জনারণ্যে থেকেও তিনি ডুব দিয়েছেন মন-সলিলে
হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি ১৮৯২ সালে মেদিনীপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বিচারপতি স্যার জাস্টিস জাহিদ সোহরাওয়ার্দি তাঁর পিতা, এবং উর্দু লেখিকা খুজান্তা আখতার বানু তাঁর মাতা। পরিবারের কথোপকথনের ভাষা ছিল উর্দু। কিন্তু হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি নিজের চেষ্টায় শিখে নিয়েছিলেন বাংলাভাষা। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার আলিয়া মাদ্রাসায়। তারপরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে লাভ করেন স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। ১৯১৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে গিয়ে ভর্তি হন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।
এই অক্সফোর্ডে ছিল বিখ্যাত অক্সফোর্ড মজলিস। ভারতীয় ছাত্ররা ১৮৯৬ সালে স্থাপন করেন এই মজলিস বা আলোচনাসভা। ৫ বছর আগে স্থাপিত কেমব্রিজ মজলিসের আদলে তৈরি হয় অক্সফোর্ড মজলিশ। প্রতি রবিবার ভারতীয় ছাত্ররা মিলিত হতেন এখানে। সোলোমন বন্দরনায়েক, এম.সি.চাগলা, গোবিন্দকৃষ্ণ চেট্টুর, ইন্দিরা গান্ধী, মহম্মদ হাবিব, হুমায়ুন কবির, বসন্তকুমার মল্লিক, কে.পি.এস. মেনন, হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি প্রভৃতিরা ছিলেন অক্সফোর্ড মজলিসের সদস্য। রবীন্দ্রনাথ ইংল্যাণ্ডে এলে এই মজলিসের পক্ষ থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ‘Tagore in Oxford’ প্রবন্ধে হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দি তার বিবরণ দিয়েছেন। এই বিবরণে রবীন্দ্রনাথের যে রূপ ফুটে উঠেছে, সে রূপের বিবরণ মুসলমান লেখক বা হিন্দু লেখকদের লেখায় আমি তেমনভাবে পাই নি। কেমন সে রূপ? সে রূপ হল, জনারণ্যে থেকেও রবীন্দ্রনাথ ডুব দিতে পারতেন মন-সলিলে।
লণ্ডনে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ। ঠিক হল অক্সফোর্ড মজলিশ থেকে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। সে ভার পড়ল শহিদ সোহরাওয়ার্দির উপর। কিন্তু তিনি দ্বিধাগ্রস্ত। কারণ অক্সফোর্ড মজলিশ সম্বন্ধে বদনাম। এই মজলিশ বিভিন্ন ভারতীয়দের আমন্ত্রণ করে আর তাদের ভীষণভাবে নাজেহাল করে নানা রকম দুষ্টুমি করে। হয়তো রবীন্দ্রনাথের কানে এই বদনামের খবর পৌঁচেছে। তিনি যদি আমন্ত্রণ নামঞ্জুর করেন!
তাই কি করতে হবে?
কবিকে বোঝাতে হবে যে অন্যের বেলায় তাঁরা যাই করুন না কেন, রবীন্দ্রনাথের বেলায় তা হবে না। রবীন্দ্রনাথের কাছে গিয়ে বিনীতভাবে কি বলবেন, সোহরাওয়ার্দি নির্জন ঘরে তার মহড়া দিলেন। এর মধ্যে তাঁরা শুনলেন রবীন্দ্রনাথ ম্যানচেস্টার কলেজে আসছেন, সুতরাং তাঁকে অনুরোধ করা হবে তিনি তাঁর সময়ের অর্ধেক ম্যানচেস্টার কলেজকে দেবেন, বাকি অর্ধেক দেবেন অক্সফোর্ড মজলিশকে। তাছাড়া রবীন্দ্র-পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী প্রতিমাদেবী আসছেন অক্সফোর্ড দেখতে, তাঁদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে আনার আর্জি তাঁরা জানাতে পারেন।

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ তাঁদের সম্মতি দিয়েছেন। তবু আনুষ্ঠানিকভাবে নিমন্ত্রণপত্র দিতে হবে। সোহরাওয়ার্দি তাই একদিন প্যাডিংটন স্টেশনে পৌঁছে ট্যাক্সি করে চেলসিতে গেলেন। সেখানেই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গিয়ে কি দেখলেন সোহরাওয়ার্দি?
…কবি একটা ডিভানের উপর বসে ছিলেন। তাঁর চারপাশে নানা ভারতীয়, ইংরেজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় নর-নারী। ঘরের এককোণে একজন ইংরেজ মহিলা মাটি দিয়ে কবির মাথার ছাঁচ গড়ছিলেন। একজন যুবক কবির আলখাল্লার ভাঁজগুলি অনবদ্য রেখায় ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করছেন। কেউ কোন কথা বলছিলেন না। ঘরের সেই সজীব নিস্তব্ধতায় সোহরাওয়ার্দির অস্বস্তি হচ্ছিল…
…সেদিন ভেবেছিলাম যে ভাস্কর ও চিত্রকরের সুবিধার জন্যই কবি নিশ্চল মূর্তিতে নিমীলিত চোখে বসে আছেন। কিন্তু পরে তার তাৎপর্য ভালো করে বুঝেছি। ইচ্ছামতো ও বিনা আয়াসে তিনি নিজের মধ্যে ডুবে যেতে পারতেন এবং তখন তাঁর যে নিস্পন্দ ভাস্কর্যরূপ, তা অনন্যসাধারণ। এ দুর্লভ শক্তির বিকাশ কবির মধ্যে যে পরিমাণে দেখেছি, অন্য কোথাও তা দেখি নি।…
…সাহচর্যের ভিতর সুদূর নিঃসঙ্গতা, কথাবার্তার মধ্যে হঠাৎ অন্তরতম জীবনের সঙ্গে নিবিড়সংযোগ ,পারিপার্শ্বিক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করবার এ শক্তি স্বপ্নদ্রষ্টা ও আদর্শবাদীদেরই থাকে, তাঁরও ছিল।
ঠিক এই কারণেই আমি এ লেখার নাম দিয়েছি ‘জনারণ্যে থেকেও তিনি ডুব দিয়েছেন মন-সলিলে’।
সোহরাওয়ার্দি তাঁর স্মৃতিচারণায় আরও অনেক মজার কথা বলেছেন। চেক জাতীয় নাট্যশালায় ‘চিত্রাঙ্গদা’ ও ‘ডাকঘরের’ অভিনয়ের কথা। তার অয়োজক ছিলেন সে নাট্যশালার অধ্যক্ষ হিলারসাহেব। রবীন্দ্রনাথ সে অভিনয় দেখেন। পরের দিন সকালে হিলার যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। তখন ঘরের মধ্যে বহু লোক। কবি চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। —“কবি চোখ খুললে তাঁর সাথে আলাপ করবেন এই আশায় হিলারও একটা চেয়ার নিয়ে বসে রইলেন। কিন্তু তাঁর সে আশা পূর্ণ হয় নি। অবশেষে মর্মাহত হয়ে তিনি চলে গেলেন।”
র্যাণ্ডলফ হোটেলে কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রাণোচ্ছল মূর্তি দেখেন সোহরাওয়ার্দি। তিনি বলেছেন, “জীবনের সব ভালো জিনিসেরই রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সমজদার, খাদ্য সম্বন্ধেও তাঁর বিচার ছিল তীক্ষ্ণ। ভারতের চিরন্তন আধ্যাত্মিকতার দোহাই দিয়ে যাঁরা নিজেদের ক্ষীণ পরিপাকশক্তির সাফাই দিতে চান, রবীন্দ্রনাথ কোনদিনই তাঁদের দলে ছিলেন না। ভোজনবিলাসের ব্যাপারে আমার বেপরোয়া ওকালতি সব সময়ই তাঁর কাছে উৎসাহ পেয়েছে।”

গ্রীষ্মকালে অক্সফোর্ডে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তখন অক্সফোর্ড-এর সৌন্দর্য পূর্ণ বিকশিত হয়। —“চারিদিকে ছড়িয়ে-ফেলা সৌন্দর্যের প্রাচুর্য দেখে তাঁর উল্লাসে যোগ দেওয়ার সে কি অবর্ণনীয় সুখ। তাঁর সঙ্গে একা থাকতে পারি নি, এইটুকুই যা ছিল দুঃখ। কবির অসাধারণ রূপের জন্য একদল লোক সর্বদাই তাঁর পিছে পিছে ঘুরে বেড়াত। সেদিন সন্ধ্যায় আমার ল্যাণ্ডলেডির ছোট মেয়েটি এসে আমাকে বলল যে সে আমাকে ফাদার ক্রিসমাসের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটতে দেখেছে। বালিকা জানে নি যে সে বছর আমাদের জীবনে কি অমূল্য সম্পদ তিনি এনে দিয়েছিলেন। মধ্যাহ্ন-ভোজনের আগে আমাদের সঙ্গে নৌকাতে এসে রঙিন তাকিয়ায় হেলান দিয়ে কবি বসলেন। গাছের ডালপালা নুয়ে নদীর ক্ষীয়মান ধারার উপর যেখানে আচ্ছাদন তৈরি করেছে, আমরা নৌকো করে তাঁকে সেদিকে নিয়ে গেলাম। সারাক্ষণ শুভ্রোজ্জ্বল বেশে মর্মর মূর্তির মতো নিশ্চল হয়ে বসে রইলেন। আমার মনে হচ্ছিল অরফিয়ুসের কথা — ইউনানি জাহাজের গলুইয়ে খোদাই করা তাঁর মূর্তি আয়োনিয়ান সমুদ্রের জলে তার ছায়া।”
অক্সফোর্ড থেকে মাইল ছয়েক দূরে ছিল কবি রবার্ট ব্রিজেসের বাড়ি। পাহাড়ের উপর বড় একটা নির্জন বাড়িতে থাকতেন ব্রিজেস। রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন ব্রিজেসের বাড়ি। সোহরাওয়ার্দির মনে হয়েছিল যেন প্রাচ্য আর পাশ্চাত্য আলাপ করছেন এক জায়গায় বসে। যে গাড়িতে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, ফিরে গেলেন সেই গাড়িতে। সোহরাওয়ার্দি ঠিক করলেন তিনি পায়ে হেঁটে অক্সফোর্ডে ফিরবেন। আসার সময় রবার্ট ব্রিজেস তাঁকে বললেন, ‘ঠাকুর অসাধারণ সুন্দর পুরুষ। তাঁর মধ্যে কি যেন একটা অবাস্তব রয়ে গেছে, খানিকটা আসিরীয়, খানিকটা প্রাচীন এশিয়ার স্মৃতিময়।
ঋণ :
The Last Enchantment : Recollections of Oxford // G.K.Chettur . Memoirs of Huseyn Shaheed Suhrawardy / H.R.Mohammad Talukdar . Tagore at Oxford / Hasan Shahid Suharawardy
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক