শান্তিনিকেতনের প্রথম মুসলমান ছাত্র
শান্তিনিকেতনের প্রথম মুসলমান ছাত্র কে? জানতাম প্রথম মুসলমান ছাত্র সৈয়দ মুজতবা আলি। কিন্তু বিশ্বভারতীর সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী, কলামিস্ট রিফাত বিন সালামের একটি লেখা (‘শান্তিনিকেতন ও সৈয়দ মুজতবা আলি’) পড়ে অন্য একটি তথ্য পেলাম। এই লেখক বলেছেন যে আগরতলার ডা. কাজির ছেলে রবীন্দ্র কাজি শান্তিনিকেতনে পড়ার জন্য প্রথম এসেছিলেন। অবশ্য তিনি ভর্তি হতে পেরেছিলেন কি না, তা জানা যায় নি। রবীন্দ্র কাজিকে শান্তিনিকেতনে স্থান দেওয়ার ব্যাপারে আপত্তি হতে পারে বলে মনে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের। তাই রবীন্দ্রনাথ নেপালচন্দ্র রায়কে একটি চিঠিতে লেখেন, “মুসলমান ছাত্রটির সঙ্গে একটি চাকর দিতে তাহার পিতা রাজি। অতএব এমন কি অসুবিধা; ছাত্রদের মধ্যে এবং অধ্যাপকদের মধ্যেও যাহাদের আপত্তি নাই তাহারা তাহার সঙ্গে একত্র খাইবেন। শুধু তাই নয়, সেই সকল ছাত্রের সঙ্গেই ওই বালকটিকে এক ঘরে রাখিলে সে নিজেকে যূথভ্রষ্ট বলিয়া অনুভব করিবে না। … আপাতত শালবাগানের দুই ঘরে নগেন আইচের তত্ত্বাবধানে আরও গুটিকয় ছাত্রের সঙ্গে একত্র রাখিলে কেন অসুবিধা হইবে বুঝিতে পারিতেছি না। আপনারা মুসলমান রুটিওয়ালা পর্যন্ত চালাইয়া দিতে চান, ছাত্র কি অপরাধ করিল? এক সঙ্গে হিন্দু-মুসলমান কি এক শ্রেণিতে পড়িতে বা খেলা করিতে পারে না? … প্রাচীন তপোবনে বাঘে-গরুতে একঘাটে জল খাইত, আধুনিক তপোবনে যদি হিন্দু-মুসলমান একত্রে জল না খায় তবে আমাদের সমস্ত তপস্যাই মিথ্যা। আবার একবার বিবেচনা করিবেন ও চেষ্টা করিবেন যে আপনাদের আশ্রমদ্বারে আসিয়াছে তাহাকে ফিরাইয়া দিবেন না — যিনি সর্বজনের একমাত্র ভগবান তাহার নাম করিয়া প্রসন্নচিত্তে এই বালককে গ্রহণ করুন, আপাতত যদি কিছু অসুবিধা ঘটে সমস্ত কাটিয়া গিয়া মঙ্গল হইবে”।
রবীন্দ্র কাজি যদি শান্তিনিকেতনে ভর্তি না হয়ে থাকেন, তাহলে সৈয়দ মুজতবা আলিই সেখানকার প্রথম মুসলমান ছাত্র। ১৯১৯ সালে। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ। রবীন্দ্রনাথ এসেছেন সিলেট মুরারিচাঁদ কলেজের ছাত্রাবাসের এক সংবর্ধনা সভায় বক্তৃতা দিতে। বক্তৃতার বিষয় ‘আকাঙ্খা’। কবির ভাষণ শুনেছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি। তখন তাঁর বয়েস পনেরো বছর। রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন। আর মুজতবা আলি সাহস করে তাঁকে লিখলেন এক চিঠি। জানতে চাইলেন, ‘আকাঙ্খাকে বড় করার উপায় কি?’ ভাবতে পারেন নি তিনি যে এ চিঠির উত্তর আসবে। কিন্তু এল উত্তর। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘আকাঙ্খা উচ্চ করতে হবে — এই কথাটার মোটামুটি অর্থ এই—স্বার্থই যেন মানুষের কাম্য না হয়। দেশের মঙ্গলের জন্য ও জনসেবার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ কামনাই মানুষকে কল্যাণের পথে নিয়ে যায়। তোমার পক্ষে কি করা উচিত তা এতদূর থেকে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তোমার অন্তরের শুভেচ্ছাই তোমাকে কল্যাণের পথে নিয়ে যাবে’।
সেই চিঠি পেয়ে মুজতবা আলি, যাঁর ডাকনাম সিতারা বা সিতু, ঠিক করে ফেললেন তিনি শান্তিনিকেতনে পড়বেন। তাঁর বাড়ির দিক থেকে খুব একটা সম্মতি ছিল না। স্বাভাবিক। এসে পড়ে সেই হিন্দু-মুসলমানের প্রশ্ন। তাঁরা মত দিলেও শান্তিনিকেতন কি গ্রহণ করবেন একজন মুসলমান ছাত্রকে!
কিন্তু সিতারার কাছে এসব প্রশ্ন মূল্যহীন। চলে এলেন তিনি শান্তিনিকেতনে। সেখানকার মানুষ ভাবলেন এ কি সাহেবদের কেউ! এমন টুকটুকে ফর্সা রঙ তো সাহেবদেরই হয়। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বললেন, ‘এখানে এসেছ, কি পড়তে চাও?’
সিতারা বললেন, ‘তা তো ঠিক জানিনে। কোন একটা জিনিস ভালো করে শিখতে চাই’।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘নানা জিনিস শিখতে আপত্তি কি?’

মুজতবা এখানে এসে শিখতে লাগলেন নানা ভাষা। জর্মান, ফরাসি, ইংরেজি, হিন্দি, আরবি, ফারসি, রুশ, ইতালিয়ান, উর্দু। দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তুচ্চি, কলিন্স, সিলভা লেভি, বিধুশেখর শাস্ত্রী, জগদানন্দ রায়, ক্ষিতিমোহন সেনদের। বিশ্বভারতী সম্মিলনীতে পড়তে লাগলেন প্রবন্ধ। একবার সমিতির সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। তিনি বুঝেছিলেন রবীন্দ্রনাথ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধানী আর এটাই তাঁর জীবনের মূল সুর। একদিন বীণা আর একতারার পার্থক্য বোঝাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘বীণাযন্ত্রের তার অনেক বেশি, তাতে জটিলতাও অনেক বেশি। বাজাতে না জানলে বীণা থেকে বিকট শব্দ বেরোয়; কিন্তু যদি বীণাটাকে আয়ত্ত করতে পারো তবে বহুর মধ্যে যে সামঞ্জস্যের সৃষ্টি হয় তা একতারার একঘেয়েমি থেকে ঢের বেশি উপভোগ্য। আমাদের সভ্যতা বীণার মতো কিন্তু আমরা এখনও ঠিকমতো বাজাতে শিখিনি। তাই বলে সে কি বীণার দোষ, আর বলতে হবে একতারাটাই সবচেয়ে ভালো বাদ্যযন্ত্র!’
রবীন্দ্রনাথই হলেন সৈয়দ মুজতবা আলির জীবনের ধ্রুবতারা। জীবিকার সূত্রে শান্তিনিকেতন থেকে চলে গেছেন দূরে ; ঘুরে বেড়িয়েছেন আলিগড়, জার্মানি, মিশর, বরোদা — কত জায়গায়। কিন্তু মনের মধ্যে গেঁথে রয়েছে শান্তিনিকেতন আর রবীন্দ্রনাথ।
১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা। সেকথা তিনি নিজেই লিখেছেন ‘গুরুদেব রবীন্দ্রনাথে’ : —
তাকিয়ে বললেন, ‘লোকটি যে বড় চেনা চেনা ঠেকছে! তুই নাকি বরোদার মহারাজা হয়ে গেছিস!’
আমি আপত্তি জানালুম না। তর্কে তাঁর কাছে বহুবার নাজেহাল হয়েছি। আপত্তি জানালে তিনি প্রমাণ করে ছাড়তেন, আমিই বরোদার মহারাজা, নয়তো কিছু জাঁদরেল গোছের।
তারপর নিজেই বললেন, ‘না না। মহারাজা নয়, দেওয়ান টেওয়ান কিছু একটা।‘
আমি তখনও চুপ। ‘মহারাজা’ দিয়ে যখন আরম্ভ করেছেন, কোথায় থামবেন তিনিই জানেন।
তারপর বললেন, ‘কি রকম আছিস ? খাওয়া-দাওয়া ?’
আমি বললুম, ‘আপনি ব্যস্ত হবেন না।‘
—‘আরে না না, আজকালকার দিনে খাওয়া-দাওয়া জোগাড় করা সহজ কর্ম নয়। তোকে আমি একটা উপদেশ দি’। ওই যে দেখতে পাচ্ছিস টাটা ভবন, তাতে একটি লোক আছে, তার নাম পঞ্চা, লোকটি রাঁধে ভালো। তার সঙ্গে তুই যদি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারিস তবে এখানে তোর আহারের দুর্ভাবনা থাকবে না’।
আমি তাঁকে আমার খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে নিশ্চিন্ত হবার জন্য অনুরোধ জানালাম।
তখন বললেন, ‘তুই এখনও বরোদায় ধর্মশাস্ত্র পড়াস না ?’
আমি জানতুম, তিনি ঠিক জানেন শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্ররা কে কি করে। তাই মহারাজা বা দেওয়ান আখ্যায় আপত্তি জানাই নি।
তারপর বললেন, ‘জানিস, তোদের যখন রাজা-মহারাজারা ডেকে নিয়ে সম্মান দেখায় তখন আমার কি গর্ব হয়, আমার কি আনন্দ হয়! আমার ছেলেরা দেশ-বিদেশে কৃতী হয়েছে’।
তারপর খানিকক্ষণ আপন মনে কি ভেবে বললেন, ‘কিন্তু জানিস, আমার মনে দুঃখও হয়। তোদের আমি গড়ে তুলেছি, এখন আমার প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য তোদের প্রয়োজন। গোখলে, শুক্ল, তোরা সব এখানে থেকে আমাকে সাহায্য করবি। কিন্তু তোদের আনবার সামর্থ্য আমার কোথায়? তা যাক, বলতে পারিস সেই মহাপুরুষ কবে আসছেন কাঁচি হাতে করে?’
আমি অবাক।
মহাপুরুষ তো আসেন ভগবানের বাণী নিয়ে অথবা শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম নিয়ে। কাঁচি কিসের?
তিনি বললেন, ‘হাঁ হাঁ, কাঁচি নিয়ে। সেই কাঁচি দিয়ে সামনের দাড়ি ছেঁটে দেবেন, পেছনের টিকি কেটে দেবেন। সব চুরমার করে একাকার করে দেবেন। হিন্দু-মুসলমান আর কতদিন এরকম আলাদা হয়ে থাকবে!’
তারপর আধঘন্টা ধরে অনেক কিছু বললেন হিন্দু-মুসলমানের কলহ নিয়ে। তাঁকে যে এই কলহ কত বেদনা দিত সে আমি জানি। আমাকে যে বলতেন তার কারণ আমি তাঁর মুসলমান ছাত্র। বোধ হয় মনে করতেন আমি তাঁকে ঠিক বুঝতে পারব।
এই কলহের শিকার হতে হয়েছিল সৈয়দ মুজতবা আলিকেও। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্তিনিকেতনে তাঁকে ‘ইসলামিক স্টাডিজে’র দায়িত্ব দেওয়া হয় তিনি মুসলমান বলে। বিশ্বভারতীতে তাঁর চরিত্র হননের চেষ্টা চলে। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় তাঁকে ‘পাকিস্তানের চর’ আখ্যা দেওয়া হয়। আবার পাকিস্তানের কাছে তিনি ছিলেন ‘ভারতের চর’ কেননা তিনি যে ‘রবীন্দ্রনাথের চ্যালা’।
শান্তিনিকেতনে তিনি ফিরে ফিরে এসেছেন। মানুষ যেমন আসে জন্মভূমির টানে। কিন্তু শান্তিনিকেতন তাঁকে আপন করে নিতে পারে নি। বিশেষ করে রবীন্দ্র-উত্তর শান্তিনিকেতন। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান শুনেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি রাজশেখর বসুর নাতি দীপংকর বসুকে বলেছিলেন, ‘এখানে যা হয়েছে তা অবর্ণনীয়। বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথকে কেউ স্মরণ করে নি। করেছে পোয়েট টেগোরকে। প্রধান পুরোহিত ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান। এঁরা তো সোনার বাংলার কবিকে চেনেন না; এঁরা চেনেন গীট্যানজেলি (গীতাঞ্জলি), চিট্রা (চিত্রা), স্যাডনার ( সাধনা) লেখক মিস্টার টেগোরকে। আর তাবৎ কার্যক্রম ইংরেজিতে!’
ঋণ :
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ) / সৈয়দ মুজতবা আলি। গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন / সৈয়দ মুজতবা আলি । শান্তিনিকেতন ও সৈয়দ মুজতবা আলি / রিফাত বিন সালাম। মুজতবা আলি / মিহিরকান্তি চৌধুরী।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক