প্রাচীন রহস্যময় রত্নভান্ডারে সঞ্চিত বিপুল ঐশ্বর্য — মণি মানিক্য চুনি পান্না হীরের অজস্র গয়না, সোনারুপোর বাসন আরো কত কিছু। খুব সহজে প্রবেশ করা যায় না এই কুঠুরীতে। ইতিহাসের ফিসফিসানিতে কান পাতলেই শোনা যায় দরজার পেছনে সাপের গর্জন। অনন্তনাগ নাকি পাহারাদার এই বিপুল রত্নভান্ডারের।….. বহু জল্পনা-কল্পনার পর দীর্ঘ ৪৬ বছর পর খোলা হলো পুরীর শ্রীশ্রীজগন্নাথ মন্দিরের রত্ন ভান্ডার। মন্দিরের রত্নভান্ডার ও তার রহস্যময় উৎস নিয়ে আজকের লেখা।
প্রভু জগন্নাথদেব যে শুধু কলিঙ্গের দেবতা তা নয়, তিনি বাঙালিরও প্রাণের দেবতা। শ্রী জগন্নাথ দেবের আবির্ভাব সম্পর্কে নানান কাহিনী প্রচলিত আছে। তারমধ্যে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর কাহিনী সবচেয়ে প্রচলিত। যে কাষ্ঠখন্ড দিয়ে শ্রীজগন্নাথদেব, বলরাম ও দেবী সুভদ্রার রূপ প্রতিষ্ঠা করা হলো সেই দেবতাদের উদ্দেশ্যে মহারাজ ইন্দ্রদ্যুম্ন প্রথম অর্ঘ্য দিয়েছিলেন সুবর্ণকঙ্কন, মুকুট আর তিনটি মনিমানিক্য খচিত স্বর্ণহার যা বেদি ছাড়িয়ে মাটিতে এসে ঠেকেছিল। অতএব রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর আজানুলম্বিত রত্নহারগুলি শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের রত্নভান্ডারের প্রথম সম্পদ। তবে সবথেকে যে রাজা শ্রীক্ষেত্রকে রত্নালংকারে নিমজ্জিত করেছিলেন তিনি ছিলেন মহারাজা অনঙ্গভীমদেব। দ্বাদশ শতকে মহারাজা অনঙ্গভীমদেব প্রায় আড়াই লক্ষ মারহা স্বর্নদিয়ে ভরিয়ে দেন রত্নভান্ডার। মারহা মধ্যযুগের ওড়িশার ওজন মাপক যার অর্থ হল সাড়ে পাঁচ গ্রাম।

গজপতি কপিলেন্দ্র দেবের আমলে (দিগ্বিজয় দ্বারের মন্দিরগাত্রে লিখিত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়) প্রত্যেক তিন মাস পরপর ১৬টি হাতি করে তিনি মন্দিরে প্রাঙ্গনে এনে হাজির করতেন বিপুল পরিমাণ সোনা রুপোর গয়না, তৈজসপত্র। তখন নিয়ম ছিল, প্রথমে ভগবান জগন্নাথদেব এগুলি দর্শন করবেন, তারপর সেগুলি রত্নভান্ডারে প্রবেশ করবে।
১৯৮৩ সালের ২৩ আগস্ট মন্দিরের নাট মন্দিরের সামনে পুরীর ট্রাস্ট একটি হুন্ডি স্থাপন করেন, ভক্তরা যাতে ভগবান জগন্নাথ দেবকে সোনা ও রূপোর অর্ঘ্য প্রদান করতে পারেন। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে হুন্ডি থেকে প্রাপ্ত সোনার পরিমাণ ছিল ৯৮০.৯৯০ গ্রাম এবং রূপো ছিলো ৫০২১৭.৮৩২ গ্রাম।

লোককথা বলে রক্তভান্ডারকে পাহারা দেয় দুটি কালসর্প। ১৯০৫ সালে ভাণ্ডার খোলার ঠিক একমাস আগে যে তিন জন পান্ডা অন্দরে গেছিলেন, রহস্যজনকভাবে তারা উধাও হয়ে যায়। সিন্দুক খুলতে তাই সহজে কেউ রাজি হয়না। ১৮৮৫ সালে আর্কলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার এক ইঞ্জিনিয়ার আর দুজন সেবাইয়েত ও প্রধান কোষাধ্যক্ষ প্রবেশ করার চেষ্টা করেছিলেন তাদের কাছে চাবি ছিল রক্তভান্ডারের। তালা খোলার মুহূর্তে আচমকা শোনা যায় হিস… হিস্ শব্দ। ১৯২৬ সালে ওই ভান্ডার খোলার চেষ্টা করার পরের দিন রক্তবমি হয়ে মৃত্যু ঘটে প্রধান সেবকের। এ নিয়ে নানান মহলে নানান প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি প্রকৃত তথ্য বারংবার গোপনই থেকে গেছে?
১৯৫২ সালে পুরী জগন্নাথ টেম্পেল অ্যাক্ট চালু করা হয়। ওই আইন অনুসারে নির্দিষ্ট সময় অন্তর সম্পদ গণনা করার কথা বলা হয়। এই রত্ন ভাণ্ডার আদতে ১১.৮ মিটার উঁচু একটি মন্দির। প্রায় ২০৯ বছর আগে পুরীর তৎকালীন কলেক্টর চার্লস গ্রোম দাবি করেছিলেন রত্ন ভাণ্ডারে ময়ূরপঙ্খির আকারের মুকুট থেকে শুরু করে সুন্দর কারুকার্য করা সোনা ও রুপোর গয়না আছে, রয়েছে শতাধিক মোহর।

রত্ন ভান্ডারে দুটি কক্ষ রয়েছে। বাহার ভান্ডার এবং ভিতর ভান্ডার।
১৯৭৮ সালে শেষবারের মতো রত্নভাণ্ডারের লকার খুলে গয়নার হিসেব পাওয়া গেছিল। ৪৬ বছর আগের তথ্য অনুযায়ী, পুরীতে জগন্নাথ দেবের রত্ন ভাণ্ডারে মোট ৪৫৪টি সোনার গয়না, যার ওজন আনুমানিক ১২,৮৩৮ ভরি এবং ২৯৩টি রুপোর গহনা রয়েছে, যার ওজন ২২,১৫৩ ভরি। এরমধ্যে রত্ন ভাণ্ডারের বাইরের যে অংশ রয়েছে, তাতে রাখা আছে জগন্নাথদেবের মণি-মুক্তো জড়ানো সাজসজ্জা। ৭৯টি সোনার গহনা, ৩৯টি রুপোর গহনা আছে। সঙ্গে রয়েছে নিত্য ব্যবহারের আরও সোনাদানা। ব্রক্ষ্মজ্যোতি হিরে, বলরামের নীলা, সুভদ্রার মণিমুক্তোও রয়েছে। ভিতরের ভাণ্ডারে কী কী রয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ৩৫০-রও বেশি সোনার গয়না ও ২৩০টিরও বেশি রুপোর গহনা আছে বলে জানা যায়।

বাহার ভান্ডারে জগন্নাথ দেবের সোনার হাত (৯.৫৪ কেজি), বলভদ্র সোনার পা (৮.২৮ কেজি) এবং জগন্নাথের (৭.১ কেজি), বলভদ্রর (৫.০৬২ কেজি) এবং সুভদ্রার (৩.২০৭ কেজি) তিনটি সোনার মুকুট আছে।
কাঞ্চি রাজকন্যা পদ্মাবতীর সঙ্গে পুরীর মহারাজা পুরুষোত্তম দেবের বিবাহের পর কাঞ্চিরাজ ৫০ টি হাতিতে চাপিয়ে এনেছিলেন সোনার অলংকার ও তৈজসপত্র। সেইসব বিপুল পরিমাণ সোনার তৈজস রাখা আছে রত্নভান্ডারের অন্তরকক্ষে কিন্তু সেই কক্ষটি খোলা সম্ভব হয়নি। রক্ত ভান্ডারের অন্তরকক্ষের চাবি উধাও হয়ে যায়।

৪৬ বছর পর রবিবার ১৪ জুলাই ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১.২৮ মিনিটে রত্ন ভান্ডারের মূল দরজা খোলা হয়। সকালে রীতি মেনে রত্ন ভান্ডার খোলার আজ্ঞা নেয়া হয় ‘রত্ন ভান্ডারের অধিকারিনী’ দেবী বিমলার থেকে। অনুমতি নেয়া হয় লোকনাথ দেব থেকে যিনি রত্ন ভান্ডারের তত্ত্ববধায়ক। গুচিন্ডা মন্দিরে জগন্নাথ বলভদ্র সুভদ্রার পুজো করার পর রত্নভান্ডারের দিকে রওনা হন সকলে।
কোষাগার খোলার জন্য ১১ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল, ১১ জন সাপুরে, সাপ উদ্ধারকারী এবং ওডিশা ডিজাস্টার র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (ODRAF) এর দলগুলিকে মোতায়েন করা হয়েছিল। ভিড় ব্যবস্থাপনার জন্য র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) একটি কোম্পানিও মন্দিরে মোতায়েন করা হয়েছিল। রত্না ভান্ডারের তালার চাবিগুলি কাজ করেনি, ফলে প্রবেশের জন্য তালাটি ভাঙতে হয়েছিল।এমনকী পুরীর সরকারি হাসপাতালে বিষধর সাপের কামড়ের ইনজেশনও মজুত রাখা হয়েছিল পর্যাপ্ত পরিমাণে। রত্ন ভান্ডার খোলার পর কোন সাপের দর্শন পাওয়া যায়নি।

ওইদিন এই রত্নভাণ্ডারের বাইরের চেম্বার থেকে সব অলংকার বিশেষভাবে তৈরি ৬টি কাঠের বাক্সে ভরে নিয়ে যাওয়া হয় অস্থায়ী স্ট্রং রুমে। বাকি ভিতরের চেম্বারে ভিতরের চেম্বারের রত্ন পড়ে নিয়ে যাওয়া হবে, তারপর শুরু হবে হিসেব করা।
সরকার রত্ন ভান্ডারে মূল্যবান জিনিসপত্রের একটি ডিজিটাল ক্যাটালগ প্রস্তুত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যাতে তাদের ওজন এবং তৈরির মতো বিবরণ থাকবে। রত্নভান্ডারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মেরামত করতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অ্যাপয়েন্ট করা হয়েছে।

আদতে রত্ন ভান্ডারে কি আছে তা সঠিক গণনা পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে আমাদের মতো সাধারণ ভক্তদের ঔৎসুক্য কম নেই। আমরা তো জগন্নাথ দেবের কৃপা পেলেই ধন্য, তবু জানতে ইচ্ছা করে নীলমাধবকে প্রদান করা শবর কন্যা ললিতার সেই প্রথম নিবেদন কিংবা রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নর
আজানুলম্বিত রত্নহারগুলির দর্শন পাওয়া সম্ভব! সব ভেদাভেদের রাজনীতি ভুলে ওড়িশা একটি নতুন পরিচয়ের দিকে যাত্রা শুরু করুক এটাই আমাদের একমাত্র প্রার্থনা। জয় জগন্নাথ।।
তথ্য ঋণ : হিন্দুস্তান টাইমস, ওড়িশা গভমেন্টের নিজস্ব ওয়েবসাইট এবং অন্যান্য।
খুব ভালো লাগলো, বেশ অজানা অনেক কিছু জানলাম, জয় জগন্নাথ জী ????
ধন্যবাদ