কবির কবীর অথবা রবীন্দ্রনাথের কবীর
কবীর। শব্দটা এসেছে আরবি থেকে –আল-কবির, যার অর্থ মহান। আমাদের দেশের মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কবীর। তাঁর প্রামাণ্য জীবনী পাওয়া যায় নি। জানা যায় না তাঁর সঠিক জন্মসাল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তথ্য থেকে জানা যায় তিনি মুসলমান ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন (এ সম্পর্কেও অবশ্য ভিন্ন মত আছে), বড় হয়েছিলেন তাঁত শিল্পের মধ্যে। তাই হয়তো তাঁর রচনায় বার বার এসেছে বুনন শিল্পের কথা। দারিদ্র্যের মধ্যে মানুষ হন তিনি। লেখাপড়া শেখা সম্ভব ছিল না। তবে তাঁর সহজাত কবিত্ব ছিল, সহজাত প্রজ্ঞা ছিল। মুখে মুখে গান ও দোহা রচনা করতেন। কালে কালে সে সব গান ছড়িয়ে যায় কাশী, দিল্লি, পঞ্জাব, রাজস্থান, গুজরাট, বিহার, বাংলা ও ওড়িশায়। ধর্মীয় ভেদাভেদ মানতেন না তিনি। মানতেন না জাতপাত। সরল লোকায়ত উপাদান ব্যবহার করতেন গান ও দোহায়। তাই সে সব রচনা জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর সময়কালে এবং কিছু পরে তাঁকে নিয়ে রচিত হয় অনেকগুলি গ্রন্থ; যেমন, খেমরাজ কৃষ্ণদাসের ‘বীজকমূল’, পূর্ণদাস সাহেবের ‘বীজক কবীর সাহবকা’, স্বামী যুগলানন্দের ‘কবীর সাগর’, শিবহরের ‘সত্য কবীরকী সাথী’, প্রমাণন্দজি-মকনজি কুবেরের ‘কবীর মনশূর’ ইত্যাদি।
আমাদের দেশের একজন শ্রেষ্ঠ গীতিকবি, প্রতিভাশালী রবীন্দ্রনাথ কবীরর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন, তাঁর গানের সংকলন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব আলোচনার আগে আমরা কবীর সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা উল্লেখ করব। কবিতার নাম ‘অপমান-বর’। কবিতাটি রবীন্দ্রের ‘কথা’ কাব্যগ্রন্থে আছে। তিনি কিছুটা বাস্তব উপাদানের সঙ্গে তাঁর কবি-কল্পনা মিশিয়ে রচনা করেছিলেন কবিতাটি —
ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে।
কুটির তাহার ঘিরিয়া দাঁড়ালো লাখো নর-নারী এসে।
কেহ কহে,’মোর রোগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহো’,
সন্তান লাগি করে কাঁদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ।
কেহ বলে, ‘তব দৈব ক্ষমতা চক্ষে দেখাও মোরে’,
কেহ কয়, ‘ভবে আছেন দেবতা বুঝাও প্রমাণ করে’।
কাঁদিয়া ঠাকুরে কাতর কবীর কহে দুই জোড় করে,
‘দয়া করে হরি জন্ম দিয়েছ নীচ যবনের ঘরে—
ভেবেছিনু কেহ আসিবেনা কাছে অপার কৃপায় তব,
সবার চোখের আড়ালে কেবল তোমায় আমায় রব।
এ কি কৌশল খেলেছ মায়াবী, বুঝি দিলে মোরে ফাঁকি।
বিশ্বের লোক ঘরে ডেকে এনে তুমি পালাইবে না কি!’
ব্রাহ্মণ যত নগরে আছিল উঠিল বিষম রাগি—
লোক নাহি ধরে যবন জোলার চরণধুলার লাগি !
চারি পোওয়া কলি পুরিয়া আসিল পাপের বোঝায় ভরা,
এর প্রতিকার না করিলে আর রক্ষা না পায় ধরা।
ব্রাহ্মণদল যুক্তি করিল নষ্ট নারীর সাথে—
গোপনে তাহারে মন্ত্রণা দিল, কাঞ্চন দিল হাতে।
বসন বেচিতে এসেছে কবীর একদা হাটের বারে,
সহসা কামিনী সবার সামনে কাঁদিয়া ধরিল তারে।
কহিল, ‘রে শঠ, নিঠুর কপট, কহি নে কাহারও কাছে-
এমনি করে কি সরলা নারীরে ছলনা করিতে আছে !
বিনা অপরাধে আমারে ত্যজিয়া সাধু সাজিয়াছ ভালো,
অন্নবসন বিহনে আমার বরন হয়েছে কালো।’
কাছে ছিল যত ব্রাহ্মণদল করিল কপট কোপ,
‘ভণ্ডতাপস, ধর্মের নামে করিছ ধর্মলোপ!
তুমি সুখে বসে ধুলা ছাড়াইছ সরল লোকের চোখে,
অবলা অখলা পথে পথে আহা ফিরিছে অন্নশোকে!’
কহিল কবীর, ‘অপরাধী আমি, ঘরে এসো নারী তবে-
আমার অন্ন রহিতে কেন বা তুমি উপবাসী রবে!’
দুষ্টা নারীরে আনি গৃহমাঝে বিনয়ে আদর করি
কবীর কহিল, ‘দীনের ভবনে তোমারে পাঠাল হরি’।
কাঁদিয়া তখন কহিল রমণী লাজে ভয়ে পরিতাপে,
‘লোভে পড়ে আমি করিয়াছি পাপ, মরিব সাধুর শাপে’।
কহিল কবীর, ‘ভয় নাই মাতঃ, লইব না অপরাধ—
এনেছ আমার মাথার ভূষণ অপমান অপরাধ।
ঘুচাইল তার মনের বিকার, করিল চেতনা দান—
সঁপি দিল তার মধুরকণ্ঠে হরিনামগুণগান।
রটি গেল দেশে- কপট কবীর, সাধুতা তাহার মিছে।
শুনিয়া কবীর কহে নতশির, ‘আমি সকলের নীচে।
যদি কূল পাই তরণী-গরব রাখিতে চাহি না কিছু-
তুমি যদি থাক আমার উপরে আমি রব সব — নিচু’।
রাজার চিত্তে কৌতুক হল শুনিতে সাধুর গাথা।
দূত আসি তারে ডাকিল যখন সাধু নাড়িলেন মাথা।
কহিলেন, ‘থাকি সবা হতে দূরে আপন হীনতা মাঝে,
আমার মতন অভাজন জন রাজার সভায় সাজে !’
দূত কহে, ‘তুমি না গেলে ঘটিবে আমাদের পরমাদ,
যশ শুনে তব হয়েছে রাজার সাধু দেখিবার সাধ’।
রাজা বসেছিল সভার মাঝারে, পারিষদ সারি সারি—
কবীর আসিয়া পশিল সেথায় পশ্চাতে লয়ে নারী।
কেহ হাসে কেহ করে ভুরুকুটি, কেহ রহে নতশিরে,
রাজা ভাবে-এটা একম নিলাজ রমণী লইয়া ফিরে!
ইঙ্গিতে তাঁর সাধুরে সভার বাহির করিল দ্বারী,
বিনয়ে কবীর চলিল কুটিরে সঙ্গে কইয়া নারী।
পথমাঝে ছিল ব্রাহ্মণদল, কৌতুকভরে হাসে—
শুনায়ে শুনায়ে বিদ্রূপবাণী কহিল কঠিন ভাষে।
তখন রমণী কাঁদিয়া পড়িল সাধুর চরণমূলে—
কহিল,’পাপের পঙ্ক হইতে কেন নিলে মোরে তুলে !
কেন অধমেরে রাখিয়া দুয়ারে সহিতেছ অপমান !’
কহিল কবীর, ‘জননী, তুমি যে আমার প্রভুর দান’।
ঠিক এই রকম ঘটনা কবীরের জীবনে না ঘটতেও পারে। কিন্তু এতে কবীরের যে জীবনদৃষ্টি ফুটে উঠেছে, সেটা সত্য। তাঁর ভক্তি অহেতুকী। তিনি তাঁর ঈশ্বরের কাছে নিজেকে নিবেদন করেছেন। এই ঈশ্বরের কোন আকার নেই। এই ঈশ্বর সর্বভূতে বিরাজমান। এই ঈশ্বর তাঁর প্রভু,বন্ধু, তাঁর প্রিয়জন। আর এই ঈশ্বরকে ভালোবাসতে হলে সমস্ত জীবকে ভালোবাসতে হবে। এটাই কবীরের জীবনদৃষ্টি।

কবীরের প্রসঙ্গে ক্ষিতিমোহন সেনের (১৮৮০-১৯৬০) নাম এসে পড়ে। ইনি নোবেলবিজয়ী অমর্ত্য সেনের মাতামহ। কাশীতে তাঁর জন্ম। কুইন্স কলেজ থেকে সংস্কৃত সাহিত্যে এম.এ। শিক্ষা বিভাগে চাকুরি করতেন। ১৯০৮ সালে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে চলে আসেন শান্তিনিকেতনে। কবীর, দাদূ, মধ্যযুগের মরমিয়া সাধক ও বাউল গানসংগ্রহ ছিল তাঁর নেশা। সম্ভবত তাঁর কাছেই রবীন্দ্রনাথ কবীরের বিশদ পরিচয় পান। তবে মধ্যযুগের ভক্ত সাধকদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আগ্রহ ছিল। পারস্যের সুফি সাধকরা তাঁকে আকর্ষণ করেছিলেন। বাবা দেবেন্দ্রনাথের মুখে তিনি হাফেজের কবিতা শুনতেন। ইরানে গিয়ে তিনি সেখানকার মানুষদের বলেছিলেন সে কথা। আর কাশী ও তার পাশ্ববর্তী অঞ্চলে হিন্দু সাধুদের আস্তানায় যাতায়াতের সূত্রে ক্ষিতিমোহনের কবীর প্রেমের সূচনা হয়েছিল। কবীরের গান সংগ্রহের ব্যাপারে এবং সেগুলি বাংলা ভাষায় পরিবেশনের ব্যাপারে ক্ষিতিমোহনকে তাগাদা দেন রবীন্দ্রনাথ।
কবীর, রবীন্দ্রনাথর প্রিয় কবীর কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জীবনে দুটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করেছেন। ক্ষিতিমোহন সেন যখন কবীরের গানগুলি অনুবাদ করে প্রকাশের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’র কাজও করছিলেন। এই সমকালীনতাকে সামনে রেখে কেউ কেউ মনে করেন যে কবীরের রচনার সঙ্গে পরিচয় লাভ করে রবীন্দ্রনাথ ‘গীতাঞ্জলি’ লেখার অন্তর- অনুপ্রেরণা প্রাপ্ত হন। এই মতের সমর্ধক ড. রামেশ্বর মিশ্র প্রভৃতি সমালোচকেরা। নাগরী প্রচারিণী সভা সম্পাদিত কবীর গ্রন্থাবলির ভূমিকায় বলা হয়েছে, “বাংলার কবীন্দ্র রবীন্দ্রকেও কবীরের ঋণ স্বীকার করিতে হইবে। রহস্যবাদের (mysticism) বীজ তিনি কবীরের কাছই পাইয়াছেন। শুধু তাহাতে জমকালো পাশ্চাত্য পালিশটি দেওয়া হইয়াছে। ভারতীয় রহস্যবাদকে তিনি পাশ্চাত্য ঢঙে সাজাইয়াছেন, ইহাতেই ইউরোপে তাঁহার প্রতিষ্ঠা”। কিন্তু রবীন্দ্র জীবনচরিতকার প্রশান্তকুমার পাল সে কথা স্বীকার করেন না। স্বীকার করেন না প্রণতি মুখোপাধ্যায়। দেখা যাক, ক্ষিতিমোহন নিজে কি বলেছেন। ক্ষিতিমোহন সেন বলেছেন, ‘গীতাঞ্জলি’র মধ্যে মধ্যযুগের বাণীর কিছু ভারসাম্য দেখিয়া আমিই কবীরের বাণীর বিষয় তাঁহাকে প্রথম জানাই। তাতেই আমি কবির কাছে ধরা পড়ি। তাহা ঘটে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে। তাহার কিছুকাল পরে আমার কবীরের প্রথম খণ্ড বাহির হয়। কবীর বাণী দেখিয়া তিনি গীতাঞ্জলি লেখেন নাই। গীতাঞ্জলি দেখিয়া আমি তাঁহাকে কবীর বাণী দেখাই’।
আবার ‘গীতাঞ্জলি’তে শুধু তো কবীরের প্রভাব নেই, আছে বৈষ্ণব পদাবলি ও সুফিবাদের প্রেমসাধনারও প্রভাব।
এবার কবীর রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে দ্বিতীয় সমস্যা সৃষ্টি করলেন, তার কথা আলোচনা করা যাক। আমেরিকা যাবার আগে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইভলিন আণ্ডারহিল নামে এক ধর্মযাজিকার পরিচয় হয়, যিনি মিস্টিসিজমের অনুরাগিনী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে কবীরের কথা বলেন, বলেন অজিতকুমার চক্রবর্তীর কথা যিনি কবীরের গানের ইংরেজি অনুবাদ করেছেন। ওড়িশার চাঁদিপুরে গ্রীষ্মাবকাশ কাটানোর সময়ে পিয়ার্সনের সহায়তায় অজিতকুমার কবীরের ১১৪টি দোহা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। ঠিক হয় যে কবীরের দোহার ইংরেজি অনুবাদ অজিতকুমারের নামেই প্রকাশিত হবে বিদেশ থেকে।
কিন্তু অবাক কাণ্ড, শেষ পর্ষন্ত ম্যাকমিলান কোম্পানি থেকে One Hundred Poems of Kabir নামে যে বইটি প্রকাশিত হল, সেখানে অনুবাদক হিসেবে আছে রবীন্দ্রনাথের নাম। অথচ একটি চিঠিতে অজিতকুমারকে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘কবীর গ্রন্থ সম্বন্ধে তুমি একটু ভুল বুঝেছ। প্রথমত গ্রন্থ থেকে তোমাকে বাদ দেওয়া হবে Evelyn Underhill এমন ইচ্ছা করেন না। দ্বিতীয়ত আর্থিক হিসেবে তোমাকে ও ক্ষিতিমোহনকে বাদ দেওয়া হবে এমন ইচ্ছা আমার নয়’।
এবার One Hundred Poems of Kabir বইটিতে ইভলিনের ভূমিকার শেষাংশ উল্লেখ করা যাক : “This version of Kabir’s songs is chiefly the work of Mr. Rabindranath Tagore, the trend of whose mystical genius makes him as who read these poems will see a peculiarly sympathetic interpreter of Kabir’s vision and thought.” এটা যে ক্ষিতিমোহনের বাংলা অনুবাদের উপর নির্ভর করে সম্ভব হয়েছে তা ইভলিন স্বীকার করেছেন, অজিতকুমারের ইংরেজি অনুবাদের কথাও বলেছেন তিনি, “We have also had before us a manuscript of English translation of 116 songs made by Mr. Ajit kumar Chakravarty from Mr. Kshiti Mohan Sen’s text, and a prose essay upon Kabir from the same hand.” ইভলিন অজিতকুমারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন সেজন্য। কিন্তু অনুবাদক হিসেবে বইতে তাঁর নাম বাদ গেল কেন ?
তাহলে কি ম্যাকমিলান কোম্পানি ব্যবসাবুদ্ধি তাড়িত হয়ে ব্যবহার করেছেন রবীন্দ্রনাথের নাম? রবীন্দ্রনাথ কি এর প্রতিবাদ করেছিলেন?
ঋণ :
রবি জীবনী/প্রশান্তকুমার পাল। ক্ষিতিমোহন সেন ও অর্ধ শতাব্দীর শান্তিনিকেতন ? প্রণতি মুখোপাধ্যায়। মজিদ মাহমুদের প্রবন্ধ। গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন/সৈয়দ মুজতবা আলি। Hundred Poems of Kabir/Rabindranath Tagore . Esaay of Subhendra kumar published in Pune Research World.
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক