| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

পুরানো সেই দিনের কথা (পঞ্চম পর্ব)

Reporter Default
রিপোর্টার / ৬৩০ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৭ মে, ২০২০

দেবাশিস ভট্টাচার্য

স্টার স্পোর্টসের সাংবাদিক অনীক মিত্র বলেছেন আজকাল পত্রিকা অফিসে বালক ব্রহ্মচারীর শিষ্যদের হামলার ঘটনা নিয়ে কিছু লিখুন। এই পর্বে সেকথায় আসা যাক। ১৯৯২ সালের মার্চের মাঝামাঝির কথা। যতদূর মনে পড়ছে ১৫ মার্চ হবে। সেদিন সকালে আজকাল পত্রিকায় বালক ব্রহ্মচারী ও তাঁর সন্তান দলের বিরুদ্ধে একটি চিঠি বেরিয়েছিল। তাতে ক্ষেপে গিয়ে ব্যারাকপুর মহকুমার পানিহাটির সুখচরে অবস্থিত বালক ব্রহ্মচারীর আশ্রমে ক্ষোভ তৈরি হয়। দুটো ম্যাটাডোরে চেপে প্রায় জনাত্রিশ শিষ্য লাঠিসোঁটা নিয়ে আজকাল অফিসে চড়াও হয়। এই পত্রিকার অফিস তখন ছিল আমর্হাস্ট্রিটে সিটি কলেজের পাশেই। ভক্ত দল অফিসে ঢুকে যথেচ্ছ ভাঙচুর করে। পাঁচ ছজন সাংবাদিক-সহ ২৫/২৬ জন কর্মীকে বেধড়ক মারধর করে। থানা উল্টো দিকেই। ওরা চলে যাওয়ার পর পুলিশ আসে।

ঘটনার সময় অ্যাসাইনমেন্টে ছিলাম। অফিসের গেট পেরুতেই দেখি পুলিশ। ভেতরে প্রবল উত্তেজনা। সাংবাদিক পূষণ গুপ্ত (এখন ৩৬৫ পত্রিকার সম্পাদক) বললেন চলো সবাই মানিকতলা মোড় অবরোধ করবো। সহকর্মীরা বললেন সেটা করা ঠিক হবেনা। পরদিন বিকেলে অফিসের গেট থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত বিরাট প্রতিবাদ মিছিল হয়। সেই মিছিলের একেবারে সামনে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী জ্যোতির্ময় দত্ত। তাঁর হাতে ছিল কাডবোর্ডের তৈরি আট ফুট দৈর্ঘ্যের খাপ খোলা একটা পেন। তাঁর পেছনে বাঁদিকে একজনের হাতে বিরাট প্লাকার্ডে লেখা ছিল ফুঃ তেমনি ডানদিকে একজনের হাতে ছিল ছিঃ। তিনদিন পর প্রেসক্লাবে এক প্রতিবাদ সভা করে ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ জার্নালিস্ট।

তিন দিনের মধ্যেই পুলিশ এগারো জনকে গ্রেফতার করে। এরমধ্যে ছিলেন বালক ব্রহ্মচারীর ডান হাত চিত্ত শিকদার। অল্পদিনের মধ্যেই পুলিশ এদের বিরুদ্ধে কোর্টে চার্জশীট জমা দেয়। এর পর আসে টেস্ট আইডেন্টিফিকেশান প্যারেড। এক দিন অন্তর মোট দুদিন টি.আই প্যারেডের দিন ঠিক হয়। ওই কেসের তদন্তকারী অফিসার ছিলেন লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের দুলাল চক্রবর্তী। সন্ধ্যাবেলায় দুলালবাবু অফিসে এসে প্যারেডের গুরুত্ব বোঝান। যারা মার খেয়েছিলেন বলে চার্জশিটে নাম দেওয়া হয়েছিল তাদেরকে ডেকে কি করতে হবে তা বুঝিয়ে দেন।

সম্পাদক মশাই এই ব্যাপারে তদারকির জন্য পূষণকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে প্রহিতদের নিয়ে অফিসের তিন চারটি গাড়ী করে প্রেসিডেন্সি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বড় একটি ক্যান ভর্তি চা দশ-বারোটি কাপ ও খাবার জল নিয়ে গিয়েছিলেন ক্যান্টিনের কর্মী অনন্তবাবু। প্রহিতদের মধ্যে এই মুহূর্তে দুজন সাংবাদিকের নাম মনে পড়ছে। দেবাশিস দত্ত ও কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত। এঁদের একেকজন করে জেলে ঢোকানো হয়। কিন্তু কেউ একজনকেও আইডেন্টিফাই করতে পারেননি। ফলে সকলের মধ্যে হতাশা নেমে আসে। ডিউটি সেরে সন্ধ্যা বেলা অফিসে ঢুকতেই অসাংবাদিক দুই কর্মী বাবলু ও নটবর বললেন আগে সম্পাদকের ঘরে যান। ঘরে ঢুকেই দেখলাম সম্পাদক খুব গম্ভীর। তাঁর সামনে আই.ও দুলাল চক্রবর্তী বসে আছেন। আমার সংগৃহীত সংবাদ সম্পর্কে বলতে গেলাম। বললেন যা আছে লিখে দাও। পরশু একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিচ্ছি। বললাম বলুন। বললেন যারা মার খেয়েছিল তারা আজ টি.আই প্যারেডে একজনকেও চিনতে পারে নি। সামনে বসা দুলালবাবুকে দেখিয়ে বললেন উনি বলছেন কেসটা মাঠে মারা যাবে। আমার শেষ ভরসা তুমি। পরশু জেলে গিয়ে ওদের চিনিয়ে দাও। বললাম আমি তো ঘটনার দিন অফিসে ছিলাম না। ওদের দেখিনি কি করে চেনাবো?

সম্পাদক বললেন তুমি ঠিক পারবে। বললাম আমার নাম তো সাক্ষীর তালিকায় নেই। তখন দুলালবাবু বললেন আপনার নাম ঢুকিয়ে একটা সাপ্লিমেনটারি চার্জশিট কাল আমরা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জমা দেবো। প্রেয়ার করবো যাতে পরশু আপনাকে টি.আই প্যারেডে ডাকা হয়। পরদিন দুলালবাবু এসে জানালেন প্রেয়ার মঞ্জুর হয়েছে। কাল দুপুর দুটোর সময় আপনাকে যেতে হবে। পরদিন বেলা একটায় অফিস থেকে তিন চারটে গাড়ী নিয়ে আমরা প্রেসিডেন্সি জেলের গেটে গেলাম। ডেপুটি জেলার এসে ভেতরে ডেকে নিয়ে গেলেন। খাতায় সই করালেন। জেলের অফিস চত্বরের শেষ প্রান্তে যে গেট সেই গেটের ছোট গেট দিয়ে মাথা নিচু করে দুজনেই ঢুকলাম। বিরাট প্রাঙ্গণ। সেখানে একদিকে টেবিল চেয়ারে ম্যাজিস্ট্রেট, সুপার ও জেলার বসে আছেন। জেলার দু’তিনটে কাগজে সই করালেন। ম্যাজিস্ট্রেট প্রশ্ন করলেন সেদিন ঘটনার সময়ে আপনি ছিলেন? বললাম হ্যা। জেলার সামনের বিরাট লাইন দেখিয়ে বললেন এই লাইনে কেসের এগারো জন আসামী আছে। নিয়ম মতো আসামী পিছু অন্য দশজন বন্দি অর্থাৎ মোট একশো দশজন অন্য বন্দি লাইনে আছেন। সব মিলিয়ে একশো একুশ জন দাঁড়িয়ে আছেন। এর মধ্যে থেকে এগারো জনকে বাছতে হবে। এদিক থেকে হাঁটা আরম্ভ করে শেষ পর্যন্ত যাবেন। আবার ফিরবেন। যাকে চিনতে পারবেন আঙ্গুল দেখাবেন। ওয়ার্ডার তাকে লাইন থেকে বের করবেন।

ওয়ার্ডারকে বাঁদিকে রেখে হাঁটা শুরু করলাম। প্রত্যেকের পায়ে নিজের পা ছুঁয়ে মুখের গন্ধ শুকতে আরম্ভ করলাম। দু’চারজন বললেন সাংবাদিক না পুলিশ কুকুর? একজন বুকের কাছে হাত নিয়ে বিবেকানন্দ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ছিল তিনি বুকটা ঢুকিয়ে নিলেন। আঙ্গুল দেখালাম। ওয়ার্ডার তাকে লাইন থেকে বার করলেন। পরের জন বুক বাড়িয়ে দিলেন তার গলা শুকলাম। মুখ অন্যরকম হয়ে গেল। আঙ্গুল দেখালাম। ওয়ার্ডার তাকেও বার করলেন। ছ’সাতজন পরে একজন পাজামা-পাঞ্জাবী পড়ে ছিল বারবার দুটো হাত পাঞ্জাবীর পকেটে ঢোকাচ্ছিলেন আর বার করছিলেন। বললাম এত অস্থিরতা কেন? পকেটের গন্ধ শুকে বললাম সেদিনের গন্ধ পাচ্ছি। শুনেই তিনি কেঁদে ফেললেন। আঙ্গুল দেখালাম। পাশের জন প্যান্টের দুটো পকেটে হাত ঢোকালেন। বললাম আপনি ফালতু। যে একশো দশজন অন্য কেসের আসামীকে এখানে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিলো জেলের পরিভাষায় এদেরকে ফালতু বলা হয়। এমনভাবে এগারো জনকে দেখালাম ওদের মুখ দেখলাম কালো হয়ে গেছে।

জেলার ডাকলেন। ম্যাজিস্ট্রেট জিজ্ঞেস করলেন আপনার নাম সাপ্লিমেনটারি লিস্টে এল কেন? বললাম জানিনা। কোর্ট আজ এখানে আমাকে হাজির হতে বলেছে। তাই এসেছি। ম্যাজিস্ট্রেট বললেন ব্যাপারটায় বড়সড় গোলমাল আছে। আরেক দিন প্যারেড হবে আসতে হবে। বললাম যা বলেছেন তাই মেনেছি। কিন্তু আরেক দিন আসতে পারবো না। ম্যাজিস্ট্রেট বললেন এটা কোর্ট। এভাবে কথা বললে আপনার বিরুদ্ধে প্রসিডিং করবো। বললাম তখন আমি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির দারস্থ হয়ে সুবিচার চাইবো। এই জেলে ১৯৭৬ সালে রাজনৈতিক বন্দী ছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেট তখন বললেন যান। বাইরে বেরিয়ে দেখি সহকর্মীদের মুখে জয়ের আনন্দ। সাংবাদিক জ্যোতি প্রকাশ খান হ্যান্ডসেক করে বললেন এগারো জনের মধ্যে দশজনই আসামী। স্বয়ং চিত্ত শিকদারকে চিনিয়ে দিয়েছেন। গোয়েন্দা অফিসার দুলাল চক্রবর্তী হ্যান্ডসেক করে বললেন একানব্বই শতাংশ সাকসেস রেট। কেউ কখনও পেয়েছে বলে মনে হয় না। এটা রেকর্ড।

এসব মিটে যাওয়ার পর অফিসে ঢুকলাম। ওখানে তখন তুমুল জয়ের আনন্দ। সম্পাদক অশোক দাশগুপ্ত সেদিন অফিসে আসেন অন্যান্য দিনের তুলনায় খানিকটা আগে। তাঁর ঘরে ঢুকে দেখি খুব ভিড়। ঢুকতেই সম্পাদক বললেন তুমি পরশু রাতে বলেছিলে ঘটনার সময় ছিলেনা? দেখোনি, চিনতে পারবে না! তাহলে দশজনকে চিনলে কি করে? ডাকাবুকো ফটোগ্রাফার ভাস্কর পাল বললেন কোচ শেষ সময়ে এমন একজনকে মাঠে নামালেন তাতে হারা ম্যাচ দশ গোলে জেতা হলো। সম্পাদক বললেন পুলিশ বলছে ওই দশজনের সাজা হয়ে যাবে। বললাম তা হবে না। কারণ আমাদের দেশে কুড়ি শতাংশ মামলায় চার্জশিট জমা পড়ে। এর মধ্যে তিন-চার শতাংশ কেসে অপরাধীরা সাজা পায়। বাকি ষোল-সতেরো শতাংশ কেসে কিছুই হয়না। কারণ পুলিশের ভুল এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা। তাই আজকাল অফিসে সন্তান দলের হামলার কেসে বিগত আঠাশ বছরে কেউ সাজা পায়নি। কেসটা টিকে আছে কিনা তাও জানিনা।

ওই ঘটনার চোদ্দ মাস পর একদিন বিকেলে বালক ব্রহ্মচারী ক্যালকাটা হসপিটালে মারা যান। ডাক্তারবাবু ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়। সন্তান দলের দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ব্যক্তি ছিলেন চিত্ত শিকদার। তিনি ডেথ সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে সাংবাদিকদের বললেন রামনাম কেবলম। বাবা মরেন নি। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন দাহ কি আজ হবে না কাল? কোন শ্মশানে হবে? চিত্তবাবু বললেন চুলকাইয়া ঘা করিবেন না। শ্মশানে কেন যাবো? শুখচর আশ্রমে বাবার নিজের খাটে নির্বিকল্প সমাধিতে থাকবেন। রাত ন’টায় মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হল সুখচরে। খবর পেয়ে পরদিন ভোর থেকে বিভিন্ন জেলার ভক্তরা কাতারে কাতারে আসতে থাকে। রোজ বিরাট লাইন হতে থাকল। ইদানিং রবিনসন স্ট্রিট কাণ্ডের ছায়া পাঁচ-ছটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে। পাড়ার লোক পুলিশে খবর দিয়েছে। পুলিশ এসে মৃতদেহ বার করে নিয়ে গেছে। কিন্তু বালক ব্রহ্মচারীর ক্ষেত্রে পুলিশ কিছু করেনি। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে একটা মৃতদেহ পড়ে থাকলো। কোচবিহার থেকে পুরুলিয়া ভক্তরা এসে দর্শন করতে লাগলেন। একমাত্র আজকাল পত্রিকায় রোজ প্রথম পাতায় তলার দিকে অ্যাঙ্কার স্টোরি হতো। একান্ন দিনের মাথায় এই প্রতিবেদকের ওখানে ডিউটি পড়ল।

ভক্তদের সাথে এক লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। তিনতলায় উঠেই দেখি সামনে একটা ঘর। চারিদিকে ধূপধুনোর গন্ধ। বালক ব্রহ্মচারীর মরদেহ একটা পালঙ্কে শায়িত। ফুল দিয়ে সাজানো। সামনে দাঁড়িয়ে প্রণাম করলাম। একজন স্বেচ্ছসেবক দশ-পনেরো সেকেন্ড পরেই বললেন চলুন চলুন পিছনের লোককে দেখতে দিন। তাকে এক ধাক্কা দিতেই পড়ে গেল। বললাম, সেই কোচবিহার থেকে বাবাকে দেখবো বলে এসেছি। বলে হাউহাউ করে কাঁদতে লাগলাম। পেছনের লোকেরা সহানুভূতি দেখিয়ে বললেন আচ্ছা দেখুন। ক্রন্দনরত অবস্থায় সাষ্টাঙ্গ প্রণামের ভঙ্গিতে সটান শুয়ে পড়লাম। উদ্দেশ্য পালঙ্কের নিচে কত বরফের স্ল্যাব রাখা আছে তার অনুসন্ধান করা। কিন্তু বুঝতে পারলাম না। কারণ বিছানার চাদরটা পালঙ্কের পায়া পর্যন্ত টানটান করে সেলোটেপ দিয়ে আটকানো ছিল।

আরও লক্ষ্য করেছিলাম সমস্ত মেঝে জুড়ে এক ইঞ্চি পুরু করে বালি বিছানো। এবার ধীরে ধীরে উঠলাম। সেই স্বেচ্ছসেবকটি আমার জামা প্যান্টের ধূলো ঝেড়ে দিলেন। তার পর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলাম। সন্তান দলের অফিসে চিত্ত শিকদার বসে ছিলেন। ঘরে ঢুকে বললাম আসতে পারি? তিনি বললেন আসুন। প্রশ্ন করলাম দিনে বরফের স্ল্যাব কটা করে লাগছে? বালিতো বিছানো হয়েছে বরফের জল শুষে নেবার জন্য। শুনেই চিত্তবাবু কাঁদতে আরম্ভ করলেন। বললেন আই.বি থেকে এসেছেন বললেই পারতেন। বললাম বরফ আনছেন কোত্থেকে? একথা শুনে তিনি আরও কাঁদতে লাগলেন। পুলিশ বরফের সাপ্লাই লাইন এবার কেটে দেবে। বলে চলে এলাম। পরে চিত্তবাবু সাংবাদিকদের বলেন বামফ্রন্ট সরকার আই.বি পাঠিয়েছে। বাবা নির্বিকল্প সমাধিতে আছেন সেটা ওদের সহ্য হচ্ছে না। পরদিন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশান্ত শূরকে ডেকে পাঠালেন। তিন চিকিৎসকের একটি কমিটি গঠন করা হয়। তাঁদের কাজ হবে সুখচরে গিয়ে বালক ব্রহ্মচারী জীবিত কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা। আজকালের সাংবাদিক অরুন্ধুতী মুখার্জি জ্যোতি বসুকে প্রশ্ন করেন ওই ডেথ নিয়ে আপনার কিছু সন্দেহ আছে? নতুবা এমন কমিটি গঠন করলেন কেন? জ্যোতিবাবু বললেন দেখতে হবে। ওই তিন জন ডাক্তারবাবুই সাংবাদিকদের ফোন পেয়ে বলেন দেখতে যাবো না। দেখার কি আছে! হাসপাতাল তো ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েই দিয়েছে। আমাদের তো একটা এথিক্স আছে। সরকারের উচিত ছিল দ্বিতীয় দিনের মাথায় বডি বের করে দাহ করে দেওয়া। বামফ্রন্ট সরকার ৩৪ বছরে ভালো কাজ যেমন করেছিল পাশাপাশি এমন গুরুতর ভুলও করেছিল।

শেষ পর্যন্ত পঞ্চান্ন দিনের মাথায় সরকার ঠিক করে ওই রাতেই বডি বের করা হবে। মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তীকে অপারেশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাত আটটায় রচপাল সিং-এর নেতৃত্বে একটি বিরাট পুলিশ বাহিনী যুবভারতী স্টেডিয়ামে জড়ো হয়। সুভাষবাবু রচপালকে বলে দেন অপারেশন যেন স্মুথ হয়। আজকালের রিপোর্টার দুর্বার গাঙ্গুলি (এখন দৈনিক মিলেনিয়াম পোস্ট পত্রিকার সম্পাদক) যুবভারতী থেকেই রচপালকে ফলো করছিল। রাত সাড়ে দশটায় পুলিশ আশ্রমে গিয়ে গেটের কড়া নাড়ে। তারপর গেট খুলে ফেলে। ভেতরে থাকা বালকরা মজুত করে রাখা শুকনো লঙ্কার গুড়ো পুলিশের দিকে ছুঁড়তে থাকে। ওই অপারেশনটা পুলিশ ভালো ট্যাকল করে ছিল। লাঠি, টিয়ার গ্যাস, গুলি কিছুই ব্যবহার করতে হয়নি। ভক্তদের সুকৌশলে পযুর্দস্ত করে ভ্যানে তোলে। তারপর বালক ব্রহ্মচারীর মৃতদেহ বের করে পুলিশের ক্যাডাভার ভ্যানে তোলে। সেই ভ্যান যায় নিমতলা শ্মশানে। পুলিশ ওই আশ্রমে তালা মেরে দেয়।

বালক্ষ ব্রহ্মচারী কিন্তু বাবা রাম রহিম, আশারাম বাপুর মত ক্রিমিনাল নন। অনেকটা ওঙ্কারনাথ, অনুকূল ঠাকুরদের মত। মূলত জেলার নিম্নবিত্ত মানুষরাই ছিলেন এঁর ভক্ত। ১৯৮৮ সালে সিপিআইএমের তদানীন্তন রাজ্য সম্পাদক সরোজ মুখার্জি বলেছিলেন সন্তান দলের বেশিরভাগ ভক্ত তাঁদের সমর্থক। সন্তান দলের রমরমা তখন শুরু হয়। সরোজবাবুর কথা নিয়ে সে সময় বিতর্ক হয়। কিন্তু সিপিআইএম বালক ব্রহ্মচারীকে অস্পৃশ্য করে রাখত। সরকারের কিছু কিছু কর্মসূচিতে রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ, সন্তান দলের মতো প্রতিষ্ঠান গুলিকে যোগদানের ডাক দিলে ভালো হতো বই মন্দ হতো না। এব্যাপারে সুভাষ চক্রবর্তীর মতো নেতাকে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব দিলে সুখচরের আশ্রমে একটা মৃতদেহ পঞ্চান্ন দিন ধরে পড়ে থাকত না। সুভাষবাবু প্রথম রাতেই হাসপাতালে গিয়ে মৃতদেহ নিয়ে পিস হাভেনে রাখতেন। পরদিন সকালে আশ্রমে ভক্তদের দর্শনার্থে ওই দেহ ছ’ঘন্টা রাখা হত। তারপর সুভাষবাবুর অভিনব স্টাইলে হয়তো সামনে চারটে ঘোড়া, দুশো খোল-করতাল-খঞ্জনী বাদক, ম্যাটাডোর থেকে খই ও ফুল ছড়ানো, দশহাজার ভক্ত, বালক ব্রহ্মচারীর চারটে বড় কাটআউট, পায়রা ছাপ শারী পড়া দুশো মহিলার গলায় বাজত ‘রাম নারায়ণ নাম’। হয়তো এভাবেই শেষকৃত্য সম্পন্ন হত। নৈহাটির রঞ্জিত কুণ্ডু, ভাটপাড়ার নেপাল দেব, পানিহাটির গোপাল ভট্টাচার্য, লেকটাউনের জহর ঘোষাল, শ্রীভূমির সুজিত বসু ওই যাত্রা দায়িত্ব সামাল দিতেন। চিত্ত শিকদার ষোলআনা হঠকারী লোক। তাঁর জন্যই সন্তান দল উঠে গেল। আগে ওই আশ্রমে স্নো পাউডারের মত কিছু প্রসাধন সামগ্রী তৈরি ও বিক্রি হত। তাতে বহু ভক্ত উপকৃত হতেন। সন্তান দলের তেমন টাকা পয়সা ছিলনা। এমন একটি আশ্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। বালক ব্রহ্মচারীকে দাহ করার পরদিন মহাকরণে সুভাষ চক্রবর্তীকে সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিল এত মসৃণ অপারেশন করলেন কি ভাবে? উত্তরে সুভাষবাবু সেই ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন ‘মরাকে জ্যান্ত করা এবং টাকে চুল গজিয়ে দেওয়া ছাড়া সুভাষ চক্রবর্তী সব কাজ পারে’। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev