সওগাতকে ‘সওগাত’ দিলেন রবীন্দ্রনাথ
সওগাত। একটি পত্রিকার নাম। মুসলমান সমাজে এই পত্রিকা নতুন দিনের আভাস নিয়ে এসেছিল। তার আগে যে পত্রিকা ছিল না, তা নয়। ছিল ‘মোহাম্মদি আখবার’ (১৮৭৭), ‘আখবারে এসলামীয়া’ (১৮৮৪), ‘মুসলমান বন্ধু’ (১৮৮৪), ‘আহমদী’ (১৮৮৬), ‘সুধাকর’ (১৮৮৯), ‘হিতকরী’ (১৮৯০), ‘ইসলাম প্রচারক’ (১৮৯১), ‘মিহির’ (১৮৯২), ‘হাফেজ’ (১৮৯২), ‘কোহিনূর’ (১৮৯৮), ‘প্রচারক’ (১৮৯৯), ‘লহরী’ (১৯০০), ‘নুর-অল-ইমান’ (১৯০০), ‘নবনূর’ (১৯০৩)। কিন্তু সে সব পত্রিকার সঙ্গে সাহিত্যের যোগ ছিল না। মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন বলেছেন, ‘কট্টর গোঁড়া ধর্মাবলম্বীরা কতকগুলো নিষেধের বেড়াজাল সৃষ্টি করে সমাজকে পঙ্গু করে রেখেছিলেন। যেমন তাঁরা মনে করতেন ইংরেজি পড়া, গল্প-উপন্যাস পড়া, গান করা বা গান শোনা, ছবি আঁকা, আমোদ-আহ্লাদ ও খেলাধুলো করা এ সবই গুনাহর কাজ। স্বাধীনভাবে চিন্তা করে কেউ কিছু লিখলে তিনি নিন্দনীয় হতেন এবং তাঁর লেখা কোন কাগজে ছাপা হত না। এমন একটা যুগে সওগাতের জন্ম’।
এই সওগাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাসিরুদ্দিনের নাম। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা, প্রকাশক ও সম্পাদক।

কুমিল্লা জেলার চাঁদপুর মহকুমার অন্তর্গত পাইকারদি গ্রামে তাঁর জন্ম। চালিতাবলি এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময়ে তাঁর মনে সঞ্চারিত হয় সাহিত্যপ্রীতি। স্কুলের গ্রন্থাগারে দেখতেন নানা পত্র-পত্রিকা। যাতে গল্প-কবিতা ছাপা হয়েছে। কিন্তু মুসলমান-পরিচালিত এমন পত্রিকা কোথায়? তাঁর মনে দানা বেঁধে ওঠে এক চিন্তা। তিনি এ রকম এক পত্রিকা প্রকাশ করবেন। বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের মতো হঠাৎ মারা গেলেন বাবা। জীবিকার সন্ধানে নাসিরুদ্দিন এলেন কলকাতায়। ঢুকলেন বিমা কোম্পানিতে। বিমা কোম্পানির প্রথম মুসলমান এজেন্ট তিনি। উপার্জন বাড়ল। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশের স্বপ্নটা এবার মাথা চাড়া দিল। চেনা-জানা মুসলমান বন্ধুদের বললেন। তাঁরা কেউ উৎসাহ দেখালেন না। কিন্তু সাদাত হোসেন অন্য ধরনের মানুষ। তিনি নাসিরুদ্দিনকে নিয়ে গেলেন আব্দুর রসুলের কাছে। ইনি কুমিল্লার জমিদার বংশের সন্তান। আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন রসুলসাহেব। কিন্তু অকালমৃত্যু হল তাঁর। নাসিরুদ্দিন তখন বই ও পত্রিকা প্রকাশের জন্য একটি যৌথ কোম্পানি গঠন করলেন। কিন্তু সে কোম্পানিও টিকল না। দমলেন না নাসিরুদ্দিন। বই পরে হবে, আগে চাই পত্রিকা। কি নাম হবে পত্রিকার? এমন একটা নাম দিতে হবে, যাতে তা হিন্দু-মুসলমান সকলের গ্রহণীয় হয়। নাম হল ‘সওগাত’। উপঢৌকন। সচিত্র মাসিক পত্রিকা হবে এই ‘সওগাত’। কিন্তু মুসলমান সমাজে ছবি গ্রহণযোগ্য নয়। আবার মুসলমান চিত্রশিল্পীও দুর্লভ। তাই শিল্পী গণেশ ব্যানার্জীর দ্বারস্থ হলেন নাসিরুদ্দিন।
১৩২৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (নভেম্বর/ডিসেম্বর, ১৯১৮) প্রকাশিত হল ‘সওগাত’। প্রথম সংখ্যায় যাঁদের লেখা প্রকাশিত হল তাঁরা হলেন — মিসেস আর.এস.হোসেন (রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন ), মানকুমারী বসু, মোহাম্মদ কে, চাঁদ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজি, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, ব্রজমোহন দাস, শাহাদাৎ হোসেন, রসময় লাহা, জীবেন্দ্রকুমার দত্ত, জলধর সেন, ফজলুর রহিম, ও. আলি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, এস.এম.হোসেন, পাঁচুলাল ঘোষ, ফজলুর রহিম চৌধুরী, ওয়াছিমুদ্দিন আহমদ, আব্দুল গফুর, ভূজঙ্গধর রায়চৌধুরী, ইসলামাবাদী, কায়কোবাদ, চণ্ডীচরণ মিত্র, এম. নাসিরুদ্দিন।
বলাবাহুল্য রক্ষণশীল মুসলমানরা এই পত্রিকাকে স্বাগত জানান নি। বরং একে তাঁরা ইসলামবিরোধী পত্রিকা বলে দেগে দেবার চেষ্টা করেছেন। রক্ষণশীলদের সমালোচনায় নিরস্ত হলেন না পত্রিকার সম্পাদক। এবার তাঁর মনে পড়ল রবীন্দ্রনাথের কথা। প্রয়োজন বিশ্ববরেণ্যের আশীর্বাদ। কবি সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল নাসিরুদ্দিনের। সত্যেন্দ্রনাথকে বলতে তিনি ব্যবস্থা করে দিলেন।

একদিন সকালবেলা নাসিরুদ্দিন চলে গেলেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। বাড়ির সমানে ঘোরাফেরা করছে যে লোকটি তাকে বললেন রবীন্দ্রনাথের কথা। লোকটি বলল, ‘কে বাবুমশাই। হ্যাঁ, তিনি আছেন। চলে যান। ওই তো সিঁড়ি। দোতলায় উঠে যান’।
দ্বিধা যায় না নসিরুদ্দিনের। এর আগে কোনদিন আসেন নি এখানে। মুখোমুখী হন নি রবীন্দ্রনাথের। তাঁর দ্বিধা দেখে লোকটি বলল, ‘যান, চলে যান বৈঠকখানায়। বাবুমশাই একাই আছেন’।
নাসিরুদ্দিন এলেন দোতলায়। দূর থেকে রবীন্দ্রনাথকে দেখলেন তিনি। স্নিগ্ধ, শান্ত, জ্যোতির্ময়। নাসিরুদ্দিন কবিকে প্রণাম করে বললেন, ‘আমি নাসিরুদ্দিন’।
—‘আগে তো দেখি নি।’
—‘না। এই প্রথম এলাম। একটা আর্জি আছে।’
—‘কি করো তুমি?’
—‘চাকরি একটা করি। কিন্তু পত্রিকা প্রকাশ করে আমার নেশা।’
রবীন্দ্রনাথ হেসে বললেন, ‘নেশাটা ভালো নয়। সর্বনেশে নেশা।’
—‘আমি একটা পত্রিকা বের করেছি। আপনাকে দিতে এলাম।’
—‘পত্রিকা? কি পত্রিকা? নাম কি?’
—‘সওগাত।’
—‘বাঃ, সুন্দর নাম তো। দেখি, দেখি।’
কবির উৎসাহ দেখে বুক ভরে গেল নাসিরুদ্দিনের। কেটে গেল দ্বিধা। বাংলার একজন বিরাট মাপের মানুষ তাঁর কথা শুনছেন, তাঁকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, এ যে অভাবিত।
পত্রিকাটা এগিয়ে দিতে দিতে নাসিরুদ্দিন বললেন, ‘আমাদের মুসলমান সমাজে ভালো সাহিত্য পত্রিকা ছিল না, তাই …।’
—‘ঠিক বলেছ।’
—‘সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করার কথা ভাবতে পারত না কেউ। আমি সাহস করে এগিয়েছি।’
—‘হিন্দু-মুসলমান নিয়ে আমাদের দেশ। তার একটা অংশে যদি আলো না পড়ে তাহলে দেশের সামগ্রিক উন্নতি হবে কি করে? তুমি যে সাহস করে এগিয়েছ, এটা ভালো কথা।’
দরদভরা এ সব কথা শুনে নাসিরুদ্দিন অভিভূত। এই তো মানবতার কবির কথা। সকলের জন্য তাঁর সমভাবনা।
রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘তোমাকেও তাহলে সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে।!’

—‘হ্যাঁ, একশ্রেণির মোল্লা -মৌলবি জেহাদ ঘোষণা করেছেন। এ পত্রিকা পড়া গুনাহ বলে ফতো্য়া দিয়েছেন তাঁরা।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সেটাই তো তোমার পুরস্কার। নিন্দা না থাকলে মহত্বের গৌরব কোথায়?’
নাসিরুদ্দিনের হাত থেকে পত্রিকাটা নিয়ে দেখতে লাগলেন পাতা উল্টে। তারপর বললেন, ‘আরে, তুমি তো হিন্দু-মুসলমানের মিলনক্ষেত্র তৈরি করেছ! কিন্তু তোমাকে যে আরও গুরু দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকেন নাসিরুদ্দিন।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘তৈরি করতে হবে মুসলমান লেখকদের। তাঁরা সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলবেন মুসলমান জীবনচিত্র। বাংলা সাহিত্যে তার অভাব আছে।’
নাসুরুদ্দিন বিনীতভাবে বলেন, ‘আমাকে আশীর্বাদ করুন। চেষ্টা করব আমি। কিন্তু আমার একটা আর্জি আছে।’
—‘বলো।’
—‘পরের সংখ্যার জন্য আপনার একটা লেখা চাই। তা পেলে তরুণ মুসলমান লেখকরাও উৎসাহিত হবেন।’
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।’
—‘কেন?’
—‘আমার লেখার সমস্ত স্বত্ব বিশ্বভারতীকে দান করেছি। তারাই আমার লেখার পারিশ্রমিক গ্রহণ করে আর অনুমতি দেয়।’
নাসিরুদ্দিন বুঝলেন তাঁর মতো অজ্ঞাতকুলশীল সম্পাদকের পক্ষে বিশ্বভারতীর অনুমতি লাভ করা সম্ভব নয়। তাই তিনি হতাশ হয়ে ফিরে এলেন।
কিন্তু বিস্ময়ের তখনও কিছু বাকি ছিল। দিন চারেক বাদে তিনি বিশ্বভারতীর মনোগ্রাম আঁকা একটা খাম পেলেন। তার ভেতর রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি আর একটি কবিতা। চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বিশ্বভারতীকে টাকা দিয়ে আমার লেখা নেওয়া তোমার পক্ষে সম্ভব নয়, বুঝেছি। আমি লক্ষ্য করেছি তুমি খুব নিরাশ হয়ে চলে গেলে। একটা কবিতা পাঠালাম। আশা করি তোমার ভালো লাগবে। এর জন্য টাকা দিতে হবে না।’
সে কবিতার নাম ‘পথের সাথী’। সেটি পরের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। এর পরে রবীন্দ্রনাথের আর যে একটি লেখা ‘সওগাতে’ প্রকাশিত হয়েছিল তার নাম ‘সওগাত’।
ঋণ :
সওগাত মুসলিমমানস ও রবীন্দ্রনাথ / ড. দিলীপ মজুমদার। সওগাত সংকলন / মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন (স.)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
মূল্যবান আলোচনা। লেখককে প্রণাম।
ভালো থেকো ।