নবজীবনের রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্যা মুসলমান নারী
দাদু,
তোমাকে দাদু বলে ডেকে ধন্য হলুম। তুমি আমার দাদু হবে তো? এ্যাঁ? কি বল? তোমাকে আমার খু-উ-ব ভালো লাগে। এই এত-ত বড় পৃথিবীর তুমি কবীন্দ্র মনে হলে আনন্দে, গর্বে প্রাণ ভরে যায়। আমাদের বাঙালি জাতির গৌরব তুমি। ভগবান তোমায় র্দীর্ঘজীবী করুন এই আমার প্রার্থনা।
আমি একটু আধটু কবিতা লিখতে চেষ্টা করি। ভালো পারি নে অবশ্য। আচ্ছা দাদু, তুমি কি করে এত সুন্দর কবিতা লেখ আমায় বলবে?
আমাদের স্কুলে কিছুদিন আগে prize distribution-এ তোমার ‘কথা ও কাহিনি’র ‘সামান্য ক্ষতি’টি মূক অভিনয় হয়েছিল। সবাই খুব প্রশংসা করেছিলেন। তোমার কবিতার মাঝে একটা জীবন্ত রূপ আছে। তোমার বই পেলে ত আমি খাওয়া ঘুমানো পর্যন্ত ভুলে যাই। এতই তোমার কাব্যের গুণ।

জেব-উন-নেসা জামাল
আমরা ক্লাসের মেয়েরা সবাই মিলে একটা হাতে লেখা মাসিক পত্রিকা বের করছি। নাম তার ‘সোনার তরী’। আমি হয়েছি তার সহঃ সম্পাদিকা ও চিত্রশিল্পী। তোমার একটি কবিতার নাম তো ‘সোনার তরী’ — না? আমরা ওই নাম দিয়ে ধন্য মনে করছি নিজেদের।
তুমি কেমন আছ দাদু? জানিও কিন্তু। আমি ভালোই আছি। তোমাকে দেখতে আমার ভা-আ্-রি ইচ্ছে করে।
তোমায় বিরক্ত করলুম, না? তা তোমার আদরের নাতনিটি যদি একটু তোমায় বিরক্ত করে তাহলে তুমি রাগ করবে কি? বলো না! জানি তোমার সময় খুবই কম তবুও আশা রাখি তোমার স্নেহলিপি হতে বঞ্চিত হব না। আমার মনের খুঁটিনাটি তোমায় জানালুম। কিছু মনে করো না, বুঝলে? লেখা যা বিছছিরি হাসবে না তো? তুমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম নাও — দাদুমণি আমার। উত্তর না দিলে কিন্তু ভা-রি অভিমান করব। আসি। ইতি
তোমারই অতি স্নেহের
জেব-উন-নেসা
১৯৩৮ সালে বগুড়া ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়েল স্কুলের ছাত্রী জেব-উন-নেসা এই চিঠি লিখেছে রবীন্দ্রনাথকে। বিশ্ববিখ্যাত রবীন্দ্রনাথ অপরিচিত এক কিশোরীকে অবজ্ঞা করেন নি। নিজের হাতে সে চিঠির উত্তর লিখেছেন। বলেছেন, ‘দাদু সম্বোধনে তুমি আমাকে আত্মীয় বন্ধনে বাঁধতে চেয়েছ, সে আমি উপেক্ষা করতে পারি নে। মাঝে মাঝে বিরক্ত করবার অধিকার তোমাদের হল, কিন্তু সবসময়ে সাড়া যদি না পাও তো জেনো তোমার দাদুর বয়েস তোমার চেয়ে বেশি’।
জেব-উন-নেশার চেয়েও আর একটি ছোট মেয়ে, চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী কুমারী আমিনা মোজাহার স্বরূপকাঠি, বাকরগঞ্জ থেকে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছিল, ‘আপনি আমাকে চিনেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। বাংলা বই-এর মধ্যে আপনাকে দেখেছিও। আপনি আমাদের ছোট ছেলেমেয়েদের খুব ভালোবাসেন। আবার চিঠি লিখলে উত্তরও দেন। তাই আমি চিঠি লেখছি। উত্তর দিবেন কিন্তু। আচ্ছা, আপনাকে কি বলে ডাকব?’

কুমারী আমিনা মোজাহার
ফরিদপুরের আর এক কিশোর নূরুল আলম রবীন্দ্রনাথকে অভিযোগ করে লিখেছিল যে কবি তার চিঠির জবাব দেন নি। রবীন্দ্রনাথ তার দ্বিতীয় চিঠির জবাব দিচ্ছেন, ‘তোমার পূর্ব চিঠির উত্তর দিই নি বলে নালিশ জানিয়েছ। হয়তো সে চিঠিখানি কোন এক দুর্যোগবশত আমার গোচরে আসে নি। ক্লান্তি আর জরার দুর্বলতাবশত আমার চিঠিপত্র মহলে অরাজকতা ঘটেছে — আমার দেহ মনের বর্তমান অবস্থায় এটা মার্জনীয়। এবার প্রীতিরসে স্নিগ্ধ চিঠিখানি আমার দৃষ্টি এড়িয়ে যায় নি — তাই আশীর্বাদ জানাবার অবকাশ পেলুম’।
মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা (১৯০৬-১৯৭৭) ‘সওগাত’-এর লেখিকা। যাতে মুসলমান নারীরা সাহিত্য রচনার ব্যাপারে উৎসাহী হন, সেজন্য মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিন ‘মহিলা সওগাত’ প্রকাশ করেছিলেন। মাহমুদা খাতুনের বয়স যখন মাত্র বারো, সেই সময়ে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বিয়ে তিনি স্বীকার করেন নি। অবরোধ ও বাল্যবিবাহের গণ্ডি অতিক্রম করে তিনি পড়াশুনো ও সাহিত্য রচনায় মন দিলেন। ‘সওগাতে’ তাঁর প্রথম কবিতা ‘বসন্ত বিদায়’ প্রকাশিত হয়। একবার তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। ‘নিশীথে’ নামক এক কবিতা ‘পরিচয়’ পত্রিকায় পাঠিয়ে রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন তিনি যেন পত্রিকা সম্পাদকে তাঁর বিষয়ে বলে দেন। রবীন্দ্রনাথ সে কবিতা ‘পরিচয়ে’ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পত্রিকার মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না বলে সে কবিতা অবশ্য ‘পরিচয়ে’ প্রকাশিত হয় নি।

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা
জাহানআরা বেগম চৌধুরী (১৯১৩-১৯৮২) আর এক রবীন্দ্র অনুরাগিনী। মাত্র উনিশ বছর বয়েসে তিনি ১৫৪ পাতার এক সচিত্র বার্ষিকী প্রকাশ করেন। তার নাম ‘রূপরেখা’। পত্রিকার নামকরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ‘রূপরেখা’র জন্য রবীন্দ্রনাথকে কবিতা ও গল্প দিতে অনুরোধ করেন জাহানআরা। রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৩ সালের ১৩ অক্টোবর তাঁকে অক্ষমতা জানিয়ে লিখলেন, ‘মস্তিষ্কের প্রতি অতিমাত্র অত্যাচার করেছি বলে সম্প্রতি সে হরতাল করেচে — তাকে ঠেলা দিলেও সে সাড়া দেয় না। স্থির করেচি ঠিকানা না রেখে দূরে কোথাও অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করব। তোমরা নিশ্চয়ই কঠিন হৃদয় নও, তোমাদের কাছে করুণা প্রত্যাশা করতে পারি’। কিন্তু তার পরের দিনই তিনি জাহানআরাকে একটি ছোট কবিতা পাঠিয়ে লিখলেন, ‘তুমি নিষ্ঠুর কিন্তু আমি নির্মম নই তাই তোমার হাত থেকে নিষ্কৃতি নিতে পারলুম না। ছেঁড়া লেখার ঝুলিতে একটুকরো কবিতা লুকিয়ে ছিল — অগত্যা তাকেই টেনে বের করে পাঠালুম’।
কবিতাটির নাম ‘দিশেহারা’—
চাঁদ কহে, ‘শোন
শুকতারা,
রজনী যখন
হলো সারা—
যাবার বেলায়
কেন শেষে
দেখা দিতে হায়
এলি হেসে,
আলো আঁধারের
মাঝে এসে
করিলি আমারে
দিশাহারা।

জাহানআরা বেগম চৌধুরী
জাহানআরাকে লেখা রবীন্দ্রনাথের আর একটি মর্মস্পর্শী চিঠি : ‘সেদিন তোমার কথা শুনে বড় আনন্দ পেয়েছি এইটুকু জানাবার জন্য তোমাকে একখানি চিঠি লেখার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু এতদিন এতটুকুও অবসর পাই নি। আজ আমার আত্মীয়ার বিবাহ উপলক্ষে কলকাতায় চলবার পথে রেলগাড়ি কোন কারণে তার চলায় ঢিলে দিয়েছে দেখে তোমাকে এই সুযোগে আমার আর্শীবাদ জানাবার ইচ্ছা হল।
সেদিন তোমার কাছ থেকে আমি যেন সমস্ত বাংলা দেশের মেয়েদের হাতের অর্ঘ্য পেয়েছি। এ আমার হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। …..বাল্যকাল থেকে দীর্ঘ দুর্গম পথ বেয়ে চলেছি সাহিত্য অমরাবতী লক্ষ্য করে। বন্ধুর পথে অনেক কাঁটা ফুটেছে — আবার ফুলেরও অভাব ঘটে নি। এই ফুলের অনেক অংশই আমার দেশের মেয়েদের কাছ থেকে পেয়েছি। সরস্বতী আমাকে তাঁর বরমাল্য পাঠাতে ত্রুটি করেন নি — কিন্তু তার ডালি তোমরাই বহন করে এনেছিলে। এখন পর্যন্ত সে মালা নবীন আছে. এই কথাটাই তোমার কাছ থেকে সেদিন জানা গেল।‘

১৯৩৩ সালে ভাই হবিবুল্লাহ বাহারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন শামসুন নাহার মাহমুদ (১৯০৮-১৯৬৪)। সে পত্রিকার নাম ‘বুলবুল’। পত্রিকাটি রবীন্দ্রনাথের কাছে পাঠানো হয় তাঁদের পক্ষ থেকে। রবীন্দ্রনাথ তার প্রাপ্তি স্বীকার করে দীর্ঘ চিঠি দেন। রবীন্দ্রের চিঠিতে তখনকার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ, হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ নিয়ে কবির বক্তব্য আছে : ‘বুলবুল’ পত্রখানি পড়ে আশান্বিত হলুম। আত্মবিচ্ছেদ ও ভ্রাতৃবিদ্বেষে দেশের হাওয়া যখন বিষাক্ত হয়ে উঠেছে সেই পরম দুর্যোগের দিনে নিষেধের বাণী যে কোথাও ধ্বনিত হতে পারল, একে আমি শুভ লক্ষণ বলে মনে করি। ….. সর্বনাশের মদমত্ততায় আত্মবিস্মৃত দেশের উন্মত্ত কোলাহলের মাঝখানে তোমরা শুভবুদ্ধির আহ্বানে নির্ভয়ে ঘোষণা করো, ঈশ্বরের প্রসন্নতা তোমাদের উদ্যোগকে গৌরবান্বিত করবে। …. আমি পারস্য ইরাক ইজিপ্ট ভ্রমণ করে এসেছি। বহু শতাব্দীর মোহান্ধকার ভেদ করে সর্বত্রই নবপ্রভাতের আলোক আজ প্রকাশিত, সর্বত্রই সেখানকার নানা লোকের মুখে শুনে এলেম ভারতবাসীর অন্ধতার প্রতি ধিক্কার। স্পষ্ট উপলব্ধি করেছি আজকের দিনে নবজীবনের উৎসাহে উদ্দীপ্ত সমস্ত প্রাচ্য মহাদেশের মধ্যে একমাত্র ভারতবর্ষেই আমরা মুক্তির ক্ষেত্রে কাঁটাগাছ রোপণ করতে বসেছি। এই মূঢ়তার অপমান সমস্ত পৃথিবীর সম্মুখে আজ অনাবৃত অথচ হতভাগ্য দেশে এর প্রতিকার আজ এত দুঃসাধ্য। এই দুর্ভাগ্যের নিষ্ঠুর আঘাতে দেশের নির্বোধ জড়ত্বে বেদনাসঞ্চার আরম্ভ হয়েছে, তোমাদের এই পত্রে তারই লক্ষণ সূচিত। তাই আনন্দের সঙ্গে আজ আমি আমার অভিনন্দন প্রেরণ করছি’।

শামসুন নাহার মাহমুদ
১৯৩৯ সালে শামসুন নাহার তাঁর ‘শিশুশিক্ষা’ বইটির ভূমিকা লিখে দিতে অনুরোধ করেন রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘তোমার সকল রচনাকেই আমি অন্তরের সঙ্গে প্রশংসা করে থাকি। কী ভাষায়, কী মননশক্তিতে, কী সরসতায় তোমার লেখা যে বিশিষ্টতা লাভ করেছে আমি তার প্রশস্তিবাদ পাঠাই’।

বেগম সুফিয়া কামাল
মুসলমান সমাজের রক্ষণশীলতার জন্য বেগম সুফিয়া কামাল প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেন নি, মায়ের উৎসাহে লাইব্রেরি থেকে চুরিকরা বই পড়ে তিনি স্বশিক্ষা লাভ করেন। ১৯২৮ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে তিনি কবির কাছে চিঠি পাঠালেন। দিন কয়েক পরেই এল উত্তর। কবি সুফিয়াকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে আসতে বললেন। স্বামী নেহাল হোসেনকে নিয়ে সুফিয়া এলেন কবির সঙ্গে দেখা করতে। কবি সুফিয়াকে উৎসাহ দিলেন। তাঁকে সাহায্য করার কথা বললেন তাঁর স্বামীকে। আসার সময় সুফিয়ার হাতে তুলে দিলেন ‘গোরা’ উপন্যাসটি। ১৯২৯ সালে কবিকে নিমন্ত্রণ জানিয়ে সুফিয়া চিঠি লেখেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ জানান যে শীঘ্র কলকাতা যাবার সম্ভাবনা নেই। চিঠির শেষাংশে লিখলেন, ‘তুমি রেঁধে খাওয়াতে চেয়েছ, এই কথাটি আমি দূরে থেকেও মনে রাখব’।
ঋণ : আসা যাওয়ার পথের ধারে / আবদুল আহাদ। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা / বেগম আখতার কামাল। রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ / ভুঁইয়া ইকবাল।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক
দেশজুড়ে পরিকল্পিত ভাবে আজকের বিদ্বেষবিষের আবাদের যুগে এ্মন লেখা খুব জরুরি প্রয়োজন মেটাবে।
আপনার লেখা এই প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো পড়ে অনেক সমৃদ্ধ হচ্ছি। এই পর্বে পাঁচজন মহিলার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ সম্পর্কে জানলাম। একই সময় কলকাতায় রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসবাস করা সত্ত্বেও তাঁদের দু জনের কোনও যোগাযোগের খবর জানা যায় না কেন? এই বিষয়ে আলোকপাত করলে কৃতজ্ঞ থাকব।
অনল , তোমার প্রশ্নের জবাব খোঁজার চেষ্টা করব । তুমি বয়েসে নিশ্চয়ই অনেক ছোট , তাই ‘তুমি’ বললাম ।
পরপর পড়ে যাচ্ছি। আরও লিখুন। জানতে চাই।