রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ। প্রতিভাশালী তিনি। নানা সৃষ্টিকর্মে তাঁর প্রতিভার বিচ্ছুরণ। কিন্তু এই কথা মনে রেখে তাঁর বই না পড়ে, তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয় না করে রবীন্দ্রনাথকে পুজো করাকে আমি রবীন্দ্র-সংস্কার বলি। কোন কিছু সম্বন্ধে অন্ধভক্তি এবং বিনা বাক্যব্যয়ে তা মেনে নেওয়াই সংস্কার। আমাদের দেশে রবীন্দ্রনাথও এ রকম সংস্কারে পরিণত হয়েছেন, এটাই তাঁর দুর্দৈব। তার মানে রবীন্দ্র-সংস্কারই রবীন্দ্রনাথের বড় শত্রু হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমাদের পাড়ার এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে আমি আলোচনা করছিলাম পিতামহ দ্বারকানাথের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অবিচারের কথা। আমার পাশে ছিলেন এক ডাক্তারবাবু। তিনি মানুষটি ভালো, চিকিৎসক হিসেবেও জনপ্রিয়। আমার বলার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বিনীতভাবে বললেন, ‘না, না, এসব বলা ঠিক নয়। রবীন্দ্রনাথ আমাদের পিতার মতো, তাঁর সমালোচনা করা ঠিক নয়। ‘আমার অপরাধের জন্য তিনি যেন দর্শক-শ্রোতার কাছে ক্ষমা-প্রার্থনা করে নিলেন। অথচ আমি জানি, স্কুল-কলেজের পাঠ্য তালিকায় রবীন্দ্রনাথের যে লেখা ছিল, তার বাইরে তিনি আর কিছু পড়েন নি। আমি তাঁর কথার প্রতিবাদ করি নি। কারণ প্রতিবাদ করলেও কোন পরিবর্তন হত না। সংস্কারের অসীম শক্তি। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর।
আমার পরিচিতা এক বয়স্কা গৃহবধূ রবীন্দ্রনাথের নাম শুনলেই বিগলিতা হয়ে পড়েন। একদিন তিনি বললেন, ‘আমাদের রবীন্দ্রনাথ ছাড়া চলে না। তিনি আমাদের অস্থি-মজ্জায়। ‘তাঁর রবীন্দ্রচর্চার খবর আমি জানি। ভোরবেলায় উঠে পড়ে তিনি টিভি চালিয়ে দেন ; ঝিমোতে ঝিমোতে রবীন্দ্রসংগীত শোনেন।
যে ডাক্তার ও যে গৃহবধূর কথা বললাম, তাঁরা নিয়মের ব্যতিক্রম নন, বরং নিয়ম। বেশিরভাগ মানুষ মেনে নিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ বিরাট মানুষ, নোবেল পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, এত লেখা সামান্য মানুষ লিখতে পারে না…। মেনে নিলে আর কোন কথা থাকে না। তখন আর কিছু পড়া বা জানার দরকার নেই, ভাবার দরকার নেই, খোঁজার প্রয়োজন নেই, একের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার দরকার নেই, ক্রস রেফারেন্সের প্রয়োজন নেই। রবীন্দ্রনাথের দুর্ভাগ্য, যে আচার-প্রথা-সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি এত সতর্ক করে গেলেন, সেই সংস্কারের ফাঁদে পড়লেন নিজে। দেশময় গড়ে উঠল বিচিত্র রবীন্দ্র-সংস্কার।
আমার কথায় তর্ক উঠতে পারে। প্রতিপক্ষ বলতে পারেন, রবীন্দ্রনাথের লেখা বই এত বিক্রি হচ্ছে, বিক্রি হচ্ছে তাঁর সম্বন্ধে লেখা বিচিত্র বই গাদা গাদা। কিন্তু সে সব বই পড়ছে কতজন? রবীন্দ্রনাথের বই সাজানো থেকে শোকেসে, স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে। আর রবীন্দ্রনাথের ওপর বই পড়ে মূলত শিক্ষক-অধ্যাপক, ছাত্র-ছাত্রীরা ; জীবিকা ও পরীক্ষা পাশের তাগিদে। পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে ওঠা নাচ-গানের স্কুলে রবীন্দ্রনাথের গান ও নাচের চর্চা হচ্ছে বলে মনে হয়, কিন্তু সেসব কানের ভিতর দিয়া মরমে প্রবেশ করে না। পাড়ায় পাড়ায় পঁচিশে বৈশাখ পালন করার ধুম চলে, কিন্তু কতজনকে প্রাণিত করতে পারেন রবীন্দ্রনাথ?
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন তাঁর দেশ সেই রকম হোক — জ্ঞান যেখানে মুক্ত, উচ্চ যেথা শির। কিন্তু কোন দেশে বাস করি আমরা? যে দেশে ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হয়’। কে সেই কর্তা? সেই কর্তা কখনও গুরু, কখনও পুরোহিত, কখনও মোল্লা-মৌলবি, আর কখনও রাজনৈতিক নেতা। আমরা আধুনিক হয়েছি কিন্তু অন্তর হতে বিদ্বেষ-বিষ নাশ করতে পারি নি। মহামানবের সাগরতীর ভারতে এখন জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায় ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়।
রবীন্দ্র-সংস্কারই কি টেগোর ম্যানিয়া?
কথাটা কেন উঠল বলি। সম্প্রতি কানাডার সাইমন ফ্রেজার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তাজ হাসমির একটি প্রবন্ধ নজরে পড়ল আমার। নাম “The Tagore Mania ; Identity Crisis and Anti-Bangladesh Syndrome’ . রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এত বছর পরেও ‘রবীন্দ্রনাথ — শুধু রবীন্দ্রনাথ’— এই ভাবটিকে লেখক ম্যানিয়া বলতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন শেক্সপীয়ার, বায়রন, কীটস, শেলি, হুইটম্যান, টেনিশন, বার্নাড শ’ এাঁদের নিয়ে তো এ রকম ম্যানিয়া তৈরি হয় নি। পূর্ব বাংলা বা বাংলাদেশে রবীন্দ্র-ম্যানিয়া সৃষ্টি করার জন্য লেখক দায়ী করেছেন আয়ুব খান, তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দিন ও রাজ্যপাল মোনেম খানকে। ১৯৬৭ সালে বোকার মতো রবীন্দ্র সংগীতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই তাঁরা রবীন্দ্রনাথকে ‘হিরো’ করেছেন, সাহায্য করেছেন রবীন্দ্র-ম্যানিয়া সৃষ্টি করতে।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক