বাংলার একেক জেলায় একেকরকম পুতুল। জেলা থেকে জেলায় যেতে যেতে বদলে যায় পুতুলের চেহারা ও চরিত্র। এমনকি বদলে যায় তা তৈরির উপকরণ। মাটি, কাঠ, পাতা, ঘাস, বাঁশ, বেত, ধাতু দিয়ে তৈরি এসব পুতুল শিশুদের খেলনার গণ্ডি ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে প্রতিটি জেলার শিল্প ও সংস্কৃতির এক নিজস্ব পরিচয়। তা শুধু নিছক শিশুদের খেলনাতেই আটকে নেই, হয়ে উঠেছে রীতিমত ঘর সাজানোর জিনিস। দেশে, বিদেশে তার কদর বাড়ছে। কিন্তু এই ঘটনা যখন ঘটছে ঠিক তখনই অভাব, অবহেলা, অনাদরে জেলায় জেলায় এই শিল্পের কারিগররা তাদের পুরনো পেশা ছাড়ছেন, পেট চালানোর জন্য যুক্ত হচ্ছেন কোন সাধারণ জীবিকায়। দারিদ্র তাদের নিঃশব্দে অন্য পেশায় সরিয়ে দিচ্ছে।

হাওড়ার রাণী পুতুল, মজিলপুরের বাবু পুতুল, পুরুলিয়া — বাঁকুড়ার রেল পুতুল, পূর্ব মেদিনীপুরের বেণী পুতুল, পশ্চিম মেদিনীপুরের যো পুতুল, পটাশপুরের গালার পুতুল, বিষ্ণুপুরের হিঙ্গুল পুতুল, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল — কেউই সুখে নেই। গুটিকয় বৃদ্ধ কারিগর বা পুতুল শিল্পী ছাড়া বাংলার এই অনুপম শিল্পকলাটি নিয়ে শোকগাথা লেখার মত নেই কেউ। মাঝেমধ্যে কোন বিশিষ্ট মানুষ বা বিদেশী বিশেষজ্ঞদের কোন মন্তব্যের সূত্রে এসব পুতুল নিয়ে বিদ্বজনেরা দু-চার কথা বলেন, বাংলার পুতুলের শিল্পসৌকর্যের প্রশংসা করেন দেশের প্রধানমন্ত্রীর মত কোন বিশিষ্ট ব্যাক্তিত্ব। তারপর সবকিছু আবার চুপচাপ। শিল্প ও শিল্পীদের দুর্দশা তাতে ঘোচেনা।

কয়েক বছর আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পটাশপুরের গালার পুতুলের উৎকর্ষে চমকিত হয়েছিলেন। সত্যিই এ পুতুল দেখলে চোখ ফেরানো যায়না। বিমূর্ত অবয়ব, রঙের ঔজ্বল্য, সূক্ষ্ম কারুকাজে তা মানুষকে কাছে টেনে নেয়। অথচ এই পুতুল শিল্পীরা এখন বানান শুধুই শাঁখা! গালার পুতুল বানাতে সময় ও মেহনতও কম নয়। কাজেই শুধু প্রশংশায় শিল্পীদের পেট ভরেনা। বাংলার পুতুল শিল্পের বিপণন ও প্রসারের জন্য কোন সংহত প্রয়াস ও প্রচার নেই। তাই শিল্পীদের পরবর্তী প্রজন্মের কেউই এই কাজে আসেননি। দু একজন বৃদ্ধ শিল্পী প্রয়াত হওয়ার পর পুতুলের এই ঘরানাটি হয়তো লুপ্ত হয়ে যাবে।

একই অবস্থা ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী দক্ষিণ ২৪ পরগণার মজিলপুরের বাবু পুতুল, আহ্লাদী পুতুল এবং দক্ষিণ রায়, মানিকপীর, বনবিবির পুতুল যারা তৈরি করেন সেই শিল্পীদের। শম্ভুনাথ দাসের পর এই ঘরানায় নতুন কোন প্রতিশ্রুতিবান শিল্পী উঠে আসেননি। কারণ এ কাজে এখন কোন অর্থ নেই। তালপাতার সেপাই বাংলার এক আশ্চর্য খেলনা। সামান্য এই খেলনা ঢুকে পড়েছে আমাদের বাকধারায়। উপহাস করতে গিয়ে আমরা বলি, তালপাতার সেপাই। উপমাটি থেকে গেছে, পুতুলটি উধাও। এখন গোটা বাংলায় হাতেগোনা কয়েকজন শিল্পী এই খেলনাটি তৈরি করেন।

বাংলার পুতুল কি তবে শুধু টিঁকে থাকবে ‘পুতুল পুতুল গড়ন’, ‘পুতুলের মত দাঁড়িয়ে আছে’, ‘পুতুল সরকার’ এর মত উপমায়! সময়ের প্রলয় ঝড়ে সত্যিই কি ভেঙে গেল খেলার পুতুল?