ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় নকশিকাঁথার মাঠ
‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’। সেই লেখা হৃদয়হরণ করেছিল ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামের এক কিশোরের। আনসারুদ্দিন মোল্লার সেই ছেলের নাম মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন মোল্লা ( ১৯০৩-১৯৭৬), পরে যিনি পরিচিত হবেন পল্লিকবি জসীম উদ্দিন নামে।
নানাজনের কাছে চেয়ে-চিন্তে জসীম সংগ্রহ করেছেন রবীন্দ্রনাথের বই। গোগ্রাসে পড়ে গেছেন সে সব। একদিন কলকাতায় এসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ঢুকে দেখে গেছেন ‘শেষবর্ষণের অভিনয়’ বিস্ময়বিমূঢ় হয়েছেন। তারপরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ পড়তে এসেছেন। ততদিনে নামডাক হয়েছে তাঁর। প্রকাশিত হয়েছে তাঁর দুটি বই : ‘রাখালি’ আর ‘নকশিকাঁথার মাঠ’। বাংলার পল্লির কথা, পল্লির হতদরিদ্র মুসলমানের কথা তাঁর আগে এমন করে কেউ বলেন নি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়িতে যাতায়াত শুরু হয়েছে জসীম উদ্দিনের। পাশেই রবীন্দ্রনাথের বাড়ি। সঙ্কোচবশত তিনি যান নি সে বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথকে তাঁর বইও পাঠান নি। রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়তে সে সঙ্কোচের আবরণ মুছে গেল। তিনি রবীন্দ্রনাথের ঘরে ঢুকে দেখে এলেন তাঁকে। ‘রাখালি’ আর ‘নকশিকাঁথার মাঠ’ তুলে দিলেন কবির হাতে। বইগুলি উল্টেপাল্টে দেখে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে তুমি বাংলা দেশের চাষি মুসলমানদের বিষয়ে লিখেছ। তোমার বই আমি পড়ব’। শুনে মন ভরে গেল জসীম উদ্দিনের। রবীন্দ্রনাথের কাছে যাবার সাহসও হল।
কয়েকদিন পরে আবার গেলেন। রবীন্দ্রনাথ জানালেন তিনি জসীম উদ্দনের বই-এর বিস্তৃত সমালোচনা লিখে পাঠাবেন। তারপর বললেন, ‘তুমি শান্তিনিকেতনে এসে থাকো। ওখানে আমি তোমার থাকার বন্দোবস্ত করে দেব’। জসীম তাঁর এম.এ পড়ার কথা বলতে রবীন্দ্রনাথ জানালেন শান্তিনিকেতনে থেকে প্রাইভেটে যাতে পরীক্ষা দিতে পারেন তার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। কিন্তু বাধা দিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। তাঁর কথারও যুক্তি ছিল। রবীন্দ্রনাথের বয়সের কথা উল্লেখ করে দীনেশচন্দ্র বললেন, ‘ওখানকার আশ্রয় বহুদিন পাওয়ার সৌভাগ্য তোমার নাও হতে পারে’।
রবীন্দ্রনাথের উপর অভিমান হয় জসীম উদ্দিনের। তাঁর বই-এর সমালোচনা লিখবেন বলেছিলেন। অনেকদিন হয়ে গেল, সে সমালোচনা পেলেন না জসীম উদ্দিন। বন্ধু মোহনলালের হাতে চিঠি পাঠালেন রবীন্দ্রনাথকে। মোহনলালের হাতেই এল উত্তর। কি লেখেছেন রবীন্দ্রনাথ?
— ‘জসীম উদ্দিনের কবিতার ভাব, ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে, অতি সহজে যাদের লেখবার শক্তি নেই, এমনতর খাঁটি জিনিস তারা লিখতে পারে না’।
কিন্তু তাঁর ‘বালুচর’ বইটি খুশি করতে পারল না রবীন্দ্রনাথকে। তিনি ভেবেছিলেন এই বইতে জসীম পদ্মাতীরের চরগুলির সুন্দর কবিত্বপূর্ণ বর্ণনা লিখবেন, — ‘কিন্তু কতকগুলি প্রেমের কবিতা দিয়ে তুমি বইখানি ভরে তুলেছ। পত্রে এ কথা লিখলে পাছে রূঢ় শোনায় সে জন্য এ বিষয়ে কিছু লিখি নি। মুখেই বললাম’। বললেন বটে, কিন্তু তিনি তাঁর বাংলা কবিতার সংকলনে এই ‘বালুচর’ বই-এর ‘উড়ানির চর’ কবিতাটি চয়ন করেছিলেন। গ্রাম-দেশের কাহিনি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নাটক লেখার কথা বলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে যে প্লট দেন, তা অবলম্বনে জসীম লেখেন ‘পল্লিবধূ’ নাটক। জসীম উদ্দিনের সঙ্গে কবি যে শুধু সাহিত্যের আলোচনা করতেন, তা নয়। দেশের কথা, বিশেষ করে হিন্দু-মুসলমানের সমস্যার কথাও আলোচনা করতেন। একবার তিনি বললেন, ‘দেশলাই-এর কাঠি জ্বলিয়ে দিলেই যে ঘরে আগুন লাগে তার কারণ ঘরের মধ্যে বহুকাল আগুন সঞ্চিত ছিল। যাঁরা বলতে চান, আমরা সবাই মিলে-মিশ ছিলুম ভালো, ইংরেজ এসেই আমাদের মধ্যে আগুন ধরিয়ে দিল, তাঁরা সমস্যাটিকে এড়িয়ে যেতে চান’।

আসলে বয়েসের উপান্তে পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষ দেখে বড় ব্যথিত হতেন। একদিন তিনি জসীমকে বলেন, ‘কেন যে মানুষ একের অপরাধের জন্য অপরকে মারে! ও-দেশের মুসলমানরা হিন্দুদের মারল, তাই এদেশের হিন্দুরা এখানকার নিরীহ মুসলমানদের মেরে তার প্রতিবাদ করবে, এই বর্বর মনোবৃত্তির হাত থেকে দেশ কি ভাবে উদ্ধার পাবে, বলতে পারো? দেখ, কি সামান্য ব্যাপার নিয়ে কলহ হয়। গরু কোরবানি নিয়ে, মসজিদের সামনে বাজনা নিয়ে। একটা পশুকে রক্ষা করতে কত মানুষকে হত্যা করেছে’।
[হায় রবীন্দ্রনাথ! একটা পশুকে রক্ষা করতে এই একবিংশ শতকেও এই দেশে মানুষকে হত্যা করা হয় এবং সেই ঘটনাকে সমর্থন করার জন্য তার উপর একটা ধর্মতাত্ত্বিক আবরণ জড়ানো হয়।]
গ্রাম্য গানের সংগ্রহ নিয়ে একবার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জসীম উদ্দিনের বিতর্ক হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ একটি সংকলনের জন্য ময়মনসিংহ গীতিকা ও ক্ষিতিমোহন সেনের সংগ্রহ থেকে কিছু গান নির্বাচিত করেছিলেন। জসীম উদ্দিন তাঁকে বলেন যে গ্রাম্যগাথার একটা কাঠামো সংগ্রহ করে চন্দ্রকুমার দে তার উপর নানা রচনা-কার্যের বুনট পরিয়ে সেগুলি দীনেশচন্দ্র সেনকে দিয়েছিলেন। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘বাউল’ নামক প্রবন্ধে ক্ষিতিমোহন সেন যে সব গ্রাম্য গান প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলিও অনেকটাই কৃত্রিম। জসীম উদ্দিন রবীন্দ্রনাথকে বললেন, “আপনার সংকলন পুস্তকে যদি এইসব গান গ্রাম্য সাহিত্যের নামে চলে যায়, তবে এরপরে যাঁরা খাঁটি গ্রাম্য গান সংগ্রহ করবেন, তাঁদের বড়ই বেগ পেতে হবে। কারণ এইসব সংগ্রহের সঙ্গে প্রচলিত আধুনিক সাহিত্যের মিশ্রণ আছে বলে সাধারণ পাঠকের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হয়। তারা এগুলি পড়ে বলে, ‘দেখ, দেখ, অশিক্ষিত গ্রাম্য কবিরা কেমন আধুনিক কবিদের মতো লিখেছে’। যাঁরা বহু পরিশ্রম করে খাঁটি গ্রাম্য গান সংগ্রহ করেন, তাঁদের সংগ্রহ পড়ে বিশেষজ্ঞেরা পর্যন্ত বলেন, ‘অমুকের সংগ্রহের চাইতে তোমার সংগ্রহ কিন্তু অনেক নিম্নস্তরের’।
জসীম উদ্দিন এখানে যে প্রশ্নটি তুলেছেন, তা খুবই প্রাসঙ্গিক ও সঙ্গত। লোকসাহিত্যের বিভিন্নশাখায় আধুনিক লেখকদের হস্তাবলেপনের দৃষ্টান্ত খুবই সুলভ।
রিপন কলেজে অধ্যাপক নিয়োগের ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্দিনকে সুপারিশপত্র দিয়েছিলেন, কিন্তু সে চাকরি তাঁর হয় নি। রবীন্দ্রনাথের সুপারিশে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-গবেষক পদে নিযুক্ত হয়ে রবীন্দ্রনাথকে কৃতজ্ঞতা জানাতে গেলে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তুমি আমাকে বড়ই আশ্চর্য করে দিলে হে। আমার কাছে কেউ কোন উপকার পেয়ে কোন দিন তা স্বীকার করে না’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকুরির ব্যাপারেও রবীন্দ্রনাথ জসীম উদ্দিনকে সুপারিশপত্র দিয়েছিলেন।
এই সময়কার একদিনের কথোপকথনের বিবরণ দিয়েছেন জসীম উদ্দিন। রবীন্দ্রনাথ কথাপ্রসঙ্গে জসীম উদ্দিনকে বলেছিলেন, ‘দেখ, আমার বিষয়ে লোকে যখন-তখন যা কিছু লিখতে পারে। কেউ কোন উচ্চবাচ্য করে না’।
জসীম উদ্দিন বললেন, ‘আপনি কবি, সাহিত্যিক ; আপনাকে নিন্দা করেও সাহিত্য তৈরি হয়। তাই আপনার নিন্দা করা সহজ। কিন্তু এ কথা নিশ্চয় জানবেন, দেশের সহস্র লোক আপনার কবিতা পড়ে আনন্দ পায়—আপনাকে শ্রদ্ধা করে, আপনি তাদের দেখেন নি’।
একটু চুপ করে থেকে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘দেখ, মহাত্মা গান্ধীকে তো কেউ নিন্দা করতে সাহস করে না’।
বিনীতভাবে জসীম উদ্দিন বলেন, ‘মহাত্মা গান্ধী বিশিষ্ট ব্যক্তি হলেও তাঁকে নিন্দা করলে সাহিত্য তৈরি হয় না। আপনার সঙ্গে আপনার নিন্দুকেরাও কিছুদিন বেঁচে থাকতে চায়। ছুছুন্দরী কাব্যের লেখকের নাম আজ কে মনে রাখত যদি মাইকেলের অমর কাব্যের সঙ্গে এই কাব্য জড়িত না থাকত!’
১৯৪১ সালে মারা গেলেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরে আরও তিরিশ বছর বেঁচে ছিলেন জসীম উদ্দিন। কিন্তু বেঁচে ছিলেন একটা আপশোশ নিয়ে। কেন তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে রাজি হলেন না? কেন থাকলেন না শান্তিনিকতনে! বারো বছর তো খুব কম সময় নয়। এই বারো বছরে তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে থাকলে আরও সমৃদ্ধ হতে পারতেন।
[মোঃ মাছুদুর রহমানের একটি গবেষণাপত্র আমার হাতে এল আমার ছাত্র গ্রন্থাগারিক ড.সমীরণ নস্করের সাহায্য। গবেষণাপত্রটির নাম ‘বাংলাভাষায় ইসলামি সাহিত্যচর্চা’ (১৯০১-১৯৫০)। এই গবেষণাপত্রে ইসলামি সাহিত্যচর্চাকারী হিসেবে শেখ আবদুর রহিম, বেগম রোকেয়া, মোজাম্মেল হক, এস ওয়াজেদ আলি, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, নজরুল ইসলাম প্রভৃতির নাম আছে কিন্তু জসীম উদ্দিনের নাম নেই। তাহলে কি জসীম উদ্দিন ইসলামি সাহিত্যের চর্চা করেন নি? তাহলে কি তাঁকে নিখাদ অসাম্প্রদায়িক বলা যায়? ]
ঋণ :
ঠাকুরবাড়ির আঙিনায় / জসীম উদ্দিন। রবীন্দ্রস্মৃতি / জসীম উদ্দিন। নানা মাত্রায় জসীম উদ্দিন / ‘প্রথম আলো’ । জসীম উদ্দিন / বিমল গুহ।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক