গতকাল ছিল ২০২৩ খ্রিস্টাব্দের ৯ মে। অর্থাৎ ২৫ শে বৈশাখ। বঙ্গাব্দের হিসাবে ১৪৩০ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬২তম জন্মদিন। ওই দিন ভোর থেকে রাত পর্যন্ত দুই বঙ্গেই হরেক কিসিমের মণ্ডপে, বিভিন্ন থিমের ঠাকুরপুজো হয়েছে। ঠাকুরের ছবিতে ফুল-মালা-পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে, সঙ্গীত, আবৃত্তি, নৃত্যনাট্য, গীতি আলেখ্য, ভাষণ এবং স্বরচিত কবিতাপাঠের ষড়োশপচারে রবীন্দ্রপুজো সম্পন্ন হয়েছে। আসন্ন রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী ও বাইশে শ্রাবণের মতো গুটিকয়েক অনুষ্ঠান বাদ দিলে আগামী এক বছরের মতো ঠাকুরপুজোর পাট গতকাল সাঙ্গ হয়েছে। ফলে ‘আসছে বছর আবার হবে’ বলে আপাতত ঘট-সহ ঠাকুরের বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। তবে প্রতি বছরের রবীন্দ্রপুজোর ধারাবাহিকতায় এ বছরের পুজো কিন্তু ব্যতিক্রমী। সেই ব্যতিক্রমী চরিত্রে দেশের সাংস্কৃতিক শহর কলকাতা আর নবাবি শহর বহরমপুরের মধ্যে বেশ তালমিল দেখা গেল বটে। সেই তালমিলের আখ্যান বর্ণনা করার আগে ভিন্ন একটি বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করা যাক।
দেবীদুর্গার পুজোপাঠের কয়েকদিন আগেই আসে মহালয়া। যেন পুজোর প্রস্তুতিপর্ব। অনেকটা সেই রকম আদলে এক অধ্যাপিকা তাঁর ফেসবুক ওয়ালে পঁচিশের দিনপাঁচেক আগে লেখেন, “যেখানে যেখানে দুর্গা পুজো হয়, সেখানে সেখানে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন হোক।” যেন দুর্গাপুজোর বিসর্জনের পর একই বেদীতে কালীপুজোর আব্দার। রবীন্দ্রভক্তকুলের অধিকাংশই সেই আব্দারের পক্ষে সম্মতির ঘাড় নাড়লেন। লাইক দিলেন। কমেন্ট লিখলেন। এমনকি সেই দলে ভিড় বাড়ালেন নকশাল আমলের আগুনখোর কোনও কমরেডও। সেই অধ্যাপিকার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া গুরুদেবের বিশ্বভারতীতে। তাঁদের অন্তত তিন পুরুষের বসবাস শান্তিনিকেতনে। তিনি আবার সাহিত্যিক এবং রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীও বটে। তিনি আরও অনেক গুণের অধিকারী। দু-একজন বেয়াড়ার সঙ্গে আমিও এমন একজন রবীন্দ্রভক্তের সুরে সুর না মিলিয়ে বেসুরে গাইলাম।
আমার গান, “এ বঙ্গে রবীন্দ্রপুজোর অভাব নেই। পঁচিশে বৈশাখ ও বাইশে শ্রাবণের তিথিলগ্ন মেনে কোজাগরি লক্ষ্মীপুজোর মতো রবীন্দ্রপুজোর যথেচ্ছ ছড়াছড়ি, সেই কোন আদ্দ্যিকাল থেকে। বাড়ির ছাদ, পাড়ার মোড়, বহুতল আবাসনের বাতানুকূল হলঘর, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত প্রেক্ষাগৃহ — পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি, পাজামা-পাঞ্জাবি, গরদের লালপাড় শাড়ি, খোঁপায় বেলি-জুঁই— বক্তা, গায়ক, বাচিকশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, গীতিনাট্যকার, কাব্যনাট্যকার ও স্বরচিত কবিতাপাঠে তের থেকে তিরানব্বই বছর বয়সের কবিকুলের অভাব পড়েনি এই পোড়াদেশে। যথেচ্ছ রবীন্দ্রপুজোর আয়োজনের দিনে টানাটানির কারণে অবশ্য পুরোহিত কিছু কম পড়লে অন্যদিনেও এক্সটেন্ডডেড রবীন্দ্রপুজোর আয়োজনের অভাব হয় না। আবার ‘কমিউনিয়াল হারমানির চাম্পিয়নের ট্রফি’ ঘরে তুলতে ‘রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী’ নামের পঞ্চরসেরও অভাব হয় না এদেশে। অভাব কেবল মুখস্থ রবীন্দ্রদর্শন আত্মস্থ করার সদিচ্ছার। অভাব কেবল ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিকজীবনে ও রাষ্ট্রীয়জীবনে রবীন্দ্রনাথের ‘মানুষের ধর্ম’ পালন করার প্রচেষ্টার। শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল জুড়ে আমরা ‘গোরা’ আওড়াব, আমরা ‘আফ্রিকা’ আবৃত্তি করব, আমরা ‘রথের রশি’ মঞ্চস্থ করব, আমরা ‘সভ্যতার সংকট’ কপচাব, কথায় কথায় ‘কালান্তর’ ও ‘লোকহিত’ থেকে ‘কোটেশন’ ঝাড়ব। এবং সেই সঙ্গে জাতবিদ্বেষবিষের দেবতার আরাধনাও করব, কাটমানি আর চৌর্যবৃত্তির দেবদেবীদেরও ভজনা করব!” যুগধর্ম যা-ই বলুক, সত্যধর্মে কিন্তু এত কিন্তু সইবে না!
আমার কথা ফলপ্রসূ হল না। দেবতা অলক্ষ্যে বসে আমার পানে চেয়ে মিটি হাসছিল বুঝি। তাই অধ্যাপিকা-রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা-লেখিকা-বিশ্বভারতীর প্রাক্তনীর প্রতিই অদৃষ্ট সদয় হল। বিবিধের মাঝে মহান মিলনের পথপ্রদর্শকের জন্মভিটে জোড়াসাঁকোয় পঁচিশে বৈশাখ সকালে রবীন্দ্রমূর্তিতে পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছেন সংশোধিত নয়া নাগরিকত্ব আইন CAA থেকে মুসলমানদের বাদ দেওয়া, ডবল ইঞ্জিনের সরকারের উত্তরপ্রদেশের শিক্ষা সিলেবাস থেকে জোব্বাপরা গুরুদেবের রবীন্দ্রসাহিত্য ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে প্রায়নগ্ন বাবা রামদেবের পতঞ্জলি সাহিত্য আর কবর থেকে মুসলিম মহিলার দেহ তুলে এনে গেরুয়াধারী ভোগী আদিত্যনাথ আবিষ্কৃত ধর্ষণোপযোগী বিজ্ঞানশাস্ত্র গুঁজে দেওয়া, ডারউইনের বিবর্তনবাদ-অভিযোজন শাস্ত্র বাতিল করে মোদীর প্রেসক্রিপশন অনুসারে গনেশের গলার প্লাসটিক সার্জারির ধনন্তরি জড়িবুটি মাহাত্ম্য গলাধকরণ করানো, নাগরিকদের ভোটে রাজা-উজির বনে যাওয়ার পর সেই নাগরিকদেরই (যেমন অসমে) NRC-র নামে বেনাগরিক বানিয়ে গরুর খোঁয়াড়ে পুরে দেওয়া, পটনায় কবিগুরুর নামাঙ্কিত রবীন্দ্রচকের নাম মুঝে দেওয়া, বিশ্ববীক্ষার আতুরঘর হিসাবে রবীন্দ্রনাথের হাতেগড়া বিশ্বভারতীকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে যাওয়া, জাতিদাঙ্গায় রবীন্দ্রনাথের সাধের মনিপুরে আগুন জ্বালিয়ে শতাধিক মানুষ হত্যার নেপথ্য ‘কারিগর’ হিসাবে অভিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। জন্মদিনের প্রভাতে আমৃত্যু সমন্বয়-সংস্কৃতির সাধক তথা আন্তর্জাতিকতার মহান পুজারি, ফ্যাসিবাদের চরম প্রতিরোধের হাতিয়ার রবীন্দ্রনাথকে স্পর্শ করল বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার ধর্মগুরু, তথা বিদ্বেষজীবীদের ক্রোনলজি শেখানো প্রবলপ্রতাপ পাষাণপাণ্ডার হাত।
রবীন্দ্রপ্রভাতে ভারতীয় সংস্কৃতির পীঠস্থান বলে প্রচারিত কলকাতা মহানগরীতে অনুষ্ঠিত ভণ্ডামির যেন রি-প্লে হল এদিন সন্ধ্যায়, আসমুদ্র-হিমাচল বিস্তৃত দেশের সীমান্তজেলা পদ্মাপাড়ের মুর্শিদাবাদের মতো মফস্বলের সদরশহর বহরমপুরে। এই শহর থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয় প্রায় ৫৬ বছর বয়সি সাপ্তাহিক ‘সংবাদ-সাহিত্য পত্রিকা ঝড়’। উল্লেখ্য, এসইউসি দলের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হলেও ‘ঝড়’ এখনও সেই দলের মুখপত্র হয়ে ওঠেনি। তবে জোড়াসাঁকোয় ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথকে প্রথমবার অমিত শাহের পুষ্পাঞ্জলি নিবেদনের মতোই বহরমপুরের ‘ঝড়’ দফতরেও এই প্রথমবার ‘কবি প্রণাম’ অনুষ্ঠান হয়। কবি-প্রণাম শব্দযুগলটি ঝড় সম্পাদক কৌশিক চট্টোপাধ্যায়ের ভাষণ থেকে আহৃত। গান, আবৃত্তি, স্বরচিত কবিতাপাঠে ও ভাষণে অনেকেই ভাল ভাল কথা উচ্চারণ করেছেন। সাম্প্রতিক কালের সমস্যা সমাধানেও রবীন্দ্রদর্শনের পথনির্দেশিকার ইঙ্গিতও দিয়েছেন কেউ কেউ। বহরমপুরের সেই সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠানের আমন্ত্রিত বক্তাদের মধ্যে একজনের চিন্তার সঙ্গে কলকাতার প্রভাতি অনুষ্ঠানের ঋত্বিক অমিত শাহের বিদ্বেষী চিন্তার ভারি তালমিল ছিল বটে।
২০২১ সালে বাংলাদেশের কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘির পাড়ের দুর্গাপুজোর মণ্ডপে অষ্টমীর রাতে হনুমানের মূর্তির জানুর উপরে এক দুষ্কৃতি কোরান শরিফ রেখে দেয়৷ সেই ষড়যন্ত্র মতো পরদিন সকালে সংখ্যালঘু হিন্দুদের অনেকে আক্রান্ত হন। মুসলমিদের একাংশের আক্রমণে অনেক পুজোমণ্ডপ ভাঙচুর হয়, সাধারন মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের যথার্থ ভূমিকায় এবং সেই দেশের বিশাল সংখ্যক শুভবোধসম্পন্ন নাগরিকের সঙ্ঘবদ্ধ প্রতিরোধে অগ্নিগর্ভ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রিত হয়। এই দাঙ্গা ও প্রতিরোধের সচিত্র সংবাদ দ্রুত বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। সেই উত্তেজনাকর খবরে নিজেকে তাতিয়ে তোলে ‘বুদ্ধিজীবী’ তকমাপ্রাপ্ত বহরমপুরের এক ধূর্ত বিদ্বেষজীবী। তিনি নানুয়া দিঘির ঘটনার দু’ দিন পর নেটিজেনদের তাতাতে ফেসবুকে লিখলেন, ‘জাগাও পথিককে সে যে ঘুমে অচেতন।’ একই দিনে তাঁর আর একটি পোস্ট, ‘ঘুম ভাঙুক এই বার।’ মেঘের আড়াল থেকে যুদ্ধরত রাবনপুত্র ইন্দ্রজিতের মতো তাঁর ‘সান্ধ্যভাষা’র আড়ালের এই উস্কানি সত্ত্বেও এই বঙ্গের বিদ্বেষজীবীদের তখন ঘুম ভাঙেনি। উস্কানি সত্ত্বেও ‘ঘুমে অচেতন’ থাকা বিভেদপন্থী পথিকরা মারণাস্ত্র হাতে পথে নামতে পারেনি। ‘ঝড়’-এর সৌজন্যে সঙ্ঘকুলের বিদ্বেষী দর্শনের পরমাত্নীয়ের কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা-চেতনা-দর্শনের পরিবর্তনশীলতা-গতিময়তার কথা শুনতে হয় সান্ধ্যকালীন ‘কবি-প্রণাম’ অনুষ্ঠানে। ‘ভারতের একমাত্র সাম্যবাদী দল এসইউসি’ পরিচালিত পত্রিকা আয়োজিত অনুষ্ঠানের বক্তারা কি তবে সুনির্বাচিত নন?
সেই বক্তাই কিন্তু তাঁর নিজস্ব ভাষণে কথিত পরিবর্তনশীলতার ধর্ম মেনে নিজের চেতনার জড়ময়তার পরিবর্তন ঘটাননি দেড় বছরেও। ওই পোস্টের প্রায় দেড় বছর পর গত এপ্রিল মাসে ভিন্ন প্রসঙ্গে, ভিন্ন পোস্টে তিনি লেখেন, “নবাব আলিবর্দী খাঁ এখানেই বর্গী দলের নায়ক ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যা করেছিলেন।” নবাব আলিবর্দির আমলে দশ বছর ধরে ‘শোলে’ সিনেমার ডাকাত গব্বর সিং- এর মতো তস্কর ভাস্কর পণ্ডিতের লুঠেরার দল লাখ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছিল, বঙ্গের হাজার হাজার নারীকে ধর্ষণ করেছিল, ধনসম্পদ সর্বস্ব লুঠ করেছিল। লুঠেরা বর্গিদলের পাণ্ডা ভাস্করের হত্যাকারী নবাব আলিবর্দী ধর্মীয় পরিচয় মুসলমান। আলিবর্দি খাঁ না হয়ে ভাস্কর হত্যাকারী নবাবের নাম অশোক গুপ্ত, বা রাজা বিম্বিসার হলে ডাকু-লুঠেরা দলের চাঁই ভাস্কর পণ্ডিত কি নায়কের বদলে ‘তস্কর পাণ্ডা’ নামে অভিহিত হত না? বুকের ভিতরে জাতি বিদ্বেষের বিষ পুষে না রাখলে ভিলেন কখনও ভুল করেও হিরো বনে যায় না। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশের দালাল সাভারকার ও মহাত্মা গাঁধীর খুনি নাথুরাম গডসেকে এখন নাগপুরি ইউনিভার্সিটি থেকে ভারতীয় জাতির হিরো বানানোর রাষ্ট্রীয় প্রকল্প চলছে। সেই একই নাগপুরি ইউনিভার্সিটির সিলেবাস মেনেই লুঠেরা বর্গি বাহিনীর ‘গব্বর সিং’ হয়ে যায় ‘নায়ক’। আর তিনিই কিনা এসইউসি দল পরিচালিত ঝড় পত্রিকা আয়োজিত অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রদর্শনের বক্তা! তাহলে বুঝতে হবে পত্রিকাটির কেবল আয়ুই বেড়েছে, অর্জনের ভাঁড়ার শূন্য। অথবা কণ্ঠস্থ আদর্শবাদ আত্মস্থ হয়নি ৫৬ বছরেও পৌনে একশো বছরের প্রাচীন দলের জেলা নেতৃত্ব আজও মুখস্থের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি।
বর্তমান প্রজন্ম আর আগের প্রজন্মের মতে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে সাড়া দিচ্ছে না বলে একাধিক বক্তা আক্ষেপ করেছেন এদিনের সন্ধাকালীন জমাটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে। কেউ কেউ তার জন্য মোবাইল ফোন কালচারকে দায়ি করেন। মোবাইল ফোন আসলে গঙ্গার মতো। এই নদীস্রোতে পচাগলা দেহ ভেসে যায়, আবার ফুলও ভেসে যায়। কে কোনটা গ্রহণ করবে তা ব্যক্তির অভিরুচি ও চয়নের বিষয়। সান্ধ্যকালীন রবীন্দ্রস্মরণ অনুষ্ঠানে মোক্ষম কথাটি বলেছেন বর্তমান প্রজন্মের বাচিকশিল্পী শাঁওলি। তিনি রবীন্দ্রকবিতা আবৃত্তি করার প্রাকমুহূর্তে মৃদু গলায় আবেদন রাখেন, রবীন্দ্রদর্শন ‘কণ্ঠস্থ’ নয়, ‘আত্মস্থ’ করতে হবে। এই জরুরি কাজটি না হওয়ার জন্য তস্কর ভাস্করকে নায়ক ভাস্কর বানানোর কর্মকারের কাছ থেকে রবীন্দ্রদর্শনের গতিময়তা-চলমানতার মুখস্থ সিলেবাস শুনতে হয়। ‘আমার পক্ষের চোর ছ্যাচড়, ডাকাত, খুনি, ধর্ষকরা সমাজসেবী নির্দোষ এবং বীরের শিরোপা পাওয়ার যোগ্য। অপর পক্ষের সবাই পচামাল। গণশত্রু। এবং দেশদ্রোহী।’ যুগযুগান্ত বাহিত এই আত্মধ্বংসকারী বিষচর্চার বদল না ঘটায় শতবর্ষ প্রাচীন ভারতীয় বামপন্থা এখন প্রায়-বনসাই। রবীন্দ্রভাবনা আত্মস্থ করার বদলে কণ্ঠস্থ করার ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে, ট্রাফিক আইল্যান্ডে অষ্টপ্রহর রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজানো বঙ্গে রবীন্দ্রসৃষ্টি নিয়ে কোটি কোটি কোটি কোটি টন পেপার নষ্ট করেও, কোটি কোটি কোটি কোটি জিবি মেমারি খরচ করেও ‘রবীন্দ্রজয়ন্তীতে নবপ্রজন্ম কই’ জাতীয় আক্ষেপ বন্ধ হবে না। হাজারতম বছরের জয়ন্তীর পরেও না।
‘ভিলেন’ বানিয়ে দেওয়া মোবাইল ফোনের দৌলতে এবছর বৈশাখ মাস জুড়ে পেজফোরনিউজ নামের অনলাইন পত্রিকায় ‘অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক দিলীপ মজুমদারের ১৮ পর্বের রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ লেখা পড়তে পেরেছেন পাঠককুল। বাঙালি অস্মিতার সংগঠন ‘ভূমিপুত্র উন্নয়ন মোর্চা’র প্রতিষ্ঠাতা ড. রামিজ রাজা বিভিন্নজনের লেখা থেকে মুসলমান সমাজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অবদান সংগ্রহ করেন। সেই সংগৃহীত তথ্য কবিগুরুর জন্মদিনে মেবাইল ফোন মারফত পাঠকের কাছে পৌঁচেছে। লেখক ও অধ্যাপক ইমানুল হক ‘ভাষা ও চেতনা সমিতি’ ২৫ বছর ধরে বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ছেন, কলকাতার মানিকতলার খালপাড়ে অবৈতনিক স্কুল গড়ে বস্তির কিছু বালক-বালিকাকে লেখাপড়া, সঙ্গীত, নাটক শেখাচ্ছেন। মোবাইল ফোনেই আমাদের সেই উজ্জ্বল উদ্ধার। একরামূল হক শেখ এ যুগের বাঙালির লাইট হাউস। কেন কেও বই পড়া জরুরি ও কেন জরুরি এবং সেই গ্রন্থপ্রাপ্তির ঠিকানা তিনি প্রতিদিন লাগাতার ফেসবুক মাধ্যমে আমপাবলিককে জানাচ্ছেন। কুফলের পাশাপাশি এই অত্যাধুনিক যন্ত্রের এ জাতীয় হাজার উপকারের ফিরিস্তি দেওয়া যায়। ছোরা মানুষ খুন করতে ব্যবহার করা হবে, নাকি ডাক্তারি অপারেশনের দ্বারা মরণাপন্নকে বাঁচিয়ে তোলা হবে? সেই নির্বাচন ব্যবহারকারীর।
উচ্চবর্ণের ও উচ্চবিত্তের হিন্দুদের প্রয়োজন মাফিক ধর্মসংস্কারকে ‘নবজাগরণ’ নাম দিয়ে কবি ঈশ্বর গুপ্ত, বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায় ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও তাঁদের মনুবাদী অনুগামীরা বরাবর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ-বিদ্বেষের আবাদ করেছেন। তাঁর বিপরীতে রাজা রামমোহন রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ক্ষিতিমোহন সেন প্রমুখ সমন্বয়বাদীর ভারতকে হিন্দু-মুসলমানের যৌথ সাধনার পীঠস্থান করতে প্রাণপাত করেছেন। আজকের মোবাইল ফোনের অজুহাতের মতো একদা ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসিকে ভারতের সাম্প্রদায়িকতার জন্য দায়ি করেন অনেকে। বহুদর্শী রবীন্দ্রনাথ যথার্থ কারণেই ওই একপেশে পথের পথিক ছিলেন না। ঋষিদৃষ্টির বিশ্বকবি দুই প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মধ্যের বিভেদের জন্য ভিতরের এবং বাইরের — উভয় কারণকেই চিহ্নিত করেছেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনের কারণকে জাহাজের বিন্মভাগের ছিদ্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেই ছিদ্র মেরামত না করে জাহাজডুবির জন্য সর্বদা ঝড়ের উপর ঝাল ঝেড়েছি। তাঁর মতে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশের ঝড়সদৃশ ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি একটি বাহ্য কারণ মাত্র। আর বর্ণহিন্দুর ও উচ্চবিত্ত হিন্দুদের বর্ণবাদী অস্পৃশ্যতা ও অপরকে হেয় করার ঘৃণ্য আচারকে জাহাজের তলার ফুটো বলতে চেয়েছেন। বহিরাগত ‘ঝড়’ সর্বদা আভ্যন্তরীণ ‘ছিদ্রপথ’কে অবলম্বন করে জাহাজডুবির ঘটনা ঘটায় বলে ঋষিকবির ভারতের অন্তর্দর্শন।
মুসলমানের গো-নিধনের জবাবে অহিংসার পুজারি রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন চাষের সহায়ক ও দুধদানের উৎস মহিষকুলকে হিন্দুর বলিপ্রথার হিংসাত্মক কাণ্ডের দৃষ্টান্ত হিসাবে। তিনি হিন্দুধর্মকে আচারসর্বস্ব ও ইসলাম ধর্মকে আচরণসর্বস্ব বলে মনে করতেন। বিভেদের এই জগদ্দল দুই পাহাড়কে তিনি উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন সামাজিকপথে, পরস্পরের অপরিচয়ের আড়াল সরিয়ে দিয়ে দৈনন্দিনের মেলামেশার সহজপথে। একাজ রাজনীতির মতলববাজির পথে সম্ভব নয় বলে তিনি মনে করতেন। শিলাইদহের জমিদারির কাছারি বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের চাক্ষুস করা হিন্দু-মুসলমানের অস্পৃশ্যতার জাজিম-সংস্কৃতি মানুষের দেবতাকে কতখানি হেয় করে তা প্রত্যক্ষ করেন রবীন্দ্রনাথ। অনুষ্ঠানের সভাপতি সৈয়দ খালেদ নৌমান ও ঝড়ের সম্পাদক মণ্ডলির সদস্য চন্দ্রপ্রকাশ সরকার-সহ আরও কয়েকজনের আলোচনায় সেই সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গ চকিতে উঠে এসেছে। আশ্রমিকদের একাংশের মনুবাদী আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে বিশ্বভারতীতে মুসলমান ছাত্রকে ভরতি, সেখানে ইসলামিক সংস্কৃতি বিভাগ চালু করা, কোরানপাঠ করা, নজরুল, জসিমুদ্দিন, বন্দেআলি মিঞা, সৈয়দ মুজতবা আলি প্রমুখ অনেক সংখ্যক মুসলমান লেখকদের সাহিত্যসাধনায় উৎসাহদান, গরিবপ্রজাদের (অধিকাশই মুসলমান) আর্থিক উন্নতির জন্য সমবায় আন্দোলন গড়ে তোলা- সহ তাঁর নানা কর্মকাণ্ডের অভ্যন্তরে অন্তঃসলিলার মতো বয়ে চলেছিল হিন্দু-মুসলমানের যুক্তসাধনার প্রবাহ। কেবল ‘কালান্তর’ প্রবন্ধগ্রন্থটিই তার বিশালবড় পাথুরে প্রমাণ। স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন গরিব মুসলমানের অস্তিত্বের পক্ষে ‘থ্রেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সত্যদ্রষ্টা কবির দরদিমন সেই বাস্তবকেও অস্বীকার করেনি। ঘরে বাইরে উন্যাসে চকিতে সেই দৃশ্য এঁকেছেন তিনি। একদা ‘সোনারচামচ মুখে দিয়ে জন্মানো বুর্জোয়া কবি’ বলে বামেদের মুখনিঃসৃত যথেচ্ছ গালমন্দ খাওয়া এই যুগস্রষ্টাঋষিকে মুখস্থবিদ্যায় ধরা যাবে না। কণ্ঠস্থ নয়, তাঁকে আত্মস্থ করতে হবে। নইলে এ পোড়াদেশের মুক্তি নেই।
সাধু সাধু।