রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পগুচ্ছ-র বেশির ভাগ গল্প সাধনা, ভারতী ও প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে, যুগান্তর-আনন্দবাজারের সঙ্গে তাঁর লেখালেখির সম্পর্ক কতটা নিবিড় ছিল। স্পষ্টতই কবির জীবনের শেষ দশায় তিনি এই দুটি পত্রিকার টিকি দেখতে পেয়েছিলেন। সেই অর্বাচীন টিকিতে তিনি কতটা বাঁধা পড়েছিলেন, সেটা জানার চেষ্টা করা যাক।
প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় সবুজপত্র প্রকাশিত হলে রবীন্দ্রনাথ এই পত্রিকায় গল্প লিখতে শুরু করেন। ‘হৈমন্তী’, ‘বোষ্টমী’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘শেষের রাত্রি’, ‘পয়লা নম্বর’-সহ তাঁর অনেক বিখ্যাত গল্পই সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাটিতেই (বৈশাখ ১৩২১ বঙ্গাব্দ/ ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছাপা হয় তাঁর ‘হালদার গোষ্ঠী’ গল্পটি। এরপর পৌষ ১৩২৪ বঙ্গাব্দ/ ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর মোট দশটি গল্প সবুজপত্রে প্রকাশিত হয়। সবুজপত্রেই রবীন্দ্রনাথ চলিত বা কথ্যভাষায় গল্প লিখতে শুরু করেন।
ওপরে উল্লিখিত পত্রিকাগুলো ছাড়াও বিভিন্ন সময় নবজীবন, বালক, সখা ও সাথী, প্রদীপ, ছোটগল্প, শনিবারের চিঠি, আনন্দবাজার পত্রিকা, বিশ্বভারতী পত্রিকা এবং ঋতুপত্রেও রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি গল্প প্রকাশিত হয়। এ-গল্পগুলো সম্পর্কেও কিছু তথ্য দেওয়া যাক। নবজীবনের অগ্রহায়ণ ১২৯১ (১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত ‘রাজপথের কথা’ গল্পটিকে রবীন্দ্রনাথ ‘রাজপথ’ শিরোনামে তাঁর বিচিত্র প্রবন্ধ (১৩১৪ বঙ্গাব্দ) পুস্তকেও স্থান দিয়েছেন। বালকের বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১২৯২ (১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত ‘মুকুট’কে একটি ক্ষুদ্র উপন্যাসও বলা যেতে পারে। এটি গল্পগুচ্ছ বা রবীন্দ্রনাথের অন্য কোনো গল্পসংকলনে স্থান পায়নি। ছুটির পড়া (১৯০৯) পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার আগে মুকুট নামেই রবীন্দ্রনাথ এর একটি নাট্যরূপ (১৯০৮) দেন। সখা ও সাথী পত্রিকায় (আশ্বিন ১৩০২ বঙ্গাব্দ/ ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত ‘ইচ্ছাপূরণ’ গল্পটি রবীন্দ্রনাথকে পত্রিকা কর্তৃপক্ষের ‘অত্যন্ত পীড়াপীড়ি’তে লিখে দিতে হয়েছিল বলে ঔপন্যাসিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়কে লেখা এক পত্রে (৬ চৈত্র ১৩০২) তিনি জানিয়েছিলেন। আর ‘প্রগতিসংহার’, ‘শেষ পুরস্কার’ ও ‘মুসলমানীর গল্প’ — এই তিনটি গল্প প্রকাশিত হয় যথাক্রমে আনন্দবাজার পত্রিকার বিশেষ শারদীয় সংখ্যা ১৯৪৮, বিশ্বভারতী পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৪৯ (১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দ) ও ঋতুপত্র পত্রিকার আষাঢ় ১৩৬২ (১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায়। এর মধ্যে শেষ দুটি গল্প রবীন্দ্রনাথ তাঁর মৃত্যুর কয়েক মাস আগে লিখলেও ছাপা হয় বলা বাহুল্য তাঁর মৃত্যুর পর। এ পর্যন্ত যে-গল্পগুলোর কথা উলেস্নখ করা হলো, তার সবই গল্পগুচ্ছের কোনও না কোনও খণ্ডে (প্রথম-চতুর্থ) সংকলিত হয়েছে। গল্পগুচ্ছেরই অন্তর্ভুক্ত আরেকটি গল্প ‘কর্মফল’ ১৩১০ সনে (১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ) সরাসরি পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এ-গল্পটিকে পরে ১৯২৬ সালে ‘শোধবোধ’ নামে নাটকে রূপান্তরিত করা হয়।
পরে গল্পগুচ্ছের চতুর্থ খণ্ডের (১৩৬৯ বঙ্গাব্দ/ ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ) অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এমন তিনটি গল্প ‘রবিবার’, ‘ল্যাবরেটরি’ ও ‘শেষ কথা’ ইতোপূর্বে একত্রে সংকলিত হয়ে তিন সঙ্গী নামে ১৩৪৭ সনে (১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ) পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এ-গল্পগুলোর মধ্যে ‘রবিবার’ ও ‘ল্যাবরেটরি’ আনন্দবাজার পত্রিকার যথাক্রমে ১৩৪৬ (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) ও ১৩৪৭ সনের (১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দ) শারদীয় সংখ্যায় এবং ‘শেষ কথা’ শনিবারের চিঠির ফাল্গুন ১৩৪৬ (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘শেষ কথা’ গল্পটির একটি ভিন্নতর পাঠ অবশ্য ‘ছোটগল্প’ শিরোনামে সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার অগ্রহায়ণ ১৩৪৬ (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) সংখ্যায় মুদ্রিত হয়। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে লেখা এ-তিনটি গল্পকে সমালোচকরা তাঁর একেবারে ভিন্ন কোটির এবং খুবই আধুনিক ধরনের গল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথের নিজেরও তাঁর এই শেষ পর্বের গল্পগুলো নিয়ে বিশেষ আগ্রহের কথা জানা যায় পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীর নিম্নোক্ত স্মৃতিচারণ থেকে :
অসুস্থতার মধ্যে পুজোর আনন্দবাজার বেরল, তাতে ল্যাবরেটরি গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল, অসুখের মধ্যে সেদিন তিনি [রবীন্দ্রনাথ] ভালো ছিলেন তাই কাগজখানি আসবামাত্র আমার স্বামী [রথীন্দ্রনাথ] তা নিয়ে গিয়ে তাঁকে দেখিয়েছিলেন। কী আগ্রহ তাঁর গল্পটি দেখে, ডাক্তারদের বারণ সত্ত্বেও তিনি কাগজখানি হাতে নিয়ে আগাগোড়া চোখ বুলিয়ে গেলেন। সোহিনীকে নিয়ে যখন কেউ-কেউ আলোচনা করতেন, তাঁদের প্রায়ই বলতেন, সে একেবারে এখনকার যুগের সাদায়-কালোয় মিশনো খাঁটি রিয়ালিজম, অথচ তলায় তলায় অন্তঃসলিলার মতো আইডিয়ালিজমই হল সোহিনীর প্রকৃত স্বরূপ।’ বন্ধুবান্ধব এসে গল্পটির প্রশংসা করলে অসুখের মধ্যেও তাঁর মুখ কত উজ্জ্বল হয়ে উঠত।’
তার মানে আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের শুরু তাঁর জীবনের অন্তিমপর্বে। তাঁর সাহিত্যজীবন তখন অস্তাচলগামী। তবু তাঁকে বইমেলার কার্ডে রাখতে হয় শরদিন্দু, সত্যজিৎ ও সুনীলের সঙ্গে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবনের পরিহাস এই যে, যে রবীন্দ্রনাথের বই তিনি লাথি মেরে বিছানা থেকে ফেলে দেওয়ার বাসনার কথা ব্যক্ত করেছিলেন যৌবনের দৃপ্ত স্পর্ধায়, তাঁকে তিনি কিছুতেই এড়াতে পারেননি। সাহিত্যের প্রথম আলো-কে অস্বীকার করার ক্ষমতা কারোরই হয়নি।