যোগাযোগের দূত হল চিঠিপত্র
জীবনে বহু চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কয়েক হাজার তো নিশ্চয়ই। কার্পণ্য ছিল না চিঠি লেখার ব্যাপারে। হিন্দু-মুসলমান, পণ্ডিত অথবা নিতান্ত সাধারণ মানুষ, যাঁরা তাঁকে চিঠি লিখেছেন, উত্তর পেয়েছেন। বছর কয়েক আগের কথা। আমি হঠাৎ রবীন্দ্রনাথকে লেখা আবুল ফজলের চিঠি এবং আবুল ফজলকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠির সন্ধান পেয়ে গেলাম। ভাবলাম আমিই বুঝি এ ব্যাপারে পথিকৃতের সম্মান লাভ করব। তড়িঘড়ি সেই চিঠিগুলোকে নিয়ে লিখে ফেললাম এক প্রবন্ধ — ‘আবুল ফজল ও রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপ’। এটা যে শেষ পর্যন্ত আমার প্রলাপ হবে, তা বুঝতে কয়েকদিন সময় লাগল। প্রবন্ধটি এক বিখ্যাত পত্রিকায় পাঠিয়ে দিলাম। সেই পত্রিকায় প্রায়শ রবীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত পত্রাবলি ছাপা হয়। দিন কুড়ি বাদে বিখ্যাত পত্রিকার সুখ্যাত সম্পাদক ফোন করলেন, জানতে চাইলেন এ সব চিঠি অন্য কোথাও প্রকাশিত হয়েছে কি না ভালো করে খোঁজ-খবর করতে। সতর্ক করে তিনি বলে দিলেন বহু গবেষক শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র ভবনের চারধারে ঘুর ঘুর করেন, কে যে কখন এ সব চিঠি হাতিয়ে নিয়েছেন তা দেখতে হবে।
কয়েক দিন বাদে শুরু হল কলকাতা বইমেলা। ঘুরতে ঘুরতে বাংলাদেশের এক বই-এর স্টলে দেখতে পেলাম একটা বই। ভুঁইয়া ইকবালের ‘রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র’। পাতা ওল্টা্তেই চক্ষু চড়কগাছ। এই বইতেই আছে আবুল ফজল ও রবীন্দ্রনাথের পত্রালাপ। পথিকৃতের গর্ব মাটিতে মিশে গেল।

আবুল ফজল
ভুঁইয়া ইকবাল (১৯৪৬-২০২১) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে মুসলমান বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের সম্বন্ধ নিয়ে তিনি বহুদিন কাজ করছেন। ‘রবীন্দ্রনাথের একগুচ্ছ পত্র’ বইটিতে তিনি মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ৫২টি চিঠি সংগ্রহ করেছেন। ১৯১৩ থেকে ১৯৩৯ পর্যন্ত কালসীমার মধ্যে এই সব চিঠি রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন জোড়াসাঁকো, শান্তিনিকেতন, বেলঘরিয়া, মংপু, কালিমপঙ, আলমোড়া থেকে।
পত্রপ্রাপকদের মধ্যে এয়াকুব আলি, কাজি আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মুহম্মদ মোজাম্মেল হক, সুফিয়া কামাল, ডা. আর আহমদ, বন্দে আলি মিয়া, শামসুন্নহার মাহমুদ, জসিমুদ্দিন, কাজি নজরুল ইসলাম, স্যার আজিজুল হক, কাজি মোতাহার হোসেন, রেজাউল করিম, আবদুল কাদির, খান মোহাম্মদ মইনুদ্দিন, হুমায়ুন কবির, আবুল ফজলের মতো খ্যাতনামা মানুষ যেমন আছেন, তেমনি আছে সাড়ে পাঁচ বছরের শিশু মামুন মাহমুদ, বগুড়া ভি এম গার্লস স্কুলের ছাত্রী বারো বছরের জেবুন্নিসা, চট্টগ্রামের পনেরো বছরের ছাত্র ফেরদাউস খান, ময়মনসিংহ জেলা স্কুলের চোদ্দ বছরের ছাত্র সাহালাম (আশরাফ সিদ্দিকি), সদ্য পরিণীতা কিশোরী ফিরদৌস করিম।
পত্রপ্রাপকদের মধ্যে ১৬/১৭ জনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। বাকিরা অপরিচিত। তাঁদের চিঠির উত্তরও তিনি দিয়েছেন। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তিনি লিখেছিলেন দুটি চিঠি। তার মধ্যে একটি লিখেছিলেন তাঁর দন্ত-চিকিৎসক ডা. আর আহমেদকে। আর একটি চিঠি লিখেছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তদানীন্তন উপাচার্য স্যার আজিজুল হককে।

ভুঁইয়া ইকবাল
চিঠিগুলির বিষয়বস্তু বিচিত্র। দেশের রাজনৈতিক অবস্থা, হিন্দু-মুসলমানের সমস্যা, শিক্ষা ব্যবস্থা, ভাষা ও শব্দ ব্যবহার, সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা ইত্যাদি। চিঠিগুলির মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব। যে ১৭টি বাংলা ও ইংরেজি বই সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেছেন সেগুলি হল : —
১। মহম্মদ এয়াকুব আলি চৌধুরীর ‘নূর নবি’।
২। কাজি ইমদাদুল হকের ‘আবদুল্লাহ’।
৩। আনোয়ারুল কাদিরের ‘আমাদের দুঃখ’।
৪। কাজি আবদুল ওদুদের ‘নদীবক্ষে’ ও ‘রবীন্দ্র কাব্যপাঠ’।
৫। মুহম্মদ শহীদুল্লাহের ‘বাঙ্গালা ব্যাকরণ’ ও ‘ভাষা ও সাহিত্য’।
৬। বন্দে আলি মিয়ার ‘ময়নামতীর চর’।
৭। মহিউদ্দিনের ‘মহামানবের মহাজাগরণ’।
৮। জসিমুদ্দিনের ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’।
৯। রেজাউল করিমের ‘নয়া ভারতের ভিত্তি’।
১০। কাজি মোতাহার হোসেনের ‘সঞ্চরণ’।
১১। আবদুল কাদিরের ‘দিলরুবা’।
১২। মইনুদ্দিনের ‘মুসলিম বীরাঙ্গনা’।
১৩। হুমায়ুন কবিরের ‘অষ্টাদশী’।
১৪। মির আজিজুর রহমানের ‘মাস্তানা’।
১৫। আবুল ফজলের ‘চৌচির’।
১৬। মোহাম্মদ আজিজুল হকের ‘The Man behind the Plough’.
বই সম্পর্কে অভিমত রবীন্দ্রনাথ যেমন দিয়েছেন, তেমনি কয়েকটি পত্রিকা, কবিতা ও কাব্যানুবাদ সম্পর্কেও তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এই বইতে রবীন্দ্রনাথ যাঁদের চিঠি লিখেছেন, তাঁদের চিঠিও যদি সংযুক্ত হত, তাহলে সর্বাঙ্গসুন্দর হত। রবীন্দ্রনাথকে লেখা নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের চিঠি ভুঁইয়া ইকবাল সংযুক্ত করেছেন তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ বইটিতে :
মির আজিজুর রহমান, মোহাম্মদ হেদায়েতুল্লা, মামুন মাহমুদ, কাজি নজরুল ইসলাম, সৈয়দ আবদুর রব, স্যার আজিজুল হক, কাদের নওয়াজ, নুরুল আলম, আ ন ম বজলুর রশিদ, মইনুদ্দিন, হুমায়ুকন কবির, নাজিরুদ্দিন আহমদ, আকাশ নূর মহম্মদ, আবদুস সাত্তার, জেবুন্নিসা, সুফিয়া এম হোসেন, আমিনুদ্দিন, মমতাজ বেগম, কাজি আবদুল ওদুদ, কাজি আহমদ, আবদুল বারি চৌধুরী, আমিনা মোজহার, আবুল ফজল, ফিরদৌস করিম, মুহম্মদ সফিউল্লাহ, সৈয়দা হাসনা আরা, সৈয়দ মাহদি ইমাম, আগা খান, স্যার আকবর হায়দারি, এম হোসেন, এ ইউসুফ আলি, স্যার মোহাম্মদ ইউসুফ ইসমাইল, ড. আব্বাস আলি খান।
চিঠিপত্রের প্রসঙ্গ অবতারণা করলাম এটা বোঝাতে যে মুসলমান বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী ও সাধারণ মানুষ — স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী, গৃ্হবধূ — কারোকেই উপেক্ষা করেন নি রবীন্দ্রনাথ।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক