দেবাশিস ভট্টাচার্য
বালক ব্রক্ষ্মচারীর মৃত্যুর মাস ছয়েক আগের কথা। যতদূর মনে পড়ছে ১৯৯২ সালের ১৪ অক্টোবর হবে। দিনটা ছিল শনিবার। তার চার পাঁচদিন আগে ইংরেজি স্টেটম্যান পত্রিকায় দুদিন বড় করে একটি বিজ্ঞাপন বেরিয়ে ছিল। স্টেটম্যান তখন কলকাতার এক নম্বর ইংরেজি দৈনিক ছিল। আজকের তুলনায় তখন এই পত্রিকার সার্কুলেশন অন্তত পাঁচ গুণ বেশি ছিল। ওই বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল আমেরিকা থেকে একজন গডম্যান অর্থাৎ সাহেব ‘বাবা’ আসবেন। ১৪ অক্টোবর বিকেলে পার্কসার্কাস ময়দানে তিনি শো দেখাবেন। তাঁর হাতের ছোঁয়ায় টাকে চুল গজাবে, অন্ধজন দৃষ্টি শক্তি ফিরে পাবে, বোবার মুখে কথা ফুটবে, খঞ্জরা চলৎ শক্তি ফিরে পাবেন। বোঝা গেল সাঁইবাবা, মহেশ যোগীর মত এক মার্কিন মডেল আসছেন।
সাহেব ‘বাবা’র নাম মরিস সেরুলো। নির্দিষ্ট দিনে সাংবাদিক গৌতম রায়ের সঙ্গে অ্যাসাইনমেন্টে বের হই। প্রথমে সিপিআইএম অফিস যাই। প্রতিদিন বিকেলে সব পত্রিকার রাজনৈতিক সংবাদদাতারা ওই অফিসের সামনে জড়ো হতেন। তখন ওই অফিসের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। দলের তদানীন্তন রাজ্য সম্পাদক শৈলেন দাশগুপ্ত ও রাজ্য সম্পাদকমন্ডলির সদস্য অনিল বিশ্বাস রিপোর্টারদের সঙ্গে দেখা করতেন। ওই দিনও শৈলেনবাবু কিছু মন্তব্য করে ছিলেন। সে সময় ভোটার কার্ড চালু করা একটা ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যাই হোক , আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে গেলাম পার্কসার্কাস ময়দানে। দক্ষিণ মুখো বিরাট মঞ্চ করা হয়েছিল। লেখা ছিল স্বাগতম বাবা মরিস সেরুলো। সে দিন ওখানে কয়েক হাজার প্রতিবন্ধী মানুষ দূরদূরান্ত থেকে এসে জড়ো হয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা হয়েছিল ‘বাবা’ ঘুরে ঘুরে সবার গায়ে হাত বোলাবেন তাতে তাঁদের প্রতিবন্ধকতা সেরে যাবে। মঞ্চের সামনেই দুশোরও বেশি হুইল চেয়ারে প্রতিবন্ধী মানুষজন বসেছিলেন। সন্ধ্যা ছ’টায় সংগঠকরা মরিসকে নিয়ে মঞ্চে উঠলেন। লম্বা সুদর্শন চেহারার মরিসকে দেখে মনে হয়েছিল আনুমানিক ষাট হবেন। মরিসকে দেখে সকলে জয়ধ্বনি করে উঠলেন। ইতিমধ্যে ওদের একজন কর্ডলেস মাইক্রোফোন নিয়ে স্বাগত ভাষণ দিতে শুরু করেন। সব দেখেশুনে এই প্রতিবেদক সবাইকে চমকে দিয়ে মঞ্চে উঠে যান। তারপর ওই ব্যক্তির হাতে থেকে মাউথ পিস কেড়ে নেন।
এরপর যুক্তিবাদী সমিতির প্রবীর ঘোষ এবং তিন-চার জন যুবক-যুবতী মঞ্চে উঠে এসে স্লোগান দিতে থাকে ভন্ড বাবা’র বুজরুকি চলবে না। সংগঠকদের একজন প্রবীর ঘোষকে মারে। এই প্রতিবেদক তখন তার কলার ধরে মাউথ পিসের ডান্ডি দিয়ে ওই নিগ্রহকারীকে পেটায় । সংগঠকদের আরও দু’তিনজন বাধা দিতে এগিয়ে আসে । প্রতিবেদকের হাতে তারাও মার খায়। আগত জনতার উদ্দেশ্যে বলি আপনারা অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছেন। মরিস সেরুলো মঞ্চে আছেন। তাঁকে এবার আপনাদের সামনে প্রশ্ন করবো। বিজ্ঞাপনের কথা মত তাঁর হাতের জাদুতে প্রতিবন্ধীরা সেরে উঠবেন। এবার মাউথপিস নিয়ে মরিসকে জিজ্ঞাসা করি Can you do this ? মরিস বললেন they will get the result after a few month. প্রতিবন্ধীদের মধ্যে থেকে এক ভদ্রলোককে মঞ্চে ডেকে নিলাম। বললাম He is a dumb. Touch him and heal. মরিস বললেন I can’t. তখন পকেট থেকে খবরের কাগজে প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটা বার করে বললাম Then why have you given this advertisement ? You are a fraud. তারপর জড়ো হওয়া তিন-চার হাজার মানুষকে বললাম আপনাদের বাড়ি ফিরে যেতে অনুরোধ করবো। এই কর্মসূচি বাতিল ।
এরপর পুলিশ মঞ্চে উঠে সকলকে উদ্দেশ্য করে বাড়ি ফিরে যেতে বলে। মরিসকে পুলিশ থানায় নিয়ে যায়। তখন সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটা হবে। পার্কসার্কাসের সাত মাথার মোড়ে তখনও প্রতিবন্ধী মানুষদের ভীড়। বিজ্ঞাপনটি পড়ে আত্মীয় অথবা বন্ধুদের নিয়ে তাঁরা এসেছিলেন। হতাশ হয়ে সব বাড়ি ফিরছিলেন।
আমরা দুজন অফিসে ফিরে এলাম। এসে সম্পাদককে সবটা বললাম। তিনি বললেন রাজ্য সরকার এটা Allow করল কি করে ? একটা ‘বাবা’ এসে অন্ধের চোখে হাত বোলাবে আর সে ভালো হয়ে যাবে এমন বুজরুকি মার্কা বিজ্ঞাপন দেখেও সরকার কিছুই করল না। পুলিশ বিটের রিপোর্টার অমিত মুখার্জিকে ডেকে পাঠালেন। অমিত তাঁর ঘরে এলেন। সম্পাদক বললেন পুলিশ কমিশনারকে জিজ্ঞেস করো পার্কসার্কাস ময়দানে এত বড় ঘটনা নিয়ে পুলিশের ভূমিকা কি ছিল ? অমিত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। মিনিট দশেক পরে আবার ফিরলেন। অমিত জানালেন কমিশনার বলেছেন পুলিশ ব্যাপারটায় গুরুত্ব দেয়নি। সেটা ঠিক হয়নি। পুলিশ ওই সাহেব বাবাকে ওখান থেকে বার করে হোটেলে নিয়ে যায়। সিকিউরিটি কন্ট্রোলের পুলিশ অফিসাররা পরদিন ভোরেই সাহেবকে দমদম বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে প্লেনে তুলে দেবে।
তদানীন্তন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রশান্ত শূরকে টেলিফোনে বিজ্ঞাপনের বয়ানটা পড়ে শোনাই। প্রশ্ন করি আপনি কি এগুলো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন? তিনি বললেন সব বোগাস। ফের প্রশ্ন তাহলে সরকার এত বড় অনুষ্ঠান করতে দিল কেন ? বললেন আমাকে নয় পুলিশকে জিজ্ঞাসা করুন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তরের মন্ত্রী ছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ও সুখ্যাত ইঞ্জিনিয়ার শঙ্কর সেন। তাঁকে প্রশ্ন করলাম এই জিনিস কি সম্ভব ? তিনি বললেন এসবের কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। পুলিশ কেন আগেই ব্যাবস্থা নিল না বুঝতে পারছি না? চতুর্থ বামফ্রন্ট সরকারের বয়স্ক শিক্ষা ও জনশিক্ষা প্রসার দপ্তরের মন্ত্রী অঞ্জু করকে ফোন করেছিলাম । পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের নেতা শঙ্কর চক্রবর্তীকে ফোন করে বলেছিলাম আপনারা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বলেন অথচ একজন তথাকথিত বাবা বিজ্ঞাপন দিয়ে এমন অনুষ্ঠান করলেন । সেখানে আপনাদের দেখা পাওয়া গেল না। শঙ্করবাবু বললেন সাংগঠনিক সমস্যা।
ওই রাতেই জানলাম ঘটনার তদন্ত করবেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার (২)। যতদূর মনে পড়ে পরের দিনটা ছিল রবিবার। সোমবার দুপুরে লর্ডসিনহা রোডে স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসে গেলাম। সেই ডেপুটি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে প্রশ্ন করলাম কাগজের বিজ্ঞাপনটা দেখেননি? তিনি বললেন, না। বললাম এটা তো স্পেশাল ব্রাঞ্চের কাজ। তিনি বললেন না। তারপর বললেন সেদিন যদি আপনি মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোন না ধরতেন তাহলে রাত দশটার সময় শহরে গোলমাল লেগে যেতে পারতো। যে সব প্রতিবন্ধী মানুষেরা আশা নিয়ে এসেছিলেন তাঁরা হতাশ হতেন। ওদের একাংশ বাড়ি চলেযেতেন। আরেক অংশ ক্ষোভ উগরে দিত। বললাম আপনাদের পুলিশের কোনও প্রস্তুতিই ছিলনা। সেই অফিসার বললেন আপনি তো মশাই শুধু সাংবাদিক নন, সোশ্যাল অ্যাক্টিভিস্টও বটে। ভাবছিলাম পকেটে সরকারি প্রেস কার্ড রেখে এমন কাজ করা ঠিক কিনা।

মনে পড়ছিল ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই হাভানার মনকাডা দুর্গ আক্রমন করতে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর আদালতে দেওয়া ভাষণ। সেই ভাষণের কিঞ্চিত বদল ঘটিয়ে স্বগতোক্তি করলাম । If resistance to promotion of superstition is a crime, then I am a criminal. But I know history will absolve me. ওই অফিস থেকে বেরিয়ে নিজের কর্মস্থলে এলাম। আজকাল পত্রিকা তখন পরিবেশ দূষণ, তথাকথিত ভন্ড বাবাদের বুজরুকির বিরুদ্ধে খবর ও জনমত গঠনে লেখা নিয়মিত প্রকাশ করতো। যুক্তিবাদি মন গড়ে তুলতে চেষ্টা করতো। এর ফলে সে সময় আজকালের সার্কুলেশন খুব বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রচার সংখ্যায় দ্বিতীয় থাকলেও প্রভাবে একনম্বর ছিল। সম্পাদকের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতাম সেকেন্ড থেকে ক্লোজ টু ফার্স্ট, তারপর ফার্স্ট হতে হবে।