‘হারামণি’র সন্ধানে ঘুরে বেড়ালেন দুই মণি
পাবনা জেলার মুরারীপুর গ্রামে জন্ম মুহম্মদ মনসুরুদ্দিনের (১৯০৪-১৯৮৭)। এই অঞ্চলটা ফোকলোর বা লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির উপাদানে ভরপুর এখানে ছড়িয়ে আছে লোকগীতি, ছড়া, লোককথা, আরও কত কি। বাউল, ফকির, বোষ্টমিরা ঘুরে বেড়ায় এই অঞ্চলে। পাগলা কানাই, লালন ফকির, ইদু বিশ্বাস, ভজন শাহ, ক্ষেপুউল্লাহ বয়াতি, পাবনা জেলার মাটির মানুষ, এখানে বসে তাঁরা রচনা করেছেন তাঁদের গান। এই আবহে মানুষ বলে মনসুরুদ্দিনের মনে গেঁথে যায় লোকগীতির সুর। সন্ধ্যাবেলায় তাঁর মাতামহের মুখে শোনেন রূপকথার গল্প। তাঁদের বাড়ির দহলিজে আমির হামজা আর আর্লি লায়লার পুঁথি পাঠ করেন লালু মোল্লা। কিশোর মনসুরের মনের মধ্যে জেগে ওঠে গভীর এক ইচ্ছা। মুখে মুখে বলা এই সব গান তো হারিয়ে যাবে একদিন এগুলি কি লিখে রাখা যায় না! ছাপিয়ে বই করা যায় না!
এমনি সময়ে হাতে এল ‘প্রবাসী’ মাসিকপত্রটি। সম্পাদনা করতেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় মশায়। মনসুর লিখছেন, — ‘গ্রামের স্কুলে যখন পড়ি, তখন শহরের এক বন্ধু আমাকে একখানা প্রবাসী দিয়েছিলেন পড়তে। তাতে রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত লালনের কয়েকটা গান ছিল। রবীন্দ্রনাথ এই সংগ্রহ করেছেন দেখে আশ্চর্য লাগল। তখন এই জাতীয় পল্লিগান সংগ্রহে নিজেকে নিয়োজিত করলাম।’ শুরু হল ঘরের পাশ থেকে। বাড়ির পাশে এক মনোহারি দোকানে আসতেন বৈরাগী প্রেমাদাসা। আলাপ জমালেন তাঁর সঙ্গে। সংগ্রহ হল কিছু গান। গ্রামের জাবেদ আলি গাইতেন বারোমাসী গান। তাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করলেন সে সব। এরপর চলে আসেন রাজশাহিতে। সংগ্রহের নেশা তখন জাঁকিয়ে বসেছে। কয়েকটি পত্র-পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে তাঁর সংগৃহীত গান। সে সবে দৃষ্টি পড়ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, শশাঙ্কমোহন সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরদের। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়বার সময় তিনি দীনেশচন্দ্র সেন, বিধুশেখর ভট্টাচার্য, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ক্ষিতিমোহন সেন, অমিয় চক্রবর্তীর কাছাকাছি আসবার সুযোগ পেয়েছেন।

কিন্তু এ দেশে যিনি লোকসাহিত্য ও লোকসংস্কৃতির প্রথম রসপিপাসু, প্রথম সংগ্রাহক, সেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে হবে। ইতিমধ্যে তিনি কবিকে তাঁর সংগৃহীত গান-এর কিছু অংশ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘খুব ভালো কাজ করছ তুমি।’
মনসুর বলেন, ‘হ্যাঁ, বহু কষ্ট করে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি। গোঁড়া মুসলমানরা এগুলো মারতে চাইছেন। কিন্তু এটা কি ঠিক? এগুলো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টি। ভগবানের সৃষ্টি নষ্ট করাও যা, এগুলো নষ্ট করাও তা। এগুলো নষ্ট করলে ভয়ানক ক্ষতি করা হবে। কেন যে এরা এগুলো নষ্ট করতে চান তা আমি বুঝি না। মুসলমানরা যেমন এগুলো পছন্দ করেন না, হিন্দুরাও তেমনি অপছন্দ করতে পারেন। কেন না কুরআনের অনেক কথা এর মধ্যে হুবহু আছে, অনেক technicalities আছে যা মোটেই হিন্দুদের নয়।’
মনসুর বলেন, ‘ভারতের cultural history লিখতে গেলে এ গানগুলোর খুবই দরকার আছে।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘হিন্দু মুসলমানের সমন্বয়ের সময়কার মানুষ ছিলেন দাদু, কবির প্রভৃতি, তারা (গান রচয়িতারা) সেই ধরনের মানুষ, তবে নিম্নস্তরের। আর নিম্নস্তর দিয়েই এই স্রোতটা বয়ে চলেছিল।’ মনসুর রবীন্দ্রনাথকে বলেছিলেন যে তিনি এইসব লোকগীতি সংগ্রহ একটা বই হিসেবে প্রকাশ করতে চান। সে প্রসঙ্গে কবি বলেন, ‘তুমি যখন বলছ তখন তোমার বই-এর একটা ভূমিকা লিখে দেব, চলো না — তুমি আমাদের বিশ্বভারতী দেখে আসবে।’
কিন্তু কবির আহ্বানে সেবার যাওয়া হয় নি শান্তিনিকেতনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা ছিল। পরের এক পৌষমেলার সময় মনসুর গিয়েছিলেন কবির আছে। কবির সেক্রেটারি অমিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে মনসুর গেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে। দিনেন্দ্রনাথকে সঙ্গে নিয়ে কবি তখন ‘অচলায়তনে’র গান শেখাচ্ছিলেন মেয়েদের। অপেক্ষা করতে হল ঘন্টাখানেক। তারপর কবির কাছে যেতে তিনি বললেন, ‘দেখো, আমার নিজের বাউল নিয়েই পাগল, এর পরে আবার তোমাদের বাউল, দেখো আমার অবসর আছে? সকাল ৫ টাতে উঠেছি, এই এতক্ষণ গান শিখালেম। আমি বেশি কিছু লিখতে পারব না, মাত্র দুই-চার ছত্র লিখে দেব।’
মনসুর বলেন, ‘যা পারেন দিন। আপনি Persian teacher-এর কথা বলেছিলেন, তা আমার friend কে লিখেছি, তবে মাইনে কিছু বেশি দিতে হবে।’
কবি বলেন, ‘হ্যাঁ, দাও আমাকে এনে। তিনি এখন কি করেন?’

—‘তিনি এখন সোয়াশ’ টাকা মাইনের একটা চাকরি করেন। আপনি গোটা আশি টাকা দিলে তিনি আসবেন বোধহয়।’ একটু থেমে মনসুর বলেন, ‘আমার এখানে থাকতে খুব ভালো লাগছে।’
উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘তোমরা এসো, তোমরা এলেই আমি বেঁচে যাই। জানো, মুসলমানরা মনে করে আমরা তাদের থেকে দূরে, হিন্দুরাও তাই করে। আমরা পড়ে গেছি ফাঁকে। তোমরা এসো, তাহলেই খুবই খুশি হব। জান, হিন্দু-মুসলমানের মিলন নিয়ে কথা হচ্ছে, এটা এই মনের মিল না হলে হবে না। আমরা এখানে এই মনের মিলের আয়োজন করছি। মানুষের এই মিলটাই সত্যিকারের মিল। আত্মার আহার্যই হচ্ছে সর্বপ্রধান, তারপরে হচ্ছে পেটের আহার্য, এই দুখানে মিল হলেই সত্যিকারের মিল হবে। সুরুলে আমরা economic basis-এ কাজ আরম্ভ করেছি। সেখানে যে কাজ করছি. তাতে হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই উপকার হচ্ছে। রাজনীতির প্রয়োজনের খাতিরে যাঁরা মিলন চান, সে মিলন ঘটলে তা স্থায়ী হবে না, কেননা প্রয়োজনের দরদামে কষা।’
—‘ঢাকার দলকে বোধহয় একটু জানেন, তারা cultural হিসাবে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘হ্যাঁ জানি, আবদুল ওদুদ অতি চমৎকার সমালোচনা লিখেছে।…. তোমরা এলেই আমাদের কাজ করবার সুবিধে হবে। এখানে এসে কারুরই গোঁড়ামি থাকে না, এ জায়গার এমনি গুণ, অতি গোঁড়া ব্রাহ্মণ ফকিরের ছেলে এসেও এক সাথে বসে খায়।’
এবার দেখি মনসুরুদ্দিনের ‘হারামণি’র কি ভূমিকা লিখলেন রবীন্দ্রনাথ। শুরুতে তিনি নিজের প্রসঙ্গ টানলেন, বললেন বাউল গান সম্বন্ধে তাঁর নিজের উৎসাহের কথা, ‘মুহম্মদ মনসুরুদ্দিন বাউল সংগীত সংগ্রহে প্রবৃত্ত হয়েছে। এ সম্বন্ধে পুর্বেই তাঁর সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে আলাপ হয়েছিল, আমিও তাঁকে আন্তরের সঙ্গে উৎসাহ দিয়েছি। আমার লেখা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন বাউল পদাবলির প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউল দলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হত।’
বাউল গান যে তাঁর কবি-আত্মাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল সে কথা মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করলেন তিনি। কবির এই স্বীকারোক্তিকে হাতিয়ার করে পরবর্তীকালে একদল বিদূষক রবীন্দ্রনাথকে চৌর্যাপরাধে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করে। পাগলে কি না বলে! রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগ-রাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে।’
এরপরে তিনি বাউল গানে হিন্দু-মুসলমানের মিলন প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন — ‘আমাদের দেশে যাঁরা নিজেদের শিক্ষিত বলেন, তাঁরা প্রয়োজনের তাড়নায় হিন্দু-মুসলমানের মিলনের নানা কৌশল খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশের ঐতিহাসিক স্কুলে তাঁদের শিক্ষা। কিন্তু আমাদের দেশের ইতিহাস আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনের মধ্যে নয়, পরন্তু মানুষের অন্তরতর গভীর সত্যের মধ্যে মিলনের সাধনাকে বহন করে এনেছে; বাউল সাহিত্যে বাউল সম্প্রদায়ের সেই সাধনা দেখি। এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই, একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করে নি ।

‘এই মিলনে সভা-সমিতির প্রতিষ্ঠা হয় নি, এই মিলনে গান জেগেছে, সেই গানের ভাষা ও সুর অশিক্ষিত মাধুর্য সরস। এই গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলেছে, কোরানে-পুরাণে ঝগড়া বাধে নি। এই মিলনেই ভারতের সভ্যতার সত্য পরিচয়, বিবাদে-বিরোধে বর্বরতা। বাংলাদেশের গ্রামের গভীর চিত্তে উচ্চ সভ্যতার প্রেরণা ইস্কুল-কলেজের অগোচরে আপনা-আপনি কি একম কাজ করে এসেছে, হিন্দু-মুসলমানের জন্য এক আসন রচনার চেষ্টা করেছে, এই বাউল গানেই তার পরিচয় পাওয়া যায়। এই জন্য মুহম্মদ মনসুরুদ্দিন মহাশয় বাউল সংগীত সংগ্রহ করে প্রকাশ করবার যে উদ্যোগ গ্রহন করেছেন আমি তার অভিনন্দন করি; সাহিত্যের উৎকর্ষ বিচার করে না, কিন্তু স্বদেশের উপেক্ষিত জনসাধারণের মধ্যে মানবচিত্তের যে তপস্যা সুদীর্ঘকাল ধরে আপন সত্য রক্ষা করে এসেছে তারই পরিচয় লাভ করব, এই আশা করে।’ পৌষ সাক্রান্তি, ১৩৩৪
মনসুরুদ্দিন ১৩ খণ্ডে ‘হারামণি’ সংকলন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের দেওয়া নামটি বহাল রেখেছিলেন তিনি। এতে প্রায় ৫ হাজারের বেশি গান সংকলিত হয়েছে। প্রথম খণ্ড মনসুর নিজেই প্রকাশ করেন। করিম বক্স ব্রাদার্স থেকে মুদ্রিত হয়। ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় খণ্ড। ১৯৪৮-এ তৃতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চতুর্থ খণ্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে পঞ্চম খণ্ড প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। এরপরে ১৯৬৭-তে ষষ্ঠ খণ্ড, ১৯৬৪ তে সপ্তম খণ্ড, ত্রয়োদশ খন্ড প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। মনসুরের এই সংকলনে লালন ফকির, পাগলা কানাই, আবদুল জব্বার, পাঞ্জু শাহ, মোহাম্মদ ইয়াসিন, আরকুম শাহ, মাদন গানবি, অনন্ত গোসাই, শেখ ভানু, হাসন রাজা, কুরবান, রাধারমণ, মনোমোহন, দ্বিজ দাস কালাচাঁদ পাগলার গান সংকলিত হয়েছিল।
১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ মনসুরকে যে আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন তা এইরকম — ‘তোমার গ্রাম্যগীতি সংগ্রহের অধ্যবসায় সফলতা লাভ করুক, এই আমি কামনা করি।’
মনসুরের দুঃখ, রবীন্দ্রনাথ তাঁর সংগ্রহের বেশিরভাগটা দেখে যেতে পারলেন না। ১৯৪০ সালে কবির সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা। সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর সময়ে। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেন, — ‘তুমি লালন ফকিরের গান সংগ্রহ করেছ না?’
ঋণ :
রবীন্দ্র সন্দর্শন/মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন। হারামণি/মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন। মুসলিম বাংলার সাময়িকপত্র/আনিসুজ্জামান।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক