দেবাশিস ভট্টাচার্য
বিষয় : সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়
এই পর্বে বাংলার এক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের কথা আলোচনা করবো। মানুষ দোষে গুণে হয়। এই ব্যক্তির জীবনের তিন-চারটি বড় অপরাধ গুণগুলিকে চেপে দিয়েছে। তিনি হলেন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়।
২০০৬ সালের গোড়ার দিকের কথা। এই প্রতিবেদক তখন আকাশ বাংলা টিভি চ্যানেলে চাকরি করেন। আগের বছর জ্যোতি বসুর দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সহযোগী ছিলেন সাংবাদিক অঞ্জন ব্যানার্জি। চারটি রবিবার রাত ন’টা থেকে দশটা চার ঘণ্টা সেই সাক্ষাৎকার দেখানো হয়েছিল। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে জ্যোতিবাবুকে রাজি করিয়েছিলাম। তিনি পারতপক্ষে টিভি দেখতেন না। সব টিভি চ্যানেলকেই দূরদর্শন বলে জানতেন। তাঁকে বুঝিয়েছিলাম কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানাধীন টিভি চ্যানেলের নাম দূরদর্শন। বাকিগুলি বেসরকারি টিভি চ্যানেল। তাঁর আপ্ত সহায়ক জয়কৃষ্ণ ঘোষ চারটে রবিবার জ্যোতিবাবুকে সেই সাক্ষাৎকার দেখিয়েছিলেন। তারপর জ্যোতিবাবু এই প্রতিবেদককে বলেছিলেন ভালই হয়েছে। মানুষ এমনিতে মনে রাখে না। এটা হয়ে রইল। ভবিষ্যতে যদি কেউ মনে করতে চায় এটা দেখবে।
জ্যোতি বসুর সাক্ষাৎকার সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তারপরেই মাথায় আসে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সাক্ষাৎকার নিয়ে রাখতে হবে। অনেক কষ্ট করে একে ওকে দিয়ে বলিয়ে তাঁকে রাজি করিয়েছিলাম। নির্দিষ্ট দিনে তিনজন ক্যামেরাম্যান নিয়ে দক্ষিণ কলকাতার বেলতলায় ওঁর বাড়িতে যাই। তিনটি ক্যামেরা রেডি করা হয়। গোটা কুড়ি বই নিয়ে গিয়েছিলাম। ওই সব বইয়ের বিভিন্ন পাতায় সিদ্ধার্থবাবুকে নিয়ে লেখা ছিল। সেইসব পাতায় ফ্ল্যাপ দেওয়া ছিল। যাতে প্রয়োজনে পাতাটি তাড়াতাড়ি বের করা যায়। শুটিং স্থল তাঁর বাড়ির চেম্বার। বিরাট ঘরের চারিদিকে আলমারিতে হাজার হাজার বই। দাদু চিত্তরঞ্জন দাশের ব্যবহার করা বইও আছে। ছ’ফুট চার ইঞ্চি লম্বা টকটকে ফর্সা সুদর্শন সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় সামনে এসে বসলেন। গায়ে ছিল লাল শার্ট। বইগুলো দেখে বললেন দেবাশিস কি ব্যাপার! এত বই এনেছ কেন? তোমার মতলব মনে হচ্ছে ভালো নয়। সব ক্যামেরা বন্ধ রাখো। আগে তোমার প্রশ্নগুলো শুনি।
প্রথম প্রশ্ন : ১৯৭২ সালের ২০ মার্চ আপনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। চরণ সিং মামলার রায় বেরুনোর পর ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। মুখ্যমন্ত্রীদের কাজের মেয়াদ পাঁচ বছর। আপনি পাঁচ বছর চল্লিশ দিন মুখ্যমন্ত্রী থাকলেন কি করে?
প্রশ্ন শুনে সিদ্ধার্থবাবু বলেন দ্বিতীয় প্রশ্নটা শুনি?
বললাম, প্রথম প্রশ্নের উত্তরে আপনি বলবেন ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনের পর লোকসভা ও বিধানসভাগুলোর মেয়াদ ৫ বছরের জায়গায় ৬ বছর করা হয়েছিল। তাই আমি ৪০ দিন বেশি ছিলাম।
সিদ্ধার্থবাবু বললেন তুমি তো দেখছি উত্তরও জানো। বললাম তাই আপনার উত্তর আন্দাজ করে আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন করতাম। জরুরি অবস্থায় সংবিধান সংশোধনের জন্য প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্মরণ সিংয়ের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী এইচ. আর. গোখলে এবং আপনাকে নিয়ে তিনজনের কমিটি গড়েছিলেন। সেই কমিটির দুজন লোকসভা ও বিধানসভার মেয়াদ বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ছিলেন। আপনার মত, আপনি ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়ে বলিয়ে ওই দুজনের উপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
সিদ্ধার্থবাবু বলেন এসব পেলে কোথায়? বললাম এই দেখুন সাংবাদিক কুলদীপ নায়ারের বিখ্যাত বই The Judgement এ এই তথ্য আছে।
তখন তিনি বললেন, তোমার মতলব বুঝতে পেরেছি। But you have underestimated my intelligence. বললাম আমার সেই ধৃষ্টতা নেই। আপনি সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নাতি। ছাত্র জীবনে ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস খেলে তিনটি ব্লু পেয়েছেন। রাজ্যের মন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেছেন। সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছেন। কঠিন সময়ে পাঞ্জাবের রাজ্যপাল হয়েছেন। আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। কম কথা। আবার বাবরি মসজিদ অ্যাকশান কমিটির হয়ে মামলা লড়েন বিনা পারিশ্রমিকে। ১৯৫৮ সালের গোড়ায় আপনি বিধানচন্দ্র রায় মন্ত্রীসভা থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। এই দেখুন সেই ভাষণের কপি। তিনি সাগ্রহে লেখাটি পড়তে লাগলেন। বললেন এটা তুমি কোথায় পেলে? বললাম বিধানসভার লাইব্রেরি থেকে। তখন দলত্যাগ বিরোধী আইন না থাকলেও নৈতিক কারণে আপনি বিধায়ক পদও ছেড়েছিলেন। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে আপনি বামপন্থীদের সমর্থনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে লড়েন। বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রার্থী ছিলেন বিজয় ব্যানার্জি। সেই সভায় আপনি বলেছিলেন স্বাধীনতার পর কংগ্রেস নীতিহীনতার পথে চলছে। আপনার পরের বক্তা ছিলেন জ্যোতি বসু। সেই ভোটে আপনি জয়লাভও করেছিলেন। অবশ্য তার কিছুদিন পর কংগ্রেসেই ফিরেছিলেন।
১৯৭৪ সালের মার্চে সঞ্জয় গান্ধীর মারুতি কারখানার জমি অধিগ্রহণের সময় আপনি একদিন ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন পুত্রস্নেহে এ’কাজটা করা ঠিক হচ্ছে না। জ্যোতির্ময় বসু যখন জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি পার্লামেন্টে তুলেছেন তখন তিনি অনেকদূর যাবেন। সঞ্জয় গান্ধী একথা শুনে ফেলেন। তিনি প্রতিশোধ নিতে চান। ১৯৭৫ সালে জরুরি অবস্থার সময় সঞ্জয় গান্ধী সর্বভারতীয় যুব কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সিকে সরিয়ে অম্বিকা সোনিকে বসান। এরপর আপনাকে সরিয়ে আপনার মন্ত্রী তরুণকান্তি ঘোষকে মুখ্যমন্ত্রী করতে চান। সেই কাজে ধূনো দিতে আপনার সরকারের আরেক মন্ত্রী প্রফুল্ল কান্তি (শত) ঘোষ ভীম নাগের কড়া পাকের সন্দেশ নিয়ে দিল্লি যেতেন। ওই মিষ্টি নাকি সঞ্জয় গান্ধীর প্রিয় ছিল। ১৯৭৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি সঞ্জয় গান্ধী কলকাতায় আসেন। শহীদ মিনারের সভায় সেদিন আপনি সঞ্জয়কে ‘যুবসূর্য’ বলে আখ্যায়িত করে ম্যানেজ করে ফেলেন। এতক্ষণ শুনে সিদ্ধার্থবাবু বলেন তুমি দেখছি আমাকে নিয়ে অনেক পড়াশুনা করেছো। বুড়ো হয়েছি তাই নিজের সম্পর্কে কেউ কিছু বললে ভালো লাগে। তুমি আমার আর কি ভালো দেখেছো? বললাম ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বাংলায় শিল্পায়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু আমেরিকায় গিয়েছিলেন আপনি তখন সেখানে ভারতের রাষ্ট্রদূত। আপনি অনেক শিল্পপতিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে জ্যোতি বসুকে সহযোগিতা করেছিলেন। আপনি বারবার মমতা ব্যানার্জিকে বিজেপির সঙ্গ ছাড়তে বলেছেন।
এবার তিনি আমায় থামিয়ে দিয়ে বললেন, আচ্ছা মারুতি নিয়ে ইন্দিরাকে আমি কি বলেছি তুমি জানলে কি করে? কে.কে বিড়লার লেখা বই Indira Gandhi Reminicenses. তাঁকে দেখালাম। সেখানে সিদ্ধার্থবাবুকে নিয়ে একটা চ্যাপ্টার আছে, তা থেকে প্রাসঙ্গিক অংশটা দেখালাম। তাঁকে বললাম আপনি বিড়লা বাড়ির উকিল এই বই দেখেন নি? আপনি একজন তুখোড় বিতার্কিক।
তাঁর খারাপ দিক বিষয়ে জানতে চাইলেন। বললাম ১৯৭১ সালের ১ জুলাই ইন্দিরা গান্ধী আপনাকে পশ্চিমবঙ্গের ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী করে পাঠান। তখন এখানে রাষ্ট্রপতি শাসন ছিল। রাজ্যপাল ছিলেন শান্তিস্বরূপ ধাওয়ান। ১৯৭০ সালের এপ্রিল থেকে নকশালপন্থীদের খুনের রাজনীতির মোকাবিলায় পুলিশও বেআইনি ভাবে নকশালপন্থীদের খুন করছিল। পুলিশ হাজতে নির্যাতনে খুন, ভ্যান থেকে নামিয়ে বাড়ি যেতে বলে পেছন থেকে গুলিকরে খুন, কলকাতার আড়িয়াদহের আটজনকে ধর্মতলা থেকে গ্রেফতারের পর গভীর রাতে বারাসত থেকে কৃষ্ণনগর যাওয়ার রাস্তায় তাদেরকে গুলি করে মৃতদেহ গুলি রাস্তায় ফেলে রাখা হয়, জেলে বন্দি হত্যা চলছিল। আপনি আসার পর বেআইনি কাজ করতে পুলিশের মনোবল বেড়ে যায়। পঞ্চাশ বছর বয়সী বুদ্ধিজীবী সরোজ দত্তকে গ্রেফতারের পর কোর্টে না তুলে ভোরবেলা ময়দানে নিয়ে গিয়ে পুলিশ গুলি করে মারে। কাশীপুর-বরাহনগর, ব্যাঁটরা, কোন্নগরে পুলিশ ও গুণ্ডারা সংগঠিত করেছিল নকশালপন্থী নিধন যোজ্ঞ।
১৯৭২ সালের ১১ মার্চ বিধানসভা ভোটে আপনার ফর্মুলায় ব্যাপক রিগিং হয়। যদিও সেবার রিগিং ছাড়াই কংগ্রেস ক্ষমতায় আসতে পারতো। কারণ বাংলাদেশের মুক্তির জন্য ইন্দিরা গান্ধীর অসামান্য ভাবমূর্তি এবং সিপিআই-এর সঙ্গে জোট। সিপিআই-এর তখন একশোটি বিধানসভা কেন্দ্রে অন্তত ৮/৯ শতাংশ ভোট ছিল। রিগিং না হলেও কংগ্রেস জিততো। তবে সিপিআইএমের আসন সংখ্যা ১৪-র বদলে ৬৪ হতো, জ্যোতি বসু হারতেন না। ১৯৭২ সালের ভোটে অনর্থক রিগিং করে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় বদনাম কুড়িয়েছেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জুন দেশে জরুরি অবস্থা জারি করার বুদ্ধি আপনি ইন্দিরা গান্ধীকে দিয়েছিলেন।
১৯৮০ দশকের শেষে পাঞ্জাবের রাজ্যপাল হয়েও মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। বহু খালিস্থানি যুবককে পুলিশ গ্রেফতার করে কোর্টে না তুলে খুন করে দেয়। পুলিশের বিরুদ্ধে এমন একশোরও বেশি খুনের মামলা সুপ্রিম কোর্টে চলছে। এগুলিকে বলে Extra Judicial killing। একটি মামলায় পাঞ্জাবের তরনতারন জেলার পুলিশ সুপারকে ডাকা হয়েছিল। পরদিন সেই পুলিশ অফিসার চলন্ত ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেন। তাঁর পকেটে একটি সুইসাইড নোট পাওয়া গিয়েছিল।
তাতে লেখা ছিল Whatever Crime I had Committed did at the behest of the then Governor. সিদ্ধার্থবাবু বললেন এটা কোথায় পেলে? পাঞ্জাবের একটি মানবাধিকার সংস্থার রিপোর্ট দেখালাম।
তিনি বললেন শোনো, ইন্টারভিউটা আজকে হবে না। তোমাকে আমি সময় মত ডেকে পাঠাবো। তোমাকে অনেক অজানা ঘটনা বলবো। Untold story বলবো। বাংলাদেশ মুক্তি যুদ্ধের সময় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কবে শুরু হয়েছিল জানো? বললাম ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর। বললেন ঠিক। সেদিন রাত একটায় ইন্দিরা গান্ধীর বাড়িতে আমরা বৈঠকে বসেছিলাম। ওই বৈঠকে আরও চারজন ছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াই. বি. চবন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম, সেনা প্রধান মানেক শা, এবং র-এর ডিরেক্টর। জিজ্ঞেস করলেন র-এর ডিরেক্টর কে ছিলেন? বললাম মি. কাও। বললেন, জানো দেখছি। বললেন এত বই নিয়ে ইন্টারভিউ করতে এসেছো কেন? কে তোমাকে শিখিয়েছে? বললাম আমার শিক্ষকের নাম সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়। তিনি বললেন আমি আবার কবে পড়ালাম? বললাম ১৯৯১ সালের মে মাসের ভোটে চৌরঙ্গী বিধানসভা কেন্দ্রে আপনি অশোক মিত্রকে হারিয়ে ছিলেন। বিধানসভার বিরোধী নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পান। সে বছর সম্ভবত ৩১ জুলাই বিধানসভায় পুলিশ বাজেট নিয়ে বিতর্ক ছিল। আপনার সত্তর মিনিটের ভাষণের পর জ্যোতি বসুর নির্ধারিত সত্তর মিনিট ছিল। আপনি শুরু করেছিলেন ১৯৭৭ সালের আগস্টে বামফ্রন্ট সরকারের নিয়োগ করা তিনটি বিচার বিভাগীয় কমিশনের ৭টি অন্তবর্তী রিপোর্ট দেখিয়ে। আপনার আমলে পুলিশি অত্যাচার, গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর আক্রমণ ও ক্ষমতা অপব্যবহারের তদন্তে ওই তিনটি কমিশন বসেছিল। মনে পড়ছে? তিনি বললেন একদম ঠিক বলছো, বলো। বললাম বামফ্রন্ট সরকার কর্তৃক প্রকাশিত ২৫-২৬ টি বই সামনে রেখে একটা একটা করে তুলে নির্দিষ্ট পাতা বের করে পড়তে থাকেন। সেদিনের ভর্তি অধিবেশন কক্ষ আপনার বিতর্কের মান ও স্টাইল দেখে অভিভূত হন। কোথায় কিরকম বক্তৃতা করতে হয় সেদিন আপনি শিখিয়েছিলেন। রাজারহাটের রবীন মন্ডলের মত বামফ্রন্ট বিধায়করা আপনাকে ষোল বার বাধা দিয়েছিলেন। পাশাপাশি সৌগত রায়ের মতো আপনার দলের বিধায়করা টেবিল চাপড়ে আপনাকে সমর্থন করেন। আপনি বই দেখানো মাত্রই বামফ্রন্ট বিধায়করা সেগুলিকে বোগাস বলছিলেন। আপনি বসে পড়ে স্পিকারকে বলেছিলেন স্যার আমার আর কিছু বলার নেই। বামফ্রন্ট বিধায়করা বলছেন, তাঁদের সরকার বোগাস বই ছাপে। সেদিনের বক্তৃতার লড়াইয়ে সুবক্তা হিসাবে খ্যাত জ্যোতি বসু ম্লান হয়ে যান। দেশে সবচেয়ে বেশি দিন স্পিকারের আসন অলঙ্কৃত করার নায়ক হাসিম আবদুল হালিম। বহুবার একান্তে বলেছেন মানুদার সেদিনের বক্তৃতা বিধানসভার ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ হয়ে থাকবে। সেদিন থেকেই আপনাকে শিক্ষক মেনেছিলাম।
সিদ্ধার্থবাবু বললেন, ভালো কথা। এবার আমি মুখ্যমন্ত্রী কেমন ছিলাম বলো? ভালো দিক কিছু ছিল। যেমন তেভাগা আন্দোলনের দাবি মেনে ভাগচাষিদের স্বার্থে আইন পাশ হয়। জোতদারদের বেআইনি জমি বাজেয়াপ্ত করে সরকারের খাস হওয়া জমির পরিমাণ আপনার আমলেই সবচেয়ে বেশি হয়েছে। যদিও সেই খাস জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বন্টনের কাজটা আপনি করতে পারেন নি। বামফ্রন্ট সরকার এসে সেই জমি ২৩ লক্ষ চাষিকে দিয়ে ভূমি সংস্কার সম্পূর্ণ করেছে। আপনার আমলে পঞ্চায়েত আইন তৈরি হয়েছে। কিন্তু আপনি ভোটটা করাতে পারেন নি। বামফ্রন্ট সরকার এসে ওই আইন মেনে ১৯৭৮ সালের ৪ ঠা জুন প্রথম পঞ্চায়েত ভোট করে। অর্থাৎ আপনি কাজ শুরু করেন কিন্তু শেষ করতে পারেন না। ক্রেডিটও পাননি। পাহাড়বাসী ও মুসলিমদের স্বার্থে কিছু করার কথা ভেবেছিলেন। ভূষি কেলেঙ্কারির কথা উঠলেই আপনি বিচারপতি ওয়াঞ্চুর নেতৃত্বে কমিশন বসান। দুজন মন্ত্রীকে সরিয়ে দেন। দলের বিধায়ক-সহ অনেক কর্মীকে জেলে ঢোকান। আপনি সৎ ও সেকুলার।
ইতিবাচক দিকগুলো চাপা পড়ে অত্যাচারী প্রশাসক হিসেবেই বদনাম পেয়েছেন। এবার সিদ্ধার্থবাবু বললেন, নকশালপন্থী ও পাঞ্জাবের খালিস্থানিদের কোনঠাসা করে মানুষকে শান্তি দিয়েছি। অন্য ভাবে হত না। নকশালপন্থী ও খালিস্তানিদের হাতে বহু মানুষ ও পুলিশ খুন হতো, আবার পুলিশের গুলিতে নকশালপন্থীরা খুন হতো। সেইটার অবসান করেছিলাম। বললাম, মানবাধিকার লঙ্ঘন না করেও সে কাজ করতে পারলে সুপ্রশাসকের নাম পেতেন। তিনি বললেন, নাম কিনতে চাইনি, খুন বন্ধ করতে চেয়েছি এবং সে ব্যাপারে সফল হয়েছি। নকশালপন্থীরা জেল থেকে পালানোর কথা না ভাবলে অতো বন্দী খুন হতো না।
তিনি বললেন ঠিক আছে এখন শেষ করো। যথাসময়ে ডেকে পাঠাবো।
২০১০ সালের জানুয়ারির প্রথমার্ধে তিনি বন্ধু জ্যোতি বসুকে দেখতে দু’দিন হাসপাতালে যান। তার মাস দুই-তিন পরে এই প্রতিবেদককে দেখা করতে বলেন। গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, তাঁর সময় কালে সরকারি কাজকর্ম নিয়ে আরও পড়াশুনা করতে। সেই না হওয়া ইন্টারভিউয়ের কথা বললাম। তিনি বললেন একটু সুস্থ হই তারপর এসো। কিন্তু তিনি আর সুস্থ হলেন না। ২০১০ সালের ৬ নভেম্বর তিনি প্রয়াত হন।
(চলবে)