তোমার বিরহ ছড়ায়ে চলেছে সৌরভনিশ্বাসে
রবীন্দ্রনাথের ‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৯৪০ সালে। এই কাব্যগ্রন্থের ৩৫টি কবিতা ১৯৩৫-১৯৪০ সালের মধ্যে লেখা। গ্রন্থটি যাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছিল সেই অমিয় চক্রবর্তী কাব্যের কবিতাগুলি সন্নিবেশিত করেন। এই কাব্যে ‘মৌলানা জিয়াউদ্দিন’ নামে একটি কবিতা আছে। কবিতাটি রচিত হয় ৮ জুলাই, ১৯৩৮ সালে। তার কয়দিন আগে জিয়াউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। মর্মস্পর্শী এই কবিতাটি পাঠ করা যাক :
কখনও কখনও কোন অবসরে
নিকটে দাঁড়াতে এসে ;
‘এই যে’ বলেই তাকাতেম মুখে,
‘বোসো’ বলিতাম হেসে।
দু-চারটে হত সামান্য কথা,
ঘরের প্রশ্ন কিছু,
গভীর হৃদয় নীরবে রহিত
হাসিতামাশার পিছু।
কত যে গভীর প্রেম সুনিবিড়,
অকথিত কত বাণী,
চিরকাল-তরে গিয়েছ যখন
আজিকে সে কথা জানি।
প্রতি দিবসের তুচ্ছ খেয়ালে
সামান্য যওয়া-আসা,
সেটুকু হারালে কতখানি যায়
খুঁজে নাহি পাই ভাষা।
তব জীবনের বহু সাধনার
যে পণ্যভারে ভরি
মধ্যদিনের বাতাসে ভাসালে
তোমার নবীন তরী,
যেমনি তা হোক মনে জানি তার
এতটা মূল্য নাই
যার বিনিময়ে পাবে তব স্মৃতি
আপন নিত্য ঠাঁই…
সেই কথা স্মরি বার বার আজ
লাগে ধিককার প্রাণে..
অজানা জনের পরম মূল্য
নাই কি গো কোনখানে।
এ অবহেলার বেদনা বোঝাতে
কোথা হতে খুঁজে আনি,
ছুরির আঘাত যেমন সহজ
তেমন সহজ বাণী।
কারো কবিত্ব, কারো বীরত্ব,
কারো অর্থের খ্যাতি..
কেহ-বা প্রজার সুহৃদ সহায়,
কেহ-বা রাজার জ্ঞাতি—
তুমি আপনার বন্ধুজনেরে
মাধুর্যে দিতে সাড়া,
ফুরাতে ফুরাতে রবে তবু তাহা
সকল খ্যাতির বাড়া।
ভরা আষাঢ়ের যে মালতীগুলি
আনন্দ মহিমায়
আপনার দান নিঃশেষ করি
ধুলায় মিলায়ে যায়..
আকাশে আকাশে বাতাসে তাহারা
আমাদের চারিপাশে
তোমার বিরহ ছড়ায়ে চলেছে
সৌরভনিশ্বাসে।
মৌলানা জিয়াউদ্দিন। পঞ্জাবের অমৃতসর থেকে তিনি এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। ছাত্র হিসেবে। ১৯২২ সালে। তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে। দেশব্যাপী উত্তেজনা। সে উত্তেজনা জিয়াউদ্দিনকেও স্পর্শ করেছিল কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বর্জনাত্মক আন্দোলনকে শান্তিনিকেতনে ছড়িয়ে দিতে বাধা দিয়েছিলেন। বিদ্যার তো কোন জাত নেই। দেশের হোক, বিদেশের হোক, যা শিক্ষণীয় তা সকলের কাছ থেকে গ্রহণ করতে হবে। বিদেশি শিক্ষা বর্জন করা চলবে না। হীরেন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন, ‘প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতি চর্চার তেমন কোন উদ্যোগ আয়োজন কি দেশের কোথাও তখন ছিল? আমাদের হিন্দু-বৌদ্ধ ঐতিহ্য সম্পর্কে কতটুকু আমাদের অনুসন্ধিৎসা? অবিভক্ত ভারত তখন পৃথিবীর বৃহত্তম মুসলিম সমাজের বাসভূমি। সেই ইসলামিক সংস্কৃতির চর্চাই বা দেশে কোথায়? রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্য-পাশ্চাত্য নানা বিদ্যার একটি সমবায় ভাণ্ডার গড়ে তুললেন’।
১৯২২ সালের ২৪ জুলাই সুফিধর্ম সম্বন্ধে শান্তিনিকেতনে বক্তৃতা করেন জিয়াউদ্দিন। ১৯২৩ সালের ১৬ মার্চ কুরআনের তেলওয়াত করেন এবং ইংরেজিতে তার অনুবাদ করেন। ফারসি ভাষায় বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন জিয়াউদ্দিন। রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা ফারসিতে তিনি অনুবাদ করেন, উর্দুতেও কিছু অনুবাদ করেছিলেন। ১৯৩৫ সালে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সদ-বন্দ-ই টেগোর’ নামে রবীন্দ্রনাথের ১০০টি কবিতা ও গানের এক সংকলন, ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়। উর্দুতে প্রকাশিত হয় ‘কলম-ই টেগোর’।
ছাত্রাবস্থা শেষ করে জিয়াউদ্দিন কিছুদিন শান্তিনিকেতনে শিক্ষকতাও করেছিলেন। বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন। খুব রস পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের গানে। পঞ্জাবি ভাষাতেও অনুবাদ করেছিলেন রবীন্দ্রসংগীত। ফুর্তিবাজ এই মানুষটি অল্পদিনেই শান্তিনিকেতনের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন।
আফগান সরকারের চাকরি নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন কাবুলে। সৈয়দ মুজতবা আলির মতো। পঞ্জবিদের রবীন্দ্রনাথের গান শুনিয়ে জমিয়ে তুলেছিলেন তিনি। কাবুলের শীতে প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত, হি হি করে কাঁপছে মানুষ, তখন জিয়াউদ্দিন গলা ছেড়ে গান ধরেছেন, ‘দারুণ অগ্নিবাণে রে হৃদয় তৃষায় হানে রে’।
জিয়াউদ্দিন ঘুরে-ফিরে আবার চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীতে ইসলামিক সংস্কৃতিবিষয়ক একটি বিভাগ চালু করার পরিকল্পনা ছিল রবীন্দ্রনাথের। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অর্থাভাব। ১৯২৭ সালে নিজাম বাহাদুর বিশ্বভারতীকে ১ লক্ষ টাকা দান করায় সে বাধা দূর হয় এবং স্থাপিত হয় ইসলামিক বিভাগ। মৌলানা জিয়াউদ্দিন সে বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
জিয়াউদ্দিনের মৃত্যুর খবর পেয়ে ব্যথিত হন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩৮ সালের ৬ জুলাই তাঁর স্ত্রীকে টেলিগ্রাম করেন তিনি : Ziauddin’s passing away is a terrible blow to me personally and Santiniketan. — Rabindranath Tagore.
শোকসভায় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘তিনি প্রথম আশ্রমে এসেছিলেন বালক বয়েসে ছাত্র হিসেবে, তখন হয়তো তিনি ঠিক তেমন করে মিশতে পারেন নি এই আশ্রমিক জীবনের সঙ্গে, যেমন পরিপূর্ণ ভাবে মিশে গিয়েছিলেন পরবর্তীকালে।…. তাঁর অকৃত্রিম অন্তরঙ্গতা, তাঁর মতো তেমনি করে কাছে আসা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না, সংকোচ এসে পরিপূর্ণ সংযোগকে বাধা দেয়। কর্মের ক্ষেত্রে যিনি কর্মী, হৃদয়ের দিক থেকে যিনি ছিলেন বন্ধু, আজ তাঁরই অভাবে আশ্রমের দিক থেকে ও ব্যক্তিগতভাবে আমরা একজন সুহৃদকে হারালাম’।
বক্তব্যের শেষাংশে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমার নিজের দিক থেকে কেবল এই কথাই বলতে পারি যে এ রকম বন্ধু দুর্লভ। এই বন্ধুত্বের অঙ্কুর একদিন বিরাট মহীরুহ হয়ে তার সুশীতল ছায়ায় আমায় শান্তি দিয়েছে — এ আমার জীবনে চিরস্মরণীয় ঘটনা হয়ে থাকল। অন্তরে তাঁর সন্নিধির উপলব্ধি থাকবে, বাইরের কথায় সে গভীর অনুভূতি প্রকাশ করা যাবে না’।
ঋণ :
মৌলানা জিয়াউদ্দিন / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নবজাতক / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনের এক যুগ/ হীরেন্দ্রনাথ দত্ত।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
অজানারে জানলাম। সমৃদ্ধ হলাম। কৃতজ্ঞতা জানাই। লেখক ও সম্পাদককে।
বিষয়টি আমার কাছে নতুন। উপকৃত হলাম।
দেখছি , অনল আবেদিন এই পর্বটির নিবিড় পাঠক । তাঁর মতো পাঠক পাওয়াও লেখকের সৌভাগ্য । রোকেয়া- রবীন্দ্রনাথ সম্পর্ক সম্বন্ধে প্রশ্ন ছিল অনলের । পূরবী বসুর একটি বইএর সন্ধান পেয়েছি ….’ কাছে থেকে দূরে’ । পড়া হয় নি এখনও ।