপ্পো চলছে তুমুল মাত্রায়।
মাদার্স বাংলোর পর শুরু হল মঠের নিজস্ব ক্ষেত। তাতে সমস্ত আনাজ, যেমন বাঁধাকপি, ফুলকপি, কুমড়ো, ক্যাপসিকাম, টম্যাটো… মানে যা যা লাগে একটা বৃহৎ সংসারের, সব ফলে আছে। তারও ওপাশে রয়েছে গোশালা। ক্ষেত আর গোশালা পাহারা দিচ্ছে চারটি কালো কুচকুচে লোমে ভরা সারমেয়। দেখে যদিও একেবারেই হিংস্র মনে হয় না তাদের। কিন্তু ক্ষেতে কাজ করা মুনিশরা বললেন “সাবধান!” এই চারজন নাকি নেকড়ে বা অন্যান্য আপদ বিপদে ক্ষেত ও গবাদিপশুকে রক্ষা করে। আমার যদিও খুব বিশ্বাস হলনা। তবে গোশালায় পরদিন যখন হালকা ট্রেক করে উঠলাম, দেখি একটি কালো কুকুর কি চিৎকার করছে আমাদের দেখে, যেই একটু সরে এলাম, অমনি সেও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। তবে গরুগুলির চেহারা দেখে প্রাণ মন ভরে গেল। গা থেকে পিছলে পড়ে রোদ। আর এত তাগড়াই চেহারা যে শিং বাগিয়ে রুখে দাঁড়ালে তেন্ডুয়া পিছু হঠবে।

এখানে তেন্ডুয়ার কথা যখন উঠলই, তখন একটা মজার ঘটনা বলি। মজার না ভয়ের সেটার বিচার আপনাদের ওপর রাখলাম। আগেই বলেছি, শ্যামলাতাল থেকে অনান্য অনেকের সঙ্গে খুবই ভাল একটা সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। সেরকমই দুটি পরিবার হলেন পুতুলদি আর তার হাজব্যান্ড এবং তনুশ্রীদি ও তার হাজব্যান্ড। এরা আবার দুই বোন। তনুদির হাজব্যান্ড ভীষণ ভাল তবলাবাদক। মিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাজিয়ে থাকেন। শ্যামলাতালেও তিনি বাজিয়েছেন।
দুপুরের আড্ডার পর পৌনে চারটে নাগাদ এক পাহাড় ভেঙে চা খেয়ে এসেছি। যতো হাঁপই ধরুক, চা না খেলে প্রাণ বাঁচেনা। যদিও এখানের মাটিতে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে একজন ভীষণ শান্ত, বয়স্ক ভদ্রলোক নিজে থেকে আমার ওনাকে বলেছেন যে গেস্ট হাউসে ওনাদের গাড়ি রাখা আছে, বড় গাড়ি, অনেক জায়গা আছে, আমরা যেন হেঁটে না খেতে ওঠানামা করি। ওনারা লিফ্ট দেবেন। তখনও তিনি আমাদের চেনেন না, জানেন না। যাই হোক, চা খেতে ওনাদের গাড়িতে যেতেই পারতাম, কিন্তু একেবারে পরিচয় নেই, তাই হুট করে লিফট নিতে মন সায় দিল না। তাছাড়া শ্যামলাতালে ছোট ছোট ট্রেক আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এতো সুন্দর রাস্তা, পাইন, দেবদারু, নানান ফুলে ছাওয়া।

চা খেয়ে আশ্রম বাড়িতে আবার ওনার সঙ্গে দেখা হতে এবার আলাপ হলো। উনি বেশ কয়েকজনকে নিয়ে এসেছেন। থাকবেন বেশ কয়েক দিন। আবারও গাড়িতে আসার কথা বললেন উনি। ঠিক করলাম, রাতের রাস্তা না হেঁটে ওনার গাড়িতে আসবো। বিকেলের আশ্রমের চারপাশে ঘুরে, মিউজিয়াম, প্রবুদ্ধ ভারতের ছাপাখানা দেখে আবার নেমে গেলাম। নিজের ঘরে না ঢুকে টোকা দিলাম তনুশ্রীদির ঘরে। ওনারা চারজন মিলে গুলতানি করছিলেন, আমরা গিয়ে ছজন হলাম। গান গল্প চলতে চলতে তনুশ্রীদির হঠাৎ করে আশ্রমের ধ্যানঘরে যাবার মন হল। তখন বাজে সাড়ে সাতটা। হেঁটে গেলে পনের থেকে কুড়ি মিনিট লাগবে।
রাস্তা দিয়ে গেলে কোন ভয় নেই এরকমই মনে হয়েছিল সবার। সুতরাং ছজন মিলে সাংঘাতিক শীতের রাতে বেরিয়ে পড়ে দেখলাম গোটা রাস্তা ঘুটঘুট করছে অন্ধকার। তনুদির হাজব্যান্ড বললেন, “আরে! কাল তো লাইট ছিল, আজ কেন নেই?” নেই তো নেই, কোই বাত নেহী। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। আমার হাতে শ্যামলাতালের লাঠি। ওটি ভুলিনি, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। কারণ পাহাড়ে হাঁটতে গিয়ে দেখলাম দারুণ কাজ দেয়। ওনারা কেউ লাঠি নেননি। আমি প্রথমে চললাম, পিছনে ওনারা। তবে মোটামুটি ক্লোজ হয়ে যাচ্ছি। মাঝে মাঝে আকাশ চোখ মন টেনে নিচ্ছে। সলমা চুমকির কাজ করা চাঁদোয়া।

কিছুটা যাওয়ার পরেই দাদা বললেন, “কি যেন জ্বলজ্বলে দুটো চোখ আর চারটে পা সরে গেল।” প্রথমে আমরা সবাই ভাবলাম উনি মজা করছেন। কিন্তু উনি serious ভাবে বারবার একই কথা বলতে লাগলেন। আর তখনই আমরা সকলেই একটা গন্ধ পেতে লাগলাম… চিড়িয়াখানায় বাঘের খাঁচার সামনে যে গন্ধটা পাই।
লাঠি ঠকঠক আর জয় রামকৃষ্ণ জয় মা বলতে বলতে একসময় আশ্রমের মেনগেটে পৌঁছে গেলাম। এর ফাঁকে ফাঁকে আকাশের ঝলমলে চাঁদোয়া দেখতে ভুল করিনি। অন্যরা দেখেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করা হয়নি। তবে আশ্রমে ঢুকে তামার জলের কলসি থেকে আমরা ওই ঠান্ডায় ঢকঢক করে অনেকটা জল খেয়ে ফেললাম। জল যখন গলা দিয়ে নামছে তখন বুঝতে পারলাম ভেতরটা একেবারে শুকনো। তবে সেটা ভয়ে না এতটা খাড়াই ভেঙে আসার কারণে বুঝিনি নিজেও। তারপর ধ্যানঘরে চোখ বন্ধ করে অনেকক্ষণ বসে থাকা হয়েছিল। অন্তর নীরব হয়েছিল।
তাই বলি, স্বামীজীর স্বপ্নভূমিতে এসে অতি তুচ্ছও জেগে ওঠে।

এবার মাদারের সম্বন্ধে যেটুকু জেনেছি তার কিছু লিখি। স্বামীজী প্রথমবার ইংল্যান্ড গিয়েই বুঝেছিলেন যে আমেরিকার থেকে লন্ডনে তাঁর কাজের সাফল্যের সম্ভাবনা অনেক বেশি। সেই জন্য তিনি ১৮৯৬ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয়বার লন্ডন যান। মিঃ জেমস হেনরি সেভিয়ার এবং মিসেস শার্লট এলিজাবেথ সেভিয়ার ছিলেন লন্ডনের বাসিন্দা। তাঁরা এক বন্ধুর কাছে শোনেন যে এক ভারতীয় যোগী এসেছেন। সেভিয়ার দম্পতির ধর্মলাভের আকাঙ্খা ছিল প্রবল। এর আগে তাঁরা বহু জায়গায় ছুটে গিয়েছেন, কিন্তু শান্তি পাননি। এখন তাঁরা এই হিন্দু যোগীর বক্তৃতা শোনার জন্য উপস্থিত হলেন। স্বামীজীর উদ্দীপনাময়, তেজঃপূর্ণ, প্রেরণাদায়ী বেদান্তের গূঢ়তত্ত্বের প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা শুনে তাঁরা এতই মুগ্ধ হলেন যে, স্বামীজীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন।
স্বামীজী মিসেস সেভিয়ারকে ‘মা’ বলে ডাকতে। মিসেস সেভিয়ার যতদিন বেঁচে ছিলেন সবার ‘মাদার’ রূপেই পরিচিতা ছিলেন। পুত্রসম গুরুর সঙ্গে তাঁরা বিদেশে ও ভারতে ছায়ার মত ঘুরে বেড়িয়েছেন। স্বামীজী চেয়েছিলেন তাঁরা যেন হিমালয়ে আশ্রম প্রতিষ্ঠার যন্ত্রস্বরূপ হন। স্বামীজী হিমালয়ের বুকে অনির্বাণ হোমাগ্নি প্রজ্বলিত করতে চেয়েছিলেন, যা মনের কুসংস্কারের আবর্জনা পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। জগতে প্রতিষ্ঠিত হবে ‘যো কুছ হ্যায় সো তুঁহি হ্যায়’।

“আমি এমন একটি মঠ চাই যেখানে সমস্ত কাজকর্ম ছেড়ে জীবনের বাকি দিনগুলি ধ্যান করে কাটাতে পারি। মঠটি হবে শুধু কর্ম ও ধ্যানের জন্য। যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিষ্যেরা একসঙ্গে বাস করবে। তারা প্রকৃত কর্মী হিসাবে গড়ে উঠবে যার ফলে প্রাচ্যের শিষ্যেরা পাশ্চাত্যে গিয়ে বেদান্ত প্রচার করতে পারবে আর পাশ্চাত্যের শিষ্যেরা ভারতের মঙ্গলের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করবে।”
সেভিয়ার দম্পতি তাঁদের গোটা জীবন এই মায়াবতী আশ্রমের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। যার ফলস্বরূপ আমাদের মত সাধারণ মানুষ এখানে গিয়ে একটু নিজেকে জানার চেষ্টাটুকু অন্তত করতে পারেন। ধ্যানঘরে ধ্যান না হলেও একটু মনঃসংযোগের চেষ্টায় রত হতে পারেন। প্রকৃতির এই অমূল্য নিস্তবদ্ধতা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারেন। একটা গোটা জীবনে এর থেকে মানুষের আর কিই বা চাওয়ার থাকতে পারে! (আগামীকাল সমাপ্ত)