মুসলমান ছাত্রের বাংলাশিক্ষায় নবাব ও কবি
সৈয়দ নওয়াব আলি চৌধুরী (১৮৬৩-১৯২৯)। ময়মনসিংহের ধনবাড়ি অঞ্চলে ছিল তাঁর জমিদারি। জমিদার, কিন্তু শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ পূর্ণ করাই জীবনের উদ্দেশ্য ছিল না তাঁর। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল ঘনিষ্ঠ। কলকাতা থেকে ‘মিহির ও সুধাকর’ (১৮৯৫) এবং ‘প্রচারক’ (১৮৯৯) নামে যে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হত, সেগুলি পেত নওয়াব আলির অর্থসাহায্য। যাতে পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে প্রেসের অসুবিধে না হয়, তার জন্য তিনি তাঁর স্ত্রী আলতাফুন্নেসার নামে ‘আলতাফি’ প্রেস স্থাপন করেন। মুসলমান ছাত্রদের জন্য বিদ্যালয়ের পাঠোপযোগী বই-এর অভাব দূর করার ব্যাপারে তিনি শুধু উৎসাহ নয়, অবারিত করেন আর্থিক সাহায্য। সেরকম কিছু বই রচিত হলে শিক্ষা বিভাগের কর্তৃপক্ষের উপর প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেগুলি অন্তর্ভুক্ত করেন পাঠ্য তালিকায়।
‘বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়িনী মুসলমান সমিতির’ (১৯০০) সভাপতি ছিলেন তিনি। সম্পাদক ছিলেন ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতির’ (১৯০৫)। ১৮৯৯ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ‘মহমেডান এডুকেশন কনফারেন্স’র সভায় বাংলাদেশে মাতৃভাষা শিক্ষাবিষয়ক একটি লিখিত ভাষণ পাঠ করেন তিনি। দানশীলতা ও গুণগ্রাহিতার জন্য বহু মুসলমান লেখক তাঁদের বই উৎসর্গ করেন নওয়াব আলিকে; যেমন পণ্ডিত রেয়াজুদ্দিন আহমদ মাশহাদির ‘সুরিয়া বিজয়’, নদিয়ার কবি দাদ আলির ‘সমাজ শিক্ষা’, কবি মোজাম্মেল হকের ‘জাতীয় ফোয়ারা’, কায়কোবাদের ‘মহাশ্মশান’।

নওয়াব আলি চৌধুরী ১৯০০ সালে মুসলমান শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুতে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেছিলেন। ‘ভার্নাকুলার এডুকেশন ইন বেঙ্গল’ তারই ইংরেজি অনুবাদ। পরে সেটি পুস্তিকাকারে প্রকাশিত হয়। অনুবাদটি ‘ভারতী’ পত্রিকায় সমালোচনার জন্য পাঠান চৌধুরীসাহেব। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল কি না, তা জানা যায় নি। ‘ভারতী’ পত্রিকায় ( বর্ষ ২৪, ভাদ্র-কার্তিক, ১৩০৭) সেই প্রবন্ধের সমালোচনা করেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
নওয়াব আলি চৌধুরী প্রশ্ন তুলেছেন, কেন দেশের বিদ্যালয়গুলির পাঠ্যপুস্তকগুলি হিন্দু ছাত্রদের উপযোগী করে লেখা হয়; এমন কি যে সব প্রদেশে হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান প্রজাসংখ্যা অধিক সেখানেও এই একই ব্যাপার দেখা যায়।
উত্তরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘এরূপ হইবার কারণ, এতদিন বিদ্যালয়ে হিন্দু ছাত্রসংখ্যাই অধিক ছিল এবং মুসলমান লেখকগণ বিশুদ্ধ বাংলা সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হন নাই’।
একথা বলার পরে রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন যে এখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, তাই পাঠ্যপুস্তকেরও পরিবর্তন দরকার, ‘কিন্তু ক্রমশই মুসলমান ছাত্রসংখ্যা বাড়িয়া চলিয়াছে এবং ভালো বাংলা লিখিতে পারেন এমন মুসলমান লেখকেরও অভাব নাই। অতএব মুসলমান ছাত্রদের প্রতি দৃষ্টি রাখিয়া পাঠ্যপুস্তক রচনার সময় আসিয়াছে’।

এই পাঠ্যগ্রন্থ যে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের সোপান হতে পারে, সে কথা রবীন্দ্রনাথ মনে করেন। রাজনৈতিক পথে ঐক্যস্থাপনের চেষ্টাকে তিনি কোনওদিন সমর্থন করেন নি, কেননা সে ঐক্য কৃত্রিম। দুই প্রতিবেশী যদি পরস্পরকে ঘনিষ্ঠভাবে জানতে ও চিনতে শেখে তাহলেই দুজনের মনের মিল হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলমান যখন ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, পরস্পরের সুখ-দুঃখ নানা সূত্রে বিজড়িত, একের গৃহে অগ্নি লাগিলে অন্যকে যখন জল আনিতে ছুটাছুটি করিতে হয়, তখন শিশুকাল হইতে সকল বিষয়েই পরস্পরের সম্পূর্ণ পরিচয় থাকা চাই। বাঙালি হিন্দুর ছেলে যদি তাহার প্রতিবেশী মুসলমানের শাস্ত্র ও ইতিহাস এবং মুসলমানের ছেলে তাহার প্রতিবেশী হিন্দু শাস্ত্র ও ইতিহাস অবিকৃতভাবে না জানে তবে সেই অসম্পূর্ণ শিক্ষার দ্বারা তাহারা কেহই আপন জীবনের কর্তব্য ভালো করিয়া পালন করিতে পারিবে না’।
শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ পরিষ্কারভাবে জানালেন যে বাংলা বিদ্যালয়ে হিন্দু ছেলের পাঠ্যপুস্তকে তার স্বদেশীয় নিকটতম প্রতিবেশী মুসলমানদের কোন কথা না থাকা অন্যায় ও অসংগত।
এরপরে রবীন্দ্রনাথ দেশের ইতিহাসের প্রশ্ন উত্থপন করেছেন। ইংরেজ এ দেশের যে ইতিহাস রচনা করেছেন, তাতে পূর্ববর্তী মুসলমান রাজত্বের উপর কলঙ্ক লেপন করা হয়েছে, ‘অনেক আধুনিক বাঙালি ঐতিহাসিক মুসলমান রাজত্বের ইতিহাসকে ইংরাজ-তুলিকার কালিমা হইতে মুক্ত করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। অক্ষয়বাবু (অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়) তাঁহার সিরাজচরিতে অন্ধকূপহত্যাকে প্রায় অপ্রমাণ করিতে কৃতকার্য হইয়াছেন’। এ কথা তিনি বলেছেন বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে স্মরণে রেখেছেন আমাদের পরাধীনতার কথা, ‘যতদিন না স্বাধীন-গবেষণা ও সুযুক্তিপূর্ণ বিচারের দ্বারা আমরা ইংরাজ সাহিত্য-সমাজে প্রচলিত ঐতিহাসিক কুসংস্কারগুলিকে বিপর্যস্ত করিয়া দিতে পারি ততদিন আমাদের নালিশ গ্রাহ্য হইবে না’।

সৈয়দ নওয়াব আলি চৌধুরীর আর একটি অভিযোগ ছিল বাঙালি হিন্দু লেখকদের লেখায় মুসলমান বিদ্বেষ প্রসঙ্গে। ১৮৯৯ সালে যে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য বিষয়িনী মুসলমান সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয় সৈয়দ নওয়াব আলি চৌধুরীর সভাপতিত্বে, তার উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি হিন্দু লেখকগণ কর্তক ইতিহাস, কাব্য, নাটক, উপন্যাসে ঐতিহাসিক চরিত্রের বিকৃতির প্রতিবাদ। প্রসঙ্গত বঙ্কিমচন্দ্রের নামও উচ্চারিত হয় এই বিকৃতির আলোচনায়। রবীন্দ্রনাধ বলেন, ‘বঙ্কিমবাবুর মতো লেখকের গ্রন্থে মুসলমান-বিদ্বেষের পরিচয় পাইলে দুঃখিত হইতে হয় কিন্তু সাহিত্য হইতে ব্যক্তিগত সংস্কার সম্পূর্ণ দূর করা অসম্ভব’। উদাহরণ হিসেবে তিনি থ্যাকারের গ্রন্থে ফরাসি-বিদ্বেষের কথা বলেন।
ঋণ :
উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা (১ম)/ ড. ওয়াকিল আহমদ। রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ/ভুঁইয়া ইকবাল। Vernacular Education in Bengal from 1813-1912 / Herbert Alick Stark
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
রবীন্দ্রনাথ ও মুসলনান সমাজ নিয়ে এমন পক্ষপাতহীন লেখা এর আগে পড়িনি। আমি তাই দীলিপদার কল্যাণে বড় ভাগ্যবান।
অনল আবেদিন , আমি সামান্য মানুষ । নিজের মতো করে ভাবি , ভাবতে চাই । কেন জানি এই বয়েসে মনে হয় ধর্মের মতো রাজনীতিরও সংস্কার আছে । বিনয় ঘোষ তাকে বলেছিলেন ‘সংস্কারের ভূত ‘ । সংস্কারের কি সাংঘাতিক শক্তি , তা রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘গুরু’ নাটকে —‘সে যে কাজ করে যায় গর্ভের মধ্যেও । ‘
ঠিক