সুভাষচন্দ্র ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এমন একটা প্রচার গত কয়েকবছর ধরে চলছে। কাউকেই এর আগে এমন কথা বলতে শোনা যায়নি! এখন একটা মহল থেকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা চলছে জওহরলাল নয়, প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সুভাষচন্দ্রকেই বুঝতে হবে। সুভাষচন্দ্র প্রবাসে আজাদ হিন্দ সরকার গঠন করেছিলেন। বৃটিশ শাসনে অস্থায়ী স্বাধীন সরকার দেশের ভিতরে ও বাইরে অনেকগুলো গঠিত হয়। এটাই মুক্তিকামী মানুষের লড়াই এর ঐতিহ্য। আমরাও এই ঐতিহ্যের শরিক। কে প্রথম, কে দ্বিতীয় এসব প্রশ্ন আদতে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিমুখ বদলে দেওয়ার অভিসন্ধি মাত্র।
১৯১৫ সালের ১ ডিসেম্বর কাবুলে রাজা মহেন্দ্রপ্রতাপ প্রবাসে ভারতের প্রথম অস্থায়ী জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি এই সরকারের রাষ্ট্রপতি ও অধ্যাপক বরকতুল্লা হন প্রধানমন্ত্রী। কাবুল ছিল এই অস্থায়ী সরকারের প্রধান কর্মকেন্দ্র।
১৯৪৩ সালের ২১ অক্টোবর সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন। সাতটি দেশ এই সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন।
১৯৪২ সালে মেদিনীপুরের তমলুকে সতীশ সামন্ত কে রাষ্ট্রপতি করে সুশীল ধারা ও অজয় মুখার্জির নেতৃত্বে গঠিত হয় স্বাধীন জাতীয় সরকার। প্রায় দু-বছর এই সরকার বৃটিশ শাসন মুক্ত স্বাধীন সরকারের মত কাজ চালায়।
এই একই সময় উড়িষ্যার ঢেনকানল দেশীয় রাজ্যের প্রজারা বৈষ্ণব পট্টনায়কের নেতৃত্বে ‘জনগণের স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে। বৈষ্ণব পট্টনায়ক হন এই সরকারের সর্বাধিনায়ক।
আগস্ট বিপ্লবের অভিঘাতে যুক্তপ্রদেশের বালিয়া জেলায় চিত্তু পান্ডের নেতৃত্বে একইরকম জাতীয় সরকার গঠিত হয়। প্রায় নয়দিন পর্যন্ত সমগ্র জেলা জনগণের শাসনাধীন ছিল এবং তারা সুখেই ছিল।

যারা এধরণের প্রচার করছেন তারা কী প্রকৃতই কাউকে শ্রদ্ধা করছেন নাকি বিশেষ কোন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য একটা এজেন্ডা সামনে আনছেন! এই অস্থায়ী সরকারগুলি নানা কারনে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়। অদম্য সাহস ও আত্মবলিদান ছিল স্বাধীনতা সেনানীদের সম্পদ। ওঁরা জাতীয় বীর, আমাদের প্রনম্য। একটি স্বাধীন জাতীয় সরকারের যা যা কাজ তা এঁরা করে উঠতে পারেননি। বিদেশী শক্তির প্রবল আক্রমন, দেশবাসীর একাংশের ভ্রান্তিকর বিরোধিতা, এবং এমন অনেক কিছু ছিল তাঁদের সামনে প্রতিবন্ধক।
সকলের ক্ষমতায়ণ চেয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র। ভারতীয় ঐক্যে প্রবল বিশ্বাসী ছিলেন, সঙ্গে সঙ্গে ভারতবর্ষের ধর্ম ও ভাষার বহুমাত্রিকতা তিনি বুঝতেন। তিনি লেজেন্ড কিনা তা নিয়ে তর্ক চলুক, কিন্তু তাঁর লিগাসি অনেক বেশী তাৎপর্যপূর্ণ। ইন্ডিয়ান স্ট্রাগল গ্রন্থে তিনি লেখেন, “এই পার্থিব জগতে, সবকিছুই বিলুপ্ত হয়, বিলুপ্ত হবেও; কিন্তু চিন্তা, আদর্শ এবং স্বপ্ন অমলিন থাকবে”। কেবল সংগ্রাম নয়, মানুষের আচার ব্যবহারে ভালবাসাই শেষ কথা। এই ছিল তাঁর রাজনৈতিক এজেন্ডা। দেশমাতৃকার জন্য জীবনপন কোন উপলক্ষ নয়, এ এক অন্তহীন পথ-যাত্রা। যৌবনে তিনি নিজেকে বলতেন একজন বামপন্থী ও সমাজতন্ত্রী। তাঁর মনের অন্দরে কোন ফ্যাসিস্ট লুকিয়ে ছিলনা। এক জাতপাত মুক্ত, সমানাধিকারভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ভারত নির্মাণের লক্ষ্যেই ছিল তাঁর পথ চলা।
তিনি ‘দেশপ্রেমিক’ কত ছটাক তার জন্য দেশপ্রম দিবস, তাঁর হিম্মত কতটা তা বোঝানোর জন্য ‘পরাক্রম’ দিবস, আবার দেশের জন্য তাঁর অবদান স্মরণে ‘দেশনায়ক’ দিবস উদযাপনের এত তোড়জোড়! এসব অভিধা ছাড়াই তিনি দেশনায়ক।
His Majesty’s Opponent ছিলেন তিনি। যে কোন শোষন, অত্যাচার, জণ বিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন এক সরব প্রতিবাদী। এক কথায় — ক্ষমতার বিরুদ্ধে এক মূর্ত বিদ্রোহ। এর চেয়ে বড় পরিচয় সুভাষ চন্দ্রের প্রয়োজন নেই।
ইতিহাসের বিকৃতি এবং ইতিহাসকে সঙ্কীর্ণ স্বার্থে কাজে লাগানোর উপায়, উপকরণ বেশ পুরনো। আমরা জানি। মনে রাখতে হবে পিগমিরা ইতিহাস বদলে দিতে পারেনা। এর গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা অতীতে করেছেন কেউ কেউ! তাতে কী হয়েছে! সেই ‘তারা’ আজ সবচেয়ে ঘৃনিত, পরিত্যক্ত আবর্জনা মাত্র।