দেবাশিস ভট্টাচার্য
রাসবিহারী মোড়ে দাঁড়িয়েই ওই দু’জনকে বললাম শ্রীধর করেছেটা কি? একজন বললো শ্রীধর কি করেছে আপনি জানেন না? শুধু স্বপনেরটাই জানেন? শ্রীধরকে পুলিশ খুঁজছে এটুকু তো জানেন? বললাম তা জানি। তখন অন্য জন চেঁচিয়ে বললেন আপনি তো রিপোর্টার! পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলেই তো জানতে পারবেন কেন ওরা শ্রীধরকে খুঁজছে? বললাম প্রয়োজনে জানবো। এর দিন কয়েক পর আলিপুরের তদানীন্তন কংগ্রেস বিধায়ক সৌগত রায় বিধানসভায় দাঁড়িয়ে বললেন শ্রীধর দাস সিপিএমের সেল্টারে আছে বলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না। সেই রাতেই আজকাল পত্রিকার সম্পাদক এই রিপোর্টারকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন শ্রীধরের কেসটা কি? সৌগত রায়ের অভিযোগের ভিত্তি আছে? বললাম আংশিক সত্য। ওই এলাকার একজন নামকরা আইনজীবী সহ সিপিআইএমের জনা দুয়েক এল.সি.এম শ্রীধরের পেছনে আছে। লোকাল কমিটির সেক্রেটারি তথা এ.বি.টি.এ নেতা স্বদেশ দাশ এর বিরোধী। স্বদেশ দাশের সঙ্গে প্রতিবেদকের এনিয়ে কথাও হয়। ওনাকে বলেছিলাম আপনারা বৌবাজার সিপিআইএমের ডিজাইন ফলো করছেন। শুনে স্বদেশবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। প্রশ্ন করলেন বৌবাজার ডিজাইন মানে? সেটা কি? জানালাম ১৯৮৮ সাল থেকে এই ডিজাইন শুরু হয়েছে। সেটার মানে কংগ্রেস মদতপুষ্ট গুণ্ডা ওমরের মোকাবিলায় আপনারা রশিদকে মদত দিলেন। রশিদ বাহিনী ১৯৯০ সালের ১৭ জুন কলকাতা কর্পোরেশন ভোটে আপনাদের হয়ে ব্যাপক রিগিং করেছিল। নতুবা সেবার বামফ্রন্ট ৯৪ আসনের বদলে ৭০ আসন পেত। লেডি ডাফরিন হাসপাতালের উল্টো দিকে ৪৮ নং ওয়ার্ডে কংগ্রেস প্রার্থী তাপস রায় কিভাবে হেরে গেলেন? অথচ এই তাপস রায় ১৯৮৫ সালের ভোটে ওই ওয়ার্ড থেকে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন। ১৯৯০ সালের ভোটের ছমাস আগে ১৯৮৯ নভেম্বরে হওয়া লোকসভা ভোট এবং এগারো মাস পর ১৯৯১ সালের ২০ মে একসঙ্গে হওয়া লোকসভা ও বিধানসভা ভোটে কংগ্রেসের দুই প্রার্থী অজিত পাঁজা ও সোমেন মিত্র ৪৮ নং ওয়ার্ড থেকে ৬-৭ হাজার ভোটে লিড পেলেন কি করে?
তীক্ষ্ণ প্রশ্ন শুনে স্বদেশবাবুর চক্ষু চড়কগাছ। বললাম ১৯৯৩ সালের ১৬ মার্চ রাতে রশিদের বাড়িতে মজুত রাখা বোমা বিস্ফোরণ হয়। সেই বিস্ফোরণে কতগুলো মানুষ মারা গেলেন। রশিদ গ্রেফতার হল। তার যাবজ্জীবন কারাদন্ডও হয়ে গেল। স্বদেশবাবু জিজ্ঞেস করলেন তুমি ওমর ও রশিদকে দেখেছো? বললাম ওমরকে দেখেছি মহামেডান ক্লাবে, রশিদকে দেখেছি ওর রেস্টুরেন্টে। বৌবাজার ডাকঘরের পাশে। মাফিয়া রশিদকে মদত দেওয়ার অভিযোগে সিপিআইএমের রাজ্য কমিটির সদস্যা শ্যামলী গুপ্ত ও কলকাতার জেলা কমিটির নেতা লক্ষ্মী দে সাসপেন্ড হন, আর এক কেউকেটা নেতা আশিস দে, বৌবাজারের প্রাক্তন বিধায়ক আবুল হাসান দল থেকে বহিষ্কৃত হন। যুগান্তর পত্রিকার নামজাদা রিপোর্টার অনিল ভট্টাচার্য এবং লালবাজারের যে সব পুলিশ অফিসার রশিদকে মদত দিত তাদের অবশ্য কোন শাস্তি হয়নি। ওনাকে আরও বললাম, কোন নেতা রশিদের থেকে কত টাকা নিয়ে ছেন তাও জানা। সেই বৌবাজার ডিজাইন আপনারা এখানে ফলো করছেন কেন? স্বপনকে মিনি ওমর ভেবে শ্রীধরকে রশিদ ভাবার কি দরকার? স্বদেশবাবু বললেন, তুমি ভালোই জানো আমি এই লাইনের বিপক্ষে। যারা মদত দিচ্ছে তাদের বলো। বললাম তারা কি দলের জেলা সম্পাদক লক্ষ্মী সেনের গ্রুপ করেন? উনি বললেন আমি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য দলের ভেতরের কথা সাংবাদিককে বলতে যাব কেন? আমি তো কংগ্রেসি কালচারে পার্টি করি না। ঠিক আছে এখন চলি এল.সি অফিস যাবো। স্বদেশবাবু চলে গেলেন।
পরদিন সকাল সওয়া দশটা হবে ঘরে বসে কাগজ পড়ছি দেখি সতেরো আঠারো বছর বয়সী দুটি ছেলে হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। দুজনেই অচেনা মুখ। জিজ্ঞেস করলাম কি চাই? তারা বললো আজ সকাল নটা পঞ্চাশ মিনিটে চিড়িয়াখানার উল্টো দিকে শ্রীধরদা ধরা পড়েছে। ওর পকেটে মেশিন ছিল। খবরটা সান্ধ্য আজকালে ধরিয়ে দিন। বলেই ছেলে দুটি দৌড়ে চলে গেল। তখন সান্ধ্য আজকালের দায়িত্বে ছিলেন পিনাকী মজুমদার। আজকালের বোর্ডে ফোন করলাম। বোর্ডে যিনি ছিলেন সেই প্রামাণিকদাকে পিনাকীকে লাইনটা দিতে বললাম। পিনাকী ফোন ধরতেই বললাম একটু আগে চিড়িয়াখানার উল্টো দিক থেকে শ্রীধরকে ডিডি ধরেছে। ওর পকেটে রিভলভার ছিল। চেক করুন। পিনাকী ডিডির ডেপুটি কমিশনারকে ফোন করে ঘটনার সত্যতা জানতে চায়। ফোনের ওপার থেকে গৌতমবাবু বলেন ভুল খবর, বলেই ফোন রেখে দেন। পিনাকী সেটা এই প্রতিবেদককে জানায়। মিনিট পনেরো পর ওই ছেলে দুটি আবার আসে। জানতে চায় সান্ধ্য আজকালে খবরটা বেরুচ্ছে কিনা? বললাম পুলিশ তো বলছে ভুল খবর। ওদের এক জন জোর দিয়ে বললো, আমাদের সামনে ঘটনাটা ঘটেছে। ফের পিনাকীকে ফোন করলাম। বললাম গৌতমবাবুকে আরেকবার ফোন করে জানুন। পিনাকী যেন একটু বিরক্ত হল। কিন্তু ফোনটা করলো। এবার গৌতমবাবু ঝাঁঝালো গলায় বললেন কি ব্যাপার বলুন তো? আসামী ধরা পড়ার খবর রিপোর্টার আগেভাগে জানছে কি করে? (চলবে )