আলোচনা, গবেষণা ও গ্রন্থরচনা ছাড়া বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চার আর একটি শক্তিশালী মাধ্যম হল রবীন্দ্রসংগীত চর্চা। রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের সময় যে শতবর্ষ উদযাপন কমিটি তৈরি হয়, তার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কাজি মোতাহার হোসেন, জসীমুদ্দিন, মনসুর উদ্দিন আহমদ, এম.এ. বারী, সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক, সনজিদা খাতুন, মোখলেসুর রহমান ও শামসুন নাহার রহমান। পরবর্তীকালে এই উদযাপন কমিটি ‘ছায়ানট’ নামে একটি সংগঠনের রূপ গ্রহণ করে। ‘ছায়ানট’ নামে আপত্তি ছিল কারও কারও। তাঁরা বৈপ্লবিক কোন নামের পক্ষপাতী ছিলেন। তবে অধিকাংশের মত অনুযায়ী ‘ছায়ানট’ নামটি বহাল থাকে।
কামাল লোহানী তাঁর ‘রবীন্দ্র-আন্দোলন ও ছায়ানট’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “এ কথা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না যে এ দেশে রবীন্দ্রচর্চা, সংগীত শিক্ষা এবং শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে ছায়ানট সংগীত বিদ্যানিকেতন এখন সুপরিচিত এবং সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশাল ছায়ানট ভবন রবীন্দ্র-আন্দোলন এবং শুদ্ধ সংগীত প্রচার ও প্রসারেই কেবল প্রতীক স্তম্ভ হয়ে নয়, নবাগত প্রজন্মকে সৎ ও যথার্থ বাঙালি সংস্কৃতির উত্তরাধিকারে স্নাত করতে চায় বলে ‘নালন্দা’গড়ে তুলেছে। “
রবীন্দ্র সংগীতচর্চায় ছায়ানটের পাশাপাশি কাজ করে চলেছে অনিমেষবিজয় চৌধুরী প্রতিষ্ঠিত শ্রীহট্টের ‘গীতবিতান’, নাটোরের ‘সুরতীর্থ’, চট্টগ্রামের ‘সংগীত ভবন’, ঢাকার ‘বিশ্ববীণা’, বেগম আখরোজ প্রতিষ্ঠিত ‘বুলবুল ললিত কলা একাডেমি’ সত্যেন সেন প্রতিষ্ঠিত ‘উদীচী’ কলিম শরাফী প্রতিষ্ঠিত ‘জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মেলন পরিষদ ‘। কলিম শরাফী, সনজিদা খাতুন, সুধীন দাস, কাদেরি কিবরিয়া, সাদি মহম্মদ, সাজিদ আকবর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, মিতা হক, পাপিয়া সারওয়ার, আরা দেওয়ান, শামা আলি, সত্য চক্রবর্তী, আমিনা আহমদ, পীযূষ বড়ুয়া, বুলা মাহমুদ প্রভৃতি রবীন্দ্র সংগীত শিল্পীদের নিরন্তর সাধনায় সমৃদ্ধ হচ্ছে রবীন্দ্র সংগীত।
তবে রবীন্দ্র সংগীতের বিকৃতির প্রশ্নও এসেছে। রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থার সভাপতি তপন মাহমুদ এই অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেছেন অযোগ্যদের হাতে ফিউশনের নামে রবীন্দ্র সংগীতের বিকৃতি ঘটছে। এই প্রসঙ্গে আসতে পারে মাকসুদুল হকের কথা। ১৯৯০-৯১ সালে তিনি রবীন্দ্র সংগীতে আধুনিক সাউণ্ড সিস্টেম চালু করেন। তাঁর যুক্তি হল : নতুন প্রজন্মের কাছে রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করতে গেলে নতুন প্রজন্মের উপযোগী করেই উপস্থাপন করতে হবে। রবীন্দ্রনাথের ‘ভাঙা গান’কে হাতিয়ার করে তিনি বলতে চেয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ অন্যের সংগীতকে ভাঙার স্পর্ধা দেখিয়েছিলেন ; জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ তারই উদাহরণ। কিন্তু মাকসুদুল হকের প্রচেষ্টা নিষিদ্ধ হয়েছে। তাই তাঁর সমর্থকরা নিষিদ্ধকারীদের ‘রবীন্দ্র- মৌলবাদী’ আখ্যা দিয়েছেন।
বাংলাদেশি গায়ক মইনুল আহসান নোবেল কোন যুক্তি ছাড়াই রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলকে উড়িয়ে দিতে চান। তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ-নজরুল তো আর নবী কিংবা দেবতা না যে তাঁদের গান প্যারোডি আকারে গাওয়া যাবে না! রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে এদেশে চর্চা হয় এটাই রবীন্দ্রনাথের জন্য বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশের সাহিত্যে যেহেতু রবীন্দ্রনাথের অবদান নিতান্তই কম, সেক্ষেত্রে তাঁর গান এদেশের কেউ যদি প্যারোডি আকারে গায়, সেটা রবীন্দ্রনাথের জন্যই মঙ্গলজনক।’
রবীন্দ্র সংগীতের সঙ্গে বুলবুল ললিত কলা একাডেমি ও ছায়ানট রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করে। ১৯৬১ সালে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘শ্যামা’; পরবর্তীকালে মঞ্চস্থ হয়েছে ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘মায়ার খেলা’, ‘শাপমোচন’, ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি’, ‘তাসের দেশ’ প্রভৃতি।
‘প্রাঙ্গণেমোর’ নাট্যদলের প্রধান অনন্ত হিরা মনে করেন বাংলাদেশের মঞ্চে যতটা রবীন্দ্রচর্চা হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। ‘রক্তকরবী’, ‘রথের রশি’, ‘মুক্তধারা’, ‘বিসর্জন’ প্রভৃতি মঞ্চস্থ হয়েছে ল সার্ধ শতবর্ষে নাটকের কর্মশালারও আয়োজন করা হয়েছিল।
গত শতকের ষাটের দশকে রবীন্দ্রচর্চা আন্দোলনের সময়ে আবৃত্তিচর্চা জনপ্রিয় হয়েছিল। মুনীর চৌধুরী, লিলি চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম, সেলিনা বাহার জামান, কাজি মদিনা, আসাদ চৌধুরী, আতাইর রহমান, মাসুমা খাতুন, সনজিদা খাতুন, জিলুর রহমান, আবেদ খান, ইকবাল বাহার চৌধুরী, নাজিমা মাহমুদ, আনোয়ার হোসেন, হাসান আজিজুল হক, আলেয়া ফেরদৌসীর আবৃত্তি মন জয় করেছিল মানুষের। ১৯৮৮ সালে গঠিত হয় আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। ২০১৩ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আবৃত্তি বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়।
বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র বিপুল সমারোহের সঙ্গে পালিত হয় রবীন্দ্র জন্মদিন। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্যোগের পাশাপাশি দাদাভাই কচিকাঁচার মেলা, দোলনচাঁপা সংগীতাঙ্গন, মৈত্রী থিয়েটার গ্রুপ, স্বদেশ নাট্যঙ্গন, আমরা ক’জন থিয়েটার, আবোল তাবোল শিশু সংগঠন, অরণি সাংস্কৃতিক সংসদ, রাজবাড়ি একাডেমি, হুমায়ুন আহমেদ পাঠক ফোরাম, প্রিয়তমাসু আবৃত্তি নিকেতন, আবৃত্তি পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, লালন বাউল একাডেমি, দিব্য নৃত্যকলা, সারগাম সংগীত নিকেতন, মামুন খান সংগীত একাডেমি, দিব্য নাট্যকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বৈচিত্র্য সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন, মঙ্গলনাট, আপন শিল্পী গোষ্ঠী, উদ্ভাস নৃত্যকলা একাডেমি, পঞ্চ ভাস্কর, গহন থিয়েটার, রাজবাড়ি সোশিও কালচারাল ফোরাম, প্রথম আলো বন্ধুসভা, মীর মশাররফ হোসেন স্মৃতি সংসদ, নজরুল সংগীত পরিষদ, সমকাল সুহৃদ সমাবেশ, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদ, কালের কণ্ঠ শুভ সংঘ, রাজবাড়ি সরকারি কলেজ থিয়েটার, ডা. আবুল হোসেন কলেজ থিয়েটার, সাংস্কৃতিক সংঘ, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা, প্রত্যাশা থিয়েটার, স্বপ্নচূড়া, রাজবাড়ি থিয়েটার, জয় বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক্য জোট, লেখক-পাঠক কেন্দ্র, জয় বাংলা গ্রামীণ গীতিনাট্য দল, বিশ্বভরা প্রাণ, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, রাজবাড়ি সাহিত্য পরিষদ প্রভৃতি সংগঠনগুলি রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করে। জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত উৎসবের মহা সমারোহ দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
রবীন্দ্রপ্রেমিক শেখ হাসিনার সরকার কুষ্টিয়ার শিলাইদহ-সহ বাংলাদেশে রবীন্দ্র-স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলিতে রবীন্দ্র-স্মৃতি ও রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকর্ম সংরক্ষণে রবীন্দ্র জাদুঘর স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রবীন্দ্র গবেষণায় দেশি ও বিদেশিদের উৎসাহ দেবার জন্য কবিগুরুর নামে পুরস্কার চালু করার কথা ভাবা হচ্ছে। শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ৩৯ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়।
পরিশেষে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করে। পশ্চিমবঙ্গবাসী রবীন্দ্রনাথকে সহজেই পেয়েছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে পাবার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে লড়াই করতে হয়েছে। তাই রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে সে দেশের মানুষের আবেগ অনেক বেশি। আর সে আবেগ তৈরি করতে সাহায্য করেছেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। শুধু আবেগ নয়, বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলায় রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে গেছেন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা। বাংলা ভাষা আর রবীন্দ্রনাথ সমার্থক হয়ে গেছেন।
শেষ
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক