পুরুলিয়ার ‘পশ্চিমবঙ্গ খেড়িয়া শবর কল্যাণ সমিতি’র আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়ে সাহিত্যিক মহাশ্বেতাদেবী হয়ে উঠেছিলেন ‘শবর জননী’। স্বপ্ন দেখতেন শবররা একদিন সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসবে। আজ সেই দিন এসে গেছে। লোধা-শবরদের মধ্যে প্রথম মহিলা হিসেবে স্নাতক হয়েছিলেন চুনী কোটাল। তার কয়েক দশক পরে খেড়িয়া শবরদের মহিলাদের মধ্যে প্রথম স্নাতক হলেন রমনিতা। রমনিতা বরাবাজার লাগোয়া ঝাড়খণ্ডের পটমদা ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী ছিলেন। সম্প্রতি ফল প্রকাশ হয়েছে। রমনিতা ইতিহাসে অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছেন।

শবররা ধীরে ধীরে মূল স্রোতে ফিরছেন। স্কুল-কলেজেও যাচ্ছেন অনেকে। তবে সার্বিক ভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁদের সংখ্যা শতাংশে আসে না। রমনিতের মায়ের নাম বেহুলা বাবা মহাদেব। মহাদেব শবর স্কুলের গন্ডি পার করলেও আর্থিক অভাবে আর পড়াশোনা করে উঠতে পারেন নি। বেহুলাদেবী বলেন, ‘‘চান্ডিলের চৌকা গ্রামে থেকে সেখানকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সহায়তায় রমনিতা প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছে। পুরুলিয়ার কস্তুরবা হিন্দি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছে হস্টেলে থেকে। এক আত্মীয়ের বাড়িতে থাকা-খাওয়ার সুবিধা থাকায় পটমদার কলেজে মেয়েকে পড়াই। মেয়ে আমাদের মুখ রেখেছে।

ফুলঝোরের ৩৫ ঘর শবরদের মধ্যে অনেকে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের মধ্যে পটমদা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া বসুমতী শবর ও শকুন্তলা শবর যেমন আছেন সেই রকমই আরেকজন নিরমা শবর। আরেক শবর পরিবার থেকে উত্থানের উদাহরণ। আমাদের গর্ব। এই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। বরাবাজারের প্রত্যন্ত গ্রাম বাগাল বাঁধের বাসিন্দা। বাবা সাধারণ কৃষি শ্রমিক, দৈনন্দিন সংগ্রাম নিত্যসঙ্গী। সব অতিক্রম করে নিরমা এগিয়ে চলেছে তার লক্ষ্যের দিকে। আমরা তার সঙ্গে রয়েছি। আমাদের অনুরোধে বরাবাজারের দুজন শিক্ষক তাঁকে নিয়মিত পড়ান বিনা পারিশ্রমিকে। ওকে বই দিয়ে সাহায্য করেছেন বরাভূম স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাশয়।

সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় নিরমা জেলার মুখ উজ্জ্বল করুক সর্বোপরি নিজের লক্ষ্যপুরণ করুক এই আমাদের একমাত্র কাম্য। রইলো অজস্র শুভ কামনা নিরমার জন্য, একটাই দাবি চাওয়া, ও যেন নিজের লক্ষ্য থেকে বিভ্রান্ত না হয়। নিরমার ভাই ও এইবারের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী, তাকে নিয়েও অনেক আশা আমাদের, তার সঙ্গেও যথাসাধ্য আছি আমরা। বরাবাজার থানার পক্ষ থেকে আমরা ৯টি স্কুল চালাই, সেখানে যারা পড়ে তারা প্রায় সকলেই শবর পরিবারগুলির প্রথম প্রজন্মের শিক্ষার্থী। তাদের কাছে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠুক রমনীতা, নিরমা। তারা পথ চলুক এই রকম উদাহরণকে সামনে রেখে। আরো অনেক রমনীতা, নিরমা উঠে আসবে এদের মধ্যে থেকেই।

সত্যি রমনীতা শবর নামটা আজ থেকে ইতিহাসের শরিক হয়ে থাকলো। খেরিয়া শবর সম্প্রদায়ের প্রথম মহিলা স্নাতক। পটমদা ডিগ্রি কলেজ থেকে ৭৬ শতাংশ নম্বর পেয়ে ইতিহাসে স্নাতক হলেন, কলেজেও প্রথম হয়েছেন রমনীতা। একটা সময় পর্যন্ত পুরুলিয়া জেলা ঠিক কতটা পিছিয়ে পড়া ছিল, তা সকলেরই জানা, বর্তমান চিত্রটা অনেকটাই অন্যরকম। রাজ্য সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ফলে উপকৃত হয়েছে গোটা জেলা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা সবক্ষেত্রেই পরিবর্তন চোখে পড়ার মত। আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন রমনীতার জন্য। পাশাপাশি কামনা করি, আরো অনেকটা যেন দৌড়তে পারে আমাদের গর্ব রমনীতা শবর…. আজকের এই সাফল্য যাতে ওর চলার গতি না রূদ্ধ করে দেয়, ওর আলোতে আলোকিত হোক ভবিষ্যতের অনেক রমনীতা।
লেখক : পুরুলিয়ার বরাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার
এ ভাবেই এগিয়ে চলুক আরো আগে আর সাথী থাকুক সবার প্রচেষ্টা।