২৫ বৈশাখ ১৪৩০— বাংলার হাজারো সংস্কৃতিবান মানুষ, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করলেন। বাঙালির কাছে রবীন্দ্রজয়ন্তীর এই দিনটি একটু বিশেষ বইকি! তিনি যে আমাদের গুরুদেব। প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তো রয়েইছে, পাশাপাশি গান, নাচ, আবৃত্তির স্কুল-সহ বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক সংস্থা, ক্লাব, সরকারি-বেসরকারি অফিস— সর্বত্রই তিনি পূজিত। হ্যাঁ, তাঁকে আমরা সেরকম আসনেই বসিয়ে রেখেছি, যাঁকে পুজো করা যায়! যদিও এতে রবীন্দ্র সাহিত্যপ্রীতি কতটা বেড়েছে বা আগামীদিনে কতটা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে সেটা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। যাইহোক, এই প্রতিবেদনে সেই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত চর্চার অবকাশ নেই। তাই মূল বিষয়ে প্রবেশ করা যাক।

নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে ২৫ বৈশাখ ১৪৩০ দিনটি বিশেষভাবে পালিত হল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা-স্মরণ করার ক্ষেত্রে কৃষ্ণনগর সমগ্র বাংলার চাইতে ব্যতিক্রম নয়। বরং জেলার অন্যান্য জায়গার থেকে এখানে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ একটু বেশিই। ফি-বছর ২৫ বৈশাখে কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করে কৃষ্ণনগরে একাধিক অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। বিভিন্ন সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কবিগুরুকে স্মরণ করে। পৌর প্রশাসন, রাজনৈতিক দলগুলিও স্ব-স্ব ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করে। রাজ্য সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর কৃষ্ণনগরের রবীন্দ্রভবনে প্রতিবছর সকাল থেকে কবিপ্রণাম জানাতে বিশাল আয়োজন করে। এবছর অর্থাৎ ২৫ বৈশাখ ১৪৩০ (মঙ্গলবার) ছিল রবি ঠাকুরের ১৬৩ তম জন্মোৎসব। উল্লেখ্য, এবার যেন পূর্বের চাইতেও মহাসমারোহে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালিত হল। সকাল থেকে অনুষ্ঠান শুরু হল, তারপর দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত পর্যন্ত চলল সেইসব কর্মকাণ্ড। শ্রোতা-দর্শকেরা ভিড় করে দেখল সেইসব অনুষ্ঠান। যত দিন যাচ্ছে আয়োজনের বাহার যেন ততই বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হল— এতে আমাদের মূল্যবোধ কতটা জাগ্রত হচ্ছে? এহেন রবীন্দ্রচর্চা কী আমাদের রবীন্দ্রপ্রীতি বর্ধনে সক্ষম হচ্ছে? এই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর অনুসন্ধান নেহাতই কঠিন কাজ বলেই আমার মনে হয়।

আসলে আমরা নিজেদের ঐতিহ্যের প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল নই। আরেকটু পরিষ্কার করে বিষয়টি বলি তাহলে। রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য একটি ঐতিহাসিক ভবন আমাদের কৃষ্ণনগর শহরে কালের নীরব সাক্ষী হিসেবে এখনো দণ্ডায়মান। ভবনটি ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৮ সালে হেরিটেজ বিল্ডিং-এর স্বীকৃতি অর্জনও করেছে। কিন্তু সুদীর্ঘকাল রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংস্কারের অভাবে বর্তমানে রবীন্দ্র স্মৃতিধন্য এই ঐতিহাসিক ভবনটি বিলুপ্তির পথে। ভবনটির নাম— ‘রানিকুঠি’। ইতিহাস সচেতন নাগরিকদের একাংশ যেমন এই ভবনটির ইতিহাস সম্পর্কে অবহিত, অপরদিকে বর্তমান প্রজন্মের বৃহদাংশ রানিকুঠি সম্পর্কে সম্ভবত কিছুই জানে না।

কৃষ্ণনগরের বুকে রানিকুঠিকে এখনো যে দণ্ডায়মান দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সেটাও কিন্তু আশ্চর্যজনক। এমনটা নাও হতে পারত। কয়েক বছর আগে রানিকুঠিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার একটা বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিরোধ এবং কিছু সংস্কৃতিবান কৃষ্ণনাগরিকদের সহযোগিতায় সেই আঘাত আটকানো গিয়েছিল। তা না হলে অনেক আগেই এর অস্তিত্ব বিলীন হত। সেই সময় সরকারি আবাসন করার অজুহাতে রানিকুঠিকে ভেঙে ফেলার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। একপ্রকার জোর করেই স্থানীয়রা রানিকুঠি বাঁচাও আন্দোলন করে জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

বর্তমানে রানিকুঠির অবস্থা কেমন, সে সম্পর্কে বলা যায় রানিকুঠির সামনের মাঠটিতে নিয়মিত খেলা হয়। প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ এবং ২২ শ্রাবণ কবিগুরুকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করতে রানিকুঠিতে গুটিকয়েক মানুষ সমবেত হন। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ২৫ বৈশাখ ১৪৩০ (ইং ৯ মে ২০২৩) সকাল ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত সেখানে চলে রবীন্দ্র স্মরণ। রানিকুঠির সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি প্রতিকৃতি রেখে মাল্যদান করা হয়। এর মধ্যে দিয়েই অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। “আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে, আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে”— গানটি উদ্বোধন সংগীত হিসেবে পরিবেশিত হয়। তারপর চলে রানিকুঠি বিষয়ে আলোচনা। রানিকুঠির ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা হয়, আগামীতে রানিকুঠি রক্ষা এবং ভগ্নপ্রায় ভবনটির সংস্কার বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের পরিকল্পনাও এদিন নেওয়া হয়।
কৃষ্ণনগরের রানিকুঠি সম্পর্কে আরো কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক। বাংলা সাহিত্যে চলিত ভাষার ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলে যিনি এক প্রকার বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, সেই প্রমথ চৌধুরীদের বাড়ি ছিল এটি, যা আজ ভগ্নপ্রায় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। চৌধুরী পরিবারের এই বাড়িটি নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে অবস্থিত। কৃষ্ণনগরে ডন বক্স রোডের ধারে সকলের অনাদরে জরাজীর্ণ অবস্থায় বাড়িটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনে আছে একটি বড় মাঠ। জায়গাটি এখন বৈশাখী ক্লাবের মাঠ নামেই বেশি পরিচিত, পুরনো মানুষেরা যদিও এটিকে এখনো রানিকুঠির মাঠই বলেন। এখন রানিকুঠির সকল গরিমা ম্লান হলেও, বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা কারিগরেরা এক সময় কৃষ্ণনগরে চৌধুরীদের এই বাড়িতে নিয়মকরে আসতেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় থেকে শুরু করে রামতনু লাহিড়ী, কালীচরণ লাহিড়ী, অতুলপ্রসাদ সেন—তালিকাটি লম্বা। সেই তালিকায় রয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। রবিঠাকুর তো এই বাড়িতে তিন-চারদিন ছিলেন বলেও জানা যায়। ‘রানিকুঠি’ নামটি নাকি তাঁরই দেওয়া— এমনও কেউ কেউ বলে থাকেন। তবে বিষয়টি নিয়ে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।

যাই হোক, আজকের ডন বক্স এলাকাটি কৃষ্ণনগর শহরের সীমান্তে অবস্থিত হলেও, সেই সময় এই জায়গাটি ছিল কৃষ্ণনগরের হোয়াইট টাউন এলাকা। একজন শ্বেতাঙ্গ সাহেব এই বাড়িতে বসবাস করতেন। অনেকে তাই ‘সাহেব বাড়ি’ বলে থাকেন। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে প্রমথ চৌধুরীর বাবা দুর্গাদাস চৌধুরী চাকরীসূত্রে কৃষ্ণনগরে এসেছিলেন। তিনি এখানে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে এসেছিলেন। দুর্গাদাস চৌধুরী তাঁর সন্তানদের পড়াশোনার সুবিধার জন্য শ্বেতাঙ্গ সাহেবের কাছ থেকে এই বাড়িটি ক্রয় করেন। চৌধুরী পরিবারের অনেকেই পরবর্তিতে বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক হয়েছিলেন। দুর্গাদাস চৌধুরীর সন্তান-সন্ততি আশুতোষ চৌধুরী, কুমুদনাথ চৌধুরী, প্রমথ চৌধুরী, প্রসন্নময়ী দেবীর জীবনের অনেকটা পর্যায় কাটে কৃষ্ণনগরের এই বাড়িতে। প্রমথ চৌধুরীর অগ্রজ আশুতোষ চৌধুরী লেখক হিসেবে বেশ নাম করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর খুব সখ্যতা ছিল। কুমুদনাথ চৌধুরী শিকারি হিসেবে বিশেষ পরিচিতি পেয়েছিলেন। বাঘ শিকার করতে গিয়েই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। প্রসন্নময়ী দেবী ছিলেন প্রমথ চৌধুরীর বোন। তিনিও বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধিকা ছিলেন। প্রমথ চৌধুরী তাঁর ‘আত্মকথা’-য় (১৯৪৬ খ্রি.) লিখেছেন যে — “আমার বড়দাদা ইংরেজি ভাষা খুব ভালো জানতেন; আর আমার সেজ-দাদা কুমুদনাথ অল্পবয়েস থেকেই ছিলেন শিকারি। তিনি শিকারের বই পেলেই পড়তেন। শেষ বয়সে তিনি শিকার করতে গিয়ে বাঘের হাতে প্রাণ দিয়েছেন।”

প্রমথ চৌধুরীদের পরিবার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল। সেই সূত্রে ঠাকুর পরিবারের অনেকেই কৃষ্ণনগরের এই ভবনে এসেছিলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল ইস্টারের ছুটিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আশুতোষ চৌধুরীর জন্য তাঁর ভাই হেমেন্দ্রনাথের কন্যা প্রতিভার সম্বন্ধ নিয়ে কৃষ্ণনগরের চৌধুরীদের বাড়িতে এসেছিলেন। প্রতিভা দেবীর সাথে আশুতোষ চৌধুরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীও পরবর্তীতে চৌধুরী পরিবারের বৌমা হয়েছিলেন। প্রমথ চৌধুরীর সঙ্গে ১৮৯৯ সালে তাঁর বিবাহ হয়। ইন্দিরা ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর কন্যা। অল্প বয়সেই অনুবাদক হিসেবে তিনি বিশেষ নাম করেছিলেন। শুধু চৌধুরী পরিবারের পুত্ররাই নন, চৌধুরী পরিবারের কন্যা এবং পুত্রবধূরাও গুণী ছিলেন। এহেন সাংস্কৃতিক পরম্পরা বহনকারী কৃষ্ণনগরের চৌধুরী পরিবারের বাসভবন পরবর্তীতে বিংশ শতকের প্রথমার্ধে নদিয়া রাজবংশের মহারানি জ্যোতির্ময়ী দেবী ক্রয় করেন। অনেকের মতে, তারপর থেকেই এই ভবনটির নাম হয় ‘রানিকুঠি’। চৌধুরী পরিবারের বসতবাটি এই রানিকুঠি আজ বিলুপ্তির পথে। এর ভগ্নদশা চিৎকার করে বলছে যে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আগামীদিনে আর রানিকুঠির অস্তিত্ব খুঁজে পাবে না। কিন্তু বিস্ময় হয়— সেই চিৎকার কেউ শুনতে পাচ্ছেন না!
লেখক : আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।