দেবাশিস ভট্টাচার্য
প্রথম পর্বের লেখা সম্পর্কে ইন্ডিয়ান ওভারসিস ব্যাঙ্কের কর্মী অনুষ্টুপ মুখার্জি জানিয়েছেন মৃত্যু কালে সত্যজিৎ রায়ের বয়স হয়েছিল ৭১। ৭২ নয়। স্বপনের বয়স তখন ২৪-২৫ নয়, ৩০ ছিল। তাঁর প্রশ্ন আমর্হারস্ট্রিটের কংগ্রেস নেতাটি কে ? উত্তরঃ সোমেন মিত্র।
তৃতীয় পর্বের লেখা নিয়ে আজকালের প্রাক্তন ব্যুরো চিফ তথা বিশিষ্ট সাংবাদিক বিশ্বজিৎ সিংহ জানতে চেয়েছেন যে শ্রীধরের সমর্থক আইনজীবী ও সিপিআইএমের দুই এল.সি.এমের নাম কি ?
উত্তরঃ ওই দুজনের নাম রাণা ও বাবলু। আইনজীবী হলেন অসিত গাঙ্গুলী। অসিতবাবু ছিলেন এক বর্ণময় চরিত্র। জঙ্গি বামপন্থা পছন্দ করতেন। ১৯৫০ দশক থেকে বহু বছর ধরে তিনি আলিপুর আদালতে ওকালতি করেছেন। অবিভক্ত চব্বিশ পরগনায় চাষিদের বিরুদ্ধে জমিদারদের দায়ের করা মিথ্যা মামলায় তিনি চাষিদের হয়ে বিনাপয়সায় লড়তেন। ১৯৭০ দশকে বহু রাজনৈতিক বন্দির মামলা সম্পূর্ণ নিখরচায় লড়তেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল সিপিআইএম ও নকশালপন্থীদের মাঝামাঝি। তাঁকে দুই দলেরই বড় নেতারা চিনতেন। অসিতবাবুকে লেখা সাংসদ জ্যোতির্ময় বসুর চিঠির পত্রবাহক ছিলেন এই প্রতিবেদক। ১৯৭০ সালে সাড়া জাগানো মামলায় তিনি বিপ্লবী অনন্ত সিং এর হয়ে লড়েছিলেন বিনাপয়সায়। ১৯৭৭ সালের ২১ জুন জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় আসে। সেই সরকারের আইন ও বিচার বিভাগীয় মন্ত্রী ছিলেন হাসিম আব্দুল হালিম। তিনি অসিতবাবুকে চব্বিশ পরগনা জেলার পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত করেন। খুব গুরুত্বপূর্ণ পদ। চল্লিশেরও বেশি থানার পুলিশের মামলার তিনি তদারকি দায়িত্ব পান। কিন্তু অসিতবাবু মন্ত্রীকে বলেন এত বছর ধরে অনন্ত সিং এর ডিফেন্সে লড়ার পর এখন প্রসিকিউসান সাইডে যেতে পারবো না। বামফ্রন্ট সরকার শপথ নিয়েই প্রথম সিদ্ধান্ত নেয় সব রাজনৈতিক বন্দীদের বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু অনন্ত সিং-এর নেতৃত্বাধীন গ্রুপের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রত্যাহারে রাজি হচ্ছিলেন না। তখন এ’নিয়ে খুব জলঘোলা হয়। অবশেষে তিনি সম্মত হন। অনন্ত সিং মুক্তি পান। মুক্তির পরেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেন সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকার সম্পাদক শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। কিছুদিন পরেই ওই সাপ্তাহিকে ধারাবাহিক ভাবে অনন্ত সিং-এর লেখা প্রকাশিত হয়। লেখার শিরোনাম ‘কেউ বলে বিপ্লবী কেউ বলে ডাকাত’। পরে এটি বই আকারে বেরিয়েছিল।
ফিরে আসি আগের কথায়। অসিতবাবু পি.পি হতে অসম্মত হওয়ায় আইনমন্ত্রী তাঁকে বলেন আপনি পি.পি থাকুন, একমাত্র অনন্ত সিং-এর মামলায় আপনি যাতে ডিফেন্সে লড়তে পারেন সে জন্য বিশেষ অনুমতি দেওয়া হবে। অসিতবাবু বলেন সেটা করলে বামফ্রন্ট সরকারের বদনাম হবে। অবশেষে অনন্ত সিং-এর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় এই সমস্যার সমাধান হয়। তদানীন্তন সেচমন্ত্রী প্রভাস রায়ের কথায় অসিতবাবু কাজে যোগ দেন। এর কিছুদিন পর বিধানসভায় কংগ্রেস সদস্য জয়নাল আবেদিন প্রশ্ন তোলেন আইনের ডিগ্রি না থাকা একজন মোক্তার অসিত গাঙ্গুলীকে পি.পি করা হল কেন? আইনমন্ত্রী উত্তর দিয়েছিলেন ১৯৬১ সালের অ্যাডভোকেট অ্যাক্ট অনুযায়ী মোক্তাররাও অ্যাডভোকেট হতে পারেন। বামপন্থীদের কাছে ডিগ্রিই একমাত্র বিবেচ্য নয়। সততা, আদর্শবোধ, নিষ্ঠা ও যোগ্যতাও দেখা হয়। এমন মানুষ ছিলেন আইনজীবী অসিত গাঙ্গুলী। এই প্রতিবেদক তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও স্নেহের পাত্র ছিলেন। তিনটি ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে মতভেদ হয়েছিল।
১) ১৯৮৩ সালের ৩০ জানুয়ারি গড়িয়াহাট মোড়ের কাছে এক বাড়িতে গৃহবধূ দেবযানী বণিক খুন হয়। ১৯৭৬ সালে গৃহবধূ সুরূপা গুহ হত্যার সময় বাংলা যেমন উত্তাল হয়েছিল দেবযানী হত্যার ঘটনাতেও তেমন হয়। শ্বশুরবাড়ির লোকেদের শাস্তির দাবিতে সব মহিলা সংগঠন পথে নামে। তখন পুলিশ কমিশনার ছিলেন নিরুপম সোম। তিনি বলেছিলেন অপরাধীরা শাস্তি পাবেই। হ্যাঁ অপরাধীদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। অসিতবাবু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেবযানীর শ্বশুরবাড়ির হয়ে আদালতে লড়েন। সেটা মানতে পারিনি।
২) ২০০০ সালের ৬ নভেম্বর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মুখ্যমন্ত্রী হন। তারপরেই সিপিআইএমের কয়েকটি জোনাল কমিটির সেক্রেটারি ও নেতাকে পুলিশ ক্রিমিনাল বলে গ্রেফতার করে। জলপাইগুড়ির তারকেশ্বর লোহার, শিলিগুড়ির বি.ডি. সিং, নদীয়ার ধানতলার সুবল বাগচি, বালির বিশ্বজিৎ বসু, দমদমের দুলাল ব্যানার্জি প্রমুখ। দুলাল ব্যানার্জির পক্ষে রাজদেও গোয়ালার মতো দলের কিছু নেতা দুলালের গ্রেফতারির প্রতিবাদ করেন। অসিতবাবু সে সময়ে একদিন এই প্রতিবেদককে ডেকে পাঠিয়ে দলের সিঁথি লোকাল কমিটির সম্পাদক কিরণ রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন দুলালের মতো মিলিট্যান্ট নেতাদের গ্রেফতার করিয়ে বুদ্ধ পার্টিটাকে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বললাম আকাশ বাংলা টিভি চ্যানেলে এজন্য বুদ্ধদেববাবুকে জোরালো সমর্থন করেছি। দমদমের জোড়া খুনের মামলায় দুলালের পক্ষ নিয়ে ভুল করছেন।
৩) শ্রীধরকে সমর্থন করা।
এবার ফিরে আসা যাক তৃতীয় পর্বের শেষ লাইনটায়। যেখানে বলা হয়েছিল শ্রীধরের গ্রেফতারের কথা। সান্ধ্য আজকাল পত্রিকায় সেই খবর প্রথম পাতায় বড় করে বেরিয়েছিল। তার মাস দুয়েক পরে একদিন তিনটি ছেলে এসে হাজির হল। একজন প্রনাম করে বললো আমি শ্রীধর। গতকাল জামিন পেয়েছি। সান্ধ্য আজকালে খবরটা ছাপিয়ে দেওয়ার জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। ব্যাপারটা ভুলে গিয়েছিলাম। সে ওই কথা বলার পর অনুসন্ধানে নামি। জানতে পারি সৌগত রায় বিধানসভায় শ্রীধর নিয়ে বলার পরেই ওর সারেন্ডারের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সারেন্ডারের পরে পুলিশ যাতে গুলি করে মারতে না পারে সে জন্য শ্রীধর ধৃত বলে কাগজে ছাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছকেছিল ওরা। (চলবে)