আজ গোটাদেশে উদযাপিত হচ্ছে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ১২৬তম জন্মদিন। এরঠিক একদিন আগেই ২২শে জানুয়ারি সুভাষচন্দ্রের সহপাঠী ও সুহৃদ দিলীপকুমার রায়ের জন্মদিন। দুজনের জন্মসাল এক হলেও (১৮৯৭) দুই বন্ধুর সাধনার পথ ভিন্ন। ২২ জানুয়ারি দিলীপকুমার রায়ের মানস কন্যা উমা বসুর ও জন্মদিন। এক অদ্ভুত মিল দুজনের মধ্যে। গুরু শিষ্যার জন্ম একই দিনে — মাঝে ব্যবধান ২৪ বছরের।
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অবিস্মরণীয় জুটি। এক সময় বাংলা গানের ভুবন মাতানো এই কিন্নরী (২২ জানুয়ারি ১৯২১) কলকাতার এক অভিজাত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। মাতা প্রভা বসু ও পিতা ধরণী কুমার বসু। ডাকনাম হাসি। ধরণীকুমার ছিলেন খ্যাতনামা স্থপতি ও কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর। উমা বসুর পিতামহ বসন্তকুমার বসু ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের লব্ধপ্রতিষ্ঠ উকিল এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতি।
ছোট থেকেই সঙ্গীতের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল উমার। মাত্র আট বছর বয়সে মাসির সঙ্গে ইউনিভার্সিটিতে আব্দুল করিম খাঁর গান শুনতে গিয়ে মোহাবিষ্ট হয়ে পড়েন উমা। গানের তালিম শুরু হয় নামী শিল্পী হরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। কিছুদিনের মধ্যেই গুরু বুঝতে পারেন শিষ্যার প্রতিভা।
ছোট্ট মেয়েটি মাস্টার মশাইয়ের কাছে তালিম নিয়ে অতুলপ্রসাদ সেনের গান গায়। সুরের স্বাভাবিক মাধুর্য, তান, লয় সহযোগে দরদী কণ্ঠ শুনে উচ্ছ্বসিত মাষ্টার মশাই তার সঙ্গে রেকর্ডই করে ফেললেন সেই গান — ‘মেঘেরা দল বেঁধে যায় কোন দেশে।’ গুরু শিষ্যার গানের রেকর্ডটি বেরোয় ১৯৩২ এ অর্থাৎ মাত্র ১১ বছর বয়সে প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বের হয় তাঁর।
স্বজনবন্ধুদের এক মিলনসভায় অতুলপ্রসাদ সেন উমার গান শুনে বলেছিলেন, ‘কংক্রিটের মধ্যে যে ঝর্ণা প্রবাহিত হচ্ছে.’ আসলে বাবা ধরণীবসু ছিলেন কাঠখোট্টা ইঞ্জিনিয়ার, তাই হয়তো পরিহাসের লক্ষ্যেই কংক্রিট শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন সেন মহাশয়।
১৯৩৬ সালে জসীমউদ্দীনের কথা-সুরে ‘আমি কেন তারে মন রে দিলাম’ আর ‘জল খেলিতে যমুনাতে যাই ‘ভাটিয়ালি গান দুটি রেকর্ড হয়। সেদিন ষোড়শীর এই অভিসারিকা — অভিজাত গাম্ভীর্যের কন্ঠস্বরে ঢেউ তুলেছিলেন শ্রোতাদের হৃদয়ের যমুনার জলে।
ন-বছর বয়সে দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে শিবনাথ শাস্ত্রী কন্যা হেমলতা সরকারের বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে উমার দেখা হয়। সেখানেই তার কণ্ঠে ‘এখনো গেলো না আঁধার’-এর মতো কঠিন গান শুনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আপ্লুত রবীন্দ্রনাথ নিজের আসন ছেড়ে কাছে টেনে নিয়েছিলেন ছোট্ট হাসিকে। পরে ১৯৩৫-এ দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের তত্বাবধানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দুটি একক গান রেকর্ড করা হয় উমার গলায়, ‘সেই ভালো সেই ভালো’, এবং ‘তোমার সুর শুনায়ে যে ঘুম ভাঙাও।’ রেকর্ড প্রকাশের সময় উমার শংসাবাক্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন তার স্বতন্ত্র কণ্ঠমাধুরীর কথা।
এদিকে পন্ডিচেরির সাধকজীবন থেকে সাময়িক বিশ্রাম নিতে বাংলায় ফিরলেন দ্বিজেন্দ্র পুত্র সঙ্গীতস্রষ্টা, শিল্পী, চিন্তাবিদ দিলীপ কুমার রায়। বাংলা গান আধুনিকতার ছোঁয়া পায় তার কথা ও সুরের হাত ধরে।
বন্ধু হরেন্দ্রনাথের ছাত্রী উমার গান শুনলেন দিলীপ রায়। বুঝলেন এবারের কলকাতাবাস তার দীর্ঘ হবে। গান শেখানোর তালিম শুরু করলেন।
প্রিয় শিষ্যার জন্য তৈরি হলো ‘আকুলে সদাই চলো ভাই’, ‘জীবনে মরণে এসো’, নির্ঝরিনী, ‘আঁধারের ডোরে গাঁথা’, ‘রূপে বর্ণে ছন্দে মধু মুরোলি বাজে…’এর মতো অসাধারণ কম্পোজিশন।

কলকাতায় শরৎ বসুর উডবার্ন পার্কের বাড়িতে ১৯৩৮-এর বসন্তে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং উপলক্ষ্যে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আগত অতিথি ছিলেন স্বয়ং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ীতে বসতো প্রার্থনাসভা। সেই সুবাদে সেখানে যাতায়াত ছিলো দ্বিজেন্দ্র পুত্র দিলীপ কুমার রায়ের। গান্ধী ছিলেন দিলীপ কুমার রায়ের গানের অনুরাগী। তবে এবারের সভায় গান্ধীজির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে গান শোনালেন সতেরো বছরের রোগা, লাজুক, সুধাকণ্ঠী দিলীপ কুমারের শিষ্যা। মীরার ভজন — ‘মেরে তো গিরিধর গোপাল..’ এমন আকুল ভক্তির কণ্ঠস্বর শুনে উচ্ছ্বসিত হলেন গান্ধী। ‘নাইটিঙ্গেল অব বেঙ্গল’ নাম দিলেন তাকে মহাত্মা। বাংলার “বুলবুল” নামেই পরিচিত হন এই সুধাকণ্ঠী — উমা বসু।
মহাত্মার কিশোরী বুলবুলকে নিয়ে গান লিখে ফেললেন দিলীপ কুমার, ‘বুলবুল মন ফুল সুরে ভেসে /চল নীল মঞ্জিল উদ্দেশে।’ শুধু বাঙালি শ্রোতা নয়, গোটা ভারত বিস্ময়ে শুনলো হাসির ‘শ্যামল ছন্দ কাঁপন।’
এরপর ব্যারাকপুরে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে বুলবুলকে নিয়ে সেই গান শোনানো হল গান্ধীকে। পরে পেশোয়ারে সীমান্ত গান্ধীর বাড়িতেও গান্ধীকে মীরার ভজন শোনালেন উমা, ‘চাকর রাখো জি।’
গান্ধীজি শুধু নন, সুভাষচন্দ্র বসুকেও গান শুনিয়েছিলেন এই বুলবুল। ব্যারাকপুরের কাছে এক বাগানবাড়িতে অনুষ্ঠিত আসরে দিলীপকুমার রায়ের তত্ত্বাবধানে গান গেয়েছিলেন উমা বসু। তবলায় সঙ্গত করেছিলেন জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। ওই আসরের আরও আকর্ষণ ছিল অমলা নন্দীর (অমলাশঙ্কর) নাচ!
একদিকে ভাটিয়ালি, অন্যদিকে কীর্তন আবার একদিকে রামপ্রসাদী অন্যদিকে গজল — কি অসাধারণ আত্মসমর্পণ ছিল গানের প্রতি এই সাধিকার। বাংলা গানে ‘দৈলিপী ঢং’ গানের প্রেরণা এই তরুণী। ঘন্টার পর ঘন্টা অনুশীলন করে গেছেন। বিস্ময়ে জ্ঞান প্রকাশ ঘোষ ভেবেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে রেওয়াজে বসে পায়ে ঝিন ধরে যায় না এই মেয়ের! ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে প্রথাগত তালিম পেয়ে নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করেন উমা। গেয়েছিলেন উর্দু গজলও। এক সময় দিলীপ রায়ের মনে আশঙ্কা জেগেছিল তবে কি বাংলা কাব্যগীতি ভুলে যাবে উমা! কুড়ি বছরের মেয়ে আশ্বস্ত করেছিলেন গুরুকে — জানিয়েছিলেন সমস্ত সুরের কাছেই সে নত হতে চায়। শিষ্যার কাছে গুরুও দীক্ষা পেলেন ‘আত্ম আবিষ্কারের।’
শিলং থেকে শিলচর যাওয়ার পথে, ১৯৩৯ জুলাই মাসে এক বাস দুর্ঘটনায় মারা গেলেন বাবা ধরণী কুমার বসু। তার ঠিক এক বছর বাদে টাইফয়েডে চলে গেল তার একমাত্র ভাই বাবুল। ১৯ বছরের মেয়েটা মানসিকভাবে একবারে ভেঙে পড়লো, বাঁচতে আর ইচ্ছা করতোনা উমার। সঙ্গে শারীরিক অসুস্থতাও বাড়তে শুরু করে।
১৯৪১-এর মে মাসে ধরা পরল টিবি। কণ্ঠ প্রায় রুদ্ধ। শিষ্যার রোগ শয্যার পাশে বসে সুরে সুরেই তার ক্ষতে প্রলেপ দেওয়ার চেষ্টা করেন গুরু দিলীপ রায় কিন্তু নিরাময় হলো না। তার জন্য তৈরি করা কিছু গান জনসম্মুখে আর কোনদিন গাইতে পারেননি দিলিপ।
কলকাতায় আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় হাসিকে নিয়ে যাওয়া হয় রাঁচিতে। সেখানেই ১৯৪২ সালে ২২শে জানুয়ারি মাত্র ২১ বছর বয়সে “বুলবুল” জীবন খাঁচা থেকে মুক্তি পেয়ে চলে যান মহাপ্রস্থানের পথে। ‘জন্মদিন মৃত্যুদিন দোঁহে একাকার’ হলো ২২ জানুয়ারিতে।
‘সারেগামা’ তাঁর ২১টি গানের সিডি প্রকাশ করেছে কিন্তু তাতেও অসমাপ্ত থাকে রেকর্ড। ১০২ বছর জন্মশতবার্ষিকীতে ক্ষণজন্মা এই প্রতিভাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
অসাধারণ প্রতিবেদন????????????????????????
ধন্যবাদ ????