| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কালিম্পংয়ে রবীন্দ্রনাথ : স্বর্ণাভা কাঁড়ার

Reporter
স্বর্ণাভা কাঁড়ার / ৮৯১ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২২

মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বের তিনটি বছর অর্থাৎ ১৯৩৮,১৯৩৯ এবং ১৯৪০ সালে কবিগুরি রবীন্দ্রনাথ কিছুদিনের বিশ্রাম ও স্বাস্থ্যের কারণে কালিম্পং-এর মংপুতে অবস্থান করেন। ১৯৩৮-এ কবি বেশ ভালোভাবেই এখানে দিনগুলি কাটিয়েছিলেন। ১৯৩৯-এ তিনি বেশির ভাগ সময় মংপুতে মৈত্রেয়ী দেবীর গৃহে কাটান। কিন্তু ১৯৪০ সালে কবির কবির গুরুতর অসুখ হয়। এই সময়ে তাঁকে যে স্থআনীয় কালিম্পংবাসী ডাক্তার চিকিৎসা করেন তাঁর নাম ডা. গোপালচন্দ্র দাশগুপ্ত (বি-এসসি, এম-বি)। তিনি যেভাবে ওই সময় রবীন্দ্রনাথের সানিধ্যে এসেছিলেন, তার আলেখ্য অনেকাংশে এই প্রবন্ধের উপজীব্য।

ডা. দাশগুপ্ত ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত একটানা ৫৪ বছর কালিম্পং শহরে ডাক্তারি করেন। ঢাকা বিক্রমপুরের প্রাক্তন অধিবাসী এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের জ্ঞাতি আত্মীয় ডা. দাশগুপ্তের পিতাও ডাক্তার ছিলেন। পরবর্তী কালে এই পরিবার পশ্চিম দিনাজপুরের বাহিন গ্রামের অধিবাসী হন। এখানেই গোপালচন্দ্রর জন্ম। তিনি ১৯১৭ সালে কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশন থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। ডা. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি ও শ্রী সৌম্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সতীর্থ ছিলেন। ১৯২৭-এ কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ (অধুনা আর জি কর) থেকে এম বি পরীক্ষায় পাস করে বিহারে মুঙ্গের শহরে চিকিৎসা আরম্ভ করেন। ওখানে সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পিতা তারাকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ডা. দাশগুপ্তকে মুঙ্গেরে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ওখানকার সামাজিক পরিস্থিতি তখন সুস্থ জীবনযাত্রার পক্ষে অনুকূল মনে হয়নি বলে তিনি ১৯২৮-২৯ সালে মাত্র ১০ মাস থেকেই চলে আসেন। তারপর ১৯৩০ থেকে ডাক্তার গোপালচন্দ্র কালিম্পংয়ের অধিবাসী হন। তিনি বলেন এই স্থান পরিবর্তন তাঁর জীবনে একটি বিরাট আশীর্বাদ ও শুভ সূচনা এনে দিয়েছে। কারণ মুঙ্গেরে থেকে গেলে হয়ত বিশ্বকবিকে চিকিৎসা করার সুযোগ আসত কিনা সন্দেহ।

‘প্রথম আলোর চরণ ধ্বনি’ তিনি শুনতে পেলন ১৯৩৮ সালের এপ্রিল মাসে। বিশ্বকবি কালিম্পং-এ আসবেন। তাই গিরিবাসীদের মধ্যে বেশ সাজ সাজ রব। আর ডাক্তার দাশগুপ্তের মনে একটি অনির্বচনীয় শিহরন! তিনি বলেন — শহরে ঢোকার মুখেই তাঁর বাড়ি ‘মাতৃমন্দির’। ওয়াটার কবিকে অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুতির ব্যাপারে ব্যস্ত।

কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ, প্রতিমা ঠাকুর, কবির সেক্রেটারি সুধাকান্ত রায়চৌধুরী, অনিল চন্দ, “আলু” বাবু ও আর কয়েকজন ১৯৩৮ সালের ২৫ এপ্রিল এলেন এবং “গৌরীপুর হাউসে” উঠে ওখানে বাসোপযোগী ব্যবস্থাদি করেন।

২৬ এপ্রিল (১৯৩৮) রবীন্দ্রনাথ কালিম্পংয়ে পদার্পণ করলেন। অসংখ্যা ফুলের মালায় ও শঙ্খধ্বনিতে কবিকে সাদর সংবর্ধনা জানালেন পাহাড়িয়া ও সমতলী অধিবাসিবৃন্দ। ২৭ এপ্রিল কবির সচিব সুধাকান্তবাবু ডাক্তার দাশগুপ্তের সঙ্গে কথাবার্তা বলে যান এবং তিনিও সুযোগ বুঝে কবির সচিবের কাছ থেকে রবীন্দ্রদর্শনের অনুমতি নিয়ে রাখলেন।

২৯ এপ্রিল (১৯৩৮) তিনি সস্ত্রীক দুই শিশুপুত্র-সহ কবি-সন্দর্শনে যান “গৌরীপুর হাউসে”। বারান্দায় রবীন্দ্রনাথ সপারিষদ খুশি মেজাজে বসে আছেন। পাশের সংলগ্ন ‘লনে’ দর্শনপ্রার্থী জনমণ্ডলী অপেক্ষমাণ। বাঙ্গালি ছাড়াও সেখানে রয়েছেন নেপালি, ভুটানি, তিব্বতি, বিহারি ও আরও অনেক মানুষ। ব্যবসায়ী, মারোয়াড়ি ও আরও কত লোক! তাঁরা কবিকে কাছে দেখা এবং তাঁর মুখনিসৃত বাণী শুনবার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষ্যমাণ। এসবের ফাঁকে সুধাকান্তবাবুর দৌলতে ইজি চেয়ারে উপবিষ্ট বিশ্বকবিকে ডাক্তার গোপালচন্দ্র সপরিবারে প্রণাম করে ধন্য হলেন। ডাক্তারবাবুর শিশু সন্তান দুটিকে কবি তাঁর হাঁটুর উপর বসিয়ে স-চুম্বন আদর করতে লাগলেন। এদিকে ওরাও সুযোগ পেয়ে কবিদাদুকে ঘন শুভ্র আলুলায়িত শ্মশ্রূ গুম্ফরাজি অবলীলাক্রমে ও অসঙ্কোচে অবিন্যস্ত করে দিচ্ছিল। কবিতে শিশুতে কী মহামিলন আর উভয়তই কত খুশি খুশি ভাব। শঙ্কা আর সঙ্কোচ শুধু ডাক্তার দম্পতির মন। এ দৃশ্য অতুলনীয় ও অপার্থিব!

ডাক্তার দাশগুপ্ত কবির শারীরিক অবস্থা কেমন জিজ্ঞেস করায় তিনি বললেন, — “দেখো ডাক্তার, অনেকেই আমার শতায়ু কামনা করেন বটে, কিন্তু আমি ভাবি কি জান? ক্ষীয়মাণ ইন্দ্রিয়সমূহ অচল, অকেজো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির ক্রমবর্ধমান অবক্ষয় নিয়ে দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকা বড্ডই বিড়ম্বনা। তার চেয়ে সবকিছু অটুট থাকতে চলে যাওয়াই তো ভাল। কি বল ডাক্তার?” ডাক্তার একমত না হয়ে বললেন, “আমি তা বলব না। মন ভাল রাখুন, আমার ওষুধ খান, সুস্ত হয়ে যাবেন। তখন সুস্থ দেহ মন ইয়ে আপনি আপনারই কথায় আবার বলে উঠবেন — ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভূবনে।’ ঈষৎ হেসে কবি বললেন — ‘বাইরের অপেক্ষমাণ দর্শকদের একজন করে ডেকে আন’। সবাই একে একে এস কবিকে প্রণতি জানিয়ে চলে গেলেন। সবাই কৃতার্থ বোধ করলেন এবং আঙিনায় জনমণ্ডলীকে উদ্দেশ করে কবি তাঁর কবিতা পড়ে শোনালেন। আর সুধাকান্তবাবু সরল হিন্দিতে তা বুঝিয়ে বলে দিলেন। তার মধ্যে একটি কবিতা ডাক্তারের এখনও স্মরণে রয়েছে। সেটি হল — ‘এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে’। এরপর ওই আঙিনায় সকলকে নিয়ে কবির অভিপ্রায়ানুযায়ী গ্রুপ ফটো তোলা হল। একটি অভূতপূর্ব ও নিরবচ্ছিন্ন আনন্দের দিন বিশ্ববিশ্রুত কবির সঙ্গে থেকে কেটে গেল। আর রেখে গেল ডাক্তার পরিবারের ও অন্য সকল দর্শকের অন্তরের অন্তস্তলে এক অনবদ্য ও আপনের সুখ-স্মৃতি। ডা. দাশগুপ্তর মতে আপাত-আনন্দের মধ্যেও কবির মনে যেন একটা বিমর্ষভাব স্বতন্ত্রভাবে আড়াল করে ছিল।

১৯৩৯ সালে কবি কালিম্পংয়ে স্বল্প সময় থেকে মংপুতে চলে যান এবং সেখানে মৈত্রেয়ী দেবীর বাসভবনে কিছু দিন অতিবাহিত করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মত কালিম্পং শহরে এলেন সদলবলে ১৯৪০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, — এই “গৌরীপুর ভবনে”। অসুস্থতার কারণে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ আসেননি। এবার কিন্তু কবি বেশ অসুস্থ, অন্যান্য বারের তুলনায়। ২৫ সেপ্টেম্বর সকালবেলায় ডা. দাশগুপ্তের ডাক পড়ল। তিনি গিয়ে দেখেন কবি প্রতিমা দেবীর সঙ্গে গল্প করছেন, বিষয় নিরামিষ আহার বনাম আমিষাহার। কবি নিরামিষাহারের পক্ষে এবং তিনি মাছ মাংস বহুদিন যাবৎ খান না। তিনি বলেন — আমিষাহার করলেই তাঁর পেটের গোলমাল দেখা দেয়। কিন্তু তিনি সখেদে বলেন — ‘কি করব, বিধান রায় তো আমিষাহারই করতে বলেছেন — তাই অগত্যা মাছ মাংস খাচ্ছি।’ ডাক্তার দাশগুপ্ত বললেন, ‘বিধানবাবুর বিধান শিরোধার্য, তিনি আমার গুরুদেব, তবু তাঁর অধম শিষ্য হিসাবে বলছি — আপনি মাছ মাংস খাওয়া আপাতত বন্ধ রাখুন।’

তারপর রবীন্দ্রনাথ যে নিজে এক নম্বর হোমিওপ্যাথি ভক্ত সে কথাটাও বলে ফেললেন। তিনি বলেন, ‘পেটের যে কোন যন্ত্রণা লাঘব হবে নাক্সভমিকা খেলে। আর তাতে যদি আশু ফল না পাওয়া যায় তবে বায়োকেমিক ওষুধ ক্যালি ফস খেলে পেটের যে কোন ব্যাধির উপশম হতে বাধ্য! এমন কি স্প্যাসমোজিক কনট্রাকশন বা গ্রিপিং পেইন যদি পেটে হয় তবে ঐ দুইটি ওষুধ একদম ধন্বন্তরির কাজ করবে। আমি এসব ওষুধ সব সময় সঙ্গেই রাখি।’ এসব কথা শুনে অ্যালোপ্যাথিক ডাক্তার গোপালচন্দ্র ভাবছেন, তাহলে আবার আমায় ডাকা কেন? ডাক্তার ভীরু কণ্ঠে বললেন, — ‘আপনি আমার ওষুধ খাবেন তো?’ কবি বললেন, ‘নিশ্চয়ই খাব’। কিন্তু কবি এর বেশি কিছু বললেন না। তখন ডাক্তারবাবু — ‘কারমোনেটিক মিকশ্চার’ খেতে দিলেন এবং নিরামিষ পথ্যের ব্যবস্থা দিয়ে চলে গেলেন।

২৫ সেপ্টেম্বর (১৯৪০) দুপুরে আবার ডাক্তারবাবুর ডাক এল। জরুরি ‘কল’। এবারে গিয়ে দেখেন কবি সব কিছু দেখছেন শুনছেন, কিন্তু তিনি নির্বাক — মৌন। মনে হয় যেন তিনি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোন অসহ্য বেদনাকে চুপ করে হজম করে ফেলতে চাইছেন। ওবেলায় কথা বলার সময় ডাক্তারবাবু বুঝতে পেরেছিলেন কবির গ্রিপিং পেইন হয়। তদনুসারে তিনি ওবেলার প্রেসক্রিপশন-এর সঙ্গে আর একটা বেদনা কমাবার ওষুধ — অর্থাৎ টি, আর হায়োসায়ামাস — এটাও কবিকে খেতে দিলেন। কিন্তু তাতেও কোন ইতরবিশেষ নেই। কবির অবস্থা যেই সেই, মুখে কথা নেই। তখন মৈত্রেয়ী দেবী ও প্রতিমা দেবীর কথা মত স্থানীয় মিশনারি হাসপাতালের ডা. ক্রেইগকে ডাকা হল। কবির মৌন অবস্থা দেখে মিশনারি ডাক্তার কিছুই বুঝতে না পেরে চলে যান। ঐ অবস্থায় ডাক্তার দাশগুপ্তর ওষুধই চলতে থাকল। প্রতিমা দেবী আর মৈত্রেয়ী দেবীর অনুরোধে ডাক্তারবাবু রাত্রে পাশের ঘরে রইলেন। রাত্রিটা ভালয় ভালয় কেটে গেল। পরদিন (ছাব্বিশ সেপ্টেম্বর) সকালে ডাঃ ক্রেইগকে আবার ডাকা হল, কিন্তু তিনি কথা না বলা রোগীকে দেখতে চান না। সকালে অবশ্য কবির অবস্থা একটু ভাল দেখে ডা. দাশগুপ্ত বাড়ি ফিরলেন। যদিও নীরব কবি তখনও।

কিন্তু ঐদিন দুপুরে আবার জরুরি খবর এল ডাক্তার দাশগুপ্তের কাছে — কবি খুব ঘন ঘন বাথরুমে ছুটে যাচ্ছেন। ডাক্তারের ধারণা হল ডায়ারিয়া বা ডিসেনট্রি হল নাকি আবার! তাছাড়া তিনি ভাবলেন গ্রিপিং পেইনটা বাড়তে পারে অথবা কিডনির কোন গোলমালে প্রস্রাব আটকে গিয়ে কবি কষ্ট পাচ্ছিলেন — এবার বোধ হয় পরিষ্কার হয়েও যেতে পারে। এইসব ভেবে ডাক্তারবাবু ‘গৌরীপুর হাউসে’ গিয়ে দেখেন কবি তখনও নির্বাক — কিছুই বলছেন না। কী ভীষণ বিপদের কথা! রথীন্দ্রনাথ এখানে নেই। তখন ডাক্তার দাশগুপ্ত প্রতিমা ও মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে পরামর্শ করে কলকাতায় অধ্যাপক প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে তার করে জানালেন যাতে বড় ডাক্তার নিয়ে তিনি সত্বর চলে আসেন। এদিকে দার্জিলিংয়ের সিভিল সার্জেনকেও ডাকা হল। ইউরোপীয় সাহেব ডাক্তার এসে কবিকে পরীক্ষা করে বললেন যে কবির প্রস্রাব মূত্রাশয়ে আটকে জমে গিয়েছে এবং প্রোস্টেট গ্লান্ডও ফুলে গেছে। তিনি বললেন — এক্ষুনি অপারেশন দরকার। ডাক্তার বিধান রায়কে না জানিয়ে অস্ত্রোপচার চলবে না শুনে সিভিল সার্জন রেগে বললেন — ‘I am the attending physician on the spot now. So I say — immediate operation is essential — no delay.’ ইউরোপীয় ডাক্তারের এই স্পর্ধিত ব্যবহারে বিশেষ বিরক্ত হলেন প্রতিমা দেবী। ডাক্তার দাশগুপ্ত অবশ্য সিভিল সার্জনের অনুমতি নিয়ে কেথিটারের সাহায্যে প্রস্রাব করাবার চেষ্টা করেও বিফল হলেন। তখন প্রতিমা দেবীর অভিপ্রায়ে সিভিল সার্জনকে ‘ফি’ দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হল। সিভিল সার্জন বেশ একটু মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে চলে গেলেন। রাত্রি তখন প্রায় ৯টা। এরপর ডাক্তার দাশগুপ্তের তো মহাভাবনা, —’একা মানে তো বোকা, রোগী তো আর কেউ নন — স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। মিশনারি ডাক্তার ও সিভিল সার্জন তো আর ‘কল’ দিলেও আসবেন না। কী সাংঘাতিক দায়িত্ব — বলুন দেখি! যদি রাত্রে ইউরোমিয়া হয়ে একটা অঘটন ঘটে যায় তাহলে তো সমস্ত দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে হবে — আর সেই কলঙ্ক — অর্থাৎ মহাগুরু নিপাতের অভিশাপ আমার মাথায় চিরদিনই বহন করতে হবে।’ ডাক্তারবাবু বলেন, ‘কবি লিখেছেন, “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, — বিপদে আমি না যেন করি ভয়”, কিন্তু আমি ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছিলাম তিনি যেন এই বিপদে আমাকে রক্ষা করেন। পাশের ঘরে ডাক্তার অন্য দুজন সঙ্গী-সহ বিনিদ্র দুঃস্বপ্নের রাত্রি কাটাচ্ছেন। তিনি যে ওষুধ দিয়েছিলেন সেগুলি প্রহরে প্রহরে প্রতিমা ও মৈত্রেয়ী দেবী কবিকে খাইয়ে দিচ্ছিলেন ডাক্তারের কথা মত। ডাক্তার নিজেও বার বার উঠে কবিকে দেখে যাচ্ছিলেন। এ দিকে মাঝরাতের দিকে কবি বাথরুমে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে প্রস্রাব করলেন — সেই সঙ্গে কবির নির্বাক দহনজালা উপশমিত হল। শুধু কবিই নন, ডাক্তার-সহ “গৌরীপুর হাউসের” সবাই স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। রোগমুক্তির দরুন কবি তখন হাল্কা মনে হেসে সবার সঙ্গে কথা বলেন এবং রসিকতার সঙ্গে মৈত্রেয়ী দেবীকে ডেকে বললেন, “শোন, তুমি তো আমাকে দিনরাত দেখাশুনা করছ, কত পরিচর্যা করছ, আর তোমার স্বামী বেচারী মংপুতে বসে শুধু কড়ি বড়গা গুনছে …।” সমস্ত বাকি রাতটা কবি-সহ সবাই জেগে খোসগল্পে কাটিয়ে দিলেন।

এই বিনিদ্র ভয়ানক রাত পোহাল, ২৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রভাত হল। সকালেই কলকাতা থেকে এসে পৌঁছে গেলেন অধ্যাপক প্রশান্ত মহলানবিশ — সঙ্গে আছেন দুজন প্রখ্যাত ডাক্তার — ডা. সত্যসখা মৈত্র, এফ-আর-সি-এস (অধ্যক্ষ হেরম্ব মৈত্রের ভ্রাতুষ্পুত্র) এবং ডা. অমিয় বসু, এম-আর-সি-পি এবং অন্যান্য কয়েকজন। গোপালবাবু ডা. মৈত্রের ছাত্র। এই দিনই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ শেষবারের মত সপরিষদ কলকাতা অভিমুখে যাত্রা করেন। তার পরের বছরই তো বিশ্বের কবিসূর্য অস্তাচলগামী হলেন — আর কালিম্পংয়ের সৌন্দর্য কবিকে হাতছানি দিয়ে ডেকে আনবে না। ‘মরণ রে তুঁহু মম শ্যাম সমান’ — মৃত্যুর প্রতি কবিকে কি একটা আমন্ত্রণী আকর্ষণ ছিল? ডাক্তার দাশগুপ্তকে কবি বলেছিলেন — ‘আমি শতায়ু হতে চাই না।’ কবি ১৯৪০ সালে কালিম্পংয়ে বসেই হয়তো বুঝেছিলেন যে তাঁর নিমন্ত্রিত আরাধ্য মরণ দেবতার আগমন দূরবর্তী নয়।

কালিম্পংয়ের কবি-চিকিৎসত ডা. গোপালচন্দ্র দাশগুপ্তের জীবনে রবীন্দ্র-দর্শন ও রবীন্দ্র-সেবার চির আকাঙ্ক্ষিত আকুতি পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল। এবং তাঁর অদ্ভুত অসুস্থতায় ডাক্তারবাবু এবং পারিষদবর্গের সশঙ্কিত দুর্ভাবনা এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের সৃষ্টি করে যায়। কে জানে কবির মহাপ্রয়াণ ১৯৪০ সালেই ঐ পাহাড়ি শহরে না ঘটার জন্য ডা. দাশগুপ্তর চিকিৎসা ও যত্ন কতটা কাজ করেছে! বিশ্ব-নিয়ন্তাই তা জানেন। আজ কবির তিরোধানের পরে প্রশ্নটা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হয়।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev