অতি ক্ষুদ্র আমি, অতি ক্ষুদ্র আমার মেধা। তবু যখন হিমালয়ের পাদস্পর্শে আসি, মনের গভীরে কিছু একটা অনুভব হয়। নিজেকে তখন আর তুচ্ছ মনে হয় না।বৃহত্তর সান্নিধ্যে নিজবোধ উন্নত হয়।
স্বামীজী যখন মাদ্রাজে মন্মথনাথ ভট্টাচার্যের বাড়িতে ছিলেন তখন একজন প্রশ্ন করেছিলেন : “স্বামীজী, হিন্দুদের ভিতর এই বৈদান্তিক ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেন তারা প্রতিমা পূজা করেন?” স্বামীজী উত্তর দিলেন : “কারণ আমাদের হিমালয় আছে।”
আপাতভাবে উত্তরটি শুনে কিছুই বোঝা যায় না। কিন্তু এই কথার অন্তরের অন্তস্থলে ঢুকলে বোঝা যায় তিনি বলতে চাইছেন যে হিমালয়ের আধ্যাত্মিক গৌরব ও মহিমান্বিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দ্বারা ভারতবর্ষ পরিবেষ্টিত হওয়ায় মানুষ তার সামনে মাথা নত করে এবং তার পূজা করে। তুষারাবৃত হিমালয় পবিত্রতার প্রতীক।

গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো করলে পূজকের কৃতিত্ব থাকে কিনা জানিনা। কিন্তু এই বিপুল এক মহিমা বর্ণনা করা যে অতি কঠিন কাজ সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। সুতরাং নানান সূত্র ধরে তবে তাঁর কাছে কিছুটা হলেও পৌঁছতে পারা যাবে। তাই বিভিন্ন পবিত্র নদীর জল স্পর্শ করতে করতে এগিয়ে চলা হিমালয়ের কোলে। শুধু গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজো নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন নদীর জলে তাঁকে পূজা করার বা নিজেকে পরিশ্রুত করার ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলার প্রয়াস এই অতি তুচ্ছ আমার।
এই যে আমি আমি, আমার আমার বোধ সমভূমিতে অতিমাত্রায় প্রকট, সেটি বিরাট বিশাল হিমালয়ের সম্মুখে এলে অনেকটা স্তিমিত হয়। আর আসে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা। নিজের অন্তরে আপনা থেকেই ডুব দিয়ে ‘আমি’ কে ভোলার নিরন্তর প্রয়াস এই বিরাটের পাদস্পর্শে এসে ঘটে।
স্বামীজী বলেছেন : “হিমালয়ে আমার চিন্তা আরও স্বচ্ছ হয়। স্নায়ুগুলি আরও শান্ত হয়।” অদ্বৈত সাধনার সর্বোত্তম স্থান হিমালয়। প্রকৃতির মাঝে মন নিরাকার ব্রহ্ম অনুধ্যানে উপযোগী হয়ে ওঠে।

এসব কঠিন কথা বাদ দিলে খুব সহজ ভাবে বলতে গেলে হিমালয় শুধুই আমাদের মুগ্ধ করে। দেওদার, পাইন, ওক, রোডোডেনড্রন, পাহাড়ি গোলাপ, নাম না জানা নানান ফুল আর বৃক্ষের ঘন সন্নিবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে। নানান পাখির কাকলি, ঝিঁঝির একটানা আওয়াজ, কোন জন্তুর ডাকের সঙ্গে ছোট্ট কোন নদীর ঝিরিঝিরি ধ্বনি মনকে কোথায় ভুলিয়ে নিয়ে যায়। কোথাও ঘন গাছের ফাঁকে সোনালী রোদ্দুর, আবার কোথাও রোদ ঢুকতে সাহস পায়না এমন গা ছমছমে পরিবেশ।
আমি বেদ বেদান্ত বুঝি না বুঝি প্রকৃতিকে খুব বুঝতে পারি, অনুভব করতে পারি। তাই মায়াবতী শ্যামলাতাল যাবার বাসনা অনেকদিনের। বিবেকানন্দর স্বপ্নভূমি, স্বামী বিরজানন্দের স্বপ্নভূমি আপামর ভারতবাসীর কাছেও পরম পুণ্যভূমি। কালো মেঘের কোলে সাদা বকের সারি দেখে আমরাও বিভোর হই। কিন্তু যাবো বললেই তো আর যাওয়া হয় না। তার জন্য চাই উপযুক্ত সময়।
সময় যে উপযুক্ত সেটার প্রমাণ পেলাম যেদিন ড. দেবাঞ্জন সেনগুপ্তের “স্বামী বিরজানন্দ” বইটি হাতে পেলাম আর সেদিনই আমাদের মায়াবতী শ্যামলাতাল যাবার টিকিট কাটা হল। এটা অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হল, হবে, এবার ঠিকঠাক স্বপ্নভূমি ছুঁয়ে দেখতে পারবো।
নভেম্বরের পাঁচ অকালতখতে উঠে বসলাম কোলকাতা স্টেশন থেকে। ছেলের যাবার কথা ছিল, কিন্তু তার কাজ থাকায় সে যেতে অপারগ। মনটা একটু খারাপ নিয়েই যাত্রা শুরু। কারণ আমরা তিনজনই স্বামী আত্মস্থানন্দ মহারাজজীর দীক্ষিত। দীক্ষার সময় উনি বারবার কিছু স্থান দর্শনের জন্য জোর দিয়েছিলেন। সময় হলে দর্শন হবেই এটা বোধহয় মানা যেতেই পারে।
পরেরদিন সকালে বেরেলী স্টেশনে নামলাম। সুপারফাস্ট ট্রেনের গল্প যত কম বলা যায় ততই ভাল। প্যান্ট্রিকার নেই। অতি জঘন্য খাবার, এত খারাপ খাবার যে মুখে দেওয়া যায় না, তাও অতিরিক্ত দাম। পনীরের দেখা নেই কিন্তু সেটি নাকি পনীর মশালা! এ নিয়ে একজন ভদ্রমহিলা তো রীতিমত ধমকালেন খাবারের পয়সা দেবার সময়। সে চুপ করে মাথা নীচু করে শুনে পয়সা গুনে নিয়ে পগারপার। আমি তাই রাতে শুকনো মুড়ি খেয়ে চালিয়ে দিলাম। দুপুরের কষ্ট আর নিই নি।
সহযাত্রী সবসময় ভাল হওয়া খুব ভাগ্যের ব্যাপার। এবারে সহযাত্রী ভীষণ ভালো পাওয়া গেছে। সারা রাস্তা গল্প করতে করতে যাওয়া। যাওয়ার দিন আমার জ্বর ছিল হালকা। তাতে একটু অসুবিধা তো হবেই শরীরের। কাঠগোদামে যখন স্বয়ং স্বামীজী নেমেছিলেন, তখন তাঁরও অল্প জ্বর ছিল। সবই coincidence আর কি!

বেদান্ত মতে ‘সবই অদ্বিতীয় আত্মা’। আমি পুরুষ নই। আমি নারী নই। আমি হিন্দু নই। আমি খ্রীষ্টান বা মুসলমান নই। ‘আমি এক বিশ্বব্যাপী অস্তিত্ব’। একটি কীট থেকে উচ্চতর সব জীবের ভিতরেই আমার অস্তিত্ব বিদ্যমান। … এত কিছু না ভেবে যখন নিজের আমিত্ব ত্যাগ করে আমরা মেলামেশা করি তখন সেই মেলামেশা একটা চিরকালীন সম্পর্কের বুনোট তৈরী করে। যাবার পথে পাঁচ ছজন সহযাত্রীর সঙ্গে সেই সম্পর্কের ওম নিয়ে বেরেলী বা বরেলীতে নামলাম। নেমেই মুখ না ধুয়ে ভোরের স্টেশনের টিস্টল থেকে চায়ে চুমুক দিলাম। মন তখন গাইতে শুরু করেছে “ঝুমকা গিরা রে বরেলী কে বাজার মে…” বেদান্ত তখন মাথায়।
“সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম”। সব মানুষকে একই ভূমিতে জায়গা করে দিতে এবং শান্তি ও সমৃদ্ধির পথ দেখাতে পারে। একজন হিন্দু আরও ভাল হিন্দু, একজন মুসলমান আরও ভাল মুসলমান, একজন খ্রীষ্টান আরও ভাল খ্রীষ্টান হতে পারে এই পথে অগ্রসর হলে। কিন্তু স্টেশন থেকে বেরিয়ে সব ভেসে গেল। এগিয়ে এল বেশ লম্বা চওড়া চেহারার কয়েকজন। “বাবুজী কাঁহা যানা হ্যায়? গাড়ি চাহিয়ে?”

যত বলা হয় “না রে বাবা, নেহি চাহিয়ে। গাড়ি আশ্রম সে ঠিক করকে ভেজা”… এই হাসবেন না কেউ। আমরা এরকমই হিন্দি বলি। তা, কেউ শোনে না। পারলে জোর করে আমাদের তাদের গাড়িতে তুলে ফেলে আর কি! তখন উনি আমাদের গাড়ি যিনি পাঠাবেন, তাকে ফোন করলেন আবার। তিনি বললেন, গাড়ি পৌঁছে গেছে। একটু পরেই ফোন এল, আননোন কল। ধরতেই শুনলাম গাড়ির চালক বলছেন ‘এসে গেছি’। খুব ভাল কথা। ও মা! বেরেলী স্টেশনের সব ড্রাইভার মিলে আমাদের সেই গাড়ি আটকে বলে, ‘যানে নেহি দুঙ্গা”।
কি মুশকিল রে বাবা! এ বলে “মেরা কার্ড রাখিয়ে”। ও বলে” বাইরের গাড়ি স্টেশন চত্বরে ঢুকতে মানা”। কয়েকজন গিয়ে তো আমাদের গাড়ির চালককে টাকা দিতে হবে বলে ঘিরে ধরল। মহা বিপদ। আশ্রমের suggest করা গাড়ির রেট স্টেশনের গাড়ির রেটের থেকে এক হাজার টাকা কম। কেউ বেদান্ত মানে না। সবাই মিলে আমি আমি করে চিৎকার জুড়ে দেয়। এই সময় গাড়ির মালিক ফোন করে আমাদের বলেন গাড়ি থেকে সব সামান নামিয়ে নিয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে রাস্তার মোড়ে চলে যেতে। কি বিরক্ত যে লাগছে তখন। কোথায় “ঝুমকা গিরা রে” আর কোথায় এক গাদা ড্রাইভার গিরা রে!

গাড়ি থেকে হাঁড়িমুখে সব ব্যাগ নামিয়ে আবার টানতে টানতে গিয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়ালাম দুজনে। তখনও আমাদের গাড়ি ওদের জিম্মায়। একদল আবার আমাদের পেছনে এসে ওদের গাড়ি নেবার জন্য জোর করতে লাগল, তারপর আমাদের শক্ত মুখ দেখে হাতে card ধরিয়ে একটু দূরে সরে অপেক্ষা করতে লাগল। একটু পরেই আমাদের গাড়ি মুক্ত হয়ে আমাদের সামনে এসে আমাদের তুলে রওনা দিল। উফ! মুক্তি।
পুরো ব্যাপারটায় মুড একটু হলেও চটকে ছিল। গাড়ি চলতে শুরু করার পর মুড একটু একটু করে বশে আসতে লাগল। গন্তব্য শ্যামলাতাল। যেতে তিন/সাড়ে তিন ঘণ্টা লাগবে। কারণ মধ্যে কোথাও একটু ব্রেকফাস্ট করে নিতে হবে। আবার বারোটা বেজে গেলে লাঞ্চ পাওয়ার আশা নেই। ঠিক বারোটার মধ্যে আশ্রমের খাবার ঘরে পৌঁছতে হবে। আমাদের সারথী একটু চুপচাপ মানুষ। বেশি কথা বলেন না। তবে ঠিক জায়গায় দাঁড় করিয়ে ব্রেকফাস্ট করালেন, মিষ্টি কেনা হল, একটু ওয়াশরুমেও যাওয়া হল। সবটাই সুন্দর, পরিষ্কার, ঝকঝকে এবং যথাযথ। ধোসা এবং ছোলে বাটুরের স্বাদ বেশ ভাল। (চলবে)
খুব সুন্দর।সহজ,সরল ভাষা ও বর্ণনার ভঙ্গী মনো মুগ্ধকর ,❤️
অনেক ধন্যবাদ ❤️
সহজ বর্ণনায় ভারতের আদি সুরটা খুব ভালো ধরা পড়েছে।
উৎসাহ পেলাম ❤️