অভিযোগ, রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছেন। প্রমাণ হিসেবে গড়ের মাঠের যে সভার কথা বলা হল, যে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তা ধোপে টিকল না। কবে হয় সভাটি?
১৯১২ সালের ২৮ মার্চ।
কিন্তু সেদিন রবীন্দ্রনাথ তো শিলাইদহে। ঘটনাচক্রে। না হলে সেদিন তাঁর জাহাজে থাকার কথা। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ কলকাতা থেকে ‘সিটি অব প্যারিস’ জাহাজে তাঁর ইংল্যাণ্ড যাওয়ার কথা। ১৮ মার্চ জাহাজে তুলে দেওয়া হল মালপত্র। তারপর কি হল, তার বর্ণনা শোনা যাবে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের মুখে :
“জাহাজ ছাড়বার আগের দিন রাত্রে স্যার আশুতোষ চৌধুরীর বাড়িতে বাবার নিমন্ত্রণ। কেবল খাওয়া-দাওয়া নয়, সেই সঙ্গে ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ অভিনয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। দীনেন্দ্রনাথ বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করলেন। অসুস্থ শরীরে বাবাকে অনেক রাত অবধি জাগতে হল। আমরা ঘরে ফিরলাম বেশ রাত করে। বাকি রাতটুকু বাবা না ঘুমিয়ে চিঠির পর চিঠি লিখে কাটিয়ে দিলেন। ভোরবেলা উঠে বাবার শরীরের অবস্থা দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম, ক্লান্তিতে অবসাদে যেন ধুঁকছেন। তাড়াতাড়ি ডাক্তার ডাকতে পাঠানো হল। জাহাজ আমাদের জিনিসপত্র সমেত যথাসময়ে পাড়ি দিল, কিন্তু আমাদের সে যাত্রা আর যাওয়া হল না।” (রবিজীবনী-ষষ্ঠ খণ্ড/প্রশান্তকুমার পাল)
তারপর ডাক্তারের পরামর্শে বিশ্রাম নেবার জন্য রবীন্দ্রনাথ চলে গেলেন শিলাইদহ। ২৪ মার্চ। তার প্রমাণ?
প্রমাণ ঠাকুরবাড়ির ক্যাশবই-এর হিসেব। প্রমাণ ২৫ মার্চ শিলাইদহ থেকে কাদম্বিনীদেবীকে লেখা চিঠি। প্রমাণ ২৮ মার্চ শিলাইদহ থেকে জগদানন্দ রায়কে লেখা চিঠি।
তাহলে এই ২৮ মার্চ ছাড়া অন্য কোন দিন কি রবীন্দ্রনাথ কোন সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী জেহাদে অংশগ্রহণ করেছিলেন?
‘দুর্ভাবনা ও ভাবনা’ বইতে ড. আকবর আলি খান বলছেন, ‘এই তারিখ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ অন্য কোন তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী কোন সভায় অংশ নিয়েছেন, এ রকম কোন তথ্য রবীন্দ্র-বিদ্বেষীরা এখনও পর্যন্ত পেশ করতে পারেন নি’।
অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের বই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশি বছরে’ও তার কোন প্রমাণ নেই।
তবে অভিযোগ যদি হত ‘রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে নীরব ছিলেন’, তাহলে নতমস্তকে সে অভিযোগ মেনে নিতে হত। রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতার যেমন কোন প্রমাণ নেই, তেমনি তাঁর সক্রিয়তারও কোন প্রমাণ নেই। ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তব প্রয়োজন ছিল। উচ্চ শিক্ষার জন্য সেখানকার ছেলে-মেয়েদের আসতে হত সুদূর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। যে রবীন্দ্রনাথ মুসলমান ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে এত আগ্রহী ছিলেন, কেন তিনি তাদের জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে সক্রিয় ও সরব হলেন না? তবে কি নিজের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবনা তাঁকে নীরব রেখেছিল? দেবতা নন রবীন্দ্রনাথ, রক্তমাংসের মানুষ, এটুকু মানবিক দুর্বলতা তাঁর পক্ষে অস্বাভাবিক নয়।
মুসলমানদের ঘৃণা করতেন রবীন্দ্রনাথ, তাদের প্রতি বিদ্বিষ্ট ছিলেন, এ রকম অভিযোগে জল ঢেলে দিয়েছেন অধ্যাপক ভুঁইয়া ইকবাল। তিনি একঝুড়ি চিঠি সংগ্রহ করে দেখিয়ে দিয়েছেন মুসলমান লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ থেকে সাধারণ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রীকে চিঠি লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। সেসব চিঠিতে নির্মল প্রীতি বিচ্ছুরিত। ইকবালসাহেবের ‘রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ’ বইটিতে একরামুদ্দিন, কাজি আবদুল ওদুদ, স্যার আজিজুল হক, হাসান সোহরাওয়ার্দি, শাহেদ সোহরাওয়ার্দি, গোলাম মোস্তফা, আবুল কালাম শামসুদ্দিন, জসিম উদ্দিন, আবুল ফজল, বন্দে আলি মিয়া, মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন, সুফিয়া কামাল প্রভৃতিকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি গ্রন্থিত হয়েছে। সৈয়দ মুজতবা আলিকে তিনি শান্তিনিকেতনে আনেন পড়ার জন্য, মৌলানা জিয়াউদ্দিনকে নিযুক্ত করেন শিক্ষক হিসেবে, নজরুল ছিলেন তাঁর স্নেহভাজন। আমাদের এই বই-এর অন্য একটি অধ্যায়ে আমরা মুসলমান লেখক প্রভৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের স্নেহ-সম্পর্কের ছবি তুলে ধরেছি।
পাকিস্তানবাদী সাহিত্যতত্ত্বের প্রচারকরা বিশেষ একটি উদ্দেশ্যে, অবশ্যই সেটা ধর্মীয় উদ্দেশ্য, আক্রমণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। কিন্তু আবুল ফজলের মতো কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে যৌক্তিক অভিযোগ উত্থাপন করেন নি। আবুল ফজল রবীন্দ্র সাহিত্যে মুসলমান জীবনচিত্রণের এবং বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কথা বলেন। রবীন্দ্রনাথ আবুল ফজলের প্রথম অভিযোগ স্বীকার করে নেন এবং প্রতিবেশী মুসলমানদের জীবনের শরিক হতে পারেন নি বলে দুঃখ প্রকাশ করেন। বাংলা ভাষায় আরবি ফারসি শব্দের ব্যবহার সম্পর্কেও তিনি তাঁর মত প্রকাশ করেন এবং আমরা দেখতে পাই তাঁর মতের সঙ্গে ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহের মতের আশ্চর্য মিল। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক