সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্পর্কে জানার কৌতূহল স্বাভাবিক ভাবেই দেশবিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। চটজলদি পদক্ষেপে বিদেশেও নানাভাবে বেশকিছু জীবনী প্রকাশিত হয়। জার্মান ভাষায় লেখা Paul Cremer-এর Rabindranath Tagore (১৯১৪) থেকে শুরু করে ইংরেজিতে লেখা Earnest Rhys-এর Rabindranath Tagore : A biographical study (১৯১৫), Basanta Koomar Roy-এর Rabindranath Tagore : The man and His poetry (১৯১৫) প্রভৃতি জীবনী রচনার প্রয়াস লক্ষণীয়। সেখানে শুধু রবীন্দ্রনাথকে প্রকাশের আলোতে নিয়ে আসার তীব্রতাই ছিল না, সেইসঙ্গে প্রথম প্রকাশের আত্মগৌরবও নিবিড়তা লাভ করে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের পুরস্কারপ্রাপ্তিতে বিদেশে তাঁর জীবনকথা জানার আগ্রহে স্বল্পপরিসরের মধ্যেই যেভাবে তা প্রকাশের তীব্রতায় সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, তাতে জীবনীলেখকের আত্মগৌরবের বিষয়টি আপনাতেই প্রকট হয়ে আসে। ইংরেজিতে লেখা জীবনীগুলিতেই তা প্রতীয়মান। সেখানে ‘study’-র আংশিকতা যেমন উঠে আসে, তেমনই তার বস্তুনিষ্ঠতার অভাববোধ স্বাভাবিকতা লাভ করে। অন্যদিকে সুদূর আমেরিকার প্রবাসী বাঙালি বসন্তকুমার রায় তাঁর বইয়ের ভূমিকার সেই আত্মগৌরবের কথা স্পষ্ট করে তোলেন।
১৯১৫-এর ১২ ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক থেকে লেখা ভূমিকায় জীবনীকার জানিয়েছেন : ‘My first paper on Tagore was published in July 1913 ; and that time of the Award it was about the only article in English that gave an idea of the wonderful personality of the poet.’ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়ার পূর্বেই বসন্তকুমারের রবীন্দ্রনাথের জীবনকথা প্রকাশের দাবি মূর্ত হয়ে উঠেছে। অথচ ইংরেজিতে রবীন্দ্রকাব্যসাধনার প্রথম সশ্রদ্ধ স্বীকৃতি বহু পূর্বেই লক্ষণীয়। ব্রজেন্দ্রনাথ শীল ১৮৯১-তেই ‘Calcutta Review’তে লিখেছেন ‘The New Romantic Movement in Bengali Literature’। আর ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় ১৯০০-র ১ সেপ্টেম্বরে সাপ্তাহিক ‘সোফিয়া’ পত্রিকায় ‘The World-Poet of Bengal’সম্পাদকীয়তে রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বকবি বলে অভিহিত করেন। অন্যদিকে আমেরিকায় রবীন্দ্রনাথ ও রথীন্দ্রনাথের পরিচয়সূত্রে বসন্তকুমার কবির ‘জীবনস্মৃতি’র (১৯১২) ছায়াকে কায়ায় আবেদনক্ষম করে তুলতে পারেননি। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের জীবনীরচনার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতার প্রথম পরিচয় দিয়েছেন বাঁকুড়ার ওয়েলিসান স্কুলের অধ্যক্ষ ও কলেজের উপাধ্যক্ষ ও ইংরেজির অধ্যাপক এডওয়ার্ড টমসন (৯ এপ্রিল ১৮৮৬-২৮ এপ্রিল ১৯৪৬)। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। এজন্য তাঁর মিশনারি-অধ্যাপকের পরিসরেই তাঁর পরিচয় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েনি, ইংরেজ কবি, সাংবাদিক, অনুবাদক, গবেষক প্রভৃতিতেও তার বিস্তার ঘটে। রবীন্দ্রনাথকে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। সে সুযোগ শান্তিনিকেতনে কবির নোবেলপ্রাপ্তির সংবাদের দিনে আরও আন্তরিক হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য লাভ করলেও এডওয়ার্ড টমসন অতিদ্রুততার সঙ্গে রবীন্দ্রজীবনী লেখায় সক্রিয় হয়ে ওঠেননি। স্বল্প পরিসরে তিনি ১৯২১-এ রবীন্দ্রনাথের জীবনীকথা তুলেধরেন তাঁর Rabindranath Tagore : His Life and Works-এ। তারই সম্প্রসারিত রূপ তাঁর দ্বিতীয় বই Rabindranath Tagore : Poet and Dramatist (১৯২৬)। এডওয়ার্ড টমসন প্রথম ইংরেজিতে যেভাবে রবীন্দ্রনাথকে বিদেশি জনমানসে তুলেধরায় ব্রতী হয়েছিলেন, তা শুধু বিতর্কের পরিসরে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েনি, তাঁর বহুমুখী ব্যক্তিত্বকেও উপেক্ষিত করে তুলেছে।
টমসন জন্মেছেন ইংলণ্ডে, শৈশব কেটেছে দক্ষিণ ভারতের তিরুচিরাপল্লিতে। তাঁর ওয়েলিসান মিশনারি পিতামাতা সেখানেই সেবাকাজে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর দশ বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। মায়ের সঙ্গে ইংলণ্ডে ফিরে যাওয়ায় সেখানেই দারিদ্রের সঙ্গে তাঁর বেড়ে ওঠা। ছাত্রজীবনেই পরিবারের দায় মেটানোর জন্য যেমন কাজে যোগ দিয়েছিলেন, তেমনি আবার পড়া চালিয়েছেন, কাব্যচর্চাও করেছেন। ১৯০৭-এর তাঁর প্রথম কাব্য The Knight Mystic প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে তাঁকে ১৯১০-এ স্কুল ও কলেজের দায়িত্ব নিয়ে বাঁকুড়া আসতে হয়। বর্তমান এতিহ্যবাহী বাঁকুড়া ক্রিশ্চান কলেজই প্রথমে ওয়েলিসান কলেজ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিল ১৯০৩-এর ২৯ জুন। সেটিই বাঁকুড়ার প্রথম কলেজ। সেই স্কুল-কলেজের দায়িত্বে ১৯২২ পর্যন্ত স্থায়ী হলেও মাঝে ১৯১৬ থেকে ১৯১৯-এর প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দেশের সৈন্য বিভাগে যোগ দিয়েছিলেন এবং তাতে বিশেষ কৃতিত্বের জন্য মিলিটারি ক্রসও পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতাই তাঁর দুটি কাব্যে (The Leicestershires beyond Baghdad, The Mesopotanimian) প্রকাশিত হয় ১৯১৯-এ এবং কবি হিসাবে আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করেন। রবীন্দ্রনাথ এই মিশনারি পণ্ডিত-কবি-অধ্যাপককে চিনেছিলেন। ১৯১৩-র ১৪ নভেম্বর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তির সংবাদে উচ্ছ্বাসমুখরিত দিনেই টমসন প্রথম শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন। বন্ধু লোকেন পালিতের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের আলাপ হয়েছিল। ইতিমধ্যে তিনি বাঁকুড়ার নিঃসঙ্গতার অবকাশে একাকী সাইকেলে করে ঘুরে বেরিয়ে যেমন গ্রামবাংলাকে চিনেছিলেন, তেমনি বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করায় সক্রিয় হয়েছিলেন। বাংলা ভাষাকে আয়ত্ব করেই তিনি থেমে থাকেননি, তার সাহিত্যের সঙ্গেও সংযোগসাধনেও তৎপর হন। সেদিক থেকে রামপ্রসাদী গান থেকে শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের অনুবাদেও তিনি ব্রতী হয়েছিলেন। দীনেশচন্দ্র সেন, শরৎচন্দ্রের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল। অন্যদিকে এদেশে তিনি ইংলণ্ডের ম্যাঞ্চেস্টারের ‘গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সাংবাদিকও ছিলেন। সেদিক থেকে বাংলা ও বাঙালিকে জানার পরিসরেই টমসন রবীন্দ্রনাথে পৌঁছেছিলেন। রবীন্দ্রনাথও তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথই তাঁকে কলকাতায় সাক্ষাতের পর শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। তাঁদের আন্তরিকতার পরশ আপনাতেই ছড়িয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত টমসন রসিকতা করে আত্মহত্যার পরামর্শ দিতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর কথায় : ‘পৃথিবীতে আর কিছু আপনার পাওয়ার রইল না, রবিবাবু। আজ রাতেই আত্মহত্যা করুন আপনি। শুধু আগে ঠিক করে নিন পরের জন্মে কী করতে চান।’ আসলে টমসনের স্পষ্টবাক্মূর্তিতে কপটতা না থাকলেও অপ্রিয়তার অবকাশ আপনাতেই সবুজ হয়ে উঠেছে। তাঁর প্রখর আত্মসম্মানবোধও তার সহায়তা করেছে। এজন্য তাঁকে ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ আপনাতেই তীব্রতা লাভ করেছে। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে তাঁকে আপনার করে নিতে চেয়েছিলেন, সেভাবে তিনি আন্তরিক হতে পারেননি।
টমসন রবীন্দ্রনাথের জন্যই তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবে জানার অবকাশ পেয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে কবির প্রশ্রয়কে টমসন তাঁর স্বভাবসঙ্গত কারণে সদ্ব্যবহার করতে অসফল হয়েছেন। শান্তিনিকেতনে সেদিন সন্ধ্যাতেই রবীন্দ্রনাথ তাঁকে তাঁর কবিতার ইংরেজি অনুবাদ একটু দেখে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। দেখে দেওয়ার বন্ধুকৃত্য শোভনতা অতিক্রম করে টমসন তাতে মাস্টারি করে শ’দেড়েক কবিতায় প্রায় শ’তিনেক পেন্সিলের আঁচড় কেটে কবির আন্তরিকতাকেই আঘাত করেন। এজন্য রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চিঠি লিখে (১৮-২০ নভেম্বর ১৯১৩) তাঁর তীব্র অনীহা জানিয়ে তা থেকে বিরত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, ১৯১৩-এর ২৭ নভেম্বরে লেখা চিঠিতে কবি তাঁর বিরূপ মনোভাব স্পষ্ট করে তোলেন। সেখানেই শেষ নয়। পরের দিন রবীন্দ্রনাথের ‘The Gardener’ পাঠের প্রতিক্রিয়ায় টমসন যে সুদীর্ঘ চিঠি লিখেছিলেন, তাতেও কবির মন ওঠেনি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের অনুবাদের দুর্বলতা নিয়ে তাঁর বইয়ের মধ্যেও মুখর হয়েছেন টমসন। তাঁর এই অপ্রিয় প্রকৃতি সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিকূলতাকে স্বাভাবিকভাবেই আমন্ত্রণ জানায়। অথচ তারপরেও দুজনের মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ টমসনের মনোভাবে বা সমালোচনায় বিরূপ হলেও তাঁর প্রতি বিমুখ হননি। এজন্য তাঁর বিরূপ প্রকৃতির পরেও কবি তাঁকে দূরে সরিয়ে দেননি, বরং ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে আপনার করে নিয়েছেন। অন্যদিকে টমসন রবীন্দ্রনাথকে আপনার করে পেতে চেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, এতে তাঁর একপ্রকার নাছোড় রবীন্দ্রানুরাগই তাঁকে রবীন্দ্রচর্চায় স্মরণীয় করে তুলেছে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বিরূপতাও সেই অনুরাগ থেকে তাঁকে বিরত করতে পারেনি। ১৯১৪-এর ১২ জানুয়ারি চিঠি লিখে তিনি কবিকে বাঁকুড়ায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, ‘You must come to Bankura, my boys are longing to see you’. রবীন্দ্রনাথ নোবেলপ্রাপ্তির পর পদ্মায় একাকী নিজেকে খুঁজে ফেরার জন্য সে আহবানে সাড়া দিতে পারেননি। অথচ কবিকে না-পাওয়ার অনুশোচনাও টমসনকে রবীন্দ্রবিমুখ করে তোলেনি। এজন্য ম্যাকমিলান থেকে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অনুবাদে তিনিও যোগদেওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করেন এবং কবিও তাতে সম্মতি জানান। অবশ্য অনুবাদের জন্য টমসনের ফি’র দাবিকে রবীন্দ্রনাথ মেনে নেননি। সেই অনুবাদ থেকে প্রাপ্ত অর্থ শান্তিনিকেতনের উন্নয়নে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে টমসন অনূদিত ‘শুভা’ গল্পটির প্রশংসা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। শুধু তাই নয়, ‘মধ্যবর্তিনী’ গল্পটির অনুবাদ নিয়ে কবি তাঁর কাছে পরামর্শও চেয়েছিলেন। অন্যদিকে অনুবাদক হিসাবেও টমসন তাঁর প্রত্যাশিত স্বীকৃতি লাভে ব্যর্থ হন। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে সি এফ এন্ড্রুজের সহায়তা করে অনুবাদ করতে বলেন। ‘Hungry stones and other stories’ (১৯১৬), ‘Mashi and other stories’ (১৯১৮) গল্প গ্রন্থদুটির প্রথমটির সাতটি গল্পের অনুবাদক হিসাবে সি এফ এন্ড্রুজের নাম ছাপা হয়। বাকি তিনটি গল্পের অনুবাদকের সহকারী হিসাবে টমসনের নাম প্রকাশ পায়। অন্যদিকে ১৯১৬-তে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিতে মেসোপটেমিয়ায় চলে গেলেও সঙ্গে বাংলা ব্যাকরণ, বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবীচৌধুরানী’ সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ‘শান্তিনিকেতন’-এর প্রবন্ধাবলিও নিয়ে যান এবং ফিরে আসার পরে আবার রবীন্দ্রচর্চায় মেতে ওঠেন। তারই প্রথম ফসল তাঁর ‘Rabindranath Tagore : His Life and Works’ ১৯২১-এর সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। অবশ্য একাজ করার জন্য রীতিমতো গবেষণা করে এগোতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, কলেজের অস্থির প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেই তিনি সেকাজে ব্রতী ছিলেন।
১৯১৯-এর জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে সারা দেশে তীব্র প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। দেশবাসীর মনের ক্ষতে প্রলেপ দিতে গিয়ে টমসন উভয় সংকটে পড়েছিলেন। ‘What happened at Jalianwala Bagh’ নামে একটি প্রবন্ধে তিনি যেমন ঘটনাটিকে পূর্বপরিকল্পিত নয় বলেছেন, তেমনই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের সমালোচনাও করেছেন। তার ফলে দেশবাসীর কাছে যেমন তিনি অপ্রিয় হয়েছিলেন, তেমনই তাতে ব্রিটিশ শাসকদের কাছেও তাঁকে বিরাগভাজন হতে হয়। অন্যদিকে তার রেশে পড়ে তাঁর কলেজেও। জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ও গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে কলেজের ছাত্ররা কলেজ বয়কট করে। আবার ১৯২১-এর এপ্রিলে প্রিন্স অব ওয়েলসের বোম্বে আগমন উপলক্ষ্যে কলেজের সহকর্মীরা আনুগত্য প্রদর্শনে ছুটির দাবি জানায়। এই সময় টমসন কলেজের এক্টিং প্রিন্সিপালের দায়িত্বে ছিলেন। সেই উভয় সংকটে পড়ে তাঁকে প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্যেই রবীন্দ্রচর্চা চালিয়ে যেতে হয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে না পেলেও তাঁকে জানার জন্য তাঁর প্রয়াস জারি ছিল। ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের দৌলতে প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের সঙ্গে টমসনের আলাপ হয়। সেই আলাপ ঘনিষ্ঠতায় আন্তরিকতা লাভ করে। প্রশান্তচন্দ্র আমন্ত্রিত হয়ে বাঁকুড়ায় এসেছিলেন এবং সপ্তাহখানেক টমসনের সঙ্গে কাটিয়ে যান। তাঁদের কথোপকথনই ‘The Notebook of Conversation’-এ মহার্ঘ হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, টমসন তাঁর ‘Rabindranath Tagore : Poet and Dramatist’ বইটি প্রশান্তচন্দ্র ও তাঁর সহধর্মিনী নির্মলকুমারীকে উৎসর্গ করেছেন। অন্যদিকে টমসন যে তাঁর জীবনীরচনা সক্রিয় রয়েছেন, সেকথা রবীন্দ্রনাথও জানতেন। এজন্য তাঁর লেখায় স্বচ্ছন্দভাবে রচনার উদ্ধৃতি ব্যবহারের সানন্দ সম্মতি দিয়েছিলেন কবি। ১৯২০-এর ২০ অক্টোবরে ইংলণ্ডে থেকে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ টমসনকে জানিয়েছেন : ‘আপনার কাজ ভালো মতো অগ্রসর হচ্ছে জেনে সুখী হলাম। আমার লেখা থেকে যেমন ইচ্ছে উদ্ধৃতি আপনি ব্যবহার করতে পারেন—কবিতার ক্ষেত্রে, যেসব কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ হয়নি, সেসব কবিতা আপনি নিজেই অনুবাদ করে নিতে পারেন।’ এই চিঠির মধ্যেই টমসনের প্রতি পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরেও রবীন্দ্রনাথের গভীর শ্রদ্ধা ও আস্থা যে বজায় ছিল, তা উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, প্রথম বইটি প্রকাশের পর তীব্র প্রতি বিরূপতার পরেও কবি তাঁকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে কাছে টেনে নিয়েছেন।
টমসনের বইটিতে রবীন্দ্রনাথ খুশি হতে পারেননি। সেখানে তাঁর প্রতি স্বদেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবোধে যেভাবে তাঁর জনপ্রিয়তার অভাবকে প্রকট করে করে তোলা হয়েছে, তাতে কবি ক্ষুব্ধ হন এবং সে ক্ষোভ তিনি প্রশান্তচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে ( ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯২১) জানিয়েছেন। অন্যদিকে টমসনের বইটির রবীন্দ্রমূল্যায়ন বাংলার বুদ্ধিজীবীদের অনেক্ককেই বিরূপ করে তুলেছিল। ‘অধ্যাপক টমসনের রবীন্দ্রনাথ’ নামে ‘প্রবাসী’তে (পৌষ ১৩২৮) বইটির সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল। এমনকি, ব্রজেন্দ্রনাথ ও প্রশান্তচন্দ্রও তাতে জীবনীকারের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। প্রথমজন তো টমসনের সঙ্গে সম্পর্কই ত্যাগ করেন। অন্যদিকে প্রশান্তচন্দ্র রবীন্দ্রনাথ ও টমসনের মধ্যে মধ্যস্থতা করায় এগিয়ে আসেন। উল্লেখ্য, টমসনের কাজের প্রতি প্রশান্তচন্দ্রের শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। এজন্য প্রয়োজনে দুজনের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে সেই ভুলবোঝাবুঝির অবসান চেয়েছিলেন। কবিও টমসনকে এজন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি লেখেন ১৯২১-এর ২ অক্টোবর। তাঁর কথায় : ‘Do not misunderstand me and never think that I am angry…I have been expecting you for long . Please do not disappointment me if you can help.’ শান্তনিকেতনে তাঁদের সেই মেধাবী সান্নিধ্যের (৭-৯ অক্টোবর ১৯২১) আধারেই লেখা হয় ‘Edward Thomson’s Notebook of conversation with Rabindranath’ প্রখ্যাত রচনাটি। সেই সাক্ষাৎকারের তথ্যগুলি টমসন তাঁর পরের রবীন্দ্রবিষয়ক বই ‘Rabindranath Tagore : Poet and Dramatist’ (১৯২৬)-এ ব্যবহার করেছেন। অবশ্য সে-বইটিও রবীন্দ্রনাথকে স্বস্তি দেয়নি। এমনকি, টমসন যে তাঁর সাহিত্যকে ভালোভাবে আত্মস্থ করতে পারেননি, সেকথা তিনি বাণীবিনোদ বন্দ্যোপাধ্যায় ছদ্মনামে ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত ‘রেভারেণ্ড টমসনের বহি’ প্রবন্ধেই জানিয়ে দেন। অন্যদিকে বাংলার বিদ্বৎসমাজে প্রথমটির চেয়েও দ্বিতীয় বইটির বিরূপ সমালোচনা আরও তীব্রতাই শুধু নয়, তিক্ততায় বিজাতিবিদ্বেষী মনোভাবের সক্রিয়তায় বিচ্ছেদের আবহও তৈরি করে। সেক্ষেত্রে বাংলায় রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠবোধে গ্রহণের উৎকর্ষমুখরতায় রবীন্দ্রবিরোধী মানসে টমসনের প্রতি বিমুখতা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। অথচ অবাঙালিদের মধ্যে বিশেষ করে বিদেশে রবীন্দ্রপ্রতিভার পরিচয় প্রদানে টমসনের প্রয়াস জনপ্রিয়তা লাভ করে। প্রথম বইটির সমাদরই কথা স্বয়ং প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ রবীন্দ্রনাথকে জানিয়েছেন(২৫ অক্টোবর ১৯২১) : ‘Thomson-এর বইখানার খুব কাট্তি হচ্ছে ও হবে—এখন যতটা পারা যায় সব ঠিক করে দেওয়া দরকার। Thomsonকে লিখেছি যে চিঠিতে হবে না, সামনাসামনি ওর সঙ্গে বসতে হবে।’ সেদিক থেকে টমসনের বইয়ের সমাদরই তার গুরুত্বকে অনস্বীকার্য করে তুলেছে।
অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে টমসনের মতান্তর হলেও মনান্তর ছিল না। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ভালোভাবেই চিনেছিলেন। এজন্য প্রশান্তচন্দ্রকে কবি টমসনের মতের প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। ১৯২১-এর ৪ নভেম্বরে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে জানিয়েছেন : ‘…না তুমি’ Thomson-এর মতের কোনো প্রতিবাদ করো না। সে তার নিজের বুদ্ধি অনুসারে যা বলেছে সে তার নিজেরই জিনিষ তার কাজ হচ্ছে নানা source থেকে তথ্য এবং মতামত সংগ্রহ করে সেগুলোকে তাঁর আপন মনের ছাঁচে ঢালাই করে একটা মূর্তি খাড়া করে তোলা। সেই মূর্তির জবাবদিহি তোমাদের নয়। আমার নিজের কথা যদি বল আমি কিছুমাত্র রাগ করিনি, কারণ আমি দেখেছি টমসন আমার প্রতি অশ্রদ্ধার ভাব থেকে কিছু লেখেননি—আমার সঙ্গে আমার চারিদিকের যে সম্বন্ধ, সে সম্বন্ধে ব্যক্তিগত বা জাতিগত কারণে ও যদি ভুল বুঝে থাকে সে ভুলের জন্যে ছটফট করবার দরকার নেই…।’ সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ টমসনের মূল্যায়নকে উপেক্ষা তো করেনেনিই, উপরন্তু তার আবেদনকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে আপন করে নিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, আজীবন তাঁদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অটুট ছিল। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথ টমসনের পরামর্শ মেনে তাঁর রচনার ইংরেজি সংকলন ও বৈষ্ণবপদাবলির গৃহপাঠ্য সংস্করণ প্রকাশের সদিচ্ছাও জানিয়েছিলেন। টমসনও রবীন্দ্রনাথের পূর্ব-পশ্চিমের সেতুবন্ধনের সহায়কই শুধু নয়, তাঁর চিন্তাভাবনারও শরিক হওয়ায় বাকি জীবনেও সক্রিয় ছিলেন। অন্যদিকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ টমসনের বইটিকেই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। প্রশান্তকুমার পাল ‘রবিজীবনী’র নবম খণ্ডে জানিয়েছেন : ‘কিছু ত্রুটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ সমালোচনা করলেও মোটের উপর তিনি টমসনের বইটি এ-পর্যন্ত তাঁর বিষয়ে লেখা শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ বলে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।’ সেই প্রথম ‘শ্রেষ্ঠ গ্রন্থে’র রচয়িতাকে রবীন্দ্রনাথ স্বীকৃতি দিলেও তাঁর আবেদন বাংলার রবীন্দ্রচর্চায় অপ্রাসঙ্গিকতায় উপেক্ষিত ও ব্রাত্য হয়ে পড়ে। অথচ প্রথমের চাঁদের কলঙ্ক অনিবার্যতা সত্বেও তার অবদানকে অস্বীকার করা যায় না। শুধু তাই নয, বাংলার সমাজ-ধর্ম-সংস্কৃতি ও সাহিত্যের ইতিহাসের আধারে বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে ইংরেজিতে রবীন্দ্রজীবনী রচনায় প্রথমের স্বীকৃতিও সেখানে অনাদরে অবহেলার শিকার হয়ে ওঠে। সেখানে টমসনের বহুমুখী ব্যক্তিত্ব আপনাতেই আত্মগোপন করে চলে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪
আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এত মূল্যবান একটি লেখা আমাদের বিনামূল্যে পড়বার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। এই প্রাবন্ধিকের আরো লেখা চাই…
খুব সুন্দর একটি বিষয় জানতে পারলাম। লেখককে ধন্যবাদ।সেই সঙ্গে একটি আবদার ওনার কাছে, বাংলা সাহিত্যের এইরকম অনালোকিত বিষয় গুলো যদি তুলে ধরেন, তাহলে আমার মতো অনেকেই উপকৃত হবেন।
ধন্যবাদ আপনাদের কে এইরকম প্লাটফর্ম করে দেবার জন্য।