এক্রামদ্দিন : প্রথম যুগের রবীন্দ্র-আলোচক
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে এ দেশের মুসলমান সমাজের বিচিত্র সম্পর্ক। সে সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাদ-প্রতিবাদ, নিন্দা-প্রশংসা, গ্রহণ-বর্জন। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রথম যে মুসলমান লেখকের মন্তব্য পাই, তিনি আবদুল হামিদ খান ইউসফজয়ী (১৮৪৫-১৯১০)। তিনি তাঁর ‘উদাসী’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকা লিখতে গিয়ে বলেছেন রবীন্দ্রনাথের কথা। বলেছেন, ‘দেশের অতি পুণ্যফলে অতিশয় তরুণ বয়সে দেবতার ঘরে দেব জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছেন। জাতীয় সাহিত্য জগতের নন্দনকাননে বাস্তবিক তিনি বাসন্তি পিক। ভাবের বিভোলে বিহ্বল হইয়া যে সকল সংগীত গাথা তিনি দিবানিশি গাহিতেছেন এবং যে সকল অমৃত লহরী অনবরত ঢালিয়া দিয়া বঙ্গের তাপিত প্রাণ শীতল করিতে প্রয়াসী হইয়াছেন, তাহা হইতে বিদগ্ধ ভারতের ভাগ্যে কালে অমৃত ফল যে না ফলিবেক. এমন নহে’।
এর পরে আসে এক্রমদ্দিনের কথা। বর্ধনামের রায়না থানার কুলিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। বর্ধমান রাজ কলেজ ও হুগলি কলেজে তিনি স্নাতক হন। সাব-ডেপুটি কালেক্টর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। মানুষটি সাহিত্য রসিক ছিলেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি ও বীরভূম সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে তাঁর যোগ ছিল। সৃজনশীল সাহিত্য ও সমালোচনা- উভয়েই তিনি পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। ‘কাচ ও মণি’, ‘মহিমাময়ী নারী’, ‘ নতুন মা’, ‘মতি মঞ্জিল’ . ‘জীবনপণ’ প্রভৃতি উপন্যাসের রচয়িতা তিনি। ‘মেঘনাদবধ ও বৃত্রসংহার’, ‘চন্দ্রশেখর ও বঙ্কিমচন্দ্র’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ প্রভৃতি তাঁর সমালোচনামূলক প্রবন্ধের উদাহরণ।
এর পরেই আসে ‘রবীন্দ্র প্রতিভা’র কথা। এই বইটি প্রকাশিত হয় ১৩২১ সালে বইটির প্রকাশক বর্ধমানের উকিল মৌলবি নজিরদ্দিন। ১৩২১ সালের আগে ১৩১৯ সালে বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অজিতকুমার চক্রবর্তীর ‘রবীন্দ্রনাথ’ বইটি। তাই আমরা এক্রমদ্দিনকে প্রথম যুগের রবীন্দ্র সমালোচক বলেছি।
বইএর নামকরণ ও রচনার প্রেরণা সম্বন্ধে লেখক বলেছেন, ‘আমি প্রথম উদ্যমেই রবীন্দ্রনাথের সমালোচনারূপ দুরূহ কার্যে কেন ব্রতী হইলাম, তাহা অনেকবার চিন্তা করিয়াছি, কিন্তু কারণ খুঁজিয়া পাই নাই। যেমন হৃদয় ভারাক্রান্ত হইলেমানুষ সঙ্গত হউক বা অসঙ্গত হউক আপনার বক্তব্য না বলিয়া থাকিতে পারে না, আমারও বুঝি তদ্রূপ। আমার মনে যাহা আসিয়াছিল তাহাই লিখিয়াছিলাম, ইহা পুস্তকাকারে প্রকাশিত হইবে তাহা কখনও স্বপ্নেও ভাবি নাই। … এই পুস্তক প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের নাট্যকাব্য বিসর্জনের আলোচনা হইলেও ইহাতে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে সাধারণভাবে অনেক কথা বলা হইয়াছে, এই নিমিত্ত ইহার নাম রবীন্দ্র প্রতিভা দেওয়া হইল। ‘
এক্রামদ্দিন তাঁর নিজের মতো করে রবীন্দ্র প্রতিভার ক্রমবিকাশের আলোচনা করেছেন। সে আলোচনার সীমাবব্ধতা আছে এবং থাকাই স্বাভাবিক। কারণ, ১৯১৪ সালে তিনি বই লিখছেন, রবীন্দ্র প্রতিভা তখন অর্ধ-বিকশিত। কিন্তু তিনি যখন বলেন ‘রবীন্দ্রনাথ সেই রূপ কবি যাঁহার রচনা কাব্যজগতে বিপ্লব আনয়ন করে’ — তখন তার যাথার্থ স্বীকার করে নিতে হয়। কবিতার রূপ ও রীতির পরীক্ষা — নিরীক্ষায়, যথার্থ গীতি কবিতার অবয়ব নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ সত্যই বিপ্লব আনয়ন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মধ্যে যে খাঁটি গীতিকবির ধর্ম ছিল, সে কথা বলতে গিয়ে এক্রমদ্দিন বলেন, ‘ রবীন্দ্রনাথ পূর্ববর্তী কবিগণের ন্যায় শ্রোতৃবর্গকে মুগ্ধ করিবার জন্য দশের মাঝে সভামণ্ডপে দণ্ডায়মান নহেন, তিনি নির্জনে বসিয়া আত্মকৌতূহল নিবৃত্তির নিমিত্ত মানব জীবনের জটিল গুপ্ততত্ব নিরূপণে যত্নবান। প্রায় অনুরূপ কথা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন বিহারীলাল সম্বন্ধে।
এক্রমদ্দিনের ‘রবীন্দ্র প্রতিভা’ মোট চব্বিশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত : নানা কথা, পিশাচ শক্তির বলসঞ্চয়, দেব শক্তির বল সঞ্চয়, দেব শক্তির সহিত পিশাচ শক্তির সংঘর্ষ, সত্য ও প্রেমের দ্বন্দ্বযুদ্ধ, বাহ্যশক্তির সহায়তায় সত্যের জয়লাভ, পিশাচের অন্তঃশক্তির পরাক্রম, বিশ্বপ্রেম ও ভক্তি, মনুষ্যত্ব ও সংস্কার, বায়ুতাড়িত গোলক, মৃগ ও ব্যাথ, পথিকের পান্থশালা ও দেবতার গৃহ, পাপের সম্মুখে পাপী, অপরাধী ও বিচারক, দেবের বাহ্যশক্তির প্রতিক্রিয়া, পিশাচের বাহ্যবলের প্রতিক্রিয়া, মধুহীন পুষ্প, পৈশাচিক শক্তির প্রতিক্রিয়ার ফল, মানব সমাজের স্বার্থপরতা, সমাজচ্যুতা অপর্ণা, দেবভাব ও পিশাচভাব, পাশব বা পৈশাচিক যুদ্ধের ফলাফল, কাব্যালোচনা, নামমাহাত্ম্য।
মোটামুটিভাবে বলা যায় ‘বিসর্জন’ নাটকে রবীন্দ্রনাথ যে দুই ভাবের বিরোধ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন, সেটি এক্রমদ্দিনের আলোচনায় প্রকাশ পেয়েছে। তবে সর্বত্র তিনি বিবেচনা ও শিল্পবোধের পরিচয় দিতে পারেন নি। সেটা সে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যাশিতও ছিল না। এই বই সম্বন্ধে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করেছেন সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী, প্রমথনাথ তর্কভূষণ, ক্ষীরোদপ্রসাদ বিদ্যাবিনোদ, বেঙ্গলি, সওগাত, মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকার সমালোচকবৃন্দ।
আর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ?
এক্রামদ্দিন রবীন্দ্রনাথকে তাঁর বই পাঠিয়েছিলেন। বিনয়ী রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, — ‘এই বই সম্বন্ধে আমি অভিমত জানাইতে পারিব না, ক্ষমা করিবেন। কেবল এটুকু বলিলে দোষ নাই যে, আপনি যে সরস বাংলা ভাষায় আমার রচনার সমালোচনা করিয়াছেন, তাহা পাঠ করিয়া আমি বিস্মিত হইয়াছি’।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক