১৯৪২ সালের ৩০ আগস্ট কলকাতার ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার অফিসে এক ঘরোয়া বৈঠকে মিলিত হন কয়েকজন মুসলমান লেখক ও ছাত্র। ‘দৈনিক আজাদ’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন মওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ (Maulana Muhammad Akram Khan)। ঘরোয়া বৈঠকে তৈরি হয় একটি সোসাইটি, যার নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ (East Pakistan Renaissance Society)। প্রথম দিকে আকরম খাঁ সহ এই সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন মোট ১১জন। সভাপতি ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন এবং সম্পাদক ছিলেন মুজিবর রহমান খাঁ। হবিবুল্লাহ বাহার, মোহাম্মদ খায়রুল আনাম খাঁ ছিলেন বিশিষ্ট সদস্য।
লাহোর প্রস্তাবের ফলশ্রুতি হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনা থেকে রেনেসাঁ সোসাইটির ভাবনা জন্ম লাভ করে। সোসাইটির সদস্যরা মনে করতেন যে সাহিত্যের মাধ্যমে উদ্দীপ্ত হতে পারে পাকিস্তানি চেতনা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সোসাইটি বিভিন্নভাবে প্রচার শুরু করে; যেমন বিতর্কসভা, বক্তৃতা, রচনাপাঠ, আলোচনা, গবেষণা, পুস্তক রচনা। সোসাইটির সদস্য লেখকরা ভাষার ক্ষেত্রেও স্বাতন্ত্র্য অবলম্বন করার চেষ্টা করেছিলেন। এঁরা আরবি-ফারসি-উর্দু মিশ্রিত বাংলা ব্যবহারের পক্ষপাতী ছিলেন।

মওলানা মুহাম্মদ আকরাম খাঁ
সোসাইটির প্রথম বার্ষিক সম্মেলন হয় ১৯৪৪ সালের জুলাই মাসে। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। এই সম্মেলনে সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে মোট ১১ টি শাখায় আলোচনা ও প্রবন্ধ পাঠের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন, খাজা শাহাবুদ্দিন, শহিদ সুহরাওয়ার্দি, হাসান সুহরাওয়ার্দি, নুরুল আমিন, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, এ.কে. ফজলুল হক, আবুল কাশেম, তমিজুদ্দিন খাঁ, শাহাদৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, এস ওয়াজেদ আলি, আবু জাফর শামসুদ্দিন, আবুল হোসেন, গোপাল হালদার, গোলাম কুদ্দুস, সুভাষ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি।
সোসাইটির আহ্বায়ক ছিলেন মুজিবর রহমান খাঁ (Mujibur Rahman Khan)। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. এম. সাদিকের সঙ্গে সহযোগিতায় মুজিবর রহমান খাঁ ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন যার নাম : Eastern Pakistan : Its Population, Delimination and Economics. এখানে উল্লেখযোগ্য যে রেনেসাঁ সোসাইটি পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁরা কল্পিত এই রাষ্ট্রের সরকার, অর্থনৈতিক উৎস, জনশক্তি, ভৌগোলিক সীমানা, নিরাপত্তা ব্যবস্থারও খসড়া প্রস্তুত করেছিলেন।
সোসাইটির মূল নীতিগুলি এ রকম : —
১] জাতীয় রেনেসাঁর উদ্বোধক পাকিস্তানবাদের সাহিত্যিক রূপায়ণ
২] পাকিস্তানবাদ বিষয়ক বৈজ্ঞানিক ও মননমূলক বক্তৃতা, তথ্যানুসন্ধান ও গবেষণা প্রভৃতি বিষয়ে উৎসাহদান।
৩] বুদ্ধিজীবী, মহিলা ও ছাত্রদের মধ্যে পাকিস্তানি ভাবধারা সম্প্রসারণ।
৪] জাতীয় তমদ্দুনের উন্মেষক ও সহায়ক আন্দোলনের সঙ্গে অ্যাকাডেমিক যোগ সংরক্ষণ।
৫] সাহিত্যে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতিমূলক আবেদনের রূপায়ণ।
৬] পাকিস্তানবিরোধী সর্বপ্রকার সর্বপ্রকার প্রতিক্রিয়াশীল ভাবধারার বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি।
১৯৪৩ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ। এই সংসদ গঠনে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেন সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন ও সৈয়দ আলি আহসান। সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ পাশ করেন এবং তারপরে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সৈ্যদ আলি আহসান ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। নব্য শিক্ষিত তরুণদের সহায়তায় তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন সমর্থন করেন এবং টি এস এলিয়ট ও আইরিশ রিভাইভ্যালদের চিন্তাধারা, বাংলা পুঁথি সাহিত্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের সমন্বয়ে এক বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলেন।

কবি কায়কোবাদ
পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ মুসলমানদের সাহিত্যে ইসলামের আদর্শ ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন থাকবে এমন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুঁথি সাহিত্য ও গ্রামীণ সাহিত্যের আদর্শে এমন সাহিত্য রচনার পরামর্শ দেন যাতে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দ থাকবে সুপ্রচুর। ‘পাক্ষিক পাকিস্তান’ ছিল সাহিত্য সংসদের মুখপত্র, যার সম্পাদক ছিলেন মুসলিম লিগের ছাত্রনেতা নাজির হোসেন। রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার কথাও পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। মুসলমানদের ঐতিহ্য ও আদর্শকে উচ্চে তুলে ধরার জন্য সাহিত্য সংসদ কবি কায়কোবাদকে (poet Kaikobad) সংবর্ধনা জানায়।
হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘রেনেসাঁ সোসাইটির সাথে সাহিত্য সংসদের কোন নীতিগত পার্থক্য ছিল না, শুধু পার্থক্য ছিল এইখানে যে রেনেসাঁ সোসাইটি জীবনের সমস্ত ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতে উৎসাহী ছিল, আর সাহিত্য সংসদ উৎসাহী ছিল শুধু পাকিস্তানি সাহিত্য নিয়ন্ত্রণে। দুটি সংঘই ছিল সাম্প্রদায়িক ও প্রগতিবিমুখ। পাকিস্তানবাদ ছিল উভয় সংঘেরই মূলমন্ত্র’। (চলবে)
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক