দেবাশিস ভট্টাচার্য
বিষয় : সুতা কাট দুঙ্গা
লকডাউনের সময় বাড়িতেই থাকতে হচ্ছে। সেই সুযোগে বই ম্যাগাজিন ঝেড়ে পুছে র্যাকে গুছিয়ে রাখছি। পাক্ষিক ‘আরেক রকম’ পত্রিকার গোড়ার দিকের ক’য়েকটি সংখ্যা দেখছিলাম। প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী অশোক মিত্র এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। অশোকবাবুর একটি লেখা পড়ছিলাম। তিনি লিখেছেন সরকারি ও আধা সরকারি অফিসে বামফ্রন্ট আমলে কর্মী নিয়োগ হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা দেখে নয় বশ্যতা দেখে। একদম ঠিক কথা। কর্মী নিয়োগে যোগ্যতা না দেখায় সরকারি পরিষেবার হাল খারাপ হয়েছে। পেছনে পার্টির মদত থাকার জন্য ফাঁকিবাজ ও অযোগ্য কর্মীরা সবাই না হলেও একাংশ তো বটেই কাজে গাফিলতি ও অযোগ্যতা দেখিয়েছে। দ্বিতীয়ত তারা অফিসে ঔদ্ধত্য ও আধিপত্যবাদ দেখায়। প্রমোশন ও বদলির ব্যাপারে খবরদারি করে ওরা অন্যদের উপর আধিপত্য দেখাতো। আজ অষ্টম পর্বে একটা ঘটনার কথা বলি।
১৯৯৩ সালের মাঝামাঝির কথা। পার্ক সার্কাসে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রসূতি বিভাগে টিটেনাস হয়। ফটোগ্রাফার অমিত ধরকে সঙ্গে নিয়ে ওই হাসপাতালে যাই। তখন বেলা তিনটে হবে। দুজনে হাসপাতালের ভিতরে ঢুকলাম। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করছিলাম। দেখলাম মায়েরা সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন। মহিলা ওয়ার্ড বলে ঢুকতে পারছিলাম না। হাসপাতালের ভিজিটিং আওয়ার বিকেল চারটে থেকে। তবু পুরুষ বিভাগ হলে ঢুকে পড়তাম। সদ্যোজাত শিশুর মায়েদের দু’তিন জনের সঙ্গে কথা বললাম। শিশুদের দিকে দেখিয়ে বললাম বাঃ খুব সুন্দর দেখতে হয়েছে। বাচ্চা কবে হয়েছে? তিনজনেই জানালেন কাল রাতে। বললাম কুড়ি ঘন্টার মধ্যে ছুটি দিয়ে দিল? ওরা বললেন হ্যাঁ। কারণ ওয়ার্ডে একজনের টিটেনাস হয়েছে। তাই ওরা ছুটি দিয়ে দিল।
তিনজনেরই বাড়ির লোকজন ছিলেন। হাসপাতালের দক্ষিণ গেট দিয়ে বেরিয়ে ওরা ট্যাক্সি ধরে চলে গেলেন।
একজন ডাক্তারবাবুকে দেখতে পেয়ে ফটোগ্রাফারকে দাঁড় করিয়ে রেখে তাড়াতাড়ি গিয়ে তাঁকে ধরলাম। রুগীর টিটেনাস হয়েছে জানলেন কবে? ডাক্তারবাবু জিজ্ঞেস করলেন আপনি কে? বললাম আজকাল পত্রিকা থেকে এসেছি। তিনি বললেন যা জানার সুপারের কাছ থেকে জানুন। ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলছি তখনই অমিত চেঁচিয়ে উঠলো। বললো দেবাশিসদা ক্যামেরা কেড়ে নিয়েছে। শুনেই ওর দিকে দৌড়ালাম। দেখি জনা চার-পাঁচেক লোক ওকে ঘিরে ধরেছে। যার হাতে ক্যামেরা ছিল তাকে বললাম ক্যামেরা কেড়েছেন কেন? তিনি গলা উঁচিয়ে বললেন নেগেটিভ ছবি দেখিয়ে বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করবেন সেটা বরদাস্ত করবো না। বললাম শুনুন এমন বামপন্থী বুলির ফ্রেসোলজি আপনার চেয়ে ঢের বেশি জানি। মনে হচ্ছে আপনি কো-অর্ডিনেশন কমিটির ইউনিট সম্পাদক। ভদ্রলোক ঝেঁঝে উঠে বললেন বলুন। বললাম ১৯৫৫ সালে রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের কো-অর্ডিনেশন কমিটি যাঁরা গড়ে ছিলেন সেই অরবিন্দ ঘোষ, অমল গাঙ্গুলি, ভবতোষ রায়, অজয় মুখার্জি, সুকোমল সেন, চুণিলাল দাশগুপ্ত—এরা সবাই এই প্রতিবেদককে স্নেহ করতেন ও করেন। কত কষ্ট করে এই সংগঠন ওঁরা গড়েছেন সে ইতিহাস জানা। ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট রাজ্যপাল অ্যান্টনি ল্যান্সলেট ডায়াস তেরো জন নেতাকে সংবিধানের ৩১১ (গ) ধারা বলে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বরখাস্ত করেছিলেন। অরবিন্দবাবুরা লড়াই করেছেন। আর আপনারা পার্টি কানেকশনে সরকারি চাকরি পেয়ে কাজ না করে নেতাগিরি দেখাচ্ছেন। একমিনিট সময় দেবো। ক্যামেরা ফেরত দিয়ে ক্ষমা না চাইলে কি করবো শুনুন। ১) বেনিয়াপুকুর থানায় গিয়ে আপনাদের বিরুদ্ধে ক্যামেরা ছিনতাইয়ের অভিযোগ জানাবো। এই কেসটায় পুলিশ কেমন সক্রিয় হয় দেখবেন। ২) মহাকরণে গিয়ে আপনাদের রাজ্য কমিটির শীর্ষ দুই নেতা মলয় রায় ও স্মরজিৎ রায়চৌধুরীকে জানাবো। ওঁরা দাড়িপাল্লায় মাপবেন। একদিকে একজন ইউনিট সম্পাদক অন্যদিকে একটা দৈনিক সংবাদপত্র। এক মিনিটে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেবেন। আপনাকে ওঁরা সাসপেন্ড করবেন। ওদের মাথায় ঘুরবে প্রেস বিবৃতি ও সাংবাদিক সম্মেলনের খবর কমিটির নামে ছোট করে যাবে। কিন্তু ওঁদের নাম থাকবে না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশান্ত শূরকে গিয়ে সব জানাবো। যেন আপনাকে কোচবিহার বদলি করে দেওয়া হয়। মামলার তারিখে নিজের পয়সায় কোচবিহার থেকে শিয়ালদহ কোর্টে যখন আসবেন তখন কান্না পাবে। ৪) সিপিআইএম রাজ্য দপ্তরে গিয়ে শৈলেন দাশগুপ্ত ও অনিল বিশ্বাসকে সবটা জানিয়ে আসবো। কোথাও কোন প্রোটেকশন পাবেন না। পার্টিতে নাম লিখিয়ে গা-জোয়ারি দেখাবেন তা হবে না। কানেকশন কাজ করবে না। সুতা কাট দুঙ্গা। নেতা তখন ক্যামেরা অমিতের হাতে দিয়ে বলেন সরি। এই প্রতিবেদককে বলেন স্যার ভুল হয়ে গেছে। আর কোনও দিন হবে না। ক্যান্টিনে চলুন একটু চা খাই। কথা কাটাকাটির সময় ওই জায়গায় ভিড় হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ কলকাতা পুলিশের পূর্ব ডিভিশনের এক অ্যাসিসটেন্ট কমিশনার এসে হাজির হলেন। তাঁর ইউনিফর্মের বুক পকেটে নাম লেখা ছিল মধু গুপ্ত। তিনি ওই নেতাকে বললেন আপনি দুটি অপরাধ করেছেন। ক্যামেরা কেড়ে নিয়েছেন। প্রেসের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছেন। বললাম এখনও তো থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের করিনি। তখন ওই অফিসার হতচকিত হয়ে গেলেন। বললেন, যা বোঝার তা বুঝে গেছি। নেতা এখন আপনার খবরের সোর্স হবে। বললাম সেটা কি আপনার কাজের এক্তিয়ারে পড়ে? তিনি অর্থপূর্ণ হাসি হাসলেন। পরে জেনেছিলাম ওই অফিসারের মেয়ে কলকাতার একটি নামী ইংরেজি দৈনিকের রিপোর্টার।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠলাম। ঠিক করে নিলাম অফিসে গিয়ে ওই টিটেনাসের ব্যাপারটি নিয়ে সুপারকে ফোন করবো। করেওছিলাম। পরদিন সে খবর বেরিয়েছিল।
গাড়ীতে বসে ভাবছিলাম চার বছর আগের একটি ঘটনা। ১৯৮৯ সালের মার্চ-এপ্রিল হবে। বোফর্স নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীরা ভারত বনধ ডেকেছিল। আজকাল সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত ওই বন্ধের সকালে অফিসে এসে ঘন্টা তিনেক কাজকর্ম সেরে দুপুরে বাড়ি ফিরছিলেন। বেকবাগানে ত্রিভোলি কোর্টের সামনে সিপিআইএমের কর্মীরা সম্পাদকের গাড়ি আটকান। গাড়ির চালক জানায় প্রেসের গাড়ি। ওদের নেতা সম্পাদককে বলেন রিপোর্টার হলে কার্ড দেখান। সম্পাদক ভিজিটিং কার্ড দেন। তখন নেতা বলেন মামা এ’কার্ডে হবে না। ফটো লাগানো সরকারি কার্ড চাই। পিছনের আসন থেকে উত্তর আসে ওরকম কার্ড সম্পাদকদের হয় না। তখন নেতা বলেন তাহলে গাড়ি ছাড়া যাবে না। সম্পাদক বলেন ভালোভালো জিনিস খেয়ে শাসক পার্টির সঙ্গে থেকে হাতের মাসল ফুলেছে। মগজে কিছু নেই কেন? এরপর তিনি চালককে গাড়িতে থাকতে বলে হেঁটে বাড়ি ফেরেন। মিনিট কুড়ির পথ। বাড়ি গিয়ে হট লাইনে আজকাল অফিসে ফোন করে ঘটনাটি জানান। তখন মোবাইল ফোন আসেনি। কিন্তু রিপোর্টারদের তৎপরতায় মহাকরণ লালবাজার বামফ্রন্টের সব শরিক দলের অফিস, প্রদেশ কংগ্রেস নেতারাও জেনে যান। ঘটনার নিন্দা করে সবাই বিবৃতি দিতে শুরু করেন। বিরাট পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে ছোটে। যারা গাড়ি আটকে ছিল তারা তার কিছুক্ষণ আগেই চলে গিয়েছিলেন। বিকেল চারটেয় মহাকরণে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বলেন বনধ সমর্থন কারীরা বেকবাগানে আজকালের সম্পাদকের গাড়ি বেআইনি ভাবে আটকে দেয়। পুলিশ অপরাধীদের খুঁজছে। ওই দিনই বিকাল পাঁচটায় সিপিআইএম রাজ্য দপ্তরে সাংবাদিক বৈঠক করেন দলের তদানীন্তন রাজ্য সম্পাদক সরোজ মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেন যারা আজকাল সম্পাদকের গাড়ি আটকে ছিল পার্টির সেই সব সদস্যকে শাস্তি দেওয়া হবে।
সাংবাদিক গৌতম রায়ের সঙ্গে ঘটনার তদন্তে নামি। জানা যায় ওই অবরোধকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সিপিআইএমের তদানীন্তন কলকাতা জেলা কমিটির সদস্য বাদশা আলম (পরে বিজেপিতে যোগ দেন)। দুদিন পরেই ঘটনাটা থিতিয়ে গেল। কারণ অশোক দাশগুপ্ত পুলিশকে কোন অভিযোগ দায়ের করতে রাজি হলেন না। সিপিআইএমের কলকাতা জেলা কমিটির তদানীন্তন সম্পাদক লক্ষী সেন বাদশাকে ডেকে বলেছিলেন বনধের দিন কি ভুল করেছো? পি সি অফিস থেকে তোমার সাথে কথা বলতে বলেছেন। মনে হয় লক্ষীবাবু সব শুনে বাদশার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন।
তাই ১৯৯০ সালের ১৭ জুন কলকাতা কর্পোরেশন ভোটে বাদশার মতো জেলা নেতারা অন্তত পঁচিশটি আসনে রিগিং করে বামফ্রন্টকে ৯৪ আসনে জিতিয়েছিল। তার দু’মাস পর ১৬ আগস্ট যুব কংগ্রেসের ডাকা বন্ধের দিন হাজরা মোড়ে লালু যখন মমতার মাথা ফাটিয়ে দেয় তখন নিকটেই দাঁড়িয়েছিলেন দাদা বাদশা আলম।
সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে লোকাল কমিটি ও কর্মস্থলে বাদশারা পেশি ফুলিয়েছেন কিন্তু মগজে শান দেননি। ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট আমলে এমন সব নেগেটিভ দিকগুলো এক জায়গায় জড়ো করে বামফ্রন্ট নেতাদের আত্মসমালোচনা করা উচিত। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ‘ফিরে দেখা’ নামে দুখন্ডের বই লিখেছেন। সেখানে শুধু ভালো ভালো কথাই আছে। খারাপ দিকগুলো দেখেও তিনি লেখেননি। বামফ্রন্ট ভুলগুলো স্বীকার না করলে কোনও দিনই এগোতে পারবে না।
(চলবে)