আরব সাহিত্য জগতে রবীন্দ্রনাথ
১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর। ঘোষণা হল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভারতবর্ষের সন্তানের এই সর্বোচ্চ পুরস্কার লাভে ভারতের গর্বের অন্ত্য নেই। কিন্তু গর্ব তো শুধু ভারতের নয়। গর্ব সমগ্র এশিয়ার। এশিয়ায় এই প্রথম এল নোবেল পুরস্কার। তাই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে মাতামাতি। পিছিয়ে রইল না আরব দুনিয়া। আরবের বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে নোবেল প্রাপ্তির খবর বড় করে প্রকাশিত হল। ইজিপ্ট এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে। সেখানকার ‘আল-আহরাম’ (Al-Ahram), ‘আল-হিলাল’ (Al Hilal), ‘আল-জিনান’ (Al-Jinan), ‘আল-মুক্তাটাটাফ’ (Al-Muqtaṭaf) পত্রিকায় প্রকাশিত হল সে খবর। সেমিনার, আলোচনাসভায় রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি নিয়ে আলোচনা শুরু হল। আরবের মানুষ প্রথমে ইংরেজি ও ফরাসি অনুবাদের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে পরিচিত হলেন, তারপর রবীন্দ্র রচনা আরবিভাষায় অনূদিত হল।
পরের বছর, ১৯১৪ সালে, লেবাননের প্রখ্যাত লেখক ওয়াদি আল-বুস্তানি (Wadi’ al-Bustani) এলেন শান্তিনিকেতনে। এই বুস্তানি একজন লেখক ও অনুবাদক। ইনি আরবি ভাষায় ওমর খৈয়ামের ‘রুবায়েত’ অনুবাদ করেছিলেন। দু’দিন ছিলেন তিনি সেখানে। রবীন্দ্রনাথকে দেখে, তাঁর সঙ্গে কথা বলে আপ্লুত তিনি। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কাছে দেবদূতের মতো প্রতিভাত হল। ২০১৬ সালে বুস্তানি ‘আল-হিলালে’ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লিখলেন চমৎকার এক নিবন্ধ। পরে তিনি আরবি ভাষায় অনুবাদ করলেন ‘গীতাঞ্জলি’।
১৯২৬ সালে রবীন্দ্রনাথ এলেন ইজিপ্টে। তাঁর লেখায় আলাদাভাবে ইজিপ্ট ভ্রমণের কথা নেই ; ‘পারস্যে’ বইতে শুধু তার উল্লেখ আছে। আরবি সূত্র থেকে জানা যায় যে কবি আলেকজান্দ্রিয়ায় নামেন।২৭ নভেম্বর সেখানকার আল-হামারা অপেরায় (Al-hamara opera) ভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি বলেছিলেন বিশ্বের সমস্ত জীবের মধ্যে ঈশ্বরের বাস। ২৯ নভেম্বর কায়রোর হাদিকা আল-উজবুকিয়া (Hadiqa al uzbekia opera) অপেরায় তিনি আর একটি ভাষণ দেন। সে ভাষণে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির পার্থক্যের আলোচনা করেন। কবির এই দুটি ভাষণের কথা আল-জাহারা পত্রিকায় লিখেছিলেন মুহিবুদ্দিন আল-খাতিব (Muhibb ud-Din al-Khateeb)। পরে তিনি এ নিয়ে একটি বইও লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ইজিপ্ট ভ্রমণের কথা লিখেছেন আরও কয়েকজন আরবের লেখক। যেমন হাসান শোয়াকি। এঁর বাবা আহমেদ শোয়াকি ইজিপ্টের বিখ্যাত লেখক। রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন তিনি, যেখানে বহু আরবি কবি-সাহিত্যিক সমবেত হন। হাসান শোয়াকি তাঁর বই ‘মাই ফাদার শোয়াকি’ বইতে সে সব কথা লিখেছেন। তাহা হাসিনও তাঁর আত্মজীবনীতে কবির ইজিপ্ট ভ্রমণের কথা লিখেছেন। সে আত্মজীবনীর নাম ‘আল-আয়াম’ (Al Aayaam)। গণতন্ত্র, মানবতা ও সৌন্দর্যের পূজারী রবীন্দ্রনাথের কথা লিখেছেন সায়েদ কুতব (Sayyid Qutb)।
এর পর রবীন্দ্র রচনার আরবি অনুবাদ শুরু হল বিপুল উৎসাহে। শুধু ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ হল বেশ কয়েকটি। বুস্তানি ছাড়া অন্য অনুবাদরা হলেন হাজিম নাজিম ফাদিল, আদনান বাগজাতি, মিশল উবরি, সুহাইলা আল-হুসেইনি, মুসা আল-খুরি, নাজিন জাবি। লিবিয়ার খালিফা মুহম্মদ আত তিলিশির ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ ছিল অনবদ্য। এখানে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে ভারতে যে সব আরবিভাষার পণ্ডিত ছিলেন, তাঁরাও রবীন্দ্রচর্চায় মনোনিবেশ করেছিলেন ; যেমন অধ্যাপক রহতুল্লা, তরুণ গবেষক হারুন অল-রশিদ . মির্জা নিহাল আহমদ বেগ।
আব্দুল্লাহিল বাকি তাঁর ‘আরবে উঠিল রবির কর’ নিবন্ধে বলেছেন যে রবীন্দ্র সাহিত্য আরবে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি হয়েছিল। বিখ্যাত ফরাসি ঊপন্যাসিক আদ্রেঁ জিদ যখন ভারতের দু-জন কবি রবীন্দ্রনাথ ও কবিরের কবিতা অনুবাদ শুরু করেছিলেন তখনই আরবি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের প্রবেশ ঘটে। ইংরেজি থেকে নয়, ফরাসি থেকেই আরবি ভাষায় রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম অনূদিত হয়। তার একটা রাজনৈতিক কারণ ছিল। আরবি সাহিত্যের রাজধানী তখন মিশর। আর এই মিশরেই চলছিল ফরাসিদের ঔপনিবেশিক রাজনীতি।
১৯৩২ সালে রবীন্দ্রনাথ আসেন ইরাকে। বিখ্যাত ইরাকি কবি জামিল সিদকি আল-জাহাবি ও মারুফ আল-রুশাফি তাঁর বিপুল সংবর্ধনার আয়োজন করেন। পরবর্তীকালে জামিল সিদকি আল-জাহাবি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন, যে কবিতায় কবির আত্মজিজ্ঞাসা প্রকাশ পেয়েছিল। সমালোচক ইহায়া খাসব বলেছেন আরব দুনিয়া যে সময়ে একটা নতুন দর্শনের জন্য উদগ্রীব ছিল, সে সময়ে রবীন্দ্রনাথকে পেয়ে তাদের আকাঙ্খা পূর্ণ হল। আরবি সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সংযোগ খোঁজার চেষ্টা করেন অনেক আরবি লেখক। তাঁদর অনেকের মত এই যে রবীন্দ্রনাথ হাফিজ সিরাজি, জালালুদ্দিন আল-রুমির মতো সুফি সাধকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। আলি শালশের মতে আরবি কবিতার সঙ্গে রবীন্দ্র কবিতার অনেক সাদৃশ্য আছে। ফাহাদ জাবুর মনে করেন রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদী কবি, তবে তাঁর জাতীয়তাবাদ মানবতাবাদ থেকে উৎসারিত। ইরাকে কবিকে নানা উপাধি দেওয়া হয়েছিল; যেমন ‘সংস্কৃতির দূত’, ‘সৌন্দর্য ও প্রজ্ঞার কবি’, ‘ইরাকের মহৎ অতিথি’, ‘ন্যায় ও মানবতার পতাকাবাহী’, ‘অনন্য দার্শনিক’ ইত্যাদি। একবিংশ শতকেও আরব জগতে — বিশেষত ইজিপ্ট, লেবানন, সিরিয়ায় অব্যাহত আছে রবীন্দ্রচর্চা। ২০১১ সালে তাঁর ১৫০তম জন্মবার্ষিকী সমারোহের সঙ্গে পালিত হয়েছে।
ঋণ
আরবে উঠিল রবির কর (প্রবন্ধ) : আব্দুল্লাহিল বাকি। Tagore in the land of Arabian Nights/(The Telegraph, 15.12.2011) /B.Rahaman. A Glimpse of the Reception of Tagore in the Arabic Literature./Dr. Mukhlesur Rahman
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয়ের লেখা পাচ্ছি। পড়তে বেশ ভালো লাগছে। জানছি অনেক কিছু। চলতে থাক এভাবে।
মাননীয় মহাশয়,
আপনার প্রবন্ধের আলোচনা খুবই মনোগ্রাহী।
আমি রুমি ও সুফি দর্শন বিষয়ে খুবই আগ্রহী।
রবীন্দ্রনাথের রচনায় রুমি ও সুফি দর্শনের প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করতে আগ্রহী।আপনি যদি দয়া করে আমাকে সহযোগিতা করেন চিরঋণী থাকব ।
প্রণাম নেবেন। ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।