সব আলো নিভে গেল, এখন যেদিকে চাই দেখি অন্ধকার
১৯৪০ সালের ১৫ জুন। দার্জিলিং-এর পাহাড়ি পথে হাঁটছেন আবুল হোসেন। অগ্রজপ্রতিম আকবর কবিরের সঙ্গে। দেখা করতে চলেছেন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। এই সেই আবুল হোসেন (১৯২২-২০১৪) যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের এক বিখ্যাত কবি হিসেবে পরিচিত হবেন। অবিভক্ত ভারতে তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্র পরিষদের সম্পাদক ছিলেন তিনি। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির কার্যকরী পরিষদ, পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ডের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলা একাডেমির কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও রবীন্দ্র চর্চাকেন্দ্রের সভাপতি আবুল হোসেন।
তার আগের দিন, ১৪ জুন, ভোর পাঁচটায় নাৎসিবাহিনী ঢুকে পড়েছে প্যারিস শহরে। পৃথিবীর কলা-জগতের রাজধানীতে তখন চলছে হত্যার বিভীষিকা। সেই ভোরবেলা প্যারি রেডিয়ো স্টেশন থেকে সম্প্রচারিত হয়েছিল একটি শ্রুতি নাটক। রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’। এ নাটকে রাজনীতি নেই। কিন্তু এই নাটক কেমন করে যেন সাহস জুগিয়েছিল মানুষকে। ১৯২৬ সালে যেমন সাহস দিয়েছিল ইহুদিদের।
দার্জিলিং-এর ম্যাল থেকে ঘুম হয়ে মংপুতে গিয়েছিলেন আবুল হোসেনরা। ১৮ মাইল রাস্তা। পায়ে হেঁটেই পাড়ি দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু বিধি বাম। মংপুতে পৌঁছে তাঁরা শুনলেন রবীন্দ্রনাথ সেখানে নেই। যাঁর আতিথ্যে তিনি এসেছিলেন, সেই মৈত্রেয়ীদেবীও নেই সেখানে। শুনলেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে কালিমপঙ।

আবুল হোসেন।
এখন কি করবেন আবুল হোসেনরা!
ভাগ্যিস রাস্তায় দেখা হয়ে গেল প্রেসিডেন্সির অধ্যক্ষ ভূপতিমোহন সেনের সঙ্গে। তিনি তাঁর গাড়িতে আবুল হোসেনদের নিয়ে গেলেন মংপু থেকে মাইল আটেক দূরে এক ডাকবাংলোয়। রাতটা কাটাতে পারবেন ডাকবাংলোয়। পরের দিন যাবেন কালিমপঙ।
পরের দিন ভোরে আবার হন্টন। ডাকবাংলো থেকে কালিমপঙ মাইল সাত.আট। তীর্থদর্শনে যেতে হলে কষ্ট তো করতে হবেই। বেলা সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছলেন কালিমপঙ। শুনলেন রবীন্দ্রনাথ উঠেছেন গৌরীপুর মহারাজার বাড়িতে। সে বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে একটা বেজে গেল।
তাঁরা দেখা করলেন রবীন্দ্রনাথের সেক্রেটারির সঙ্গে। কিন্তু সেক্রেটারির সাফ কথা, ‘কবি অসুস্থ। একটু আগে তিনি খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নিচ্ছেন। এখন দেখা করা সম্ভব নয়।‘
আবুল হোসেন বললেন, ‘আমরা কোন কথা বলব না। শুধু দেখে চলে আসব’।
তবু সেক্রেটারির হৃদয় গলল না।
এইসব কথাবার্তা কানে গিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। তিনি ডেকে পাঠালেন সেক্রেটারিকে। সেক্রেটারি ফিরে এসে বললেন, ‘আসুন আপনারা। গুরুদেব আপনাদের ভেতরে নিয়ে যেতে বলেছেন’।
গুরুদেব বলেছেন! আবুল হোসেনরা আনন্দে উদ্বেল।
রবীন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকলেন তাঁরা। একটা বিপুলাকার খাটে শুয়ে আছেন কবি। তাঁর পা থেকে গলা পর্যন্ত একটা কালো চাদরে ঢাকা। চোখ বন্ধ। আবার কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? খুব সন্তর্পণে আবুল হোসেনরা কবির পা ছুঁয়ে প্রণাম করলেন। কবি একবার চোখ খুলে আবার চোখ বন্ধ করলেন। তারপর চুপচাপ। কেটে গেল অনেকক্ষণ। বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন অসুস্থ কবি।
তাহলে কি ফিরে যাবেন আবুল হোসেন?
এমন সময়ে কবির ঠোঁট নড়ে উঠল। অস্ফুট স্বরে তিনি বলছেন, ‘শুনেছ, প্যারিসের পতন হয়েছে! প্যারিস এখন ফ্যাসিস্টদের দখলে! আজ সকালে শুনলুম রেডিয়োতে। বিশ্ব সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেল। নিভে গেল সব আলো। এখন যেদিকে চাই দেখি অন্ধকার, শুধু অন্ধকার’।
কবির আবেগ স্পর্শ করল আবুল হোসেনদের। একজন অসুস্থ মানুষ নিজের যন্ত্রণা ভুলে ব্যথা পাচ্ছেন প্যারির পতনে!
একটু পরে কবি আবার অস্ফুটস্বরে বললেন, ‘এখন আর বেঁচে থাকে লাভ কি?’
এর কিছুদিন পরে এই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’। পরম বেদনায় বলেছিলেন, ‘জীবনের প্রথম আরম্ভে সমস্ত মন থেকে বিশ্বাস করেছিলুম ইউরোপের অন্তরের সম্পদ এই সভ্যতার দানকে। আর আজ আমার বিদায়ের দিনে সে বিশ্বাস একেবারে দেউলিয়া হয়ে গেছে’। তবু তিনি শেষ পর্ষন্ত মানুষের উপর বিশ্বাস হারান নি। বলেছেন, ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে’।
ঋণ :
চলে গেলেন কবি আবুল হোসেন / দৈনিক সমকাল ; ২৯ জুন, ২০১৪ । শেষ দেখা / আবুল হোসেন। কালান্তর / রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক